নবাবি আমলের ঢাকার রূপরেখা


অথর
সাহিত্য আসর সংবাদদাতা   ডোনেট বাংলাদেশ
প্রকাশিত :১৩ মার্চ ২০২০, ১২:৫৮ অপরাহ্ণ | পঠিত : 149 বার
0
নবাবি আমলের ঢাকার রূপরেখা

২০২০ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় ‘নৈঋতা ক্যাফে’ থেকে প্রকাশিত হয়েছে এস. এম. রুহুল আমীন রিজভীর গবেষণা গ্রন্থ ‘ঢাকার নাগরিক উন্নয়নে নবাবদের ভূমিকা’। ভূমিকা, চারটি অধ্যায়, উপসংহার দিয়ে লেখক খুবই পরিকল্পিতভাবে প্রসঙ্গগুলো উপস্থাপন করেছেন। প্রথম অধ্যায়ের বিষয়- ঢাকার অবস্থান ও পরিচিতি। ঢাকার ভৌগোলিক অবস্থান, নামকরণ, অবয়বগত বিকাশ, পরিবেশ ও জনসংখ্যা, নদী ও খাল ইত্যাদি বিষয় তথ্য সহকারে বর্ণিত হয়েছে। বিভিন্ন গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে লেখক বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করেছেন। ঢাকার নামকরণের ইতিহাস জানতে গিয়ে বিভিন্ন মিথের কথা জানা যায়। যেমন ১. ইসলাম খান শহর প্রতিষ্ঠা করতে এসে দেখেন যে নদীর তীরে কিছু কৃষক ঢাক নামের বন্য গাছের জঙ্গল কাটছে।

ইসলাম খান এই স্থানের নাম জিজ্ঞাসা করলে তারা ভাবে, ঐ গাছের নাম জানতে চাচ্ছেন। তাই তারা উত্তর দেয় ঢাককা। ইসলাম খান ভাবলেন, এই জায়গার নাম ঢাকা। ২. ইসলাম খান কিছু হিন্দু লোককে নদীর তীরে ঢাক বাজিয়ে পূজায় রত দেখেন। ঢাকীকে নদীর তীরে দাঁড় করিয়ে জোরে ঢাক বাজানোর আদেশ করেন। পতাকা দিয়ে তিনজন লোককে পূর্বে, পশ্চিমে ও উত্তরে পাঠিয়ে দেন এবং ঢাকের শব্দ যে স্থানে পৌঁছাবে সেখানে শহরের সীমানা পতাকা পুঁতে দেওয়া হয়। তাই শহরের নাম রাখা হয় ঢাকা। ৩. ঢাক্কা- কালহন ‘রাজতরঙ্গীনী’তে এর অর্থ পাহারা চৌকি। এ অঞ্চলে উঁচু ভূমি থাকায় এখান থেকে পার্শ্ববর্তী হিন্দু রাজধানী বিক্রমপুর ও


সোনারগাঁও-এর প্রতি নজরদারি সহজ হতো। সেখান থেকেই এ অঞ্চলের নাম হয় ঢাকা। ৪. কথিত আছে, এখানে দেবী দুর্গা লুকায়িত হয়ে যান। এ কারণে এ এলাকার নাম ঢাকা। ৫. এখানে নদীর মাঝে সম্ভবত ভূভাগটি একবার ভেসে উঠেছিল এবং পুনরায় কিছু সময়ের জন্য তা পানির নিচে চলে যায়। ফলে তা আবার ভেসে উঠলে এর নাম হয় ঢাকা। ঢাকা শহরের পত্তন থেকে শুরু করে এর বিস্তৃতির ইতিহাস নিয়ে বিবিধ মতামত ও তথ্য একসঙ্গে উপস্থিত করায় গ্রন্থটি সমৃদ্ধ হয়েছে। লেখক নিজস্ব কোনো মত প্রকাশের চেষ্টা অনেক ক্ষেত্রেই এড়িয়ে গেছেন। বরং বিভিন্ন রেফারেন্স ব্যবহার ও উপস্থাপনের প্রতি লেখকের মনোযোগ বেশি লক্ষ করা গেছে। দ্বিতীয় অধ্যায়ে


লেখক আলোচনা করেছেন- ঢাকার নবাবদের বিস্তারিত পরিচয়। এ পর্যায়ে ধারাবাহিকভাবে নয় জন নবাবের ব্যক্তিগত পরিচয় থেকে শুরু করে তাদের জীবনযাপন, রাজনৈতিক-সামাজিক কর্মকাণ্ড এবং তৎকালীন তাদের প্রভাব ও কর্তৃত্ব চমৎকারভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। এখানে সমসাময়িক সময়ে ঢাকা শহরের আর্থসামাজিক অবস্থা, জনজীবনের সমস্যা ও নবাবদের ভূমিকা তথ্য সহকারে উপস্থাপন করা হয়েছে। ঢাকার নগরায়ণে বড় অবদান ছিল নবাবদের। গ্রন্থে বর্ণিত তাদের গুরুত্বপূর্ণ কিছু অবদানের তথ্য তুলে ধরছি- ১. খাজা আবদুল গণি পঙ্গু ও অসহায় লোকদের জন্য ১৮৬৬ সালে একটি লঙ্গরখানা ও আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ করেন। আড়াই লক্ষ টাকা ব্যয়ে ঢাকায় পানীয় জলের কল স্থাপন করেন। শাহবাগে একটি চিড়িয়াখানা প্রতিষ্ঠা করেন। বেশ কিছু

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরিতে বিশেষ অবদান রাখেন। ২. খাজা আহসানুল্লাহ ঢাকা পৌর এলাকায় গোরস্থান সমূহ নির্মাণ ও উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রাখেন। তিনি জনকল্যাণমূলক কাজে ৫০ লক্ষাধিক টাকা দান করেন। শহর উন্নয়ন, হাসপাতাল নির্মাণসহ বিবিধ কাজে এ অর্থ ব্যয় হয়। তিনি ঢাকা শহরে প্রথম বিজলিবাতির ব্যবস্থা করেন। মোহামেডান ইউনিয়ন স্পোর্টিং ক্লাব প্রতিষ্ঠার অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ছিলেন তিনি। ৩. খাজা সলিমুল্লাহ নৈশ স্কুল স্থাপন করেন। মুসলিম রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন। ১৯১১ সালের ১৯ আগস্ট কার্জন হলে পূর্ববঙ্গের ছোট লাট হেয়ারের বিদায় ও বেইলি’র স্বাগত অনুষ্ঠানে তিনি ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় ও হাইকোর্ট প্রতিষ্ঠার দাবি জানান। কৃষি, শিল্প খাত, মসজিদ, মাদ্রাসা, হাসপাতাল, ছাত্রাবাস বিভিন্ন বিষয়ে

তিনি অপরিসীম অবদান রাখতে সক্ষম হন। ৪. খাজা হাবিবুল্লাহ রাজনীতিবিদ ও সমাজসেবী ছিলেন। ১৯১৮ সালে তার সভাপতিত্বে ‘আঞ্জুমান-ই-ইসলামিয়া’ প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯১৬ ও ১৯৩০ সালে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গাকালে তিনি শৃঙ্খলা রক্ষার্থে শান্তি কমিটি গঠন করেন। ৫. খাজা আতিকুল্লাহ জনহিতৈষী ও ইহজাগতিকতায় বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি শিক্ষাব্যবস্থার অগ্রগতির জন্য মুক্তহস্তে দান করেন। ১৯০১ সালের ৭ ডিসেম্বর নিজের বিবাহ অনুষ্ঠানকে স্মরণীয় করতে ঢাকা শহরকে বিদ্যুতায়িত করতে চার লক্ষ টাকা দান করেন। তার নামানুসারে নিয়মিত হকি টুর্নামেন্টের আয়োজন করতেন। ৪. খাজা ইউসুফজান ঢাকার পৌর নেতা ও সমাজকর্মী। তার প্রচেষ্টায় ঢাকার পানীয় জলের কল এবং পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার যথেষ্ট উন্নতি ঘটে। তিনি দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে অবৈতনিক ম্যাজিস্ট্রেট

হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ৫. নওয়াব আলী চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন। ঢাকা, কলকাতা, ময়মনসিংহ শহরের বিভিন্ন কলেজের ছাত্রদের জন্য কয়েকটি হোস্টেল প্রতিষ্ঠিত করেন। বইটির তৃতীয় অধ্যায়ে ঢাকা নগরের গোড়াপত্তন, নাগরিক অবস্থা, অষ্টাদশ ও উনিশ শতকের ঢাকার জনসংখ্যা, নাগরিক সমস্যার তথ্য, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা, বাসিন্দাদের জীবনমান, স্থাপত্য, বাড়ি-ঘর ইত্যাদি বিষয় বিশ্লেষণ করা হয়েছে। চতুর্থ অধ্যায়ে ঢাকার নাগরিক উন্নয়নে নবাবদের ভূমিকা পাঁচটি পরিচ্ছেদে বিস্তারিত তথ্য সহকারে তুলে ধরা হয়েছে। প্রথম পরিচ্ছেদে আর্থিক সাহায্য দান ও বিভিন্ন ফান্ড গঠনে নবাবদের কর্মকা- তুলে ধরা হয়েছে। দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে ঢাকার নাগরিক জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে নবাবদের ভূমিকা উঠে এসেছে। নবাবরা শুধু জনকল্যাণকর কাজ

করেই ক্ষান্ত ছিলেন তা নয়। নাগরিকদের উন্নয়ন করতে হলে সমাজস্থিত বিভিন্ন কুসংস্কার ও পশ্চাৎপদ বিষয়গুলো সারিয়ে তোলা জরুরি। সমাজ ও নাগরিক উন্নয়নের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের উন্নয়ন। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে পৃষ্ঠপোষকতা, সমাজ সংস্কার, বাল্যবিবাহ- বহু বিবাহ বন্ধ, রক্ষিতা পালন প্রতিহত করা, মাদক নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা, যত্রতত্র বারবণিতাদের অবস্থান ও দৌরাত্ম্য কমিয়ে আনতে বিশেষ অবদান ছিল নবাবদের। তৃতীয় পরিচ্ছেদে এ বিষয়গুলো আলোচিত হয়েছে। চতুর্থ পরিচ্ছেদে ধর্মীয় স্থাপনা নির্মাণ, ইমারত তৈরি ও সংস্কার বিষয়ে নবাবদের পৃষ্ঠপোষকতার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের আধুনিক শিক্ষা প্রসারে ঢাকার নবাবদের ভূমিকা অনেক। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন, ছাত্রাবাস তৈরি, বৃত্তি প্রদান, অনুদান দেওয়া, শিক্ষা গ্রহণে সচেতনতা তৈরিতে তাদের অবদান অপরিসীম।


পঞ্চম পরিচ্ছেদে এ বিষয় বিস্তৃতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। সর্বোপরি, ঢাকার নবাবদের ইতিহাস, ঢাকা নগরের উৎপত্তি ও বিকাশ, আর্থসামাজিক অবস্থান, ঢাকার উন্নয়নে নবাবদের ভূমিকা বিষয়ে এটি একটি চমৎকার তথ্য বহুল। বইয়ের নাম : ঢাকার নাগরিক উন্নয়নে নবাবদের ভূমিকা (১৮৫৭-১৯৪৭) লেখক : এস. এম. রুহুল আমীন রিজভী প্রকাশক : নৈঋতা ক্যাফে

No Comments