রমজানে তাহাজ্জুদের নামাজ পূর্বের গুনাহ মার্জনা করে


অথর
ডোনেট বাংলাদেশ ডেক্স   ধর্ম ও জীবন
প্রকাশিত :৭ মে ২০২০, ৪:৩০ অপরাহ্ণ | পঠিত : 161 বার
0
রমজানে তাহাজ্জুদের নামাজ পূর্বের গুনাহ মার্জনা করে

ড.সাইফুল গণি নোমান:- রমজান আসলে তাহাজ্জুদের প্রতি রাসূল (সা. এর আকর্ষণ বেড়ে যেতো। তিনি রমজানে অধিক পরিমাণ তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করতেন। বিশেষতঃ রমজানের শেষ দশকে তিনি ইতেকাফ করতেন এবং রাত্রী জাগরণ করতেন। এ সময় তিনি তার পরিবারের সদস্যদেরকেও রাতে আমলের জন্য ডেকে দিতেন। মা আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘রমজানের শেষ দশকে রাসুল(সা.) রাত জেগে ইবাদত করতেন, তার পরিবারকে ডেকে দিতেন এবং লুঙ্গি শক্ত করে বেঁধে নিতেন।(’সহিহ বোখারি ও মুসলিম) আবু হুরায়রা (রা.) বলেন রাসূল (সা.) রমজান মাসে তাহাজ্জুদের প্রতি উদ্বুদ্ধ করতেন। তবে তিনি আবশ্য পালনীয় বিষয় হিসেবে নির্দেশ দেননি। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি ঈমান ও নিষ্ঠার সঙ্গে রমজানে তাহাজ্জুদের নামাজ আদায়

করবে, আল্লাহ তায়ালা তার পূর্ববর্তী পাপ মার্জনা করবেন। (সুনানে নাসায়ি: ২১৯৭) মধ্যরাতের পর বা রাতের দুই–তৃতীয়াংশ অতিবাহিত হওয়ার পর থেকে, তথা রাত দুইটার পর থেকে ফজরের ওয়াক্ত আরম্ভ হওয়ার আগ পর্যন্ত তাহাজ্জুদের সময়। সাহ্‌রির সময় শেষ হলে, তথা ফজরের ওয়াক্ত শুরু হলে তাহাজ্জুদের ওয়াক্ত শেষ হয়। রাসুল (সা.)এর সময়কালে তাহাজ্জুদের জন্য আলাদা আজান দেওয়া হতো। এখনো মক্কা শরিফ ও মদিনার হারাম শরিফে এই নিয়ম প্রচলিত আছে। তাহাজ্জুদ একাকি পড়াই উত্তম। তাই অন্য সব সুন্নত ও নফলের মতো তাহাজ্জুদ নামাজের সুরা কিরাআত নিম্ন স্বরে পড়তে হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে সর্বাধিক প্রিয় আমল ছিলো নামাজ। তিনি নামাজে প্রশান্তি খুঁজে পেতেন।

নামাজের মাধ্যমে তিনি জীবনের যাবতীয় সঙ্কটের সমাধান খুঁজতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন ‘নামাজকে আমার চোখের প্রশান্তি করা হয়েছে। (সুনানে নাসায়ি: ৩৯৫০) ফরজ নামাজের পর শেষ রাতের নামাজ তথা তাহাজ্জুদ ছিলো রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে সবচেয়ে প্রিয়। তিনি বলেন, ‘রমজানের রোজার পর সবচেয়ে উত্তম রোজা মহররমের। আর ফরজ নামাজের পর সবচেয়ে উত্তম হলো- রাতের নামাজ।(সহিহ মুসলিম: ১১৬৩) বছরের বিশেষ রাতগুলোতে সূর্যাস্তের পরে আল্লাহ তাআলা প্রথম আসমানে নেমে আসেন। এ ছাড়া প্রতি রাতে তাহাজ্জুদের সময়ে আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার প্রথম আসমানে এসে বান্দাদের ফরিয়াদ শোনেন। কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় হাবিব (সা.)কে উদ্দেশ করে বলেন, ‘এবং রাত্রির কিছু অংশ তাহাজ্জুদ কায়েম করবে, ইহা তোমার এক অতিরিক্ত কর্তব্য। আশা করা যায় তোমার প্রতিপালক তোমাকে প্রতিষ্ঠিত করবেন প্রশংসিত স্থানে—মাকামে মাহমুদে।’ (সুরা ইসরা, আয়াত: ৭৯)। তাহাজ্জুদের প্রতি রাসূল (সা.)-এর তীব্র আকর্ষণ বিবৃত হয়েছে পবিত্র কোরআনেও। রমজান ছাড়াও রাসূল(সা.) সারারাত তাহাজ্জুদে কাটিয়ে দিতেন। মহান আল্লাহ বলেন 'হে বস্ত্রাবৃত! রাতে দণ্ডায়মান হোন কিছু অংশ বাদ দিয়ে; অর্ধরাত্রি অথবা তদপেক্ষা কিছু কম অথবা তদপেক্ষা বেশি এবং কোরআন আবৃত্তি করুন সুবিন্যস্তভাবে ও স্পষ্টভাবে। আমি আপনার প্রতি অবতীর্ণ করেছি গুরুত্বপূর্ণ বাণী। নিশ্চয় ইবাদতের জন্য রাত্রিতে ওঠা প্রবৃত্তি দলনে সহায়ক এবং স্পষ্ট উচ্চারণের অনুকূল। নিশ্চয় দিবাভাগে রয়েছে আপনার দীর্ঘ কর্মব্যস্ততা। আপনি আপনার পালনকর্তার নাম স্মরণ করুন এবং একাগ্রচিত্তে তাতে নিমগ্ন হোন।’ (সুরা মুজাম্মিল, আয়াত: ১-৮)। ‘হে চাদরাবৃত! উঠুন, সতর্ক করুন, আপন পালনকর্তার মাহাত্ম্য ঘোষণা করুন, আপন পোশাক পবিত্র করুন এবং অপবিত্রতা থেকে দূরে থাকুন। অধিক প্রতিদানের আশায় অন্যকে কিছু দেবেন না এবং আপনার পালনকর্তার উদ্দেশে সবর করুন।’ (সুরা-৭৪ মুদ্দাচ্ছির, আয়াত: ১-৭)। নবীজি (সা.) তাহাজ্জুদ সব সময় পড়তেন। তাই এটি সুন্নত, অতিরিক্ত হিসেবে নফল। নবীজি (সা.)এর জন্য এটি অতিরিক্ত দায়িত্ব ছিল। আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) বলেন, ‘ফরজ নামাজ সমূহের পর উত্তম নামাজ হলো রাতের তাহাজ্জুদ।’ (মুসলিম হাদিস: ৪০৫)। রাসূল(সা.) তাহাজ্জুদের নামাজের মাধ্যমে গভীর ধ্যানে নিমজ্জিত হতেন। এমনকি নিজের শরীরের প্রতিও কোনো ভ্রুক্ষেপ থাকতো না। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘রাসূল (সা.) রাতে নামাজ আদায় করতেন; এমনকি তার পা ফুলে যেতো। আমি তাকে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি এতো কষ্ট করেন কেন? অথচ আল্লাহ আপনার পূর্বাপরের সব গোনাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, আমি কী কৃতজ্ঞ বান্দা হবো না।’ (সহিহ বোখারি: ৪৮৩৭) আলি ইবনে আবি তালেব (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘এক রাতে রাসূল (সা.) তার ও ফাতেমার ঘরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি তাদেরকে ডেকে বলেন, তোমরা নামাজ পড়বে না।’ রাসূল (সা.) শুধু পরিবারকেই উদ্বুদ্ধ করতেন না; বরং তার সাহাবিদেরকেও রমজানে তাহাজ্জুদ আদায়ে উদ্বুদ্ধ করতেন। সাহাবা কেরাম (রা.) ও তাহাজ্জুদ আদায়ে প্রলুব্ধ ছিলেন। রমজানে তাদের এ আগ্রহ আরও বহুগুণ বেড়ে যেতো। যেমন আবু হুরায়রা (রা.) এর ঘরে পালাক্রমে সারারাত আল্লাহর ইবাদত করা হতো। আল্লাহ তায়ালা কুরআনের একাধিক স্থানে সাহাবায়ে কেরামের তাহাজ্জুদ আদায়ের প্রসংশা করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, তারা রাতের খুব সামান্য অংশই ঘুমাতো এবং শেষরাতে তারা আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতো।’ (সূরা জারিয়াত: ১৭-১৮) স্বামী-স্ত্রীর একে অন্যকে তাহাজ্জুদের জন্য ডেকে তোলা সুন্নত। আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ তাআলা সেই স্বামীর প্রতি রহম করেছেন, যে নিজে রাতে উঠে তাহাজ্জুদ পড়ে এবং তার স্ত্রীকে জাগায়। যদি সে উঠতে অস্বীকার করে, তবে তার মুখমণ্ডলে পানির ছিটা দেয়। আল্লাহ তাআলা সেই স্ত্রীর প্রতি রহম করেছেন, যে নিজে রাতে উঠে তাহাজ্জুদ পড়ে এবং তার স্বামীকে জাগায়। যদি সে উঠতে অস্বীকার করে, তবে তার মুখমণ্ডলে পানির ছিটা দেয়।’ (আবুদাউদ ও নাসায়ী, হাদিস: ৪০৭)। সাধারণত রাসূল(সা.) তাহাজ্জুদ ছেড়ে দিতেন না এবং তিনি ছেড়ে দেওয়া পছন্দও করতেন না। আবদুল্লাহ বিন আমর ইবনুল আস (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূল (সা.) বলেন, হে আবদুল্লাহ! অমুকের মতো হয়ো না। সে তাহাজ্জুদ আদায় করতো। অতঃপর তাহাজ্জুদের নামাজ ছেড়ে দিয়েছে।’ (রিয়াদুস সালিহিন) বছরের অন্যান্য সময় সাধারণত শেষ রাতে অনেকেরই ওঠা কঠিন হয়। তাই তখন তাহাজ্জুদ পড়ার অভ্যাস করে নিলে বাকি এগারোটি মাস এ আমল করা সহজতর হবে । রমজান মাসে যেহেতু ফরজ রোজা পালনের জন্য সহায়ক হিসেবে সাহ্‌রির সুন্নত আদায়ের জন্য আমরা সবাই উঠি এবং সাহ্‌রির সময়ই হলো তাহাজ্জুদের সময়; সুতরাং রমজানে তাহাজ্জুদ আদায় করা খুবই সহজ। আসুন! তাহাজ্জুদের নামাজের অভ্যাস করি। সারা বছর যারা তাহাজ্জুদ আদায় করতে পারি না। অন্তত রমজান মাসে নিজে তাহাজ্জুদ আদায় করি এবং নিজের পরিবার ও বন্ধু-বান্ধবকে তাহাজ্জুদ আদায়ে অভ্যস্ত করি। আল্লাহ আমাদেরকে রাসুলের এ উত্তম আমলটি পালন করার তৌফিক দিন, আমিন।

No Comments