কুরআন-হাদিসে প্রকৃত আলেমের যত মর্যাদা


অথর
ডোনেট বাংলাদেশ ডেক্স   ধর্ম ও জীবন
প্রকাশিত :৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১০:৪২ পূর্বাহ্ণ | পঠিত : 113 বার
কুরআন-হাদিসে প্রকৃত আলেমের যত মর্যাদা

একজন আলেম দেশ ও জাতির শ্রেষ্ঠ সম্পদ। মূল্যবান সম্পদ হারিয়ে গেলে মানুষ যেমন দিশেহারা হয়ে যায়, ঠিক তেমনি কোন আলেম চলে গেলে পুরো দেশ ও সমাজ অচল হয়ে পড়ে। যেহেতু আলেম-ওলামা না থাকলে দ্বীন ও দ্বীনি জ্ঞান চর্চা হবে না, পৃথিবীর সব মানুষ মনুষ্যত্ব ভুলে গিয়ে চতুষ্পদ জন্তুতে পরিণত হয়ে যাবে, তাই তাদের অনুপস্থিতিতে এই নশ্বর পৃথিবীও টিকে থাকবে না, ধ্বংস হয়ে যাবে। সেজন্যে একজন প্রকৃত আলেমকে দান করা হয়েছে সর্বোচ্চ মর্যাদা। হাদিসের ভাষায় আলেমের মর্যাদা— ১. আলেমরা সম্মানিত উবাদা ইবনে সামেত (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘ওই ব্যক্তি আমার আদর্শের ওপর নাই, যে আমাদের বড়দের সম্মান করে না, ছোটদের স্নেহ করে না এবং আমাদের আলেমদের প্রাপ্য মর্যাদা প্রদান করে না।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২২১৪৩) ২. আলেমরা নবীদের ওয়ারিশ আল্লাহতায়ালার বান্দাদের মধ্যে প্রিয় হচ্ছেন নবীগণ। একজন সত্যিকারের আলেম নবীদের উত্তরাধিকারী হিসেবে মর্যাদা পান। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলেমের মর্যাদা সম্পর্কে ইরশাদ করেন, ‘আলেমরা নবীদের উত্তরাধিকারী, আর নবীরা উত্তরাধিকার হিসেবে দিনার ও দিরহাম (অর্থকড়ি) রেখে যাননি। তারা উত্তরাধিকার হিসেবে রেখে গেছেন ইলম। অতএব যে ব্যক্তি তা গ্রহণ করেছে, সে বিপুল অংশ লাভ করেছে। (সুনানু আবী দাউদ, হাদিস: ৩৬৪৩) ৩. মৃত্যুর পরও আলেমের নেক আমল জারি থাকে মানুষ মৃত্যুবরণ করার সঙ্গে সঙ্গে তার আমল বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু আলেমের আমল জারি থাকে। একজন আলেম জীবিত অবস্থায় ইলম বিতরণ করার কারণে অনেকে উপকৃত হয়েছেন। সেজন্য মৃত্যুবরণ করার পরও তার সওয়াব তিনি পেতে থাকবেন। এ প্রসঙ্গে বিখ্যাত সাহাবি আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘মানুষ যখন মারা যায়, তখন তার আমল বন্ধ হয়ে যায়। তবে তিনটি উৎস থেকে তা অব্যাহত থাকে : সদকায়ে জারিয়া, উপকারী ইলম ও নেক সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।’ (সহীহ মুসলিম: ৪৩১০) ৪. সকল সৃষ্টি আলেমের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে কুরআন-সুন্নাহর ইলমে সমৃদ্ধ ব্যক্তির জন্য বড়ই সুসংবাদ যে, তার জন্য আল্লাহর নিকট সকলেই ক্ষমা প্রার্থনা করে। আনাস ইবনু মালিক (রা.) হতে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘ইলমের অধিকারী ব্যক্তির জন্য সব কিছুই ক্ষমা প্রার্থনা করে। এমনকি সমুদ্রের মাছও।’ (মুসনাদু আবী ইআ'লা: ২/২৬০) আল্লাহতায়ালা আলেমদের শান ও মর্যাদাকে সমুন্নত করেছেন, কুরআনে বর্ণিত হয়েছে— আল্লাহ তায়ালা স্বাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, তিনি ছাড়া কোন উপাস্য নেই, এবং ফেরেশতাগণ, আলেমগণ ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় বদ্ধপরিকর। (সুরা আলে ইমরান- ৩) আল্লাহতায়ালা যাদের কে নিজ সত্তার সাথে, ফেরেশতাগণের সাথে সম্পৃক্ত করেছেন তাদেরকে সম্মান করা মুসলমানদের জন্য আবশ্যক। আলেমদের বিরুদ্ধাচারণের কুফল— ধর্মের সঠিক ব্যাখ্যা ও মুসলমানদের বিশুদ্ধ পথে পরিচালনা করার জন্য যে আলেমরা নিজেদের সর্বস্ব কোরবান করেন তাদের প্রতি অবজ্ঞা বা ধৃষ্টতা প্রদর্শন করলে, তাদের নিয়ে উপহাস বা ঠাট্টা করলে বা বিশ্রী ভাষায় গালাগালি করলে এর পরিণতি হবে ভয়ংকর। ইমাম ত্বহাবী রহ, তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আল আকিদাতুত তহাবিয়্যা’য় লিখেছেন— পূর্ববর্তী ও পরবর্তী ওলামায়ে কেরাম যারা হাদিস, ফিকহ ও দ্বীনি দূরদর্শীতাসম্পন্ন, ন্যায়সঙ্গত কারণ ব্যতিত তাদের সমালোচনা করা জায়েজ নেই। যারা অন্যায়ভাবে তাদের সমালোচনা করবে তারা গোমরাহ হিসেবে গণ্য হবে। (আল আকিদাতুত ত্বহাবিয়্যাহ,,পৃষ্ঠা:১৪৫) ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত: আলেমদের রক্ত বিষাক্ত। যে তার ঘ্রাণ নিবে সে অসুস্থ হয়ে পড়বে। যে তা ভক্ষণ করবে সে মারা যাবে। আলেমদের সঙ্গে শত্রুতা পোষণ করা আল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধ করার নামান্তর। যে আলেমের সঙ্গে বিদ্বেষ পোষণ করে সে যেন স্বয়ং আল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধ লিপ্ত হল। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ বলেন— ‘যে আমার ওলির সঙ্গে বিদ্বেষ পোষণ করল; পরিণামে আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দিলাম।’ (সহিহ বুখারি) আলেমের প্রতি বিদ্রুপ করলে অন্তর মরে যায়। হাফেজ ইবনে আসাকির (রহ.) বলেন—‘যে ব্যক্তি আলেমের প্রতি বিদ্রুপাত্মক শব্দ ব্যবহার করে মৃত্যুর আগে তার অন্তর মরে যাবে।’ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘তোমরা মোরগকে গালি দিও না; কেননা সে প্রত্যুষে মানুষকে নামাজের জন্য জাগিয়ে তোলে।’ (আবু দাউদ : ৫১০১)। নামাজের জন্য ডাকার কারণে একটি সাধারণ মোরগের ব্যাপারে যখন এমন বলা হল, আল্লাহর দিকে আহ্বানকারী, নবীর উত্তরাধিকারী আলেমদের সম্মান ও মানহানি থেকে বিরত থাকা তো আরও অধিকতর গুরুত্বের দাবি রাখে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন— ‘তার কথার চেয়ে উত্তম কথা আর কার হতে পারে, যে মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করে। নিজেও সৎকর্ম করে এবং এও বলে যে, নিশ্চয়ই আমি একজন মুসলমানের অন্তর্ভুক্ত।’ (সুরা হা মীম সাজদা) অতএব, ইসলামি বিধি-বিধানের প্রকৃত মূল্যবোধ বজায় ও জাগরিত রাখার জন্য আলেম-ওলামাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও আস্থাশীল হতে হবে। তাদের প্রতি মান্যতা থাকতে হবে। তুচ্ছতাচ্ছিল্য ও অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখা যাবে না। বিরুদ্ধাচারণ করা যাবে না। কারণ, আলেমদের বিরোধিতা করা ইসলাম বিরোধী হওয়ার নামান্তর। লেখক: তরুণ আলেম, ফারেগ- জামিয়া শারইয়্যাহ মালিবাগ, ঢাকা







Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Ok