কৃষিকাজ বদলে দিল ৩০ হাজার মানুষের ভাগ্য


অথর
কৃষি ও প্রকৃতি সংবাদদাতা   ডোনেট বাংলাদেশ
প্রকাশিত :১৮ মার্চ ২০২০, ৯:৫৬ পূর্বাহ্ণ | পঠিত : 142 বার
0
কৃষিকাজ বদলে দিল ৩০ হাজার মানুষের ভাগ্য

৫০-৬০ বছর আগে বন্যা থেকে রক্ষা পেতে পাখিমারা খালের দুই প্রান্তে বাঁধ দেয়া হতো। এরপর থেকে শাখা জুগীর খালের মাধ্যমে পাখিমারা খালে আন্ধারমানিক নদের পানি প্রবাহিত হয়ে আসছে। জুগীর খালের একপ্রান্ত আন্ধারমানিক নদে মিলেছে। আরেক প্রান্ত মিলেছে মাখিমারা খালে। খালগুলো মিঠাপানির অন্যতম উৎস। অন্তত ২৬টি গ্রামের প্রায় ৩০ হাজার মানুষ তাদের জীবিকার জন্য খালগুলোর ওপর নির্ভরশীল। তাদের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ খালগুলো। তবে কুমিরমারা গ্রামে জুগীর খালের বিভিন্ন অংশে আড়াআড়ি করে বাঁশের ওপর জাল দিয়ে প্রভাবশালী কয়েকটি পরিবার মাছ ধরত। ফলে পানিপ্রবাহে বিঘ্ন ঘটতো। দখলদারদের কারণে গ্রামের বাসিন্দারা খালের পানি ব্যবহার করতে পারতেন না। খালের পানি ছাড়া অন্য কোনো সেচের ব্যবস্থা

নেই। বর্ষা মৌসুমে আমন ছাড়া বছরের অন্য সময় আবাদ হতো না। সেচের অভাবে বিপুল পরিমাণ জমি অনাবাদি পড়ে থাকতো। ফলে গ্রামগুলোর অধিকাংশ পুরুষ কাজের সন্ধানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলে যেতেন। দুই যুগের বেশি সময় এভাবে চলছিল তাদের বেঁচে থাকার লড়াই। প্রায় দুই যুগ পর কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুনিবুর রহমানের হস্তক্ষেপে দখল মুক্ত হয় ওই খালগুলো। তখন খালের পানি ব্যবহারে আর বাধা না থাকলেও দেখা দেয় ভিন্ন সমস্যা। খালের জলকপাটগুলো জরাজীর্ণ হওয়ায় জোয়ারের লোনা পানি প্রবেশ করে প্লাবিত হয় কৃষিজমি। এবার তাদের সহায়তায় হাত বাড়িয়েছেন ইউএনও। খালে বাঁধ নির্মাণে সরকারি তহবিল থেকে টাকাও দেন তিনি। গ্রামের মানুষ সাধ্যমতো চাঁদা দেন। সেই


টাকা দিয়ে খালে লোনা পানির প্রবেশ ঠেকাতে নির্মাণ করা হয় তিনটি বাঁধ। বাঁধগুলো নির্মাণের ফলে গ্রামের কৃষিতে এসেছে পরিবর্তন। খালের আশপাশের ৫০০ একর অনাবাদি জমিতে এবার দেখা যাচ্ছে সবুজের সমারোহ। গ্রামজুড়ে কর্মমুখর পরিবেশ। নীলগঞ্জ ইউনিয়ন গোটা উপজেলার মধ্যে কৃষির পাশাপাশি সবজি চাষের মডেল ইউনিয়ন হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এক সময়ের দরিদ্র গ্রামগুলোর ৩০ হাজার মানুষ এখন সমৃদ্ধশালী। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, নীলগঞ্জ ইউনিয়নের গ্রামের সংখ্যা ৫২টি। এর মধ্যে ঘুটাবাছা, নাওভাঙ্গা, গামুরতলা, পূর্বসোনাতলা, নেয়ামতপুর, এলেমপুর, মজিদপুর, ফরিদগঞ্জসহ ১৬টি গ্রামের মধ্য দিয়ে পাখিমারা খাল বয়ে গেছে। পাখিমারার খালের শাখা রয়েছে অন্তত সাতটি। এর মধ্যে জুগীর খাল, হাজীর খাল, মজিদপুর খাল, আমিরাবাদ খাল


ও জোনাব আলীর খাল ইউনিয়নের ১০টি গ্রামে প্রবেশ করেছে। নীলগঞ্জ ইউনিয়নের কৃষকরা জানান, আড়াই কিলোমিটার দীর্ঘ জুগীর খাল। কুমিরমারা গ্রামে এটির বিভিন্ন অংশে আড়াআড়ি করে বাঁশের ওপর জাল দিয়ে প্রভাবশালী কয়েকটি পরিবার মাছ ধরত। দখলদারদের কারণে গ্রামের বাসিন্দারা খালের পানি ব্যবহার করতে পারতেন না। খালের পানি ছাড়া সেচের অন্য ব্যবস্থা না থাকায় বর্ষা মৌসুমে আমন ছাড়া অন্য কিছু আবাদ হতো না। দিনে দিনে গ্রামবাসীরা খালের পানি জমিতে সেচ কাজে ব্যবহারের দাবিতে সোচ্চার হন। শুরু হয় খাল দখলমুক্ত করার লড়াই। সেই লড়াইয়ে সঙ্গী হন কলাপাড়া উপজেলার ইউএনও। প্রায় দুই যুগ পর গ্রামবাসী ও ইউএনওর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় প্রভাবশালীদের হাত থেকে দখলমুক্ত হয় জুগীর খাল। এরপর

খালের জলকপাটগুলো জরাজীর্ণ হওয়ায় জোয়ারের লোনা পানি ঢুকে পড়ত জমিনে। জলকপাট মেরামতের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ বিভিন্ন দফতরে গিয়েও কাজ হয়নি। এবারও এগিয়ে আসেন ইউএনও। খালে বাঁধ নির্মাণে সরকারি তহবিল থেকে ২৫ হাজার টাকা দেন তিনি। গ্রামের মানুষও সাধ্যমতো চাঁদা দেন। এভাবে সংগ্রহ হওয়া ৪০ হাজার টাকা দিয়ে নির্মাণ করা হয় তিনটি বাঁধ। বাঁধ নির্মাণের ফলে গ্রামগুলোর কৃষিতে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। প্রায় ৫০০ একর অব্যবহৃত জমিতে এবার দেখা যাচ্ছে সবুজের সমারোহ। স্থানীয় কৃষকেরা আবাদ করেছেন তরমুজ, লাউ, শিম, টমেটো, কপি, মুলা ও মরিচসহ নানা ধরনের সবজি। এবার প্রায় ৫০ একর জমিতে বোরোর আবাদ হয়েছে। স্থানীয় কৃষক জাকির গাজী জানান, খালের পাশেই

তার বাবার দুই বিঘা জমি রয়েছে। তবে জমিতে আগে আমন ছাড়া বছরের অন্য সময়ে আবাদ করা যেত না। কারণ চাষাবাদ করতে সেচের প্রয়োজন। খাল দিয়ে পানি প্রবাহিত হলেও তা ব্যবহারের সুযোগ ছিল না। কারণ মজিদপুরের শামসুদ্দিন, ছোটকুমিরমারার মনির হাওলাদার ও কুদ্দুস হাওলাদারের নেতৃত্বে ১৫-২০ জন জুগীর খালে মাছ চাষ করতেন। তাদের ৪০-৫০ জনের বাহিনী ছিল। খালে মাছ চাষের প্রতিবাদ করলে ওই বাহিনী দিয়ে হামলা চালানো হতো। এসব কারণে গ্রামবাসী মুখ খুলতে সাহস পায়নি। তিনি জানান, ২০১৭ সাল থেকে তিনিসহ এলাকার কয়েকজন গ্রামে ঘুরে লোকজনকে বোঝানো শুরু করেন। ২০১৮ সালে তিন গ্রামের শত শত মানুষ বৈঠকে সমবেত হন। সেখানেই খাল উদ্ধারের জন্য

গঠন করা হয় নীলগঞ্জ আদর্শ কৃষক শ্রমিক সমবায় সমিতি। গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি সুলতান গাজীকে সভাপতি, আবু বকর মৃধাকে সাধারণ সম্পাদক ও জাকির গাজীকে কোষাধ্যক্ষ করে ৩৪ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। এরপর ২০১৯ সালের জুলাইয়ে যোগ দেয়া ইউএনও মুনিবুর রহমান এগিয়ে আসেন। আগস্ট মাসে খাল থেকে দখলদারদের জাল অপসারণে অভিযান চালান তিনি। কিন্তু দখলদাররা কয়েকদিন পর আবারও খালে জাল পেতে পানি প্রবাহে প্রতিবন্ধকতা ঘটায়। এরপর ইউএনওর উদ্যোগে আরও দুই দফা অভিযান চালানো হয়। সর্বশেষ অভিযানে দখলদারদের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি দেন তিনি। এরপর আর জাল পাতার সাহস পায়নি দখলদাররা। এরপরও শুরু হয় গ্রামে কৃষিকাজ। কুমিরমারা গ্রামের মাস্টার্স পরীক্ষার্থী হেমায়েত উদ্দিন বলেন, চাকরির চিন্তা

না করে কৃষিকাজে নেমেছি। বাবার দেয়া জমিতে সবজি ও ফসলের আবাদ করেছি। ১০ শতাংশ জমি বন্ধক নিয়ে বোম্বাই মরিচের আবাদ করেছি। চাষ বাবদ আমার খরচ হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার টাকা। বোম্বাই মরিচ থেকে দুই লাখ টাকা আয় হবে আশা করছি। মজিদপুর গ্রামের লিটন হাওলাদার বলেন, একসময় ঢাকা ও বরিশালে গিয়ে দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালাতাম। এখন অন্যের জমি বর্গা নিয়ে কৃষিকাজ করছি। সবজি চাষাবাদ করে অভাব দূর হয়েছে আমার। নীলগঞ্জ আদর্শ কৃষক শ্রমিক সমবায় সমিতির সভাপতি সুলতান গাজী জানান, জমিতে সেচ দেয়ার জন্য আগে খালের পানি ব্যবহারের সুযোগ ছিল না। ফসলাদি ভালো হতো না বলে কুমিরমারা গ্রামে অভাব লেগেই ছিল। এক ফসলি


জমি ছিল গ্রামবাসীর একমাত্র ভরসা। এখন কুমিরমারাসহ আশেপাশের কয়েকটি গ্রামের চিত্র বদলে গেছে। কৃষকরা এখন সবজির আবাদ করেছেন। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল মন্নান বলেন, সেচের সুবিধা পেয়ে নীলগঞ্জ ইউনিয়নের অন্তত ২৬টি গ্রামের পাঁচ শতাধিক একর জমিতে নতুন করে এবার আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫০ একর জমিতে বোরোর চাষ হয়েছে। বাকি জমিতে হয়েছে সবজির চাষ। আগে এক বিঘা জমিতে ধান চাষ করে বছরে ১৪ থেকে ১৮ হাজার টাকা আয় হতো। এবার সবজি চাষ করে গড়ে প্রতি বিঘা থেকে অন্তত ১ লাখ ২০ হাজার টাকা আয় করার আশা কৃষকদের। সবজির আবাদ এখানকার কৃষকদের ভাগ্য বদলে দিয়েছে। এতে তাদের জীবনযাত্রায় ব্যাপক উন্নতি ঘটেছে। নীলগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন মাহমুদ বলেন, সেচ সুবিধা পেয়ে নীলগঞ্জ ইউনিয়নের ২৫-৩০ গ্রামের মানুষ কৃষিতে যে সাফল্য অর্জন করেছেন তা অবিশ্বাস্য। পরিবর্তন এসেছে তাদের জীবনযাত্রায়। জমি আবাদ করে নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন করেছেন তারা। আগে জমিগুলো পড়ে থাকত। এখন তারা আবাদ করে স্বাবলম্বী হয়েছেন। সবচেয়ে ভালো খবর হলো লেখাপড়া ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে এগিয়ে যাচ্ছে ছেলে-মেয়েরা। কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুনিবুর রহমান বলেন, প্রশাসনের কাজ হচ্ছে জনসেবা করা। আমি শুধু আমার ওপর রাষ্ট্রের অর্পিত দায়িত্ব পালন করেছি। গ্রামবাসীরা সম্মিলিত প্রচেষ্টায় চরম প্রতিকূলতা জয় করেছেন। সহায়তা পেলে গ্রামের মানুষ তার আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তন করতে পারে, তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত নীলগঞ্জ ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রাম।

No Comments


আরও পড়ুন