“ এমপিও ” তুমি কতদুর..?


অথর
শিক্ষকের কলাম   খোলা মতামত ডেক্স
প্রকাশিত :২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ৭:৪০ অপরাহ্ণ | পঠিত : 664 বার
0
“ এমপিও ” তুমি কতদুর..?

শিক্ষকরা মানুষ গড়ার কারিগর, সমাজে সম্মানিত ব্যক্তি। সেই শিক্ষকরা আজ বিভিন্ন সময়ে রাজপথে কেন? পৃথিবীর কোনো দেশেই এ জাতীয় ঘটনা দেখা যায় না। অথচ স্বাধীন বাংলাদেশে শিক্ষকদের রাজপথে নামতে হয় জীবন ও পেটের তাগিদে। শিক্ষকরা কেন না খেয়ে থাকবেন? শিক্ষকদের এমপিওভুক্তি নিয়ে এত লুকোচুরি কেনই বা হবে বিভিন্ন সময়ে? দয়াকরে এমপিওভুক্তির গেজেট জারি করুন ; নইলে আইন করে বন্ধ করে দিন স্বীকৃতি পাওয়া দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। অভুক্ত শিক্ষকদের এ হয়রানি জাতির জন্য লজ্জাজনক। কেননা,ঢিমেতালে চলছে নতুন প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির কাজ। প্রায় সাড়ে ৯ বছর পর গত বছরের ২৩ অক্টোবর ২ হাজার ৭৩৭টি স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা এমপিওভুক্ত করে সরকার। কিন্তু ওই তালিকায় বেশ কয়েকটি অযোগ্য

প্রতিষ্ঠানের নাম আসায় নানা মহলে শুরু হয় সমালোচনা। এরপরই এসব প্রতিষ্ঠান যাচাই বাছাইয়ের কাজ শুরু করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ফলে সংশোধিত গেজেট প্রকাশ করতে হবে। কিন্তু তিন মাস পার হলেও এখনো প্রকাশ করা হয়নি গেজেট। ফলে হতাশ শিক্ষরা। অন্যদিকে প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির পর শুরু হবে শিক্ষকদের এমপিওভুক্তির কাজ। সেখানেও ব্যয় হবে কয়েক মাস। সে হিসাবে আগামী জুনের আগে শিক্ষক এমপিওভুক্ত নিয়ে এক প্রকার অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।একটি জাতিকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করে শিক্ষকসমাজ। সে শিক্ষকসমাজের একাংশ প্রাপ্য ও মর্যাদা থেকে বঞ্চিত। তাদের এমপিওভুক্ত বন্ধ রাখা কোনো যৌক্তিক কারণ হতে পারে না। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না, শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতি উন্নতি করতে পারে

না। এজন্য শিক্ষাকে জাতির মেরুদন্ড বলা হয়। কিন্তু একটু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে বুঝতে অসুবিধা হবে না, শিক্ষা জাতির মেরুদন্ডের চেয়েও বেশি কিছু। কারণ মেরুদন্ডহীন প্রাণী (যেমন কেঁচো) চলতে পারে। এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে পারে। কিন্তু শিক্ষা? শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতি চলতে পারে না। এ চলা মানেই জাতির অগ্রগতি, উন্নয়ন, সমৃদ্ধি। শিক্ষার দ্বারা অর্জিত হয় একটি জাতির কাঙ্ক্ষিত উন্নতি। আবার যারা শিক্ষকতা পেশার সঙ্গে জড়িত তারা শিক্ষক। আবার পেশার দিক থেকে বলা হয় শিক্ষকতা একটি মহান পেশা। জীবন-জীবিকা নির্বাহের জন্য যত পেশা রয়েছে তন্মধ্যে শিক্ষকতা শ্রেষ্ঠ। শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড, সবশ্রেষ্ঠ মহান পেশা এ শব্দগুলো খুবই সম্মানজনক। শিক্ষা একটি চলমান

প্রক্রিয়া। সময়ের চাহিদা ও যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিশ্ব এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের দেশও শিক্ষায় পিছিয়ে নেই। একটি দক্ষ জনগোষ্ঠীও আলোকিত সমাজ গঠনে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। তাই শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতি উন্নতি করতে পারে না। বিশ্বে যে জাতি যত শিক্ষিত সে জাতি তত উন্নত। চায়ের আড্ডায় গতকাল কথা হয় কিছু নন-এমপিও শিক্ষকের সাথে।নাম প্রকাশ না করার স্বার্থে এক শিক্ষক কষ্টের কথা বলতে গিয়ে বললেন, সরকার থেকে কোনো বেতন পাই না। স্কুল থেকে মাস শেষে কিছু টাকা দেয়া হয়, তা দিয়ে বড়ই কষ্টে জীবনযাপন করি। কেউ দাওয়াত দিলে ভালমন্দ খেতে পাই, না হয় ডালভাত আর সব্জী। কবে যে মাছ-মাংস খেয়েছি, মনে নেই।

বললেন, এখন দাওয়াতেও যাই না। দাওয়াতে ভাল ভাল খাবার সামনে আনলে আমার স্ত্রী ও সন্তানদের মুখ ভেসে উঠে। আমি মাছ-মাংস-কোরমা-পোলাও খাচ্ছি, আর আমার সন্তানরাতো বহুদিন মাছ, মাংস দেখেনি। খাবারটা আর ভিতরে ঢুকে না।’ একথা গুলো বলার সময় দু'চোখ গড়িয়ে অশ্রু ঝড়ছিল তার। কখন যেন আমার ও চোখ বেয়ে বেরিয়ে আসলো লোনা পানি। কিছুক্ষণ থেমে আরো যোগ করেন তিনি, বড় মেয়ের বিয়ের বয়স হয়েছে টাকার অভাবে বিয়ে দিতে পারছি না। ছোট মেয়ে এবার ক্লাস ফোরে পড়ে। সুন্দর দেখে একটা স্কুল ব্যাগের বায়না ধরেছিল। আমি একটা স্কুল ব্যাগ কিনেও দিয়েছিলাম। ওর পছন্দ হয়নি। স্থানীয় বাজার থেকে কেনা সস্তা দামের ব্যাগ পছন্দ না

হওয়া অস্বাভাবিক কিছু না। সহপাঠীদের মতো দামি ও সুন্দর ব্যাগ চাই তার। কোথায় পাব টাকা। মেয়েটার কান্না দেখে, নিজেকে মনে হয় আমি এক ব্যর্থ বাবা।’ সবাই সন্তানদের নিয়ে এ জায়গা ওই জায়গায় পিকনিকে যায়। আমার সামর্থ্য নেই, আমি বাচ্চাদের নিয়ে যাই ওদের নানার বাড়িতে। বাবা হিসেবে ওদের কোন সাধ-আহ্লাদ আমি পূরণ করতে পারিনি। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছে মরতে হলে মরব দাবি আদায় না করে বাড়ি ফিরে যাব না। শিক্ষকের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আসলেও কাল সারাটাদিন আমার হৃদয়টা ছিল ক্ষতবিক্ষত। লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে এদেশ স্বাধীন হয়েছে অনেক বছর আগে। অথচ এখনো দেশের শিক্ষকরা অন্নহীন। দুমুঠো ভাতের জন্য তাদের রাস্তায়


নামতে হয়। ভাবতেও আমার কষ্ট হয়। যে শিক্ষা নিজের, পরিবারের, সমাজের ও দেশের কাজে আসবে। এক্ষেত্রে স্বল্প শিক্ষিত বেকারদের জন্য উৎপাদনমুখী ও কারিগরি শিক্ষা খুব জরুরি। পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষাকে করতে হবে বিশ্ব মানের। এজন্য পাঠক্রম ও পাঠ্যপুস্তক যুগোপযোগী করতে হবে। শিক্ষার উন্নয়নে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখেন শিক্ষকরা। তাদেরও প্রচুর পড়তে হবে। নতুন নতুন কনসেপ্ট, গবেষণা সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে। শিক্ষা ও গবেষণার বাইরে তাদের অন্য কিছু নিয়ে সময় ব্যয় করার সুযোগ নেই। কিন্তু জাতি গড়ার এ কারিগরদের যদি দু'মুঠো ভাতের অধিকারের জন্য দিনের পর দিন রাস্তায় ঘুমাতে হয়, তাহলে শিক্ষিত জাতি গঠনের স্বপ্ন পূরণ হবে কিভাবে? আমাদের রাজনীতিকরা দেশকে নিয়ে কতই না স্বপ্ন দেখেন। কারো কারো এই স্বপ্ন, সেই স্বপ্নের যে কাহিনী শুনি তা বইয়ে লিপিবদ্ধ করতে গেলে ওই বই দিয়েই লাইব্রেরি গড়া যাবে। কিন্তু তারা জাতি গঠনে সবচেয়ে বেশি যেটির প্রয়োজন ‘শিক্ষা’ নিয়ে কেন স্বপ্ন দেখলেন না। যদি দেখেই থাকেন তা হলে শিক্ষার কেন এমন দুরবস্থা? শিক্ষকদের কেন বেতনের জন্য কাঁদতে হবে? তথ্য-প্রযুক্তির কল্যাণন পত্র-পত্রিকা মারফত যতটুকু জেনেছি তাহলো, স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় এমপিওভুক্ত একটি সময় সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। বর্তমানে অনলাইনে এমপিওর জন্য আবেদন করতে হয়। নিয়ম অনুযায়ী, প্রত্যেক শিক্ষক-কর্মচারীর এমপিও-সংক্রান্ত কাগজপত্র প্রতিষ্ঠান প্রধান অনলাইনে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে আপলোড করবেন। এরপর তা উপজেলার মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা যাচাই-বাছাই করেন। তার মতে, কাগজপত্র ঠিক থাকলে, তা তিনি জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে পাঠাবেন। তিনি ঐ কাগজপত্রে সন্তুষ্ট হলে তা পাঠাবেন আঞ্চলিক উপপরিচালকের কাছে। উপপরিচালক তা নিষ্পত্তি করে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য এমপিও-সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় কমিটিতে উপস্থাপন করবেন। সেখানে তা চূড়ান্ত অনুমোদন পাবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এভাবে শিক্ষকদের কাগজপত্র চারটি ধাপে যাচাই-বাছাই হয়। এ কারণে প্রত্যেকটি ধাপেই ধরনা দিতে হবে। এই সুযোগে অনেকেই হয়রানি এবং ঘুষ বাণিজ্যের শিকার হন। ঘুষ না দিলে ফাইল নিষ্পত্তি হয় না এমন অভিযোগ প্রায় সব শিক্ষকের। এই চার ধাপে নিষ্পত্তি হতে কখনো ছয় মাসেও হয় না। সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা বলছেন, এভাবে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া অনলাইনে আবেদন নেওয়া হলে শিক্ষকরা হয়রানির শিকার হতে পারেন। তাই তারা সনাতনী পদ্ধতিরও দাবি তুলছেন। তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যমান প্রক্রিয়ায় মাউশির অধীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিষ্ঠানের কোড সৃষ্টি করা হয় প্রতি বেজোড় মাসের এমপিও কমিটির কেন্দ্রীয় বৈঠকে। সেই হিসাবে সামনে বেজোড় মাস আছে মার্চ এবং মে। যদি আগামী সপ্তাহে প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ করা সম্ভব হয় এবং অন্যান্য কাজ ঠিকঠাক মতো চলে তবে মার্চ মাসে প্রতিষ্ঠানগুলো কোড নম্বর পাবে, যে কোডে শিক্ষক-কর্মচারীদের এমপিওর অর্থ যাবে। এরপর শিক্ষক-কর্মচারীদের এমপিওর জন্য আবেদন করতে হবে। উল্লেখ্য,গত বছরের ২৩ অক্টোবর এমপিওভুক্তির ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সাড়ে ৯ বছর পর সরকার ২ হাজার ৭৩০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করে। এর আগে ২০১০ সালে একসঙ্গে ১ হাজার ৬২৬টি প্রতিষ্ঠানকে একসঙ্গে এমপিও দেওয়া হয়। এমপিওভুক্ত ২ হাজার ৭৩০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে স্কুল ও কলেজ ১ হাজার ৬৫১টি, বিভিন্ন ধরনের কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং মাদ্রাসা ১ হাজার ৭৯টি। নতুন এই এমপিওভুক্তির কারণে শিক্ষামন্ত্রণালয়ের দুই বিভাগে মোট ৮৮১ কোটি টাকা ব্যয় বেড়েছে। সবশেষে,শিক্ষানুরাগী মাতৃতুল্য শিক্ষাবান্ধব মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে নিবেদন- দেশের অভাবনীয় উন্নয়ন, মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ ইত্যাদি সম্ভব হয়েছে আপনার সুযোগ্য নেতৃত্বে। অথচ নন-এমপিও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তকরণের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে, যা মোটেই কাম্য নয়। প্রশ্ন হল, এমপিওভুক্তিতে আপনার দিকনির্দেশনা এবং আশ্বাস থাকা সত্ত্বেও তাহলে বিষয়টি নিয়ে ঘোলাপানিতে মাছ শিকারের ষড়যন্ত্র হচ্ছে? সামান্য এ বিষয়টি কেন প্রশ্নবিদ্ধ করছে আপনার পর্বতপ্রমাণ সাফল্যকে। এমপিওভুক্তির বিষয়টি সুরাহার জন্য আপনারকাছে তাই বিনীত অনুরোধ করছি,যার মধ্যদিয়ে শিক্ষকরা অন্তত্ত দু-বেলা দু-মুঠো খেয়ে পরে শিক্ষার মান উন্নয়নসহ দেশের সার্বিক কল্যানে ভুমিকা রাখতে পারবে। লেখকঃ এম.এ মারুফ সোহেল, প্রভাষক(দর্শন) জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেমোরিয়াল ডিগ্রী কলেজ। কালীগঞ্জ,ঝিনাইদহ।

No Comments