শিক্ষা নিয়ে আমার ভাবনা


অথর
শিক্ষকের কলাম   খোলা মতামত ডেক্স
প্রকাশিত :৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ৯:০২ পূর্বাহ্ণ | পঠিত : 1175 বার
0
শিক্ষা নিয়ে আমার ভাবনা

পবিত্র কোরআনের প্রথম বাণী ‘ইকরা’, যার অর্থ পড়। মূলত মহান প্রতিপালক আল্লাহতায়ালার প্রথম নির্দেশ ‘ইকরা’ শব্দ দিয়েই জ্ঞান আহরণ ও জ্ঞান বিকাশের অগ্রযাত্রা শুরু হয়। আধুনিক বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক হজরত মুহাম্মদ (সা.) শিক্ষার গুরুত্ব বোঝাতে বলেছেন, ‘বিদ্যার্জনের জন্য সুদূর চীন পর্যন্ত যাও’ এবং ‘দোলনা হতে কবর পর্যন্ত বিদ্যার্জন কর’। জাতীয় উন্নয়নের পূর্বশর্তই হচ্ছে শিক্ষা। শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড, সভ্যতার আলোকবর্তিকা। আর সমস্ত অন্ধকারকে বিচূর্ণ করে উদ্ভাসিত হওয়াই আলোর ধর্ম। জ্ঞান গবেষক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছেন, ‘শিক্ষা ছাড়া গণতন্ত্র অচল’। প্রকৃত অর্থে শিক্ষা নাগরিক জীবনের মৌলিক ও মানবিক অধিকার। জোহান হেনরিক পোস্তালৎসি শিক্ষার মর্মার্থ বোঝাতে বলেছেন-‘Education is natural, harmonious and progressive development

of man’s innate power' অর্থাৎ শিক্ষা হচ্ছে মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তিসমূহের স্বাভাবিক, সুষম ও প্রগতিশীল বিকাশ। শিক্ষকদের গুণাবলি : চরিত্রবান ও মিশুক হবেন, তাদের সঙ্গে খোলা মনে মেলামেশা করবেন। শিশুদের প্রতি যতটুকু সম্ভব ব্যক্তিগতভাবে দৃষ্টি দেবেন। শিক্ষাগত ও নৈতিক উন্নতি সম্পর্কে অভিভাবকদের অবহিত করবেন। অভিভাবকদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখবেন এবং তাদের শিশুদের বিষয়ে পরামর্শ প্রদান ও পরামর্শ গ্রহণ করবেন। তাদের প্রতিক্রিয়ার প্রতি লক্ষ রেখে তাদের সমালোচনা হাসিমুখে শুনবেন। সন্তানদের সঙ্গে স্নেহ-মমতা প্রদর্শন ও তাদের মাতাপিতার খেদমত ও আনুগত্যের প্রতি উদ্বুদ্ধ করবেন। সন্তানদের সামনে তাদের বা তাদের পরিবারের দোষত্রুটি বর্ণনা করবেন না। সন্তানদের শিক্ষা ও আচার-আচরণের ওপর নিজেদের চেষ্টা-সাধনার ফলাফল তাদের বুঝিয়ে দেবেন। যিনি


পাঠ্যস্থ সব বিষয়, মেধাবিকাশ, সৃজনশীলতা, চরিত্র গঠন, শিষ্টাচার, মানবতাবোধ, আত্ম ও মানবকল্যাণ, কর্মমুখী মনোভাব, স্বাস্থ্য, খাদ্য, চিকিৎসা, বাসস্থান নাগরিক অধিকার ও দায়িত্ব এবং দেশপ্রেম সম্পর্কে শিশু-কিশোর, তরুণদের শেখান, বোঝান এবং জানান দেন তিনিই শিক্ষক। তিনি শিক্ষক যার নিজের রয়েছে মেধাশক্তি, জ্ঞান অন্বেষণের আগ্রহ, অনুশীলন, ব্যক্তিত্ববোধ, চারিত্রিক আদর্শ, নির্লোভচিত্ততাÑসর্বোপরি যিনি জ্ঞান বিতরণে (অন্যকে জ্ঞান প্রদানে) সর্বদাই অকৃপণ। তিনি শিক্ষক, যিনি নেশায় শিক্ষা, শিক্ষাদানে উৎসাহী, শিক্ষার সুষ্ঠু ও সুন্দর পরিবেশ তৈরি করতে পারঙ্গম, নতুন জ্ঞানের সঙ্গে নিজে খাপখাইয়ে নিতে সক্ষম এবং সৃজনশীলতায় উৎসাহী। শিক্ষকদের বলা হয় মানুষ গড়ার কারিগর। পৃথিবীর বর্তমান অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি শিক্ষা। আর শিক্ষাকে সর্বদা চলমান রাখেন শিক্ষক। শিক্ষক


সমাজের শ্রেষ্ঠতম সম্মানিত মানুষ। শিশুকাল হতে সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের ডিগ্রি অর্জন পর্যন্ত সব মানুষ তার শিক্ষাজীবনের এ দীর্ঘপথ অতিক্রম করেন মহান শিক্ষকদের আদর-শাসন, উৎসাহ-অনুপ্রেরণা, সহযোগিতা এবং অন্তরঙ্গ তত্ত্বাবধানের মাধ্যমে। মাতাপিতার পরই সে অর্থে সম্মানের পাত্র হলেন শিক্ষক। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, জজ-ব্যারিস্টার, সাংবাদিক, লেখক-সাহিত্যিকসহ নানা ক্ষেত্রে পেশাজীবী, ব্যবসায়ী এমনকি রাজনৈতিক অঙ্গনে এবং দেশ পরিচালনায় যারা স্বমহিমায় অধিষ্ঠিত তারা সবাই কোনো না কোনো শিক্ষকেরই ছাত্র। তাই দেশ, সমাজ এবং মানবকল্যাণের স্বার্থে সারাজীবন অকৃপণ জ্ঞান বিতরণের পেশার নামই শিক্ষকতা। প্রথম দর্শনেই শিক্ষকের যে গুণটি শিক্ষার্থীর মন কাড়ে, তা হচ্ছে তার শান্ত প্রসন্ন ব্যক্তিত্ব। শিক্ষকের মধুর ব্যক্তিত্ব প্রত্যেক শিক্ষার্থীর চিত্তে তার প্রতি স্বাভাবিক প্রীতি ও শ্রদ্ধার ভাব

সঞ্চার করে। শিক্ষক যথাসম্ভব সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হবেন। কর্মোদ্যম ও প্রাণময়তা, শান্ত মেজাজ ও পরিমিতিবোধÑশিক্ষকতার অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য। একজন বিচক্ষণ শিক্ষক শিক্ষার্থীর হৃদয়ে শিক্ষার্জনের অনুকূল প্রেরণা-উদ্দীপনা সৃষ্টির কলাকৌশল প্রয়োগে সুনিপুণ হবেন। নিরানন্দ শিক্ষাদান ও কৃত্রিম নিয়মশৃঙ্খলা শিক্ষার্থীর সহজ চিত্ত-বিকাশের বৈরী। সুশিক্ষক শিশুকে ভালো না বাসলে তিনি ক্লাসের ক্রমিক সংখ্যার বাইরেও যে তাদের সজীব মনের ইচ্ছা-অনিচ্ছা, স্বপ্ন-সাধ, আশা-আকাক্সক্ষা, আনন্দ-বেদনা, অনুরাগ-অভিমান আছে; তা জানতে পারবেন না। মনোবিজ্ঞানের পুঁথিগত বিদ্যার্জন করে শিশুমানসের তত্ত্ব ও তথ্য সম্পর্কে কৃতবিদ্য হওয়া আর আপনার অন্তরে শিশুর পরিপক্ব সরল অস্তিত্বের কল্পনা-ভাবনা, আশা, আকাক্সক্ষার রূপ প্রতিফলিত করা বড় কঠিন বিষয়। এক প্রকৃত শিক্ষকের এ গুণে গুণান্বিত হতে হবে। শিক্ষকের একটি মূল্যবান চিত্তসম্পদ

মৌলিকতা। কল্পনা প্রকাশ-ভঙ্গির স্বাতন্ত্র্য, ভাব ও ভাবনার ব্যঞ্জনা, সৃষ্টিশীল কর্মতৎপরতা শিক্ষকের মৌলিক সম্পদ। বিদ্যালয়ের মতো শিক্ষামূলক সামাজিক প্রতিষ্ঠানে মৌলিক গুণসম্পন্ন শিক্ষকের প্রয়োজনীয়তা এবং তার গুণের প্রয়োগ অপরিহার্য। চিত্তের প্রসার ও নমনীয়তা শিক্ষককে বিচিত্র ধরনের মানুষের মধ্যেও বিবিধ পরিবেশে সামঞ্জস্য বিধানের দক্ষতা দান করে। সহ্যশক্তি, ক্ষমাগুণ এবং সহজাত প্রসন্নতা ব্যতীত গ্রহণশীলতার দুর্বল ক্ষমতা অর্জন করা সম্ভব নয়। এ ক্ষমতা শিক্ষককে একাধারে বিচিত্র এবং বিরুদ্ধ প্রকৃতির শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং সংশ্লিষ্ট কর্মীদের নিয়ে একই সঙ্গে, একই লক্ষ্যে চলবার সামর্থ্য দেয়। শিক্ষক অবশ্যই রসিক। মানব চরিত্রায়ণ এবং জীবনের জীবায়ন যার মূল ব্রত, তাকে শিল্পীজনোচিত রস সংবেদনের অনুরাগী ও অধিকারী হবেন, কিন্তু আনন্দের উপলক্ষ হয়ে

ক্রমে তাদের তামাশার কারণ হয়ে দাঁড়াবেন না। পাঠদানে সময়োচিত রস কৌতুকের স্নিগ্ধ আমেজ ও মধুর সম্পর্ক অনুভূত হলে শিক্ষার্থীদের কাছে পাঠগ্রহণ হবে স্বচ্ছন্দ। প্রত্যয়-দৃঢ় মানসিকতা উত্তম শিক্ষকের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। প্রাত্যহিক জীবনে প্রতিটি কথায় ও কাজে, পোশাক ও রুচিতে, পেশায় ও কর্তব্য পালনে তিনি আদর্শবান, ধর্মপ্রাণ, সত্যপ্রিয় ব্যক্তিত্বের পরিচয় দেবেন। কেবলমাত্র আদেশ-উপদেশ নয়, শিক্ষক নিজের অভ্যাস, অনুশীলন এবং জ্ঞান-অভিজ্ঞতার লব্ধ বিচিত্র কর্মের মাধ্যমে ছাত্রদের চরিত্রের বাঞ্ছিত পরিবর্তন সাধনে উদ্যোগী হবেন। আদর্শ অর্থেÑএকজন শিক্ষক মাত্রই তিনি সুশিক্ষিত, কুসংস্কারমুক্ত, ধর্মপরায়ণ এবং ব্যক্তিত্ববোধ সম্পন্ন মানুষ। শিক্ষকরা ন্যায়ের পথে কথা বলেন। মানুষের মঙ্গল চিন্তা করেন। শিক্ষক মানেই নির্লোভচিত্ত একজন সৎ বিবেক। শিক্ষক মানেই অফুরন্ত সাহসের উৎস।

পেশাদারিত্বে আছে ভদ্রতা ও আদর্শের প্রতিফলন। সম্মানজনক অর্থেÑআদর্শ এবং মহান কর্মকান্ডে নিরলস প্রচেষ্টায় একজন সাধারণ শিশু শিক্ষার আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে স্বমহিমায় দেশের বিভিন্ন উন্নয়ন ক্ষেত্রে অবদান রাখছে। এ সুবাদে শিক্ষকরা এ বিরল কৃতিত্বের দাবিদার। তারা সম্মানিত, তারা শ্রদ্ধাভাজন। শিক্ষকের অতি বড় হাতিয়ার প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব। বিদ্যালয়ের যেকোনো আকস্মিক সমস্যার তাৎক্ষণিক মোকাবিলার জন্য অতিদ্রুত একটি বৌদ্ধিক এবং যৌক্তিক সমাধানে পৌঁছতে হয়। আদর্শবান শিক্ষক ব্যক্তিত্বের ভূষণ : সুমার্জিত আচার-আচরণ এবং পরিপাটি পোশাক-পরিচ্ছদ। আড়ম্বরের বাহুল্য আসল মানুষের ব্যক্তিত্বকে কৃত্রিম আবরণে ঢেকে রাখে। এসব গুণাবলি শিক্ষকতার পক্ষে অতি প্রয়োজনীয়। এ ছাড়াও শিক্ষক অবশ্যই তার আচার-আচরণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর আস্থা, শ্রদ্ধা এবং সহৃদয় সহযোগিতা লাভ করতে প্রয়াসী হবেন।


অন্যথায় তাদের শিক্ষার লক্ষ্যপথে চালাতে তথা তাদের আচার-আচরণে বাঞ্ছিত পরিবর্তন সাধনে শিক্ষক নানা অসুবিধার সম্মুখীন হতে পারেন। তিনি আত্মপ্রত্যয়শীল ও সক্রিয় হবেন। নিরুদ্যম, নিস্পৃহ শিক্ষক, ব্যর্থতার বিষণœ প্রতিমূর্তি। শিক্ষায় সঞ্চরণশীলতার সক্রিয় প্রতিভূ যিনি, তার নিষ্ক্রিয় মনোভাব থাকলে চলবে না। নিরলস নিষ্ঠা শিক্ষকের প্রতিষ্ঠার পথ সুদৃঢ় করে। শিক্ষক হবেন মুদ্রাদোষ রহিত। শৈশব, বাল্য ও কৈশোর অনুসরণ ও অনুশীলনের সময়। শিক্ষকের মুদ্রাদোষ স্বভাবতই শিক্ষার্থীর ওপর প্রভাব ফেলে। তাই শিক্ষকের মুদ্রাদোষ থাকা অনুচিত। শিক্ষক একজন উত্তম ছাত্র। এই পরিবর্তনের সঙ্গে মন-মানসিক সক্রিয়, সজীব রাখার জন্য শিক্ষা ক্রিয়ার ‘অপরিহার্য উপাদান’ শিক্ষককে অধ্যয়নের মাধ্যমে সক্রিয়, সজীব রাখার ভাব-ভাবনা নতুনতর দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী হতে হবে। শিক্ষকের সাধনাই হচ্ছে সারাজীবন ছাত্র থাকার অনুধ্যান। শিক্ষার্জনের পথ ডিগ্রির খুঁটিতে আবদ্ধ বা পুঁথিসর্বস্বলব্ধ জ্ঞানেই সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষা একটি পরিবর্তনশীল প্রক্রিয়া। যেখান থেকে বেরিয়ে আসা আমি, আমরা এবং দেশ, জাতি ও রাষ্ট্র কারো পক্ষেই সম্ভব নয়।

No Comments