ক্ষমতাসীনদের শুভবুদ্ধির উদয় হোক - ডোনেট বাংলাদেশ

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ঘিরে জাতীয় পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত গত কয়েক দিনের সংবাদ শিরোনামগুলোয় বাংলাদেশের গণতন্ত্রচর্চা ও ক্ষমতাসীন দলের বেহাল অবস্থার চিত্রই যেন ফুটে উঠেছে। এর মধ্যে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য শিরোনাম ছিল, ‘সহিংস পরিবেশে আজ ৮৩৮ ইউপিতে ভোট’, ‘ভোট ছাড়া জয়ে রেকর্ড’, ‘এমপি লীগই শেষকথা, ত্যাগীরা কোণঠাসা’, ‘রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে নিহত ৭ ’, ‘দ্বিতীয় স্থানেও নেই আওয়ামী লীগ’, ‘তৃণমূলে আওয়ামী লীগের বেহাল দশা’ ইত্যাদি ইত্যাদি। ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনের সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, ৫৯ জনের মৃত্যু হয়েছে।

আহত হয়েছে শত শত। ১৩ নভেম্বর দৈনিক আজকের পত্রিকার প্রধান শিরোনাম ছিল, ‘ক্ষমতাসীনেরা যেন সহিংসতা মেনে নিয়েছেন’। প্রশ্ন হলো, ক্ষমতাসীনেরা সহিংসতা কি শুধু মেনে নিয়েছেন? নাকি সহিংসতার ইন্ধনও জোগাচ্ছেন কেউ কেউ? আজকের পত্রিকার এ খবরে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের উল্লেখ আছে। খবরে বলা হয়েছে, চলমান ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অতীতের সবকিছু ছাড়িয়ে গেছে; মানুষের মৃত্যু, সংঘর্ষ, কেন্দ্র দখল। অন্য সব নির্বাচনে একাধিক রাজনৈতিক দলের মধ্যে সহিংসতা হলেও এবারের চিত্র ছিল ভিন্ন। এবারের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে নিজেদের মধ্যে। একদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী, অপরদিকে আওয়ামী লীগ থেকে সাময়িকভাবে বেরিয়ে যাওয়া তথাকথিত বিদ্রোহী প্রার্থী।

পাঠক, প্রশ্ন করতেই পারেন, আওয়ামী লীগের এসব বিদ্রোহী প্রার্থীর সাময়িকভাবে বেরিয়ে যাওয়া তথাকথিত বিদ্রোহী প্রার্থী বললাম কেন? অতীতে দেখেছি, বিদ্রোহী প্রার্থীরা নির্বাচনে জয়লাভ করার পর দলে আবার ফিরে এসেছেন। দলও তখন তাঁদের গ্রহণ করে নিয়েছে। আবার এমনও দেখা গেছে, দলের হাইকমান্ড থেকেই নির্দেশ আসছে, জয়লাভকারী বিদ্রোহী প্রার্থীদের যেন দলে ফিরিয়ে আনা হয়। এ জন্যই তাঁদের দল থেকে সাময়িকভাবে বেরিয়ে যাওয়া প্রার্থী বলেছি।
এবার দেখা গেছে, দলের প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে ঘরের ঝগড়া নিজেরা মিটমাট করতে ব্যর্থ হয়ে, দলের পক্ষ থেকে প্রশাসনকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর হওয়ার নির্দেশ দিলেও প্রশাসন সামাল দিতে ব্যর্থ হয়েছে। সুতরাং যা হওয়ার তা-ই হয়েছে। এ বিষয়ে দলের সাধারণ সম্পাদক দুঃখ প্রকাশ করলেও সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কিন্তু অন্য কথা বলছেন। তিনি বলেছেন, ‘এটা গোষ্ঠী গোষ্ঠীর নির্বাচন, আধিপত্যের নির্বাচন, এতে সব সময়ই একটু ঝগড়াঝাঁটি হয়।’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য শুনে মনে হয়েছে, খুনোখুনির ঘটনা কোনো ব্যাপারই নয়। সভ্য দেশে যখন একজনের অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়, তখন তোলপাড় পড়ে যায়, সেখানে ৫৯ জনের হত্যাকাণ্ডের পরও দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে স্রেফ ‘একটু ঝগড়াঝাঁটি’ বলে মনে হয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডে খুনিদের উৎসাহিত জোগাবে বৈকি!
বিরোধী রাজনৈতিক দলের রাজনীতির পথ যখন রুদ্ধ করে দেওয়া হয়, তখন দেশে সুষ্ঠু গণতন্ত্রচর্চার পথটিও বন্ধ হয়ে যায়। বিরাজনীতিকরণের পথ বড়ই পিচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত এর আছর নিজেদের দলেও এসে পড়ে। ফলে রাজনীতি হয় কলুষিত। ক্ষমতাসীনদের তখন ক্ষমতার ভাগা-বাঁটোয়ারা নিয়ে শুরু হয় ঝগড়া। কাকে ডিঙিয়ে কে উঁচুতে উঠবেন—নিজেদের মধ্যে শুরু হয় এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য যেন তারই ইঙ্গিত বহন করে। এ জন্যই তিনি নির্দ্বিধায় বলতে পেরেছেন, ‘গোষ্ঠী গোষ্ঠীর নির্বাচন’। ক্ষমতাসীন দল এমন পরিস্থিতির যে মুখোমুখি হবে, তা গত জাতীয় নির্বাচনের পর অনেক রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞই সে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘একসময় এমনও পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে, যখন বিরোধী দলের মুখোমুখি নয়; অবৈধ ক্ষমতার চর্চা রাজনীতির ময়দানের এমন লালসার সৃষ্টি করবে যে, নিজ দলের বখে যাওয়া লোকদের মুখোমুখি হয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতেই তখন হিমশিম খেতে হবে।’

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচনের পরপর ঢাকার একটি জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত ‘বাংলাদেশি গণতন্ত্রব্যবস্থায় জনগণের অবস্থান’ নামে আমার একটি নিবন্ধেও সেই ইঙ্গিত আছে। জনগণকে নির্বাসনে পাঠিয়ে আর যা-ই হোক গণতন্ত্র রক্ষা করা যায় না। মুখে যে কথাই বলুন না কেন, এভাবে মন্ত্রী-এমপি হওয়ার মধ্যে গর্বের কিছু নেই। গণতান্ত্রিক চর্চায় জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলনই যদি না ঘটে, এর কুফল ভোগ করতেই হবে। বর্তমানে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ক্ষমতাসীনেরা যেন সেই কুফলের আঁচ টের পাচ্ছেন। জনগণকে বাদ দিয়ে আমাদের দেশে যে গণতন্ত্রের কথা হয়, তা গণতন্ত্র সংস্কৃতির মধ্যে পড়ে কি না, এ নিয়ে বড় প্রশ্ন আছে। অথচ গণতন্ত্রব্যবস্থা চালু হয়েছিল রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের অধিকারটুকু নিশ্চিত করার জন্য। ‘গণতন্ত্র’ পরিভাষাটি ইংরেজি ‘ডেমোক্রেসি’ থেকে এসেছে। এই ইংরেজি শব্দটি আবার গ্রিক শব্দ ‘দেমোক্রাতিয়া’ থেকে নেওয়া, যার অর্থ জনগণের শাসন। বিশ্বের প্রথম গণতন্ত্র চালু হয় গ্রিসের শহর রাষ্ট্র এথেন্সে। সে সময় রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিচালনার জন্য বিভিন্ন উপজাতির মধ্য থেকে নেতাদের মনোনীত করে নেওয়া হতো।

সেখানে সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণের কোনো সুযোগ ছিল না। পরে সনাতনি এ রীতি ভেঙে রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণকে সম্পৃক্ত করতে একটি অভিনব ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। নতুন এ ব্যবস্থাপনার অধীনে প্রতিটি মুক্ত নাগরিককে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণকালে সরকার পরিচালনায় সরাসরি অংশগ্রহণের অধিকার দেওয়া হয়। সাধারণভাবে এ ঘটনাকেই গণতন্ত্রের প্রথম উন্মেষ বলে গণ্য করা হয়ে থাকে। অতঃপর কালের বিবর্তনে পরিমার্জিত হয়ে বিশ্বের
বিভিন্ন দেশে গণতন্ত্রের বর্তমান রূপটি অনুসৃত হয়ে আসছে।

ক্ষমতাসীন দলের নিজেদের মধ্যে এই সহিংসতা ইউপি নির্বাচনকে ঘিরেই শুরু হয়নি। সহিংসতা অনেক আগে থেকেই চলে আসছে। এরূপ ঘটনা শুধু নিজেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বিরোধীপক্ষ ও সাধারণ মানুষের ওপরও নানাবিধ অত্যাচার, লুটতরাজ, নারী ধর্ষণের অনেক ঘটনার সঙ্গে ক্ষমতাসীনদের জড়িত থাকতে দেখা গেছে। গত জাতীয় নির্বাচনের পর পর নোয়াখালীর সুবর্ণচরের গৃহবধূকে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতার নেতৃত্বে গণধর্ষণের মাধ্যমে এ ধরনের সহিংস ঘটনার সূত্রপাত ঘটেছিল। সুবর্ণচরের সেই নারী ছিলেন আমাদেরই কারও ভগিনী, কারও জননী, কারও গৃহবধূ। তাঁর অপরাধ তিনি ক্ষমতাসীন দলের কর্মীদের চোখরাঙানি উপেক্ষা করে তাঁর নিজ পছন্দের ব্যক্তির পক্ষে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছিলেন।

এর জন্য যে তাঁকে এত বেশি মাশুল দিতে হবে, তা হয়তো তিনি কল্পনাও করেননি। হয়তো ভেবেছিলেন এ ঘটনার সেখানেই সমাপ্তি ঘটেছে। আমাদের অনেকের হয়তো মনে আছে, ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের দিন সন্ধ্যায় গ্রাম্য এই গৃহবধূর জীবনে নেমে এসেছিল বিভীষিকাময় সেই মুহূর্ত। ১০-১২ জন পুরুষের একটি দল সেদিন অসুস্থ অটোরিকশাচালক স্বামী ও সন্তানদের রশি দিয়ে বেঁধে রেখে, জংলি জানোয়ারের মতো অসহায় গৃহবধূকে ঘিরে ধরে একে একে লালসা মিটিয়েছিল তাদের হুকুম অমান্য করার অপরাধে। সেদিনের সেই রাতে নোয়াখালীর সুবর্ণচরে, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হায়েনাদের বাঙালি কন্যা, জায়া ও জননী গণধর্ষণের যেন এক নতুন অ্যাপিসোডের প্রদর্শনী হয়েছিল। এ ঘটনার পর থেকে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা (সবাই নয়) এযাবৎ যত অপকর্ম ঘটিয়েছে, তার বর্ণনা একটি লেখায় উল্লেখ করা সম্ভব নয়। এ কথা এখন বলা যায়, বর্তমানে দেশে যে সহিংস ঘটনা ঘটছে, তা ক্ষমতাসীনেরা শুধু মেনেই নেয়নি, কোনো কোনো ঘটনায় তাদের ইন্ধনের গন্ধও পাওয়া যায়। এ প্রসঙ্গে ‘চাকরির কোটা আন্দোলন’ ও ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি হাতুড়ি ও হেলমেট বাহিনীর অত্যাচারের কথা উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করাই যায়। সেদিনের সেই ক্ষতচিহ্ন যুবসমাজের মনের ভেতর আজও দগদগে
হয়ে জ্বলছে।

অগণতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতা দখল কিংবা ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য যেকোনো উপায়ে বিরোধীপক্ষকে রাজনৈতিক ময়দানছাড়া করা যে হিতের বিপরীত হতে পারে, এবারের ইউনিয়ন পরিষদের দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনের সহিংস ঘটনা তা-ই প্রমাণ করে। শক্ত বিরোধী দল না থাকায় নিজেদের মধ্যে হানাহানি, খুনোখুনির ঘটনায় আওয়ামী লীগের নেতারা যে উদ্বিগ্ন, সে খবর পত্রিকায় বেরিয়েছে। তাঁদের এই উপলব্ধি গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য ভালো লক্ষণ বলেই মনে হয়। এই উপলব্ধি থেকে যদি তাঁদের শুভবুদ্ধির উদয় হয়, তাহলে সবার জন্যই মঙ্গল; দেশের জন্য তো বটেই। এ প্রসঙ্গে খবরের কাগজে প্রকাশিত আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদের একটি মন্তব্য তুলে ধরা যায়: ‘ইউপি নির্বাচনে দীর্ঘদিন ধরে সহিংসতা ও প্রাণহানির অপসংস্কৃতি চলে আসছে। সাম্প্রতিককালে এর বহিঃপ্রকাশ অনেক কদর্য ও বিব্রতকর; বিশেষ করে ইউপি নির্বাচনে দলের অভ্যন্তরে পেশিশক্তির অনুপ্রবেশ এবং পরিকল্পিত সহিংসতা আমাদের গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা ও সৌন্দর্য বিনষ্ট করছে। সমগ্র রাজনৈতিক প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। যার পরিণতি সুখকর হবে না।’

আমরা বিশ্বাস করতে চাই, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের এই উপলব্ধি তাঁর দলের উচ্চপর্যায়ের নেতা-নেত্রীর উপলব্ধিরই বহিঃপ্রকাশ। আমরা আরও বিশ্বাস করতে চাই, তাঁর এই কথা ও কাজের যেন মিল ঘটে। তা না হলে ক্ষমতাসীন দলের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে আবু সাঈদ আল মাহমুদের এই বক্তব্য আরও একটি অসার রাজনৈতিক বুলিতে পরিণত হবে।

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ঘিরে জাতীয় পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত গত কয়েক দিনের সংবাদ শিরোনামগুলোয় বাংলাদেশের গণতন্ত্রচর্চা ও ক্ষমতাসীন দলের বেহাল অবস্থার চিত্রই যেন ফুটে উঠেছে। এর মধ্যে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য শিরোনাম ছিল, ‘সহিংস পরিবেশে আজ ৮৩৮ ইউপিতে ভোট’, ‘ভোট ছাড়া জয়ে রেকর্ড’, ‘এমপি লীগই শেষকথা, ত্যাগীরা কোণঠাসা’, ‘রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে নিহত ৭ ’, ‘দ্বিতীয় স্থানেও নেই আওয়ামী লীগ’, ‘তৃণমূলে আওয়ামী লীগের বেহাল দশা’ ইত্যাদি ইত্যাদি। ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনের সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, ৫৯ জনের মৃত্যু হয়েছে।

আহত হয়েছে শত শত। ১৩ নভেম্বর দৈনিক আজকের পত্রিকার প্রধান শিরোনাম ছিল, ‘ক্ষমতাসীনেরা যেন সহিংসতা মেনে নিয়েছেন’। প্রশ্ন হলো, ক্ষমতাসীনেরা সহিংসতা কি শুধু মেনে নিয়েছেন? নাকি সহিংসতার ইন্ধনও জোগাচ্ছেন কেউ কেউ? আজকের পত্রিকার এ খবরে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের উল্লেখ আছে। খবরে বলা হয়েছে, চলমান ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অতীতের সবকিছু ছাড়িয়ে গেছে; মানুষের মৃত্যু, সংঘর্ষ, কেন্দ্র দখল। অন্য সব নির্বাচনে একাধিক রাজনৈতিক দলের মধ্যে সহিংসতা হলেও এবারের চিত্র ছিল ভিন্ন। এবারের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে নিজেদের মধ্যে। একদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী, অপরদিকে আওয়ামী লীগ থেকে সাময়িকভাবে বেরিয়ে যাওয়া তথাকথিত বিদ্রোহী প্রার্থী।

পাঠক, প্রশ্ন করতেই পারেন, আওয়ামী লীগের এসব বিদ্রোহী প্রার্থীর সাময়িকভাবে বেরিয়ে যাওয়া তথাকথিত বিদ্রোহী প্রার্থী বললাম কেন? অতীতে দেখেছি, বিদ্রোহী প্রার্থীরা নির্বাচনে জয়লাভ করার পর দলে আবার ফিরে এসেছেন। দলও তখন তাঁদের গ্রহণ করে নিয়েছে। আবার এমনও দেখা গেছে, দলের হাইকমান্ড থেকেই নির্দেশ আসছে, জয়লাভকারী বিদ্রোহী প্রার্থীদের যেন দলে ফিরিয়ে আনা হয়। এ জন্যই তাঁদের দল থেকে সাময়িকভাবে বেরিয়ে যাওয়া প্রার্থী বলেছি।
এবার দেখা গেছে, দলের প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে ঘরের ঝগড়া নিজেরা মিটমাট করতে ব্যর্থ হয়ে, দলের পক্ষ থেকে প্রশাসনকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর হওয়ার নির্দেশ দিলেও প্রশাসন সামাল দিতে ব্যর্থ হয়েছে। সুতরাং যা হওয়ার তা-ই হয়েছে। এ বিষয়ে দলের সাধারণ সম্পাদক দুঃখ প্রকাশ করলেও সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কিন্তু অন্য কথা বলছেন। তিনি বলেছেন, ‘এটা গোষ্ঠী গোষ্ঠীর নির্বাচন, আধিপত্যের নির্বাচন, এতে সব সময়ই একটু ঝগড়াঝাঁটি হয়।’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য শুনে মনে হয়েছে, খুনোখুনির ঘটনা কোনো ব্যাপারই নয়। সভ্য দেশে যখন একজনের অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়, তখন তোলপাড় পড়ে যায়, সেখানে ৫৯ জনের হত্যাকাণ্ডের পরও দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে স্রেফ ‘একটু ঝগড়াঝাঁটি’ বলে মনে হয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডে খুনিদের উৎসাহিত জোগাবে বৈকি!
বিরোধী রাজনৈতিক দলের রাজনীতির পথ যখন রুদ্ধ করে দেওয়া হয়, তখন দেশে সুষ্ঠু গণতন্ত্রচর্চার পথটিও বন্ধ হয়ে যায়। বিরাজনীতিকরণের পথ বড়ই পিচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত এর আছর নিজেদের দলেও এসে পড়ে। ফলে রাজনীতি হয় কলুষিত। ক্ষমতাসীনদের তখন ক্ষমতার ভাগা-বাঁটোয়ারা নিয়ে শুরু হয় ঝগড়া। কাকে ডিঙিয়ে কে উঁচুতে উঠবেন—নিজেদের মধ্যে শুরু হয় এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য যেন তারই ইঙ্গিত বহন করে। এ জন্যই তিনি নির্দ্বিধায় বলতে পেরেছেন, ‘গোষ্ঠী গোষ্ঠীর নির্বাচন’। ক্ষমতাসীন দল এমন পরিস্থিতির যে মুখোমুখি হবে, তা গত জাতীয় নির্বাচনের পর অনেক রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞই সে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘একসময় এমনও পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে, যখন বিরোধী দলের মুখোমুখি নয়; অবৈধ ক্ষমতার চর্চা রাজনীতির ময়দানের এমন লালসার সৃষ্টি করবে যে, নিজ দলের বখে যাওয়া লোকদের মুখোমুখি হয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতেই তখন হিমশিম খেতে হবে।’

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচনের পরপর ঢাকার একটি জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত ‘বাংলাদেশি গণতন্ত্রব্যবস্থায় জনগণের অবস্থান’ নামে আমার একটি নিবন্ধেও সেই ইঙ্গিত আছে। জনগণকে নির্বাসনে পাঠিয়ে আর যা-ই হোক গণতন্ত্র রক্ষা করা যায় না। মুখে যে কথাই বলুন না কেন, এভাবে মন্ত্রী-এমপি হওয়ার মধ্যে গর্বের কিছু নেই। গণতান্ত্রিক চর্চায় জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলনই যদি না ঘটে, এর কুফল ভোগ করতেই হবে। বর্তমানে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ক্ষমতাসীনেরা যেন সেই কুফলের আঁচ টের পাচ্ছেন। জনগণকে বাদ দিয়ে আমাদের দেশে যে গণতন্ত্রের কথা হয়, তা গণতন্ত্র সংস্কৃতির মধ্যে পড়ে কি না, এ নিয়ে বড় প্রশ্ন আছে। অথচ গণতন্ত্রব্যবস্থা চালু হয়েছিল রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের অধিকারটুকু নিশ্চিত করার জন্য। ‘গণতন্ত্র’ পরিভাষাটি ইংরেজি ‘ডেমোক্রেসি’ থেকে এসেছে। এই ইংরেজি শব্দটি আবার গ্রিক শব্দ ‘দেমোক্রাতিয়া’ থেকে নেওয়া, যার অর্থ জনগণের শাসন। বিশ্বের প্রথম গণতন্ত্র চালু হয় গ্রিসের শহর রাষ্ট্র এথেন্সে। সে সময় রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিচালনার জন্য বিভিন্ন উপজাতির মধ্য থেকে নেতাদের মনোনীত করে নেওয়া হতো।

সেখানে সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণের কোনো সুযোগ ছিল না। পরে সনাতনি এ রীতি ভেঙে রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণকে সম্পৃক্ত করতে একটি অভিনব ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। নতুন এ ব্যবস্থাপনার অধীনে প্রতিটি মুক্ত নাগরিককে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণকালে সরকার পরিচালনায় সরাসরি অংশগ্রহণের অধিকার দেওয়া হয়। সাধারণভাবে এ ঘটনাকেই গণতন্ত্রের প্রথম উন্মেষ বলে গণ্য করা হয়ে থাকে। অতঃপর কালের বিবর্তনে পরিমার্জিত হয়ে বিশ্বের
বিভিন্ন দেশে গণতন্ত্রের বর্তমান রূপটি অনুসৃত হয়ে আসছে।

ক্ষমতাসীন দলের নিজেদের মধ্যে এই সহিংসতা ইউপি নির্বাচনকে ঘিরেই শুরু হয়নি। সহিংসতা অনেক আগে থেকেই চলে আসছে। এরূপ ঘটনা শুধু নিজেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বিরোধীপক্ষ ও সাধারণ মানুষের ওপরও নানাবিধ অত্যাচার, লুটতরাজ, নারী ধর্ষণের অনেক ঘটনার সঙ্গে ক্ষমতাসীনদের জড়িত থাকতে দেখা গেছে। গত জাতীয় নির্বাচনের পর পর নোয়াখালীর সুবর্ণচরের গৃহবধূকে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতার নেতৃত্বে গণধর্ষণের মাধ্যমে এ ধরনের সহিংস ঘটনার সূত্রপাত ঘটেছিল। সুবর্ণচরের সেই নারী ছিলেন আমাদেরই কারও ভগিনী, কারও জননী, কারও গৃহবধূ। তাঁর অপরাধ তিনি ক্ষমতাসীন দলের কর্মীদের চোখরাঙানি উপেক্ষা করে তাঁর নিজ পছন্দের ব্যক্তির পক্ষে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছিলেন।

এর জন্য যে তাঁকে এত বেশি মাশুল দিতে হবে, তা হয়তো তিনি কল্পনাও করেননি। হয়তো ভেবেছিলেন এ ঘটনার সেখানেই সমাপ্তি ঘটেছে। আমাদের অনেকের হয়তো মনে আছে, ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের দিন সন্ধ্যায় গ্রাম্য এই গৃহবধূর জীবনে নেমে এসেছিল বিভীষিকাময় সেই মুহূর্ত। ১০-১২ জন পুরুষের একটি দল সেদিন অসুস্থ অটোরিকশাচালক স্বামী ও সন্তানদের রশি দিয়ে বেঁধে রেখে, জংলি জানোয়ারের মতো অসহায় গৃহবধূকে ঘিরে ধরে একে একে লালসা মিটিয়েছিল তাদের হুকুম অমান্য করার অপরাধে। সেদিনের সেই রাতে নোয়াখালীর সুবর্ণচরে, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হায়েনাদের বাঙালি কন্যা, জায়া ও জননী গণধর্ষণের যেন এক নতুন অ্যাপিসোডের প্রদর্শনী হয়েছিল। এ ঘটনার পর থেকে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা (সবাই নয়) এযাবৎ যত অপকর্ম ঘটিয়েছে, তার বর্ণনা একটি লেখায় উল্লেখ করা সম্ভব নয়। এ কথা এখন বলা যায়, বর্তমানে দেশে যে সহিংস ঘটনা ঘটছে, তা ক্ষমতাসীনেরা শুধু মেনেই নেয়নি, কোনো কোনো ঘটনায় তাদের ইন্ধনের গন্ধও পাওয়া যায়। এ প্রসঙ্গে ‘চাকরির কোটা আন্দোলন’ ও ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি হাতুড়ি ও হেলমেট বাহিনীর অত্যাচারের কথা উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করাই যায়। সেদিনের সেই ক্ষতচিহ্ন যুবসমাজের মনের ভেতর আজও দগদগে
হয়ে জ্বলছে।

অগণতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতা দখল কিংবা ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য যেকোনো উপায়ে বিরোধীপক্ষকে রাজনৈতিক ময়দানছাড়া করা যে হিতের বিপরীত হতে পারে, এবারের ইউনিয়ন পরিষদের দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনের সহিংস ঘটনা তা-ই প্রমাণ করে। শক্ত বিরোধী দল না থাকায় নিজেদের মধ্যে হানাহানি, খুনোখুনির ঘটনায় আওয়ামী লীগের নেতারা যে উদ্বিগ্ন, সে খবর পত্রিকায় বেরিয়েছে। তাঁদের এই উপলব্ধি গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য ভালো লক্ষণ বলেই মনে হয়। এই উপলব্ধি থেকে যদি তাঁদের শুভবুদ্ধির উদয় হয়, তাহলে সবার জন্যই মঙ্গল; দেশের জন্য তো বটেই। এ প্রসঙ্গে খবরের কাগজে প্রকাশিত আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদের একটি মন্তব্য তুলে ধরা যায়: ‘ইউপি নির্বাচনে দীর্ঘদিন ধরে সহিংসতা ও প্রাণহানির অপসংস্কৃতি চলে আসছে। সাম্প্রতিককালে এর বহিঃপ্রকাশ অনেক কদর্য ও বিব্রতকর; বিশেষ করে ইউপি নির্বাচনে দলের অভ্যন্তরে পেশিশক্তির অনুপ্রবেশ এবং পরিকল্পিত সহিংসতা আমাদের গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা ও সৌন্দর্য বিনষ্ট করছে। সমগ্র রাজনৈতিক প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। যার পরিণতি সুখকর হবে না।’

আমরা বিশ্বাস করতে চাই, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের এই উপলব্ধি তাঁর দলের উচ্চপর্যায়ের নেতা-নেত্রীর উপলব্ধিরই বহিঃপ্রকাশ। আমরা আরও বিশ্বাস করতে চাই, তাঁর এই কথা ও কাজের যেন মিল ঘটে। তা না হলে ক্ষমতাসীন দলের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে আবু সাঈদ আল মাহমুদের এই বক্তব্য আরও একটি অসার রাজনৈতিক বুলিতে পরিণত হবে।

ক্ষমতাসীনদের শুভবুদ্ধির উদয় হোক

এ কে এম শামসুদ্দিন
আপডেটঃ ১৮ নভেম্বর, ২০২১ | ৮:২৭ 90 ভিউ
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ঘিরে জাতীয় পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত গত কয়েক দিনের সংবাদ শিরোনামগুলোয় বাংলাদেশের গণতন্ত্রচর্চা ও ক্ষমতাসীন দলের বেহাল অবস্থার চিত্রই যেন ফুটে উঠেছে। এর মধ্যে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য শিরোনাম ছিল, ‘সহিংস পরিবেশে আজ ৮৩৮ ইউপিতে ভোট’, ‘ভোট ছাড়া জয়ে রেকর্ড’, ‘এমপি লীগই শেষকথা, ত্যাগীরা কোণঠাসা’, ‘রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে নিহত ৭ ’, ‘দ্বিতীয় স্থানেও নেই আওয়ামী লীগ’, ‘তৃণমূলে আওয়ামী লীগের বেহাল দশা’ ইত্যাদি ইত্যাদি। ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনের সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, ৫৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছে শত শত। ১৩ নভেম্বর দৈনিক আজকের পত্রিকার প্রধান শিরোনাম ছিল, ‘ক্ষমতাসীনেরা যেন সহিংসতা মেনে নিয়েছেন’। প্রশ্ন হলো, ক্ষমতাসীনেরা সহিংসতা কি শুধু মেনে নিয়েছেন? নাকি সহিংসতার ইন্ধনও জোগাচ্ছেন কেউ কেউ? আজকের পত্রিকার এ খবরে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের উল্লেখ আছে। খবরে বলা হয়েছে, চলমান ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অতীতের সবকিছু ছাড়িয়ে গেছে; মানুষের মৃত্যু, সংঘর্ষ, কেন্দ্র দখল। অন্য সব নির্বাচনে একাধিক রাজনৈতিক দলের মধ্যে সহিংসতা হলেও এবারের চিত্র ছিল ভিন্ন। এবারের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে নিজেদের মধ্যে। একদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী, অপরদিকে আওয়ামী লীগ থেকে সাময়িকভাবে বেরিয়ে যাওয়া তথাকথিত বিদ্রোহী প্রার্থী। পাঠক, প্রশ্ন করতেই পারেন, আওয়ামী লীগের এসব বিদ্রোহী প্রার্থীর সাময়িকভাবে বেরিয়ে যাওয়া তথাকথিত বিদ্রোহী প্রার্থী বললাম কেন? অতীতে দেখেছি, বিদ্রোহী প্রার্থীরা নির্বাচনে জয়লাভ করার পর দলে আবার ফিরে এসেছেন। দলও তখন তাঁদের গ্রহণ করে নিয়েছে। আবার এমনও দেখা গেছে, দলের হাইকমান্ড থেকেই নির্দেশ আসছে, জয়লাভকারী বিদ্রোহী প্রার্থীদের যেন দলে ফিরিয়ে আনা হয়। এ জন্যই তাঁদের দল থেকে সাময়িকভাবে বেরিয়ে যাওয়া প্রার্থী বলেছি। এবার দেখা গেছে, দলের প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে ঘরের ঝগড়া নিজেরা মিটমাট করতে ব্যর্থ হয়ে, দলের পক্ষ থেকে প্রশাসনকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর হওয়ার নির্দেশ দিলেও প্রশাসন সামাল দিতে ব্যর্থ হয়েছে। সুতরাং যা হওয়ার তা-ই হয়েছে। এ বিষয়ে দলের সাধারণ সম্পাদক দুঃখ প্রকাশ করলেও সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কিন্তু অন্য কথা বলছেন। তিনি বলেছেন, ‘এটা গোষ্ঠী গোষ্ঠীর নির্বাচন, আধিপত্যের নির্বাচন, এতে সব সময়ই একটু ঝগড়াঝাঁটি হয়।’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য শুনে মনে হয়েছে, খুনোখুনির ঘটনা কোনো ব্যাপারই নয়। সভ্য দেশে যখন একজনের অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়, তখন তোলপাড় পড়ে যায়, সেখানে ৫৯ জনের হত্যাকাণ্ডের পরও দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে স্রেফ ‘একটু ঝগড়াঝাঁটি’ বলে মনে হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডে খুনিদের উৎসাহিত জোগাবে বৈকি! বিরোধী রাজনৈতিক দলের রাজনীতির পথ যখন রুদ্ধ করে দেওয়া হয়, তখন দেশে সুষ্ঠু গণতন্ত্রচর্চার পথটিও বন্ধ হয়ে যায়। বিরাজনীতিকরণের পথ বড়ই পিচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত এর আছর নিজেদের দলেও এসে পড়ে। ফলে রাজনীতি হয় কলুষিত। ক্ষমতাসীনদের তখন ক্ষমতার ভাগা-বাঁটোয়ারা নিয়ে শুরু হয় ঝগড়া। কাকে ডিঙিয়ে কে উঁচুতে উঠবেন—নিজেদের মধ্যে শুরু হয় এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য যেন তারই ইঙ্গিত বহন করে। এ জন্যই তিনি নির্দ্বিধায় বলতে পেরেছেন, ‘গোষ্ঠী গোষ্ঠীর নির্বাচন’। ক্ষমতাসীন দল এমন পরিস্থিতির যে মুখোমুখি হবে, তা গত জাতীয় নির্বাচনের পর অনেক রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞই সে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘একসময় এমনও পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে, যখন বিরোধী দলের মুখোমুখি নয়; অবৈধ ক্ষমতার চর্চা রাজনীতির ময়দানের এমন লালসার সৃষ্টি করবে যে, নিজ দলের বখে যাওয়া লোকদের মুখোমুখি হয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতেই তখন হিমশিম খেতে হবে।’ ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচনের পরপর ঢাকার একটি জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত ‘বাংলাদেশি গণতন্ত্রব্যবস্থায় জনগণের অবস্থান’ নামে আমার একটি নিবন্ধেও সেই ইঙ্গিত আছে। জনগণকে নির্বাসনে পাঠিয়ে আর যা-ই হোক গণতন্ত্র রক্ষা করা যায় না। মুখে যে কথাই বলুন না কেন, এভাবে মন্ত্রী-এমপি হওয়ার মধ্যে গর্বের কিছু নেই। গণতান্ত্রিক চর্চায় জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলনই যদি না ঘটে, এর কুফল ভোগ করতেই হবে। বর্তমানে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ক্ষমতাসীনেরা যেন সেই কুফলের আঁচ টের পাচ্ছেন। জনগণকে বাদ দিয়ে আমাদের দেশে যে গণতন্ত্রের কথা হয়, তা গণতন্ত্র সংস্কৃতির মধ্যে পড়ে কি না, এ নিয়ে বড় প্রশ্ন আছে। অথচ গণতন্ত্রব্যবস্থা চালু হয়েছিল রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের অধিকারটুকু নিশ্চিত করার জন্য। ‘গণতন্ত্র’ পরিভাষাটি ইংরেজি ‘ডেমোক্রেসি’ থেকে এসেছে। এই ইংরেজি শব্দটি আবার গ্রিক শব্দ ‘দেমোক্রাতিয়া’ থেকে নেওয়া, যার অর্থ জনগণের শাসন। বিশ্বের প্রথম গণতন্ত্র চালু হয় গ্রিসের শহর রাষ্ট্র এথেন্সে। সে সময় রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিচালনার জন্য বিভিন্ন উপজাতির মধ্য থেকে নেতাদের মনোনীত করে নেওয়া হতো। সেখানে সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণের কোনো সুযোগ ছিল না। পরে সনাতনি এ রীতি ভেঙে রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণকে সম্পৃক্ত করতে একটি অভিনব ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। নতুন এ ব্যবস্থাপনার অধীনে প্রতিটি মুক্ত নাগরিককে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণকালে সরকার পরিচালনায় সরাসরি অংশগ্রহণের অধিকার দেওয়া হয়। সাধারণভাবে এ ঘটনাকেই গণতন্ত্রের প্রথম উন্মেষ বলে গণ্য করা হয়ে থাকে। অতঃপর কালের বিবর্তনে পরিমার্জিত হয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণতন্ত্রের বর্তমান রূপটি অনুসৃত হয়ে আসছে। ক্ষমতাসীন দলের নিজেদের মধ্যে এই সহিংসতা ইউপি নির্বাচনকে ঘিরেই শুরু হয়নি। সহিংসতা অনেক আগে থেকেই চলে আসছে। এরূপ ঘটনা শুধু নিজেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বিরোধীপক্ষ ও সাধারণ মানুষের ওপরও নানাবিধ অত্যাচার, লুটতরাজ, নারী ধর্ষণের অনেক ঘটনার সঙ্গে ক্ষমতাসীনদের জড়িত থাকতে দেখা গেছে। গত জাতীয় নির্বাচনের পর পর নোয়াখালীর সুবর্ণচরের গৃহবধূকে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতার নেতৃত্বে গণধর্ষণের মাধ্যমে এ ধরনের সহিংস ঘটনার সূত্রপাত ঘটেছিল। সুবর্ণচরের সেই নারী ছিলেন আমাদেরই কারও ভগিনী, কারও জননী, কারও গৃহবধূ। তাঁর অপরাধ তিনি ক্ষমতাসীন দলের কর্মীদের চোখরাঙানি উপেক্ষা করে তাঁর নিজ পছন্দের ব্যক্তির পক্ষে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছিলেন। এর জন্য যে তাঁকে এত বেশি মাশুল দিতে হবে, তা হয়তো তিনি কল্পনাও করেননি। হয়তো ভেবেছিলেন এ ঘটনার সেখানেই সমাপ্তি ঘটেছে। আমাদের অনেকের হয়তো মনে আছে, ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের দিন সন্ধ্যায় গ্রাম্য এই গৃহবধূর জীবনে নেমে এসেছিল বিভীষিকাময় সেই মুহূর্ত। ১০-১২ জন পুরুষের একটি দল সেদিন অসুস্থ অটোরিকশাচালক স্বামী ও সন্তানদের রশি দিয়ে বেঁধে রেখে, জংলি জানোয়ারের মতো অসহায় গৃহবধূকে ঘিরে ধরে একে একে লালসা মিটিয়েছিল তাদের হুকুম অমান্য করার অপরাধে। সেদিনের সেই রাতে নোয়াখালীর সুবর্ণচরে, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হায়েনাদের বাঙালি কন্যা, জায়া ও জননী গণধর্ষণের যেন এক নতুন অ্যাপিসোডের প্রদর্শনী হয়েছিল। এ ঘটনার পর থেকে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা (সবাই নয়) এযাবৎ যত অপকর্ম ঘটিয়েছে, তার বর্ণনা একটি লেখায় উল্লেখ করা সম্ভব নয়। এ কথা এখন বলা যায়, বর্তমানে দেশে যে সহিংস ঘটনা ঘটছে, তা ক্ষমতাসীনেরা শুধু মেনেই নেয়নি, কোনো কোনো ঘটনায় তাদের ইন্ধনের গন্ধও পাওয়া যায়। এ প্রসঙ্গে ‘চাকরির কোটা আন্দোলন’ ও ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি হাতুড়ি ও হেলমেট বাহিনীর অত্যাচারের কথা উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করাই যায়। সেদিনের সেই ক্ষতচিহ্ন যুবসমাজের মনের ভেতর আজও দগদগে হয়ে জ্বলছে। অগণতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতা দখল কিংবা ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য যেকোনো উপায়ে বিরোধীপক্ষকে রাজনৈতিক ময়দানছাড়া করা যে হিতের বিপরীত হতে পারে, এবারের ইউনিয়ন পরিষদের দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনের সহিংস ঘটনা তা-ই প্রমাণ করে। শক্ত বিরোধী দল না থাকায় নিজেদের মধ্যে হানাহানি, খুনোখুনির ঘটনায় আওয়ামী লীগের নেতারা যে উদ্বিগ্ন, সে খবর পত্রিকায় বেরিয়েছে। তাঁদের এই উপলব্ধি গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য ভালো লক্ষণ বলেই মনে হয়। এই উপলব্ধি থেকে যদি তাঁদের শুভবুদ্ধির উদয় হয়, তাহলে সবার জন্যই মঙ্গল; দেশের জন্য তো বটেই। এ প্রসঙ্গে খবরের কাগজে প্রকাশিত আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদের একটি মন্তব্য তুলে ধরা যায়: ‘ইউপি নির্বাচনে দীর্ঘদিন ধরে সহিংসতা ও প্রাণহানির অপসংস্কৃতি চলে আসছে। সাম্প্রতিককালে এর বহিঃপ্রকাশ অনেক কদর্য ও বিব্রতকর; বিশেষ করে ইউপি নির্বাচনে দলের অভ্যন্তরে পেশিশক্তির অনুপ্রবেশ এবং পরিকল্পিত সহিংসতা আমাদের গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা ও সৌন্দর্য বিনষ্ট করছে। সমগ্র রাজনৈতিক প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। যার পরিণতি সুখকর হবে না।’ আমরা বিশ্বাস করতে চাই, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের এই উপলব্ধি তাঁর দলের উচ্চপর্যায়ের নেতা-নেত্রীর উপলব্ধিরই বহিঃপ্রকাশ। আমরা আরও বিশ্বাস করতে চাই, তাঁর এই কথা ও কাজের যেন মিল ঘটে। তা না হলে ক্ষমতাসীন দলের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে আবু সাঈদ আল মাহমুদের এই বক্তব্য আরও একটি অসার রাজনৈতিক বুলিতে পরিণত হবে।

দৈনিক ডোনেট বাংলাদেশ সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ট্যাগ:

সংশ্লিষ্ট সংবাদ: