আতঙ্কিত না হয়ে শান্তভাবে পরিস্থিতি সামলাতে হবে


অথর
পাঠকের কলাম   খোলা মতামত ডেক্স
প্রকাশিত :১৩ মার্চ ২০২০, ১২:৫৭ অপরাহ্ণ | পঠিত : 149 বার
0
আতঙ্কিত না হয়ে শান্তভাবে পরিস্থিতি সামলাতে হবে

মনোরোগবিদ্যার অধ্যাপক ডা. সালাহ্উদ্দিন কাউসার বিপ্লবের জন্ম ১৯৭২ সালের ২০ জানুয়ারি, ঢাকায়। তার পিতার নাম আলফাজউদ্দিন আহম্মদ ও মাতার নাম রহিমা খাতুন। ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করার পর তিনি মনোরোগবিদ্যায় উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করেন। এখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। ডা. সালাহ্উদ্দিন ওয়ার্ল্ড সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন (ডব্লিউপিএ)-এর ‘মাস মিডিয়া অ্যান্ড মেন্টাল হেলথ সেকশন’-এর প্রাক্তন সেকশন মেম্বার এবং বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক ‘মেন্টাল স্কিল কনসালটেন্ট’ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক পত্রিকা ‘মনের খবর’-এর সম্পাদক তিনি। সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) কর্র্তৃক করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবকে বৈশ্বিক

মহামারী হিসেবে ঘোষণা করা এবং বাংলাদেশেও করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে জনমনে যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে সেসব নিয়ে সঙ্গে কথা বলেছেন অধ্যাপক সালাহ্উদ্দিন কাউসার বিপ্লব। সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে করোনাভাইরাস। এখন পর্যন্ত ১২৩টি দেশে এই ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত করা হয়েছে। সর্বশেষ হিসাবে দুনিয়াজুড়ে সব মিলিয়ে প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজারের মতো মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। বিভিন্ন দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ৪ হাজার ২৯১ জনের মৃত্যুর খবরও ইতিমধ্যে সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে। মানুষ এসব তথ্য-উপাত্ত পড়ছে-শুনছে এবং আতঙ্কিত হয়ে পড়ছে। কিন্তু বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত মাত্র তিনজনের করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে এবং তাদের মধ্যে দুই জনেরই সুস্থ হয়ে ওঠারও

খবর আমরা জানি। জনমনে এই আতঙ্ককে কীভাবে দেখছেন? সালাহ্উদ্দিন কাউসার বিপ্লব : আসলে এটা ঠিক আতঙ্ক নয়, ‘অ্যাংজাইটি’ বা উদ্বেগ। অ্যাংজাইটির ডেফিনিশনটাই এরকম যখন কোনো বিষয়ে একটা থ্রেট বা হুমকি তৈরি হয় এবং মানুষ বুঝতে পারে না যে কী করতে হবে, তখন সে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। এটাকে আমি অস্বাভাবিক মনে করছি না। আর যেহেতু এটা প্যানডেমিক বা মহামারী, অর্থাৎ সমষ্টিগতভাবে মানুষের সমস্যা, তাই উদ্বেগটাও সব মানুষের মধ্যে ছড়াবে, সবাই উদ্বিগ্ন হবে এটাও স্বাভাবিক। এখন প্রশ্ন হলো এই মহামারীর মাত্রা কতদূর যাবে, এটা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে? সাধারণ মানুষের উদ্বেগ কিন্তু সেটা নিয়েই। মানুষ আসলেই জানতে চায়। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে গণমাধ্যমের

পাশাপাশি মানুষের তথ্য চাহিদা মেটানোর ক্ষেত্রে ক্রমশই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে ফেইসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো। এর হয়তো ভালো-মন্দ দুটো দিকই আছে। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা রকম ভুল বা মিথ্যা তথ্যও ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ থাকে। অনেক সময় সেসব গুজবের আকার ধারণ করে। করোনাভাইরাস নিয়েও এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমন অনেক ছবি-ভিডিও-অডিও ছড়িয়ে পড়ছে যার হয়তো কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই, অনেক ক্ষেত্রে তথ্যসূত্রও নেই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রবল উপস্থিতির এই পরিস্থিতিতে মানুষ উদ্বেগ সামলে কীভাবে শান্ত থাকবে? আপনার পরামর্শ কী? প্রথম কথা হলো নেগেটিভ কথা বা নেতিবাচক কথা কিংবা পজিটিভ বা ইতিবাচক কথা মানুষ যেটা বেশি শোনে সে সেটা দ্বারাই আক্রান্ত

হয়। কেউ একজন ফুটবল বা ক্রিকেট খেলায় জেতার খবর যতবার শুনবে ততবারই সে আনন্দিত হবে। কারণ এটা তার পছন্দের দলের জয়ের খবর। তেমনি পরাজয়ের খবরও বারবার শুনলে সে বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়বে। এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। এখন সংবাদপত্র, টেলিভিশন, রেডিও ও অনলাইন নিউজ পোর্টালের সংখ্যা অনেক বেশি। আবার দেখা যাচ্ছে একই সংবাদকে নানাজন নানাভাবে পরিবেশন করছে। বিশেষত অনেক অনলাইন সংবাদ মাধ্যম আছে যাদের খুব একটা বস্তুনিষ্ঠতা নেই। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেসব ছড়িয়ে পড়ছে এবং মানুষ সেগুলোই দেখছে। এভাবে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। এ অবস্থায় আমার পরামর্শ হলো এ ধরনের নেতিবাচক সংবাদ যত কম পড়া যায় দেখা যায় ততই ভালো। আর পড়লেও সেগুলো মাথা থেকে

সরিয়ে ফেলতে হবে। বিশ্বাসযোগ্য কি না সে বিষয়ে নিশ্চিত না হয়ে আমরা নিজেরা এমন নেতিবাচক সংবাদ শেয়ার করা থেকে বিরত থাকতে পারি। আরেকটা সমস্যা দেখা দিচ্ছে করোনাভাইরাসের লক্ষণ এবং এর সংক্রমণ থেকে নিরাপদ থাকার বিষয়ে নানাজনের নানারকম পরামর্শে অনেকে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছেন। আবার অনেকে নিজেরা ভালোভাবে না জেনেই বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন। এসব বিষয়ে মানুষ কীভাবে সিদ্ধান্ত নেবে? সালাহ্উদ্দিন কাউসার বিপ্লব : এক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো উপায় মনে হয়, সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে প্রচারিত যথাযথ পরামর্শ মেনে চলা। অনেক দায়িত্বশীল গণমাধ্যমই করোনাভাইরাস সংক্রমণ থেকে নিরাপত্তা এবং রোগের লক্ষণ শনাক্ত করার বিষয়ে সরকারি পরামর্শগুলো প্রচার করছে। আরেকটা পদ্ধতি হলো আমরা যে যেই সংবাদ


মাধ্যমকে অথেনটিক বা বস্তুনিষ্ঠ বলে মনে করি, সেটা জাতীয় বা আন্তর্জাতিকও হতে পারে, এমন যে কোনো একটি তথ্য উৎসের ওপর নির্ভর করা। আর সবচেয়ে ভালো হয় সরকারি তথ্য উৎসকে গ্রহণ করতে পারলে, তাহলে আর বাকি সবকিছুতে বিভ্রান্ত হওয়ার সুযোগও কমে যাবে। আসলে তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে এখন তো আমরা প্রবলভাবে বিশ্বায়িত একটা সমাজে বসবাস করছি। ফলে আমরা চাই বা না চাই আমাদের সামনে একের পর এক তথ্য আসতেই থাকে। জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেল বলেছেন জার্মানির প্রায় ৬০-৭০ ভাগ মানুষ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এতদিনের, এত মাসের জন্য সব কর্মসূচি বাতিল করেছেন, ইতালিতে এত কোটি লোক গৃহবন্দি হয়ে পড়েছে এমনসব তথ্য আমাদের কাছে আসছেই। ফলে পুরো পৃথিবী যখন একটা মহামারীতে আক্রান্ত হয়ে গেছে তখন দেশের মানুষের উদ্বেগও স্বাভাবিক। আপনার কি মনে হয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ই হোক বা তথ্য মন্ত্রণালয় সরকার জনগণকে আশ্বস্ত করার জন্য এ পরিস্থিতিতে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে? সালাহ্উদ্দিন কাউসার বিপ্লব : সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তো দায়িত্ব নিয়েই কাজ করছে। ফলে নতুন সংক্রমণের তথ্যই হোক কিংবা করোনাভাইরাস আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা আছে কি না এমন খবরই হোক, সেটা জানার জন্য আমাদের উদগ্রীব হওয়ার কিছু নেই। এটা কবে জানব, কীভাবে নিশ্চিত হব এসব ভাবনা নিয়ে চিন্তিত হওয়া যাবে না। ভাবতে হবে যে, যথাসময়ে কোনো না কোনোভাবে এই সংবাদ আমাদের কাছে আসবেই। সরকারই সেটা করবে। আর এখন জাতীয় আন্তর্জাতিক এত এত মাধ্যম আছে যে আপনি সবই জেনে যাবেন। আমাদের রাজধানী ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোর অন্যতম। এমন ঘনবসতিতে মহামারী ছড়িয়ে পড়লে ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কাও অনেক বেশি। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে জনসমাগমস্থল এড়িয়ে চলা, গণপরিবহন এড়িয়ে চলা, যত্রযত্র থুথু-কফ না ফেলা, হ্যান্ডশেক না করাসহ অনেক পরামর্শ আমরা শুনেছি। অনেক অভিভাবক সন্তানের নিরাপত্তার চিন্তায় প্রয়োজনে স্কুল-কলেজ বন্ধ রাখার পক্ষে মত দিচ্ছেন। এ অবস্থায় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হতে পারে। বিষয়টা আপনি কীভাবে দেখছেন? সালাহ্উদ্দিন কাউসার বিপ্লব : সংক্রমণ রোধ করার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরামর্শগুলো আমরা মেনে চলব। আর পরিস্থিতির অবনতি হলে স্কুল-কলেজ বন্ধ করার প্রয়োজন হলে সরকার নিশ্চয়ই সেসব সিদ্ধান্ত ঘোষণা করবে। কিন্তু আমি বলব সচেতনতা ও নিরাপত্তা বজায় রাখার পাশাপাশি আমাদের প্রাত্যহিক জীবনযাপন যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রাখতে হবে। আমরা যেন ভয় বা উদ্বেগ থেকে ঘরে-বাইরে কোনোরকম কাজকর্ম বন্ধ করে না ফেলি। নিজেদের গুটিয়ে নিলে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কা আরও বেড়ে যায়। তাই বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন সবার সঙ্গে স্বাভাবিক যোগাযোগ বজায় রাখতে হবে। আনন্দ-ফুর্তিতে থাকতে হবে, মন ভার করে অন্যকে ভারাক্রান্ত করা যাবে না। মনে রাখতে হবে, পরিস্থিতি যাই হোক না কেন সেটা সবাই মিলেই সামলাতে হবে। তাই নিজেদের গুটিয়ে ফেলার কিছু নেই। আতঙ্কিত না হয়ে শান্তভাবে পরিস্থিতি সামলাতে হবে।

No Comments