গুহার মধ্যে লুকিয়ে রাখলে এ দেশকে আলোকিত করা যাবে না - ডোনেট বাংলাদেশ

দীর্ঘ দু দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের মডেলিং জগতে কাজ করে চলেছেন মারিয়া ক্রিসপোট্টা। এখন র‍্যাম্পে খুব একটা না হাঁটলেও কাজ করছেন নতুন মডেলদের গ্রুমিং নিয়ে। এ বিষয়ে রয়েছে তাঁর নিজের স্কুল, জেনেসিস। এ ছাড়া তিনি করছেন উপস্থাপনার কাজও। বিভিন্ন মডেলিং শোয়ে তিনি মেন্টর, কোরিওগ্রাফার হিসেবে কাজ করেন। সম্প্রতি তিনি মুখোমুখি হয়েছিলেন আজকের পত্রিকার সঙ্গে। কথা বলেছেন রজত কান্তি রায়।

প্রথমে আপনার সৌন্দর্য চর্চার বিষয়ে জানতে চাই।
মারিয়া: ত্বকের চর্চা করার খুব একটা সময় হয় না। অনেক ব্যস্ততার মধ্যে থাকি। তারপরও ত্বকের চর্চা করা খুব জরুরি। নয়তো এত মেকআপ নেওয়ার পর, এত লাইটের মধ্যে কাজ করে সবকিছু ডিজাস্টার হয়ে যায়। প্রতিদিন আমি প্রচুর পানি পান করি। অনেক বেশি লিকুইড; অর্থাৎ, তরল খাবার খাই। রোজ ফল খাই। বিশেষ করে যে ফলগুলো শরীরকে বিষমুক্ত করে, সেসব ফল বেশি খাই। যেমন, কলার মধ্যে অনেক পটাশিয়াম থাকে। এটা শরীরকে বিষমুক্ত করতে সাহায্য করে। ত্বককে উজ্জ্বল করে। অ্যাভোকাডো খাই। এটি শরীরের টক্সিক উপাদানগুলো কমায়। এ ছাড়া তৈলাক্ত খাবারগুলো এড়িয়ে চলার চেষ্টা করি। কারণ, অতিরিক্ত তৈলাক্ত খাবার খেলে শরীরে ফ্যাট জমা হয়, স্কিনের লেয়ারে তেল জমতে থাকে।

তবে যেহেতু আমি বাঙালি, কিছু খাবার খেতে তো ভালো লাগেই। যেমন, মেজবানি মাংস, কালা ভুনা, তেহারি, বিরিয়ানি—এসব কে না পছন্দ করে। এগুলো আমি খাই। তবে লিমিটেড খাই।

ত্বক চর্চার বিষয়ে আমি, মুখ সব সময় পরিষ্কার রাখা, বারবার মুখ ধোয়া, মেকআপের পর ভালো করে মেকআপ রিমুভ করা ইত্যাদি বিষয়গুলো মেনে চলি। মেকআপ রিমুভ করতে আমি h2o ব্যবহার করি। এটা বায়োডার্মার পণ্য। এতে মিনারেলস আছে। এটি স্কিনের পোরস রিমুভ করে। এর পর ভিটামিন সিযুক্ত ফেইসওয়াশ দিয়ে মুখ ওয়াশ করি। তারপর টোনার ব্যবহার করি। মুখ পরিষ্কার করার পর একটা ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করি। তারপর ঘুমাতে চলে যাই।

সকালে ঘুম থেকে উঠেও একইভাবে ত্বক চর্চা করি। মুখ ধোয়ার পর টোনার, ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করি এবং সানব্লক ক্রিম লাগাই। ঘর থেকে বের হলেই যে সানব্লক ক্রিম ব্যবহার করতে হবে, তা নয়। ঘরে থাকলেও সানব্লক ব্যবহার করা যায়। কারণ আমরা ঘরে যে লাইটগুলো ব্যবহার করি, সেগুলো থেকেও অনেক রশ্মি আসে, যা ত্বকের জন্য ক্ষতিকর।

চুলের জন্য কী করেন?
মারিয়া: চুলে আমি অ্যালোভেরা লাগাই। আমার চুল সারা বছরই ডাই করা থাকে। ডাই করলে চুল অনেক বেশি রুক্ষ হয়ে যায়। বাজারে যে অ্যালোভেরা জেল পাওয়া যায়, ওটা নয়; অ্যালোভেরা পাতা থেকে জেল বের করে চুলে লাগাই। আমার ছাদে অনেক অ্যালোভেরা গাছ আছে। অ্যালোভেরার জেলের সঙ্গে অলিভ ওয়েল ও ক্যাস্টর ওয়েল মিশিয়ে চুলে লাগাই। এক ঘণ্টা পর চুল ধুয়ে ফেলি।

দু-চার মাস পরপর চুল ট্রিম করি। কারণ, চুল ফেটে যায়। তাই ট্রিমিংটা নিয়মিত করি। যখন চুল ডাই করি, তখন চুলে তেল দিতে হয়। স্পা করতে হয়। দুই মাস অন্তর অন্তর স্যালুনে গিয়ে হেয়ার স্পা করার চেষ্টা করি।

আরেকটা বিষয় জানতে চাই তা হলো, আপনি ঠোঁটের যত্নে কিছু করেন কিনা?
মারিয়া: ঠোঁটের যত্নে স্পেশাল কিছু করা হয়ে ওঠে না। আমার ঠোঁট অনেক ডার্ক। বিভিন্ন কারণে ডার্ক হয়ে যায়। তাই চিনি ও এক্সট্রা ভার্জিন কোকোনাট ওয়েল মিশিয়ে পাঁচ মিনিট হালকা করে স্ক্রাব করি। এতে ঠোঁটের কালো দাগ অনেকটাই কমে আসে।

ত্বকের জন্য বেকিং সোডাও খুব কার্যকরী। অনেকের স্কিন খুব সেনসিটিভ। তারা বিভিন্ন প্রোডাক্ট ব্যবহার করতে পারেন না। তাঁরা যদি বেকিং সোডা দিয়ে রূপচর্চা করেন, তাহলে এটা বেশ ভালো কাজ করে। বেশি মেকআপ ব্যবহার ও সূর্যের আলোর কারণে অনেকের ত্বকের পোরস অনেক বড় হয়ে যায়। পোরস থেকে গভীরভাবে মেকআপ রিমুভ করা কষ্টকর হয়ে যায়। তাদের জন্য পরামর্শ হলো, একটা মাইল্ড ফেইসওয়াশ কিংবা সোপ দিয়ে ত্বক পরিষ্কার করা। মাইল্ড ফেইসওয়াশ কিংবা সোপের সঙ্গে অল্প একটু বেকিং সোডা মিশিয়ে ত্বকে ৩০-৩২ সেকেন্ড ম্যাসাজ করলে পোরসগুলো পরিষ্কার হয়ে যায়।

ফিটনেসের জন্য কী করেন?
মারিয়া: ফিটনেসের জন্য তেমন কিছুই করা হয় না। তবে আমার মেইন বিষয়টা হলো মেটাবলিক সিস্টেম। আমার মেটাবলিক সিস্টেম খুব ভালো। ছোট থেকে মিশনারি স্কুলে আমাকে শেখানো হয়েছে যার যার মেটাবলিক সিস্টেম জেনে খাবার গ্রহণ করা উচিত। আমি সেভাবেই খাবার খাই।

চিকিৎসকেরা বলেন, চর্বি ঝরানো এবং ফিটনেস বজায় রাখা ৮০ শতাংশ নির্ভর করে খাবারের ওপর। বাকি ২০ শতাংশ নির্ভর করে ওয়ার্ক আউটের ওপর। আমি খাবারটা সেভাবেই গ্রহণ করি। সকালের নাশতায় আমি টোস্ট, সুগার ছাড়া হরলিক্স ইত্যাদি খাই।

মডেলিং জগতে আপনার আগমন ও বিচরণ সম্পর্কে জানতে চাই।
মারিয়া: ইন্টারন্যাশনালি ফ্যাশন টিভি সবচেয়ে বড় প্ল্যাটফর্মগুলোর মধ্যে অন্যতম। ফ্যাশন টিভির সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল আমার। তাদের সঙ্গে সাড়ে চার বছর কাজ করেছি। বিশ্বের সবচেয়ে সেরা ডিজাইনারদের সঙ্গেও কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। গুচি, আরমানি, ডিএনজি, ডিজি—এসব ব্র্যান্ডের সঙ্গে আমার কাজ করা হয়েছে। তারপর বাংলাদেশে যখন এলাম, র‍্যাম্প নিয়ে কাজ বেশি হয়েছে। র‍্যাম্প নিয়ে কাজ করতে থাকলাম।

একটা পর্যায়ে আর ভালো লাগছিল না। অনেকের মনের কলুষতা নিতে পারছিলাম না। আমি যেতে চাই। কিন্তু কেন যেন পারছি না। আমি পালানোর রাস্তা খুঁজছিলাম।

তারপর দুঃখজনকভাবে আমার বিয়ে হলো। তারপরের খবরে আমি জানতে পারলাম—আমি মা হতে যাচ্ছি। দ্যটস দ্য সিগনাল, যে আমি আর কাজ করব না। তখন কাজ থেকে নিজেকে আমি সম্পূর্ণভাবে সরিয়ে নিয়েছি। বিশেষ করে র‍্যাম্প থেকে। ২০০৯-এর পর থেকে ২০১০-১৪ পর্যন্ত র‍্যাম্প থেকে দূরে ছিলাম। ২০১৫ সালে আমি আবার এসে জয়েন করেছি। ওই পাঁচ বছর আমি সিডনিতে ছিলাম। তারপর দেশে ফিরে আসছি। কাজ শুরু করেছি। আমি ভেবেছিলাম অন্য জব করব। কিন্তু তা হয়নি। মডেল আজরা মাহমুদ আমাকে ফোন দিলেন ইয়েলোর একটা শোয়ের জন্য। জানান, সেখানে ইন্টারন্যাশনাল মডেল দুজন আসছে। ইউকে থেকে একজন এবং পাকিস্তান থেকে একজন। আজরা বললেন, ‘আমি চাই তুই বাংলাদেশকে প্রেজেন্ট কর। প্লিজ না বলবি না আমাকে।’ আমি আজরা মাহমুদকে না করতে পারিনি। আমি ভেবেছিলাম ওই একটা শো করে আবার গায়েব হয়ে যাব। কিন্তু তা আর হলো না।

২০০২ সালের ২৬ নভেম্বরে র‍্যাম্পে প্রথমবার শো করেছিলাম। সেটায় শাবনূর, পপি, ফেরদৌসসহ আরও অনেক নায়ক-নায়িকা হেঁটেছেন আমাদের সঙ্গে। সেই স্টেজে আমার প্রথম র‍্যাম্পে পা রাখা হয়েছিল। সেখানে আমি প্রথম পেয়ার হিসেবে দাঁড়াই ওয়ান অ্যান্ড ওনলি লিজেন্ডারি মডেল নোবেল ভাইয়ের সঙ্গে। যাকে ছোটবেলা থেকে টিভিতে দেখেছি, সেই মানুষটাকে প্রথমবারের মতো স্টেজে দেখছি, তাঁর সঙ্গে স্টেজে পা রাখছি র‍্যাম্প মডেল হিসেবে—এটা আমার জন্য অনেক বড় অ্যাচিভমেন্ট ছিল। তখন বেছে নিয়েছিলাম র‍্যাম্প হলো আমার প্ল্যাটফর্ম। এর আগে আমি মিউজিক ভিডিওতে কাজ করেছি। তারপর চ্যানেল আইয়ের একটা প্রোগ্রামে আমাকে হোস্ট হিসেবে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর ৭-৮ মাসের মধ্যে আমাকে নিয়ে নাড়াচাড়া শুরু হলো। আমার হাইটটা ভালো ছিল। দেখতে অন্যরকম ছিলাম। এ কারণে সাড়া পড়ে গিয়েছিল। র‍্যাম্পে হেঁটে এত ভালো লেগেছিল, অন্য কোনো কাজে সেটা লাগেনি। আমি মনে করেছিলাম ওটাই আমার প্ল্যাটফর্ম।

২০১৫ সালে ইয়েলোর শোয়ের জন্য আজরা যখন ডাকলেন, আমি ভেবেছিলাম, একটা শো করে গায়েব হয়ে যাব। কিন্তু পরে আর পারিনি। হাঁটতেই থাকলাম। এখনো হাঁটি, কম।

ব্যাকগ্রাউন্ডে কাজ শুরু করলেন কবে থেকে?
মারিয়া: ২০১৯ সাল থেকে কাজ করা কমিয়ে দিয়েছি। আমার মনে হলো ১৯-২০ বছর তো হয়ে গেল। আর কত? এখন আমরা যদি না সরি, তাহলে নিউ জেনারেশন জায়গা পাবে না। একটা সময় থাকে মডেলিংয়ের। এবং সেই সময়টা আমি পার করে এসেছি। ২০১৯ সালে এসে মনে হলো আমার এখন কাজ কমানো উচিত। ডিরেকশনে যাওয়া উচিত। আমি একটি বিজ্ঞাপন বানাই। ক্যামেরার পেছনে কাজ করি আমি। স্টোরি আমার লেখা ছিল। প্রডিউস করেছি আমি। টিভিসি করলাম। তারপর একটা ফ্যাশন ফিল্ম করলাম। তখন মজাটা পেয়ে গেলাম। ভাবলাম ব্যাকগ্রাউন্ডে কাজ করব।

গত বছরের নভেম্বরে আমি গ্রুমিং একাডেমি জেনেসিস লঞ্চ করলাম। এর আগেও বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে গ্রুমিং করাতাম। একটু একটু করে সময় দিয়ে, সবকিছু দিতে পারি না স্টুডেন্টদের। তাই নভেম্বর থেকে গ্রুমিং একাডেমি জেনেসিস লঞ্চ করলাম। এখন সেকেন্ড ব্যাচ চলছে। করোনা মহামারির জন্য অনেক ক্ষতি হয়েছে আমাদের। যেখানে একটা ব্যাচে ২০ জন স্টুডেন্ট থাকে, সেখানে পেয়েছি ১৬ জন স্টুডেন্ট। এর মধ্যে চারজন এই ব্যাচে করবে না। আর দুজনের সার্জারি হয়েছে। তারা পরের ব্যাচে জয়েন করবে। তবে আমি আশাবাদী। মানুষের যে বিশ্বাস অর্জন করছি, সে জায়গাটা তৈরি করার চেষ্টা করছি। এই জায়গা থেকে যে টাকা আসবে, তা দিয়ে ব্যবসা করার প্রয়োজন নেই। যেই টাকাটা আমি চার্জ করছি, তা যথেষ্ট নয়। বাট আমার ইচ্ছা হলো আমার লিগ্যাসি ধরে রাখা। ২০টা বছর মডেলিং করে কী পেলাম! অনেকগুলো অ্যাওয়ার্ড পেয়েছি। অনেকগুলো সম্মাননা স্মারক পেয়েছি।

এই মাইলস্টোনগুলো সম্পর্কে শুনি…
মারিয়া: ইন্টারন্যাশনালি বিউটি কন্টেস্টে আমি পার্টিসিপেট করেছিলাম ২০০৫ সালে। ৩৯টি দেশের মধ্যে আমি বিজয়ী হয়েছিলাম। তারপর ফ্যাশন টিভির জন্য কাজ করেছি। আমি ডিজেলের জন্য কাজ করেছি। ইউরোপিয়ান ইন্টারন্যাশনাল টপ ব্র্যান্ডের জন্য কাজ করেছি। বাংলাদেশের ডিজাইনারদের নাম না নিলে তো হয়ই না। রীনা লাতিফ, মাহিন খান, মেহরুজ—এরাই টপ ডিজাইনার। বিবি রাসেলের সঙ্গে আমার ক্যারিয়ারের শুরুতে একটা কাজ হয়েছিল। বিবি আপার সঙ্গে আমার একটু ভুল বোঝাবুঝির কারণে কাজ করা হয়নি আর। তবে ভবিষ্যতে আমি কাজ করব তাঁর সঙ্গে। রীনা লাতিফ, মাহিন খান, মেহরুজ, বিপ্লব সাহা, শৈবাল সাহা, শারুখ আমিন—দেশের যত প্রমিনেন্ট ডিজাইনার আছেন, সবার সঙ্গে কাজ করা হয়েছে। শারুখ আমিন আমাকে প্রথম র‍্যাম্পে হাঁটিয়েছিলেন।

বাংলাদেশে যখন প্রথম ফ্যাশন টিভি এসেছিল, তখন বাংলাদেশকে আমি প্রতিনিধিত্ব করেছিলাম। সবগুলো মডেল ছিল ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ইতালি, স্পেন থেকে। ওসব দেশ থেকে ২৫ জন মডেল এসেছিল। আমি একমাত্র বাঙালি মেয়ে ছিলাম। ওটা আমার জন্য অনেক সম্মানের ব্যাপার ছিল। এমন ছোট ছোট অনেক মাইলস্টোন পার করে গিয়েছি। আমি সরওয়ার ফারুকি, অমিতাভ রেজার সঙ্গে কাজ করেছি। টিভিসির কাজ করেছি, টেলিফিল্মের কাজ করেছি, অভিনয় করেছি। ইন্টারন্যাশনালি কোনো কাজ হলেই আমাকে ডাকত। অমিতাভ রেজা আমাকে বলতেন, এ দেশের বিদেশি নায়িকা। ক্রিকেটের সঙ্গে আমি বেশ অনেক দিন জড়িত ছিলাম। খুব প্রশংসা পেয়েছি।

কেন উত্তরসূরি তৈরি করার আগ্রহ?
মারিয়া: একজন মানুষ কত দিনই-বা বাঁচতে পারে! ১০০ বছর! ১২০ বছর! এর থেকে বেশি না। কিন্তু মানুষ চিরঞ্জীব হয় তার কর্ম দিয়ে। তার কাজ এবং সমাজে সে কী অবদান রেখেছে, সেই অবদানের ওপর ভিত্তি করে তার উত্তরসূরি সৃষ্টি হয়। তার অমরত্বটা থেকে যায়। আমি অমর হতে চাই। আমি চাই আমার স্টুডেন্টরা কাজ করবে। আমি মারিয়া যদি মরেও যাই, তারপরেও যেন মানুষ বলে জেনেসিস মারিয়া। কিংবা এই মডেল জেনেসিসের স্টুডেন্ট। মারিয়ার স্টুডেন্ট আজকে বিশ্বজয় করেছে। হতেও তো পারে। আমি আমার ইনস্টিটিউট থেকে পাঠাতেও তো পারি।

এই যে এতগুলো বছর পার করে দিয়েছি, আমার নাম নিয়ে, শিক্ষা নিয়ে কেউ যদি বড় কোনো জায়গায় ক্রস ওভার করতে পারে, তাহলে তো আমার নাম হবে। তাই না? তখন তাকেও কেউ জিজ্ঞেস করবে, তোমার মেন্টর কে ছিল? তখন সে আমার নামটা নেবে। এভাবে আমি বেঁচে থাকব।

আপনি একেবারে ছোটবেলা থেকেই বাইরে। সচরাচর যারা বাইরে যান তাঁরা ফিরে আসেন না। আপনি কেন ফিরলেন?
মারিয়া: বিদেশে যখন কাজ করেছি, ফ্যাশন টিভিতে যখন কাজ করেছি, তখন দেখেছি, সব মডেলের উচ্চতা আমার চেয়ে অনেক বেশি। দেখা যাচ্ছে আমার উচ্চতা ৫ ফিট ১০ ইঞ্চি, সেখানে ৬ ফিট উচ্চতার মডেলও ছিল। তারা যখন হাই হিল পরত, আরও অনেক লম্বা দেখাত। আমিও কিন্তু তাদের সঙ্গে কাজ করেছি। ডিজাইনাররা আমাকে নিয়েছেন। ভালোবেসেছেন। আমি বাংলাদেশের কথা চিন্তা করে দেখলাম, দেশটা আমার। এই দেশের মানুষগুলো আমার। এই দেশের ভালো ও মন্দটাও আমার। বিদেশের তো সবই আছে। এত সুন্দর সুন্দর মডেল আছে। এক হাজারটা মারিয়া ওদের হাতের মুঠোয় আছে। বাংলাদেশে কয়টা মারিয়া আছে? সো আমার মনে হয়েছিল আমার দায়িত্ব, আমার কর্তব্য হলো আমার দেশকে কিছু দেওয়া। আমি যদি আমার দেশকে পথ না দেখাই, তাহলে অন্য কেউ তো এসে পথ দেখাবে না। আমার কর্তব্য এটা। আমার সুযোগ থাকলে আমি দেশকে গ্লোবালি নিয়ে যাব। আমার দেশ সোনার বাংলাদেশ। গুহার মধ্যে লুকিয়ে রাখলে এ দেশকে আলোকিত করা যাবে না। এটা সবাই বলে—নিজের ব্যাপারে চিন্তা না করে, সেলফিশ না হয়ে চলে আসছ! ৮০ শতাংশ লোক সেলফিশ, ২০ শতাংশ লোক সেলফলেস। ২০ শতাংশ লোক সেলফলেস না হলে দেশটা তো টিকে থাকত না। তাই না? সো আমার মতো মারিয়া আরও অনেক কর্নারেই আছে। যারা দেশের জন্য কিছু করতে চায়। দেশপ্রেমের কারণে বারবার দেশে ফিরে আসে। আমাকে যদি এখানে থাকতে দেওয়া না হয়, অন্য কোথাও পাঠিয়ে দেওয়া হয়, পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকি, আমি নিজ দেশের জন্য কাজ করব। কারণ আমার শেকড় এখানে।

কেমন লাগছে ২০ বছর আগের ও ২০ বছর পরের অবস্থা? এখনকার জেনারেশন, ইন্ডাস্ট্রি—সবকিছু কেমন দেখছেন?
মারিয়া: ১০ বছর আগেও যেমন ছিল, এখনো যদি এমন থাকতাম, তাহলে আমরা অনেক এগিয়ে যেতে পারতাম। অধঃপতন, অবনতি ও বৈষম্য লেগেই আছে। অসম্মান তো আছেই। ১০ বছর আগেও মডেল হিসেবে পরিচয় দিলে ভ্রু কুঁচকে তাকাত লোকজন। অপমানজনক নজর দিত। আজও যখন নিজেকে মডেল বলি, কিছু কিছু মানুষের কাছে অসম্মানিত হতে হয়। কিছু কিছু মানুষ জায়গাটাকে নোংরা করে ফেলেছেন। এ কারণে বাদবাকি যারা পরিষ্কার মানুষ আছেন, তাঁদের গায়েও নোংরা লেগে যাচ্ছে। এখনকার দিনে অসংখ্য মানুষ মডেলিং, অ্যাক্টিং এসবে আগ্রহী হচ্ছে। কিন্তু তাদের আর্ট, কাজ ইত্যাদি পছন্দ না। ফ্যামিলির সঙ্গে যুদ্ধ করে মিডিয়াতে কাজ করেছি। যুদ্ধ করে চলেছি। একা একা চলেছি। কখনো খারাপ পথে যাইনি। বাবা-মায়ের শেখানো নীতিতে চলেছি। অনেক স্ট্রাগল করেছি। প্যাশন ছিল আমার, আর্ট ছিল। এখনকার সবার টাকার প্রতি আগ্রহ অনেক বেশি। তারা কাজ শিখতে চায় না। ভালোমতো কাজ করতে চায় না। কয়েকটা ম্যাগাজিন, টিভিতে চেহারা দেখাবে, স্টেজে কয়েকবার উঠবে এবং ছবিগুলো নিয়ে অনেক টাকা আদায় করবে। এই যে কাজগুলো হচ্ছে, সেগুলো আসলেই ডিসটার্বিং। যারা কাজ করতে চাচ্ছেন, তাঁরা কাজ করতে পারছেন না। যাদের কাজ করার ইচ্ছা নেই, তারা চেহারা দেখিয়ে, ঘুরে বেড়িয়ে অন্যদের থেকে টাকা আয় করার সোর্স বানানোর ইচ্ছা যাদের, তাঁদের দেওয়া হচ্ছে প্রায়োরিটি। এসবের কারণে ইন্ডাস্ট্রিটা নষ্ট হয়ে গেছে। প্রচুর মানুষ আসছেন, কিন্তু কাজের মানুষ তো আমি দেখি না।

আমাদের এখনো মানুষ বলে, তোমাদের ফার্স্ট ব্যাচটা অনেক কিছু দেখিয়ে গেছে। সেকেন্ড ব্যাচ ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিকে কামড়ে ধরে আছে। এখনো পর্যন্ত তোমাদের মতো মডেল দেখি না। আরেকটা সেকেন্ড মারিয়া, ইমি, রুমা, আজরা দেখি না। আমি এখন উল্লেখযোগ্য কাউকে দেখি না। প্রত্যেকটা মানুষের একটা সিংহাসন আছে। আমার একটা আছে। আমি যে সিংহাসন থেকে নেমে অন্যকে ওঠার সুযোগ দেব, আমার সিংহাসনে কাউকে বসতে হবে তো। কাউকে তো এসে জায়গাটা দখল করতে হবে। গত পাঁচ বছর ধরে আমি খুঁজে বেড়াচ্ছি।

সম্প্রতি আমরা কিছু মডেল দেখছি, যারা ইন্টারন্যাশনালি কাজ করছেন। অনেকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যাচ্ছেন। অনেকে ব্যক্তিগতভাবে যাচ্ছেন। সেটা দেখে তো আরেকটা ইমপ্রেশন তৈরি হয়।
মারিয়া: একসময় ‘ফেস অব এশিয়া’ নামে কনটেস্ট হতো। সেখানে যাওয়ার জন্য প্রসেসটা করে দেওয়া হতো। সেখানে ব্যক্তিগত কিছু খরচ হতো। সেখানে আজাদ ফারহানা মিলি নামের একজন মডেল গেছেন। অবনি নামের একজনও গিয়েছেন। সেখানে তাঁরা বিজয়ী হয়েছিলেন। এ রকম কয়েকজন আছেন যারা ‘ফেস অব এশিয়া’ থেকে ক্রাউনগুলো পেয়েছেন। বাদবাকি ইন্টারন্যাশনাল কনটেস্টে কে গিয়েছেন? কোনো জায়গায় যেতে পারেনি তো এখন পর্যন্ত। সিলেক্টেডও হয়নি যাওয়ার জন্য। মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশের খেলাটা তো দেখলেন আপনারা, গত বছর (২০২০) কী হলো?

ব্যাঙের ছাতার মতো একাডেমি, গ্রুমিং স্কুল হচ্ছে। ঠিক সেরকম মাশরুমের মতো অনেকগুলো কনটেস্ট ওপেন হচ্ছে। সেই কন্টেস্টে যে পটেনশিয়াল ক্যানডিডেট থাকেন, তাঁর মূল্যায়ন হচ্ছে না। তাঁকে দাম দেওয়া হচ্ছে না। তাঁকে সামনে আসতে দেওয়া হচ্ছে না। প্রপার ওয়েতে রান করা হচ্ছে না।

নিজের একাডেমি জেনেসিসে শিক্ষার্থীদের মডেলিংয়ের পাঠ দিচ্ছেন মারিয়া ক্রিসপোট্টা। ছবি: সৈয়দ মাহামুদুর রহমান
নিজের একাডেমি জেনেসিসে শিক্ষার্থীদের মডেলিংয়ের পাঠ দিচ্ছেন মারিয়া ক্রিসপোট্টা। ছবি: সৈয়দ মাহামুদুর রহমান
প্রপার ওয়েতে রান কেন হচ্ছে না? ইন্ডাস্ট্রির বয়স তো খুব কম নয়। আপনারা তো কাজ করছেন। সময় তো অনেক গেল। আমরা অনেক কিছুই দেখলাম। অনেকগুলো জেনারেশন দেখলাম। এখন কেন বলছেন যে প্রপার ওয়েতে হচ্ছে না?
মারিয়া: প্রবলেমটা হচ্ছে নিউ মানি। নিউ পিপল হু হ্যাজ নিউ মানি ইন দিস স্টেজ। হি হ্যাজ নো এডুকেশন, নো ক্লাস, নো নলেজ। দিস ইজ দ্য প্রবলেম। এখন একটা হ্যাচারির মালিক যদি কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে যান, ট্রাক সমিতির মালিক যদি কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে যান, তারপর এসে ইন্ডাস্ট্রিতে ঢুকে ইনভেস্ট করতে চান, তাঁর কিন্তু রুচিটা ওইরকমই থাকবে। তাঁর মনে হবে তিনি নায়িকা দেখবেন, নায়িকার হাত ধরে বসবেন, গল্প করবেন, মডেলদের নিয়ে বিদেশে ঘুরতে যাবেন। কারণ, মডেলরা অনেক সেক্সি ক্লথিং পরে, তারা দেখতে হলিউড-বলিউডের হেরোইনের মতো। তো তাঁরা একটু ঘুরবেন ফিরবেন, আর ফ্রেন্ডদেরকে ছবি দেখিয়ে বলবেন ‘আমার গার্লফ্রেন্ড এটা’। একজন অর্ধশিক্ষিত ট্রাক সমিতির সভাপতি বা হ্যাচারি ব্যবসায়ী কী করে বুঝবেন বিউটি কী, নলেজ কী, আর কোয়ালিফিকেশন কী। আমাদের দেশে তো ক্লাসি, এডুকেটেড, এলিট পিপলের সংখ্যা কম। এসব কারণেই ঘটছে অনেক কিছু।

আমিও যেন ওয়ালের মধ্যে ঠেসে যাচ্ছি। মাঝেমধ্যে আমি আবার গা ঝাড়া দিই। ধাক্কা দিই। বলি, এই সরো। জায়গা ছাড়ো। আমার ঘর খালি করো। আমার ঘরে ময়লা এনো না। তোমাদের ঘরে যা করার করো, কিন্তু আমার ঘরে প্রবেশ করো না। আই ডোন্ট লাইক ইট। এটা তো সবাই করতে পারছে না। সংখ্যায় খুব কম হয়ে যাচ্ছি আমরা। যারা সংখ্যায় খুব কম হয়ে যাচ্ছে, তাঁদের ইচ্ছাটাও খুব কম। তারা ইচ্ছাটাকে নিয়ে কাজ করতে চায় না।

মাঝেমধ্যে খারাপ লাগে, বিবি আপার ক্ষমতা ছিল অনেক কিছু করার। কিন্তু বিবি আপা করলেন না। এর পেছনে সম্পূর্ণ বিবি আপার দোষও না। এর পেছনে বাঙালির দোষ। দেশের মানুষের দোষ। বিবি রাসেলের মতো একজন ডিজাইনার, যিনি ইন্টারন্যাশনালি এত সম্মানিত হয়েছেন, তাঁকে বাংলাদেশ কিছুই দিতে পারেনি। কতটুকু সম্মান দিয়েছে তাঁকে? দুই পক্ষই দায়ী। বিবি আপার ইচ্ছেটা কম ছিল। তাঁর ইচ্ছা না থাকার কারণ হলো, বাংলাদেশের মানুষ তাঁকে প্রায়োরিটি দিচ্ছিল না। তাঁকে দাঁড়াতে দেওয়া হচ্ছিল না। জেলাসি থেকে তাঁর আশপাশের অনেক মানুষই তাঁকে পুট ডাউনের চেষ্টা করেছে। অ্যান্ড শি লস্ট হার ইন্টারেস্ট। বড় বড় মানুষেরা যদি এভাবে ছেড়ে চলে যান, তাহলে আমাদের দেশের ভালো কী করে হবে? ভালো কিছু হবে না। খারাপই হবে।

আরেকটা জিনিস, অনেক কিছুর ইনস্টিটিউট হলো, আমাদের ফ্যাশন মডেলিং—এই ইন্ডাস্ট্রির কোনো ইনস্টিটিউট হলো না। এ বিষয়ে আপনাদের বক্তব্য কী?
মারিয়া: আমি শুধু আমারটা বলতে পারি। বাকিদের কথা বলতে পারব না। কেন সরকারিভাবে আমরা স্বীকৃতি পাচ্ছি না, এই প্রশ্ন আমার সব সময় থাকবে। যত দিন পর্যন্ত স্বীকৃতি না পাই। আমাদের কোনো অর্গানাইজেশন কেন নেই, কোনো সোসাইটি কেন নেই, আমাদের নিজের কমিটি নাই, যেখানে আমাদের সঙ্গে হওয়া কোনো অন্যায়ের বিচার হবে, যেখানে আমাদের রুলস অ্যান্ড রেগুলেশন দেওয়া থাকবে।

এখন এমন হচ্ছে কেউ একটু জিন্স পরল, নাচানাচি করল—তারাই মডেল হয়ে যাচ্ছে। এই প্রবণতা মারাত্মক। আমার মনে হয় মডেলিংয়ে সবচেয়ে বেশি হিংসেমি কাজ করে। সবাই মিলে খেতে গেলে তো অল্প অল্প ভাগে পড়বে। সবাইকে ফেলে দিয়ে আমি একা যদি খেতে পারি, তাহলে অনেক বেশি খেতে পারব। কমিটি হলে, অর্গানাইজেশন হয়ে গেলে তো সবাই মিলে কাজ করব, একাত্ম থাকতে হবে। তাহলে আমি খুব বেশি এখান থেকে নিতে পারব না। এর জন্য বড় বড় মাথারাও চায় না যে অর্গানাইজেশনটা হোক। বাট আমি স্ট্রংলি চাই অর্গানাইজেশন হোক। চাই সরকারিভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হোক। আমাদের কমিটি হোক। যেখানে আইনটা বাস্তবায়ন করা হবে। ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি ও মডেলদের জন্য নতুন আইন করা হোক। আমি কাজ চালাচ্ছি। সামনে আরও এগিয়ে যাব। আশা করি কিছু একটা করতে পারব।

তাহলে কি পুরো ব্যাপারটা শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত বলছেন?
মারিয়া: শিক্ষার সাথে অনেক বেশি যুক্ত। আর তারপর তো একটা ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড আসেই। শিক্ষা, প্রপার গাইডলাইন থাকলে নেক্সট জেনারেশন সুন্দর হয়। হবেও। গুরু যদি না জানে কোনো কিছু, কীভাবে শিষ্যদের শেখাবে?

আপনি তো অনেকগুলো দেশ ঘুরেছেন। বিদেশে থেকেছেন অনেক দিন। সেসব ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে আমাদের ইন্ডাস্ট্রির বেসিক পার্থক্যটা কী?
মারিয়া: আকাশ আর পাতাল সমান পার্থক্য। একটা ফ্যাশন শো, একটা প্রোজেক্ট করতে গেলে, ছোট্ট থেকে ছোট্টতর কিছু করতে গেলেও তারা অনেক বেশি অর্গানাইজড থাকে। একটা ফটোশুটের জন্য ১৫-২৫ দিন সময় নেয়। ওরা লে-আউট তৈরি করে, মডেলকে আগে থেকে বুকিং দিয়ে রাখে, মডেলের ম্যাজারমেন্ট নিয়ে রাখবে, ট্রায়ালের জন্য ডাকবে, মডেলের স্কিন টেস্ট করবে, স্কিন কেয়ারের ব্যাপারে নির্দেশনা দেবে। এর পর প্লেস, ভেন্যু, ব্যাকগ্রাউন্ড কী হবে, ছবির কালার কারেকশন কেমন হবে—সবকিছু তারা ঠিক করে রাখে। পরিকল্পনামাফিক করে। সবকিছু টাইম টু টাইম হবে।

আমাদের পাশের দেশ ভারতেও সকাল ৮টা মানে ৮টা। তারা সবকিছু মেনে নেয়। কাজের প্রয়োজনে তারা ছোট পোশাকও পরতে পারে, আবার বোরকাও পরতে পারে। তারা পেশাটাকে সিরিয়াসলি নেয়। এবং তারা খুবই সম্মানের সাথে নেয়। নাচতে নেমে তারা ঘোমটা দেওয়ার চেষ্টা করে না। আর বাঙালি হচ্ছে আমি নাচব এবং ঘোমটাও সরতে পারবে না। বাংলাদেশিদের অ্যাপ্রোচ, বিহেভ, প্রেজেন্টেশন দেখলে অনেক দুঃখ লাগে। নতুন মডেলদের সঙ্গে এমন যাচ্ছেতাই ব্যবহার করা হয়, যা-তা বলা হয়, গালিগালাজও করা হয়। কিন্তু দু-চার-পাঁচ বছর পর সে যখন অনেক বড় মডেল হয়ে যায়, তাকেই ধরে কিন্তু চাটে। নতুন মডেলদের সঙ্গে বিদেশে এমন করা হয় না। বলা হয়, ডোন্ট ডু দিস। আর এ দেশে তো নির্দোষ-চুপচাপ মডেলের সঙ্গেও খারাপ ব্যবহার করা হয়। এ জন্যই দু-চার-পাঁচ বছর পর সেই মডেল বেয়াদব হয়ে যায়। অন্যদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে। কারণ, সে তো শুরুতে ভালো ব্যবহার পায়নি। ওকে তো শেখায়নি আচরণ কেমন হবে।

আপনি কী মনে করেন, একটা রাষ্ট্রীয় ইনস্টিটিউট থাকা উচিত? যেমন চারুকলা ইনস্টিটিউট আছে।
মারিয়া: অবশ্যই। প্রত্যেকটা দেশে আছে। পাশের দেশ ইন্ডিয়াতেই আছে। বাংলাদেশে কেন নেই? বাংলাদেশের মাটি, ঋতু সবই ভালো। কী নেই! যাদের ট্যালেন্ট আছে, তারা সাংঘাতিক ট্যালেন্টেড হয়। এত ট্যালেন্ট, রিসোর্সেস নিয়ে আমরা বসে আছি। তারপরও কেন হবে না! আমাদের কেন চিনবে না ইন্টারন্যাশনালি? কেন এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের নাম অন্যান্য দেশ জানবে না? এ বিষয়টা তো খারাপ লাগে!

যারা সিনিয়র আছেন, একসঙ্গে কাজ করেন, তাদের কি বাংলাদেশে বড় প্ল্যাটফর্ম বানানোর ইচ্ছে আছে?
মারিয়া: সবার নেই। আমার ইচ্ছে আছে। আর মডেল আসিফ খানের আছে। আর কারও কাছে এই জিনিসটা পাইনি।

টেলিভিশন আর্টিস্টদের অনেক প্ল্যাটফর্ম আছে। আমাদের মডেলদের নেই। কেন জানি মনে হয় জেলাসি কাজ করে। তারা এক জোট হতে চায় না। একসঙ্গে হলেই তারা ইনফ্যারিওরিটি কমপ্লেক্সে ভোগে। তারা ভাবে এখন বুঝি একা চলতে পারব না। এটা আসলে ভুল।

নিজের একাডেমি জেনেসিসে শিক্ষার্থীদের মডেলিংয়ের পাঠ দিচ্ছেন মারিয়া ক্রিসপোট্টা। ছবি: সৈয়দ মাহামুদুর রহমান
নিজের একাডেমি জেনেসিসে শিক্ষার্থীদের মডেলিংয়ের পাঠ দিচ্ছেন মারিয়া ক্রিসপোট্টা। ছবি: সৈয়দ মাহামুদুর রহমান
ভবিষ্যৎ কী?
মারিয়া: যদি এভাবেই চলতে থাকে, তাহলে ভবিষ্যৎ খুব খারাপ। সব জায়গায় অন্ধকার। এই ইন্ডাস্ট্রিতে ভালো ফ্যামিলি থেকে কোনো ছেলে কিংবা মেয়ে আসবে না। কাজ করবে না। যদি এখন ইন্ডাস্ট্রির মানুষ সোচ্চার হয়, প্রত্যেকের মধ্যে যদি দায়িত্ববোধ কাজ করে, যদি অ্যাকশন নেয়, তাহলে একেকটা সিঙ্গেল অ্যাকশন যথেষ্ট।

আরেকটা জিনিস জানতে চাই, আপনি তো মিউজিক ভিডিওতে কাজ করেছেন, র‍্যাম্প করেছেন, অ্যাক্টিং করেছেন। কোনটা বেশি ভালো লেগেছে? কোনটার প্রতি আগ্রহ বেশি?
মারিয়া: অবশ্যই র‍্যাম্প।

অ্যাক্টিং কেন নয়?
মারিয়া: যারা অ্যাক্টিং করেন, তাঁদের আমি সম্মান জানাই। অভিনয়ে অনেক কষ্ট। অনেক বেশি কষ্ট। ঘরে, বাইরে, বস্তিতে, এখানে-সেখানে অনেক জায়গায় গিয়ে থাকতে হয়। অনেক কষ্ট করতে হয়। আমার দ্বারা এত কষ্ট সম্ভব না।

দীর্ঘ দু দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের মডেলিং জগতে কাজ করে চলেছেন মারিয়া ক্রিসপোট্টা। এখন র‍্যাম্পে খুব একটা না হাঁটলেও কাজ করছেন নতুন মডেলদের গ্রুমিং নিয়ে। এ বিষয়ে রয়েছে তাঁর নিজের স্কুল, জেনেসিস। এ ছাড়া তিনি করছেন উপস্থাপনার কাজও। বিভিন্ন মডেলিং শোয়ে তিনি মেন্টর, কোরিওগ্রাফার হিসেবে কাজ করেন। সম্প্রতি তিনি মুখোমুখি হয়েছিলেন আজকের পত্রিকার সঙ্গে। কথা বলেছেন রজত কান্তি রায়।

প্রথমে আপনার সৌন্দর্য চর্চার বিষয়ে জানতে চাই।
মারিয়া: ত্বকের চর্চা করার খুব একটা সময় হয় না। অনেক ব্যস্ততার মধ্যে থাকি। তারপরও ত্বকের চর্চা করা খুব জরুরি। নয়তো এত মেকআপ নেওয়ার পর, এত লাইটের মধ্যে কাজ করে সবকিছু ডিজাস্টার হয়ে যায়। প্রতিদিন আমি প্রচুর পানি পান করি। অনেক বেশি লিকুইড; অর্থাৎ, তরল খাবার খাই। রোজ ফল খাই। বিশেষ করে যে ফলগুলো শরীরকে বিষমুক্ত করে, সেসব ফল বেশি খাই। যেমন, কলার মধ্যে অনেক পটাশিয়াম থাকে। এটা শরীরকে বিষমুক্ত করতে সাহায্য করে। ত্বককে উজ্জ্বল করে। অ্যাভোকাডো খাই। এটি শরীরের টক্সিক উপাদানগুলো কমায়। এ ছাড়া তৈলাক্ত খাবারগুলো এড়িয়ে চলার চেষ্টা করি। কারণ, অতিরিক্ত তৈলাক্ত খাবার খেলে শরীরে ফ্যাট জমা হয়, স্কিনের লেয়ারে তেল জমতে থাকে।

তবে যেহেতু আমি বাঙালি, কিছু খাবার খেতে তো ভালো লাগেই। যেমন, মেজবানি মাংস, কালা ভুনা, তেহারি, বিরিয়ানি—এসব কে না পছন্দ করে। এগুলো আমি খাই। তবে লিমিটেড খাই।

ত্বক চর্চার বিষয়ে আমি, মুখ সব সময় পরিষ্কার রাখা, বারবার মুখ ধোয়া, মেকআপের পর ভালো করে মেকআপ রিমুভ করা ইত্যাদি বিষয়গুলো মেনে চলি। মেকআপ রিমুভ করতে আমি h2o ব্যবহার করি। এটা বায়োডার্মার পণ্য। এতে মিনারেলস আছে। এটি স্কিনের পোরস রিমুভ করে। এর পর ভিটামিন সিযুক্ত ফেইসওয়াশ দিয়ে মুখ ওয়াশ করি। তারপর টোনার ব্যবহার করি। মুখ পরিষ্কার করার পর একটা ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করি। তারপর ঘুমাতে চলে যাই।

সকালে ঘুম থেকে উঠেও একইভাবে ত্বক চর্চা করি। মুখ ধোয়ার পর টোনার, ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করি এবং সানব্লক ক্রিম লাগাই। ঘর থেকে বের হলেই যে সানব্লক ক্রিম ব্যবহার করতে হবে, তা নয়। ঘরে থাকলেও সানব্লক ব্যবহার করা যায়। কারণ আমরা ঘরে যে লাইটগুলো ব্যবহার করি, সেগুলো থেকেও অনেক রশ্মি আসে, যা ত্বকের জন্য ক্ষতিকর।

চুলের জন্য কী করেন?
মারিয়া: চুলে আমি অ্যালোভেরা লাগাই। আমার চুল সারা বছরই ডাই করা থাকে। ডাই করলে চুল অনেক বেশি রুক্ষ হয়ে যায়। বাজারে যে অ্যালোভেরা জেল পাওয়া যায়, ওটা নয়; অ্যালোভেরা পাতা থেকে জেল বের করে চুলে লাগাই। আমার ছাদে অনেক অ্যালোভেরা গাছ আছে। অ্যালোভেরার জেলের সঙ্গে অলিভ ওয়েল ও ক্যাস্টর ওয়েল মিশিয়ে চুলে লাগাই। এক ঘণ্টা পর চুল ধুয়ে ফেলি।

দু-চার মাস পরপর চুল ট্রিম করি। কারণ, চুল ফেটে যায়। তাই ট্রিমিংটা নিয়মিত করি। যখন চুল ডাই করি, তখন চুলে তেল দিতে হয়। স্পা করতে হয়। দুই মাস অন্তর অন্তর স্যালুনে গিয়ে হেয়ার স্পা করার চেষ্টা করি।

আরেকটা বিষয় জানতে চাই তা হলো, আপনি ঠোঁটের যত্নে কিছু করেন কিনা?
মারিয়া: ঠোঁটের যত্নে স্পেশাল কিছু করা হয়ে ওঠে না। আমার ঠোঁট অনেক ডার্ক। বিভিন্ন কারণে ডার্ক হয়ে যায়। তাই চিনি ও এক্সট্রা ভার্জিন কোকোনাট ওয়েল মিশিয়ে পাঁচ মিনিট হালকা করে স্ক্রাব করি। এতে ঠোঁটের কালো দাগ অনেকটাই কমে আসে।

ত্বকের জন্য বেকিং সোডাও খুব কার্যকরী। অনেকের স্কিন খুব সেনসিটিভ। তারা বিভিন্ন প্রোডাক্ট ব্যবহার করতে পারেন না। তাঁরা যদি বেকিং সোডা দিয়ে রূপচর্চা করেন, তাহলে এটা বেশ ভালো কাজ করে। বেশি মেকআপ ব্যবহার ও সূর্যের আলোর কারণে অনেকের ত্বকের পোরস অনেক বড় হয়ে যায়। পোরস থেকে গভীরভাবে মেকআপ রিমুভ করা কষ্টকর হয়ে যায়। তাদের জন্য পরামর্শ হলো, একটা মাইল্ড ফেইসওয়াশ কিংবা সোপ দিয়ে ত্বক পরিষ্কার করা। মাইল্ড ফেইসওয়াশ কিংবা সোপের সঙ্গে অল্প একটু বেকিং সোডা মিশিয়ে ত্বকে ৩০-৩২ সেকেন্ড ম্যাসাজ করলে পোরসগুলো পরিষ্কার হয়ে যায়।

ফিটনেসের জন্য কী করেন?
মারিয়া: ফিটনেসের জন্য তেমন কিছুই করা হয় না। তবে আমার মেইন বিষয়টা হলো মেটাবলিক সিস্টেম। আমার মেটাবলিক সিস্টেম খুব ভালো। ছোট থেকে মিশনারি স্কুলে আমাকে শেখানো হয়েছে যার যার মেটাবলিক সিস্টেম জেনে খাবার গ্রহণ করা উচিত। আমি সেভাবেই খাবার খাই।

চিকিৎসকেরা বলেন, চর্বি ঝরানো এবং ফিটনেস বজায় রাখা ৮০ শতাংশ নির্ভর করে খাবারের ওপর। বাকি ২০ শতাংশ নির্ভর করে ওয়ার্ক আউটের ওপর। আমি খাবারটা সেভাবেই গ্রহণ করি। সকালের নাশতায় আমি টোস্ট, সুগার ছাড়া হরলিক্স ইত্যাদি খাই।

মডেলিং জগতে আপনার আগমন ও বিচরণ সম্পর্কে জানতে চাই।
মারিয়া: ইন্টারন্যাশনালি ফ্যাশন টিভি সবচেয়ে বড় প্ল্যাটফর্মগুলোর মধ্যে অন্যতম। ফ্যাশন টিভির সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল আমার। তাদের সঙ্গে সাড়ে চার বছর কাজ করেছি। বিশ্বের সবচেয়ে সেরা ডিজাইনারদের সঙ্গেও কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। গুচি, আরমানি, ডিএনজি, ডিজি—এসব ব্র্যান্ডের সঙ্গে আমার কাজ করা হয়েছে। তারপর বাংলাদেশে যখন এলাম, র‍্যাম্প নিয়ে কাজ বেশি হয়েছে। র‍্যাম্প নিয়ে কাজ করতে থাকলাম।

একটা পর্যায়ে আর ভালো লাগছিল না। অনেকের মনের কলুষতা নিতে পারছিলাম না। আমি যেতে চাই। কিন্তু কেন যেন পারছি না। আমি পালানোর রাস্তা খুঁজছিলাম।

তারপর দুঃখজনকভাবে আমার বিয়ে হলো। তারপরের খবরে আমি জানতে পারলাম—আমি মা হতে যাচ্ছি। দ্যটস দ্য সিগনাল, যে আমি আর কাজ করব না। তখন কাজ থেকে নিজেকে আমি সম্পূর্ণভাবে সরিয়ে নিয়েছি। বিশেষ করে র‍্যাম্প থেকে। ২০০৯-এর পর থেকে ২০১০-১৪ পর্যন্ত র‍্যাম্প থেকে দূরে ছিলাম। ২০১৫ সালে আমি আবার এসে জয়েন করেছি। ওই পাঁচ বছর আমি সিডনিতে ছিলাম। তারপর দেশে ফিরে আসছি। কাজ শুরু করেছি। আমি ভেবেছিলাম অন্য জব করব। কিন্তু তা হয়নি। মডেল আজরা মাহমুদ আমাকে ফোন দিলেন ইয়েলোর একটা শোয়ের জন্য। জানান, সেখানে ইন্টারন্যাশনাল মডেল দুজন আসছে। ইউকে থেকে একজন এবং পাকিস্তান থেকে একজন। আজরা বললেন, ‘আমি চাই তুই বাংলাদেশকে প্রেজেন্ট কর। প্লিজ না বলবি না আমাকে।’ আমি আজরা মাহমুদকে না করতে পারিনি। আমি ভেবেছিলাম ওই একটা শো করে আবার গায়েব হয়ে যাব। কিন্তু তা আর হলো না।

২০০২ সালের ২৬ নভেম্বরে র‍্যাম্পে প্রথমবার শো করেছিলাম। সেটায় শাবনূর, পপি, ফেরদৌসসহ আরও অনেক নায়ক-নায়িকা হেঁটেছেন আমাদের সঙ্গে। সেই স্টেজে আমার প্রথম র‍্যাম্পে পা রাখা হয়েছিল। সেখানে আমি প্রথম পেয়ার হিসেবে দাঁড়াই ওয়ান অ্যান্ড ওনলি লিজেন্ডারি মডেল নোবেল ভাইয়ের সঙ্গে। যাকে ছোটবেলা থেকে টিভিতে দেখেছি, সেই মানুষটাকে প্রথমবারের মতো স্টেজে দেখছি, তাঁর সঙ্গে স্টেজে পা রাখছি র‍্যাম্প মডেল হিসেবে—এটা আমার জন্য অনেক বড় অ্যাচিভমেন্ট ছিল। তখন বেছে নিয়েছিলাম র‍্যাম্প হলো আমার প্ল্যাটফর্ম। এর আগে আমি মিউজিক ভিডিওতে কাজ করেছি। তারপর চ্যানেল আইয়ের একটা প্রোগ্রামে আমাকে হোস্ট হিসেবে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর ৭-৮ মাসের মধ্যে আমাকে নিয়ে নাড়াচাড়া শুরু হলো। আমার হাইটটা ভালো ছিল। দেখতে অন্যরকম ছিলাম। এ কারণে সাড়া পড়ে গিয়েছিল। র‍্যাম্পে হেঁটে এত ভালো লেগেছিল, অন্য কোনো কাজে সেটা লাগেনি। আমি মনে করেছিলাম ওটাই আমার প্ল্যাটফর্ম।

২০১৫ সালে ইয়েলোর শোয়ের জন্য আজরা যখন ডাকলেন, আমি ভেবেছিলাম, একটা শো করে গায়েব হয়ে যাব। কিন্তু পরে আর পারিনি। হাঁটতেই থাকলাম। এখনো হাঁটি, কম।

ব্যাকগ্রাউন্ডে কাজ শুরু করলেন কবে থেকে?
মারিয়া: ২০১৯ সাল থেকে কাজ করা কমিয়ে দিয়েছি। আমার মনে হলো ১৯-২০ বছর তো হয়ে গেল। আর কত? এখন আমরা যদি না সরি, তাহলে নিউ জেনারেশন জায়গা পাবে না। একটা সময় থাকে মডেলিংয়ের। এবং সেই সময়টা আমি পার করে এসেছি। ২০১৯ সালে এসে মনে হলো আমার এখন কাজ কমানো উচিত। ডিরেকশনে যাওয়া উচিত। আমি একটি বিজ্ঞাপন বানাই। ক্যামেরার পেছনে কাজ করি আমি। স্টোরি আমার লেখা ছিল। প্রডিউস করেছি আমি। টিভিসি করলাম। তারপর একটা ফ্যাশন ফিল্ম করলাম। তখন মজাটা পেয়ে গেলাম। ভাবলাম ব্যাকগ্রাউন্ডে কাজ করব।

গত বছরের নভেম্বরে আমি গ্রুমিং একাডেমি জেনেসিস লঞ্চ করলাম। এর আগেও বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে গ্রুমিং করাতাম। একটু একটু করে সময় দিয়ে, সবকিছু দিতে পারি না স্টুডেন্টদের। তাই নভেম্বর থেকে গ্রুমিং একাডেমি জেনেসিস লঞ্চ করলাম। এখন সেকেন্ড ব্যাচ চলছে। করোনা মহামারির জন্য অনেক ক্ষতি হয়েছে আমাদের। যেখানে একটা ব্যাচে ২০ জন স্টুডেন্ট থাকে, সেখানে পেয়েছি ১৬ জন স্টুডেন্ট। এর মধ্যে চারজন এই ব্যাচে করবে না। আর দুজনের সার্জারি হয়েছে। তারা পরের ব্যাচে জয়েন করবে। তবে আমি আশাবাদী। মানুষের যে বিশ্বাস অর্জন করছি, সে জায়গাটা তৈরি করার চেষ্টা করছি। এই জায়গা থেকে যে টাকা আসবে, তা দিয়ে ব্যবসা করার প্রয়োজন নেই। যেই টাকাটা আমি চার্জ করছি, তা যথেষ্ট নয়। বাট আমার ইচ্ছা হলো আমার লিগ্যাসি ধরে রাখা। ২০টা বছর মডেলিং করে কী পেলাম! অনেকগুলো অ্যাওয়ার্ড পেয়েছি। অনেকগুলো সম্মাননা স্মারক পেয়েছি।

এই মাইলস্টোনগুলো সম্পর্কে শুনি…
মারিয়া: ইন্টারন্যাশনালি বিউটি কন্টেস্টে আমি পার্টিসিপেট করেছিলাম ২০০৫ সালে। ৩৯টি দেশের মধ্যে আমি বিজয়ী হয়েছিলাম। তারপর ফ্যাশন টিভির জন্য কাজ করেছি। আমি ডিজেলের জন্য কাজ করেছি। ইউরোপিয়ান ইন্টারন্যাশনাল টপ ব্র্যান্ডের জন্য কাজ করেছি। বাংলাদেশের ডিজাইনারদের নাম না নিলে তো হয়ই না। রীনা লাতিফ, মাহিন খান, মেহরুজ—এরাই টপ ডিজাইনার। বিবি রাসেলের সঙ্গে আমার ক্যারিয়ারের শুরুতে একটা কাজ হয়েছিল। বিবি আপার সঙ্গে আমার একটু ভুল বোঝাবুঝির কারণে কাজ করা হয়নি আর। তবে ভবিষ্যতে আমি কাজ করব তাঁর সঙ্গে। রীনা লাতিফ, মাহিন খান, মেহরুজ, বিপ্লব সাহা, শৈবাল সাহা, শারুখ আমিন—দেশের যত প্রমিনেন্ট ডিজাইনার আছেন, সবার সঙ্গে কাজ করা হয়েছে। শারুখ আমিন আমাকে প্রথম র‍্যাম্পে হাঁটিয়েছিলেন।

বাংলাদেশে যখন প্রথম ফ্যাশন টিভি এসেছিল, তখন বাংলাদেশকে আমি প্রতিনিধিত্ব করেছিলাম। সবগুলো মডেল ছিল ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ইতালি, স্পেন থেকে। ওসব দেশ থেকে ২৫ জন মডেল এসেছিল। আমি একমাত্র বাঙালি মেয়ে ছিলাম। ওটা আমার জন্য অনেক সম্মানের ব্যাপার ছিল। এমন ছোট ছোট অনেক মাইলস্টোন পার করে গিয়েছি। আমি সরওয়ার ফারুকি, অমিতাভ রেজার সঙ্গে কাজ করেছি। টিভিসির কাজ করেছি, টেলিফিল্মের কাজ করেছি, অভিনয় করেছি। ইন্টারন্যাশনালি কোনো কাজ হলেই আমাকে ডাকত। অমিতাভ রেজা আমাকে বলতেন, এ দেশের বিদেশি নায়িকা। ক্রিকেটের সঙ্গে আমি বেশ অনেক দিন জড়িত ছিলাম। খুব প্রশংসা পেয়েছি।

কেন উত্তরসূরি তৈরি করার আগ্রহ?
মারিয়া: একজন মানুষ কত দিনই-বা বাঁচতে পারে! ১০০ বছর! ১২০ বছর! এর থেকে বেশি না। কিন্তু মানুষ চিরঞ্জীব হয় তার কর্ম দিয়ে। তার কাজ এবং সমাজে সে কী অবদান রেখেছে, সেই অবদানের ওপর ভিত্তি করে তার উত্তরসূরি সৃষ্টি হয়। তার অমরত্বটা থেকে যায়। আমি অমর হতে চাই। আমি চাই আমার স্টুডেন্টরা কাজ করবে। আমি মারিয়া যদি মরেও যাই, তারপরেও যেন মানুষ বলে জেনেসিস মারিয়া। কিংবা এই মডেল জেনেসিসের স্টুডেন্ট। মারিয়ার স্টুডেন্ট আজকে বিশ্বজয় করেছে। হতেও তো পারে। আমি আমার ইনস্টিটিউট থেকে পাঠাতেও তো পারি।

এই যে এতগুলো বছর পার করে দিয়েছি, আমার নাম নিয়ে, শিক্ষা নিয়ে কেউ যদি বড় কোনো জায়গায় ক্রস ওভার করতে পারে, তাহলে তো আমার নাম হবে। তাই না? তখন তাকেও কেউ জিজ্ঞেস করবে, তোমার মেন্টর কে ছিল? তখন সে আমার নামটা নেবে। এভাবে আমি বেঁচে থাকব।

আপনি একেবারে ছোটবেলা থেকেই বাইরে। সচরাচর যারা বাইরে যান তাঁরা ফিরে আসেন না। আপনি কেন ফিরলেন?
মারিয়া: বিদেশে যখন কাজ করেছি, ফ্যাশন টিভিতে যখন কাজ করেছি, তখন দেখেছি, সব মডেলের উচ্চতা আমার চেয়ে অনেক বেশি। দেখা যাচ্ছে আমার উচ্চতা ৫ ফিট ১০ ইঞ্চি, সেখানে ৬ ফিট উচ্চতার মডেলও ছিল। তারা যখন হাই হিল পরত, আরও অনেক লম্বা দেখাত। আমিও কিন্তু তাদের সঙ্গে কাজ করেছি। ডিজাইনাররা আমাকে নিয়েছেন। ভালোবেসেছেন। আমি বাংলাদেশের কথা চিন্তা করে দেখলাম, দেশটা আমার। এই দেশের মানুষগুলো আমার। এই দেশের ভালো ও মন্দটাও আমার। বিদেশের তো সবই আছে। এত সুন্দর সুন্দর মডেল আছে। এক হাজারটা মারিয়া ওদের হাতের মুঠোয় আছে। বাংলাদেশে কয়টা মারিয়া আছে? সো আমার মনে হয়েছিল আমার দায়িত্ব, আমার কর্তব্য হলো আমার দেশকে কিছু দেওয়া। আমি যদি আমার দেশকে পথ না দেখাই, তাহলে অন্য কেউ তো এসে পথ দেখাবে না। আমার কর্তব্য এটা। আমার সুযোগ থাকলে আমি দেশকে গ্লোবালি নিয়ে যাব। আমার দেশ সোনার বাংলাদেশ। গুহার মধ্যে লুকিয়ে রাখলে এ দেশকে আলোকিত করা যাবে না। এটা সবাই বলে—নিজের ব্যাপারে চিন্তা না করে, সেলফিশ না হয়ে চলে আসছ! ৮০ শতাংশ লোক সেলফিশ, ২০ শতাংশ লোক সেলফলেস। ২০ শতাংশ লোক সেলফলেস না হলে দেশটা তো টিকে থাকত না। তাই না? সো আমার মতো মারিয়া আরও অনেক কর্নারেই আছে। যারা দেশের জন্য কিছু করতে চায়। দেশপ্রেমের কারণে বারবার দেশে ফিরে আসে। আমাকে যদি এখানে থাকতে দেওয়া না হয়, অন্য কোথাও পাঠিয়ে দেওয়া হয়, পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকি, আমি নিজ দেশের জন্য কাজ করব। কারণ আমার শেকড় এখানে।

কেমন লাগছে ২০ বছর আগের ও ২০ বছর পরের অবস্থা? এখনকার জেনারেশন, ইন্ডাস্ট্রি—সবকিছু কেমন দেখছেন?
মারিয়া: ১০ বছর আগেও যেমন ছিল, এখনো যদি এমন থাকতাম, তাহলে আমরা অনেক এগিয়ে যেতে পারতাম। অধঃপতন, অবনতি ও বৈষম্য লেগেই আছে। অসম্মান তো আছেই। ১০ বছর আগেও মডেল হিসেবে পরিচয় দিলে ভ্রু কুঁচকে তাকাত লোকজন। অপমানজনক নজর দিত। আজও যখন নিজেকে মডেল বলি, কিছু কিছু মানুষের কাছে অসম্মানিত হতে হয়। কিছু কিছু মানুষ জায়গাটাকে নোংরা করে ফেলেছেন। এ কারণে বাদবাকি যারা পরিষ্কার মানুষ আছেন, তাঁদের গায়েও নোংরা লেগে যাচ্ছে। এখনকার দিনে অসংখ্য মানুষ মডেলিং, অ্যাক্টিং এসবে আগ্রহী হচ্ছে। কিন্তু তাদের আর্ট, কাজ ইত্যাদি পছন্দ না। ফ্যামিলির সঙ্গে যুদ্ধ করে মিডিয়াতে কাজ করেছি। যুদ্ধ করে চলেছি। একা একা চলেছি। কখনো খারাপ পথে যাইনি। বাবা-মায়ের শেখানো নীতিতে চলেছি। অনেক স্ট্রাগল করেছি। প্যাশন ছিল আমার, আর্ট ছিল। এখনকার সবার টাকার প্রতি আগ্রহ অনেক বেশি। তারা কাজ শিখতে চায় না। ভালোমতো কাজ করতে চায় না। কয়েকটা ম্যাগাজিন, টিভিতে চেহারা দেখাবে, স্টেজে কয়েকবার উঠবে এবং ছবিগুলো নিয়ে অনেক টাকা আদায় করবে। এই যে কাজগুলো হচ্ছে, সেগুলো আসলেই ডিসটার্বিং। যারা কাজ করতে চাচ্ছেন, তাঁরা কাজ করতে পারছেন না। যাদের কাজ করার ইচ্ছা নেই, তারা চেহারা দেখিয়ে, ঘুরে বেড়িয়ে অন্যদের থেকে টাকা আয় করার সোর্স বানানোর ইচ্ছা যাদের, তাঁদের দেওয়া হচ্ছে প্রায়োরিটি। এসবের কারণে ইন্ডাস্ট্রিটা নষ্ট হয়ে গেছে। প্রচুর মানুষ আসছেন, কিন্তু কাজের মানুষ তো আমি দেখি না।

আমাদের এখনো মানুষ বলে, তোমাদের ফার্স্ট ব্যাচটা অনেক কিছু দেখিয়ে গেছে। সেকেন্ড ব্যাচ ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিকে কামড়ে ধরে আছে। এখনো পর্যন্ত তোমাদের মতো মডেল দেখি না। আরেকটা সেকেন্ড মারিয়া, ইমি, রুমা, আজরা দেখি না। আমি এখন উল্লেখযোগ্য কাউকে দেখি না। প্রত্যেকটা মানুষের একটা সিংহাসন আছে। আমার একটা আছে। আমি যে সিংহাসন থেকে নেমে অন্যকে ওঠার সুযোগ দেব, আমার সিংহাসনে কাউকে বসতে হবে তো। কাউকে তো এসে জায়গাটা দখল করতে হবে। গত পাঁচ বছর ধরে আমি খুঁজে বেড়াচ্ছি।

সম্প্রতি আমরা কিছু মডেল দেখছি, যারা ইন্টারন্যাশনালি কাজ করছেন। অনেকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যাচ্ছেন। অনেকে ব্যক্তিগতভাবে যাচ্ছেন। সেটা দেখে তো আরেকটা ইমপ্রেশন তৈরি হয়।
মারিয়া: একসময় ‘ফেস অব এশিয়া’ নামে কনটেস্ট হতো। সেখানে যাওয়ার জন্য প্রসেসটা করে দেওয়া হতো। সেখানে ব্যক্তিগত কিছু খরচ হতো। সেখানে আজাদ ফারহানা মিলি নামের একজন মডেল গেছেন। অবনি নামের একজনও গিয়েছেন। সেখানে তাঁরা বিজয়ী হয়েছিলেন। এ রকম কয়েকজন আছেন যারা ‘ফেস অব এশিয়া’ থেকে ক্রাউনগুলো পেয়েছেন। বাদবাকি ইন্টারন্যাশনাল কনটেস্টে কে গিয়েছেন? কোনো জায়গায় যেতে পারেনি তো এখন পর্যন্ত। সিলেক্টেডও হয়নি যাওয়ার জন্য। মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশের খেলাটা তো দেখলেন আপনারা, গত বছর (২০২০) কী হলো?

ব্যাঙের ছাতার মতো একাডেমি, গ্রুমিং স্কুল হচ্ছে। ঠিক সেরকম মাশরুমের মতো অনেকগুলো কনটেস্ট ওপেন হচ্ছে। সেই কন্টেস্টে যে পটেনশিয়াল ক্যানডিডেট থাকেন, তাঁর মূল্যায়ন হচ্ছে না। তাঁকে দাম দেওয়া হচ্ছে না। তাঁকে সামনে আসতে দেওয়া হচ্ছে না। প্রপার ওয়েতে রান করা হচ্ছে না।

নিজের একাডেমি জেনেসিসে শিক্ষার্থীদের মডেলিংয়ের পাঠ দিচ্ছেন মারিয়া ক্রিসপোট্টা। ছবি: সৈয়দ মাহামুদুর রহমান
নিজের একাডেমি জেনেসিসে শিক্ষার্থীদের মডেলিংয়ের পাঠ দিচ্ছেন মারিয়া ক্রিসপোট্টা। ছবি: সৈয়দ মাহামুদুর রহমান
প্রপার ওয়েতে রান কেন হচ্ছে না? ইন্ডাস্ট্রির বয়স তো খুব কম নয়। আপনারা তো কাজ করছেন। সময় তো অনেক গেল। আমরা অনেক কিছুই দেখলাম। অনেকগুলো জেনারেশন দেখলাম। এখন কেন বলছেন যে প্রপার ওয়েতে হচ্ছে না?
মারিয়া: প্রবলেমটা হচ্ছে নিউ মানি। নিউ পিপল হু হ্যাজ নিউ মানি ইন দিস স্টেজ। হি হ্যাজ নো এডুকেশন, নো ক্লাস, নো নলেজ। দিস ইজ দ্য প্রবলেম। এখন একটা হ্যাচারির মালিক যদি কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে যান, ট্রাক সমিতির মালিক যদি কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে যান, তারপর এসে ইন্ডাস্ট্রিতে ঢুকে ইনভেস্ট করতে চান, তাঁর কিন্তু রুচিটা ওইরকমই থাকবে। তাঁর মনে হবে তিনি নায়িকা দেখবেন, নায়িকার হাত ধরে বসবেন, গল্প করবেন, মডেলদের নিয়ে বিদেশে ঘুরতে যাবেন। কারণ, মডেলরা অনেক সেক্সি ক্লথিং পরে, তারা দেখতে হলিউড-বলিউডের হেরোইনের মতো। তো তাঁরা একটু ঘুরবেন ফিরবেন, আর ফ্রেন্ডদেরকে ছবি দেখিয়ে বলবেন ‘আমার গার্লফ্রেন্ড এটা’। একজন অর্ধশিক্ষিত ট্রাক সমিতির সভাপতি বা হ্যাচারি ব্যবসায়ী কী করে বুঝবেন বিউটি কী, নলেজ কী, আর কোয়ালিফিকেশন কী। আমাদের দেশে তো ক্লাসি, এডুকেটেড, এলিট পিপলের সংখ্যা কম। এসব কারণেই ঘটছে অনেক কিছু।

আমিও যেন ওয়ালের মধ্যে ঠেসে যাচ্ছি। মাঝেমধ্যে আমি আবার গা ঝাড়া দিই। ধাক্কা দিই। বলি, এই সরো। জায়গা ছাড়ো। আমার ঘর খালি করো। আমার ঘরে ময়লা এনো না। তোমাদের ঘরে যা করার করো, কিন্তু আমার ঘরে প্রবেশ করো না। আই ডোন্ট লাইক ইট। এটা তো সবাই করতে পারছে না। সংখ্যায় খুব কম হয়ে যাচ্ছি আমরা। যারা সংখ্যায় খুব কম হয়ে যাচ্ছে, তাঁদের ইচ্ছাটাও খুব কম। তারা ইচ্ছাটাকে নিয়ে কাজ করতে চায় না।

মাঝেমধ্যে খারাপ লাগে, বিবি আপার ক্ষমতা ছিল অনেক কিছু করার। কিন্তু বিবি আপা করলেন না। এর পেছনে সম্পূর্ণ বিবি আপার দোষও না। এর পেছনে বাঙালির দোষ। দেশের মানুষের দোষ। বিবি রাসেলের মতো একজন ডিজাইনার, যিনি ইন্টারন্যাশনালি এত সম্মানিত হয়েছেন, তাঁকে বাংলাদেশ কিছুই দিতে পারেনি। কতটুকু সম্মান দিয়েছে তাঁকে? দুই পক্ষই দায়ী। বিবি আপার ইচ্ছেটা কম ছিল। তাঁর ইচ্ছা না থাকার কারণ হলো, বাংলাদেশের মানুষ তাঁকে প্রায়োরিটি দিচ্ছিল না। তাঁকে দাঁড়াতে দেওয়া হচ্ছিল না। জেলাসি থেকে তাঁর আশপাশের অনেক মানুষই তাঁকে পুট ডাউনের চেষ্টা করেছে। অ্যান্ড শি লস্ট হার ইন্টারেস্ট। বড় বড় মানুষেরা যদি এভাবে ছেড়ে চলে যান, তাহলে আমাদের দেশের ভালো কী করে হবে? ভালো কিছু হবে না। খারাপই হবে।

আরেকটা জিনিস, অনেক কিছুর ইনস্টিটিউট হলো, আমাদের ফ্যাশন মডেলিং—এই ইন্ডাস্ট্রির কোনো ইনস্টিটিউট হলো না। এ বিষয়ে আপনাদের বক্তব্য কী?
মারিয়া: আমি শুধু আমারটা বলতে পারি। বাকিদের কথা বলতে পারব না। কেন সরকারিভাবে আমরা স্বীকৃতি পাচ্ছি না, এই প্রশ্ন আমার সব সময় থাকবে। যত দিন পর্যন্ত স্বীকৃতি না পাই। আমাদের কোনো অর্গানাইজেশন কেন নেই, কোনো সোসাইটি কেন নেই, আমাদের নিজের কমিটি নাই, যেখানে আমাদের সঙ্গে হওয়া কোনো অন্যায়ের বিচার হবে, যেখানে আমাদের রুলস অ্যান্ড রেগুলেশন দেওয়া থাকবে।

এখন এমন হচ্ছে কেউ একটু জিন্স পরল, নাচানাচি করল—তারাই মডেল হয়ে যাচ্ছে। এই প্রবণতা মারাত্মক। আমার মনে হয় মডেলিংয়ে সবচেয়ে বেশি হিংসেমি কাজ করে। সবাই মিলে খেতে গেলে তো অল্প অল্প ভাগে পড়বে। সবাইকে ফেলে দিয়ে আমি একা যদি খেতে পারি, তাহলে অনেক বেশি খেতে পারব। কমিটি হলে, অর্গানাইজেশন হয়ে গেলে তো সবাই মিলে কাজ করব, একাত্ম থাকতে হবে। তাহলে আমি খুব বেশি এখান থেকে নিতে পারব না। এর জন্য বড় বড় মাথারাও চায় না যে অর্গানাইজেশনটা হোক। বাট আমি স্ট্রংলি চাই অর্গানাইজেশন হোক। চাই সরকারিভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হোক। আমাদের কমিটি হোক। যেখানে আইনটা বাস্তবায়ন করা হবে। ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি ও মডেলদের জন্য নতুন আইন করা হোক। আমি কাজ চালাচ্ছি। সামনে আরও এগিয়ে যাব। আশা করি কিছু একটা করতে পারব।

তাহলে কি পুরো ব্যাপারটা শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত বলছেন?
মারিয়া: শিক্ষার সাথে অনেক বেশি যুক্ত। আর তারপর তো একটা ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড আসেই। শিক্ষা, প্রপার গাইডলাইন থাকলে নেক্সট জেনারেশন সুন্দর হয়। হবেও। গুরু যদি না জানে কোনো কিছু, কীভাবে শিষ্যদের শেখাবে?

আপনি তো অনেকগুলো দেশ ঘুরেছেন। বিদেশে থেকেছেন অনেক দিন। সেসব ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে আমাদের ইন্ডাস্ট্রির বেসিক পার্থক্যটা কী?
মারিয়া: আকাশ আর পাতাল সমান পার্থক্য। একটা ফ্যাশন শো, একটা প্রোজেক্ট করতে গেলে, ছোট্ট থেকে ছোট্টতর কিছু করতে গেলেও তারা অনেক বেশি অর্গানাইজড থাকে। একটা ফটোশুটের জন্য ১৫-২৫ দিন সময় নেয়। ওরা লে-আউট তৈরি করে, মডেলকে আগে থেকে বুকিং দিয়ে রাখে, মডেলের ম্যাজারমেন্ট নিয়ে রাখবে, ট্রায়ালের জন্য ডাকবে, মডেলের স্কিন টেস্ট করবে, স্কিন কেয়ারের ব্যাপারে নির্দেশনা দেবে। এর পর প্লেস, ভেন্যু, ব্যাকগ্রাউন্ড কী হবে, ছবির কালার কারেকশন কেমন হবে—সবকিছু তারা ঠিক করে রাখে। পরিকল্পনামাফিক করে। সবকিছু টাইম টু টাইম হবে।

আমাদের পাশের দেশ ভারতেও সকাল ৮টা মানে ৮টা। তারা সবকিছু মেনে নেয়। কাজের প্রয়োজনে তারা ছোট পোশাকও পরতে পারে, আবার বোরকাও পরতে পারে। তারা পেশাটাকে সিরিয়াসলি নেয়। এবং তারা খুবই সম্মানের সাথে নেয়। নাচতে নেমে তারা ঘোমটা দেওয়ার চেষ্টা করে না। আর বাঙালি হচ্ছে আমি নাচব এবং ঘোমটাও সরতে পারবে না। বাংলাদেশিদের অ্যাপ্রোচ, বিহেভ, প্রেজেন্টেশন দেখলে অনেক দুঃখ লাগে। নতুন মডেলদের সঙ্গে এমন যাচ্ছেতাই ব্যবহার করা হয়, যা-তা বলা হয়, গালিগালাজও করা হয়। কিন্তু দু-চার-পাঁচ বছর পর সে যখন অনেক বড় মডেল হয়ে যায়, তাকেই ধরে কিন্তু চাটে। নতুন মডেলদের সঙ্গে বিদেশে এমন করা হয় না। বলা হয়, ডোন্ট ডু দিস। আর এ দেশে তো নির্দোষ-চুপচাপ মডেলের সঙ্গেও খারাপ ব্যবহার করা হয়। এ জন্যই দু-চার-পাঁচ বছর পর সেই মডেল বেয়াদব হয়ে যায়। অন্যদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে। কারণ, সে তো শুরুতে ভালো ব্যবহার পায়নি। ওকে তো শেখায়নি আচরণ কেমন হবে।

আপনি কী মনে করেন, একটা রাষ্ট্রীয় ইনস্টিটিউট থাকা উচিত? যেমন চারুকলা ইনস্টিটিউট আছে।
মারিয়া: অবশ্যই। প্রত্যেকটা দেশে আছে। পাশের দেশ ইন্ডিয়াতেই আছে। বাংলাদেশে কেন নেই? বাংলাদেশের মাটি, ঋতু সবই ভালো। কী নেই! যাদের ট্যালেন্ট আছে, তারা সাংঘাতিক ট্যালেন্টেড হয়। এত ট্যালেন্ট, রিসোর্সেস নিয়ে আমরা বসে আছি। তারপরও কেন হবে না! আমাদের কেন চিনবে না ইন্টারন্যাশনালি? কেন এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের নাম অন্যান্য দেশ জানবে না? এ বিষয়টা তো খারাপ লাগে!

যারা সিনিয়র আছেন, একসঙ্গে কাজ করেন, তাদের কি বাংলাদেশে বড় প্ল্যাটফর্ম বানানোর ইচ্ছে আছে?
মারিয়া: সবার নেই। আমার ইচ্ছে আছে। আর মডেল আসিফ খানের আছে। আর কারও কাছে এই জিনিসটা পাইনি।

টেলিভিশন আর্টিস্টদের অনেক প্ল্যাটফর্ম আছে। আমাদের মডেলদের নেই। কেন জানি মনে হয় জেলাসি কাজ করে। তারা এক জোট হতে চায় না। একসঙ্গে হলেই তারা ইনফ্যারিওরিটি কমপ্লেক্সে ভোগে। তারা ভাবে এখন বুঝি একা চলতে পারব না। এটা আসলে ভুল।

নিজের একাডেমি জেনেসিসে শিক্ষার্থীদের মডেলিংয়ের পাঠ দিচ্ছেন মারিয়া ক্রিসপোট্টা। ছবি: সৈয়দ মাহামুদুর রহমান
নিজের একাডেমি জেনেসিসে শিক্ষার্থীদের মডেলিংয়ের পাঠ দিচ্ছেন মারিয়া ক্রিসপোট্টা। ছবি: সৈয়দ মাহামুদুর রহমান
ভবিষ্যৎ কী?
মারিয়া: যদি এভাবেই চলতে থাকে, তাহলে ভবিষ্যৎ খুব খারাপ। সব জায়গায় অন্ধকার। এই ইন্ডাস্ট্রিতে ভালো ফ্যামিলি থেকে কোনো ছেলে কিংবা মেয়ে আসবে না। কাজ করবে না। যদি এখন ইন্ডাস্ট্রির মানুষ সোচ্চার হয়, প্রত্যেকের মধ্যে যদি দায়িত্ববোধ কাজ করে, যদি অ্যাকশন নেয়, তাহলে একেকটা সিঙ্গেল অ্যাকশন যথেষ্ট।

আরেকটা জিনিস জানতে চাই, আপনি তো মিউজিক ভিডিওতে কাজ করেছেন, র‍্যাম্প করেছেন, অ্যাক্টিং করেছেন। কোনটা বেশি ভালো লেগেছে? কোনটার প্রতি আগ্রহ বেশি?
মারিয়া: অবশ্যই র‍্যাম্প।

অ্যাক্টিং কেন নয়?
মারিয়া: যারা অ্যাক্টিং করেন, তাঁদের আমি সম্মান জানাই। অভিনয়ে অনেক কষ্ট। অনেক বেশি কষ্ট। ঘরে, বাইরে, বস্তিতে, এখানে-সেখানে অনেক জায়গায় গিয়ে থাকতে হয়। অনেক কষ্ট করতে হয়। আমার দ্বারা এত কষ্ট সম্ভব না।

গুহার মধ্যে লুকিয়ে রাখলে এ দেশকে আলোকিত করা যাবে না

ডেস্ক নিউজ
আপডেটঃ ২০ নভেম্বর, ২০২১ | ৫:৩৬ 63 ভিউ
দীর্ঘ দু দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের মডেলিং জগতে কাজ করে চলেছেন মারিয়া ক্রিসপোট্টা। এখন র‍্যাম্পে খুব একটা না হাঁটলেও কাজ করছেন নতুন মডেলদের গ্রুমিং নিয়ে। এ বিষয়ে রয়েছে তাঁর নিজের স্কুল, জেনেসিস। এ ছাড়া তিনি করছেন উপস্থাপনার কাজও। বিভিন্ন মডেলিং শোয়ে তিনি মেন্টর, কোরিওগ্রাফার হিসেবে কাজ করেন। সম্প্রতি তিনি মুখোমুখি হয়েছিলেন আজকের পত্রিকার সঙ্গে। কথা বলেছেন রজত কান্তি রায়। প্রথমে আপনার সৌন্দর্য চর্চার বিষয়ে জানতে চাই। মারিয়া: ত্বকের চর্চা করার খুব একটা সময় হয় না। অনেক ব্যস্ততার মধ্যে থাকি। তারপরও ত্বকের চর্চা করা খুব জরুরি। নয়তো এত মেকআপ নেওয়ার পর, এত লাইটের মধ্যে কাজ করে সবকিছু ডিজাস্টার হয়ে যায়। প্রতিদিন আমি প্রচুর পানি পান করি। অনেক বেশি লিকুইড; অর্থাৎ, তরল খাবার খাই। রোজ ফল খাই। বিশেষ করে যে ফলগুলো শরীরকে বিষমুক্ত করে, সেসব ফল বেশি খাই। যেমন, কলার মধ্যে অনেক পটাশিয়াম থাকে। এটা শরীরকে বিষমুক্ত করতে সাহায্য করে। ত্বককে উজ্জ্বল করে। অ্যাভোকাডো খাই। এটি শরীরের টক্সিক উপাদানগুলো কমায়। এ ছাড়া তৈলাক্ত খাবারগুলো এড়িয়ে চলার চেষ্টা করি। কারণ, অতিরিক্ত তৈলাক্ত খাবার খেলে শরীরে ফ্যাট জমা হয়, স্কিনের লেয়ারে তেল জমতে থাকে। তবে যেহেতু আমি বাঙালি, কিছু খাবার খেতে তো ভালো লাগেই। যেমন, মেজবানি মাংস, কালা ভুনা, তেহারি, বিরিয়ানি—এসব কে না পছন্দ করে। এগুলো আমি খাই। তবে লিমিটেড খাই। ত্বক চর্চার বিষয়ে আমি, মুখ সব সময় পরিষ্কার রাখা, বারবার মুখ ধোয়া, মেকআপের পর ভালো করে মেকআপ রিমুভ করা ইত্যাদি বিষয়গুলো মেনে চলি। মেকআপ রিমুভ করতে আমি h2o ব্যবহার করি। এটা বায়োডার্মার পণ্য। এতে মিনারেলস আছে। এটি স্কিনের পোরস রিমুভ করে। এর পর ভিটামিন সিযুক্ত ফেইসওয়াশ দিয়ে মুখ ওয়াশ করি। তারপর টোনার ব্যবহার করি। মুখ পরিষ্কার করার পর একটা ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করি। তারপর ঘুমাতে চলে যাই। সকালে ঘুম থেকে উঠেও একইভাবে ত্বক চর্চা করি। মুখ ধোয়ার পর টোনার, ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করি এবং সানব্লক ক্রিম লাগাই। ঘর থেকে বের হলেই যে সানব্লক ক্রিম ব্যবহার করতে হবে, তা নয়। ঘরে থাকলেও সানব্লক ব্যবহার করা যায়। কারণ আমরা ঘরে যে লাইটগুলো ব্যবহার করি, সেগুলো থেকেও অনেক রশ্মি আসে, যা ত্বকের জন্য ক্ষতিকর। চুলের জন্য কী করেন? মারিয়া: চুলে আমি অ্যালোভেরা লাগাই। আমার চুল সারা বছরই ডাই করা থাকে। ডাই করলে চুল অনেক বেশি রুক্ষ হয়ে যায়। বাজারে যে অ্যালোভেরা জেল পাওয়া যায়, ওটা নয়; অ্যালোভেরা পাতা থেকে জেল বের করে চুলে লাগাই। আমার ছাদে অনেক অ্যালোভেরা গাছ আছে। অ্যালোভেরার জেলের সঙ্গে অলিভ ওয়েল ও ক্যাস্টর ওয়েল মিশিয়ে চুলে লাগাই। এক ঘণ্টা পর চুল ধুয়ে ফেলি। দু-চার মাস পরপর চুল ট্রিম করি। কারণ, চুল ফেটে যায়। তাই ট্রিমিংটা নিয়মিত করি। যখন চুল ডাই করি, তখন চুলে তেল দিতে হয়। স্পা করতে হয়। দুই মাস অন্তর অন্তর স্যালুনে গিয়ে হেয়ার স্পা করার চেষ্টা করি। আরেকটা বিষয় জানতে চাই তা হলো, আপনি ঠোঁটের যত্নে কিছু করেন কিনা? মারিয়া: ঠোঁটের যত্নে স্পেশাল কিছু করা হয়ে ওঠে না। আমার ঠোঁট অনেক ডার্ক। বিভিন্ন কারণে ডার্ক হয়ে যায়। তাই চিনি ও এক্সট্রা ভার্জিন কোকোনাট ওয়েল মিশিয়ে পাঁচ মিনিট হালকা করে স্ক্রাব করি। এতে ঠোঁটের কালো দাগ অনেকটাই কমে আসে। ত্বকের জন্য বেকিং সোডাও খুব কার্যকরী। অনেকের স্কিন খুব সেনসিটিভ। তারা বিভিন্ন প্রোডাক্ট ব্যবহার করতে পারেন না। তাঁরা যদি বেকিং সোডা দিয়ে রূপচর্চা করেন, তাহলে এটা বেশ ভালো কাজ করে। বেশি মেকআপ ব্যবহার ও সূর্যের আলোর কারণে অনেকের ত্বকের পোরস অনেক বড় হয়ে যায়। পোরস থেকে গভীরভাবে মেকআপ রিমুভ করা কষ্টকর হয়ে যায়। তাদের জন্য পরামর্শ হলো, একটা মাইল্ড ফেইসওয়াশ কিংবা সোপ দিয়ে ত্বক পরিষ্কার করা। মাইল্ড ফেইসওয়াশ কিংবা সোপের সঙ্গে অল্প একটু বেকিং সোডা মিশিয়ে ত্বকে ৩০-৩২ সেকেন্ড ম্যাসাজ করলে পোরসগুলো পরিষ্কার হয়ে যায়। ফিটনেসের জন্য কী করেন? মারিয়া: ফিটনেসের জন্য তেমন কিছুই করা হয় না। তবে আমার মেইন বিষয়টা হলো মেটাবলিক সিস্টেম। আমার মেটাবলিক সিস্টেম খুব ভালো। ছোট থেকে মিশনারি স্কুলে আমাকে শেখানো হয়েছে যার যার মেটাবলিক সিস্টেম জেনে খাবার গ্রহণ করা উচিত। আমি সেভাবেই খাবার খাই। চিকিৎসকেরা বলেন, চর্বি ঝরানো এবং ফিটনেস বজায় রাখা ৮০ শতাংশ নির্ভর করে খাবারের ওপর। বাকি ২০ শতাংশ নির্ভর করে ওয়ার্ক আউটের ওপর। আমি খাবারটা সেভাবেই গ্রহণ করি। সকালের নাশতায় আমি টোস্ট, সুগার ছাড়া হরলিক্স ইত্যাদি খাই। মডেলিং জগতে আপনার আগমন ও বিচরণ সম্পর্কে জানতে চাই। মারিয়া: ইন্টারন্যাশনালি ফ্যাশন টিভি সবচেয়ে বড় প্ল্যাটফর্মগুলোর মধ্যে অন্যতম। ফ্যাশন টিভির সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল আমার। তাদের সঙ্গে সাড়ে চার বছর কাজ করেছি। বিশ্বের সবচেয়ে সেরা ডিজাইনারদের সঙ্গেও কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। গুচি, আরমানি, ডিএনজি, ডিজি—এসব ব্র্যান্ডের সঙ্গে আমার কাজ করা হয়েছে। তারপর বাংলাদেশে যখন এলাম, র‍্যাম্প নিয়ে কাজ বেশি হয়েছে। র‍্যাম্প নিয়ে কাজ করতে থাকলাম। একটা পর্যায়ে আর ভালো লাগছিল না। অনেকের মনের কলুষতা নিতে পারছিলাম না। আমি যেতে চাই। কিন্তু কেন যেন পারছি না। আমি পালানোর রাস্তা খুঁজছিলাম। তারপর দুঃখজনকভাবে আমার বিয়ে হলো। তারপরের খবরে আমি জানতে পারলাম—আমি মা হতে যাচ্ছি। দ্যটস দ্য সিগনাল, যে আমি আর কাজ করব না। তখন কাজ থেকে নিজেকে আমি সম্পূর্ণভাবে সরিয়ে নিয়েছি। বিশেষ করে র‍্যাম্প থেকে। ২০০৯-এর পর থেকে ২০১০-১৪ পর্যন্ত র‍্যাম্প থেকে দূরে ছিলাম। ২০১৫ সালে আমি আবার এসে জয়েন করেছি। ওই পাঁচ বছর আমি সিডনিতে ছিলাম। তারপর দেশে ফিরে আসছি। কাজ শুরু করেছি। আমি ভেবেছিলাম অন্য জব করব। কিন্তু তা হয়নি। মডেল আজরা মাহমুদ আমাকে ফোন দিলেন ইয়েলোর একটা শোয়ের জন্য। জানান, সেখানে ইন্টারন্যাশনাল মডেল দুজন আসছে। ইউকে থেকে একজন এবং পাকিস্তান থেকে একজন। আজরা বললেন, ‘আমি চাই তুই বাংলাদেশকে প্রেজেন্ট কর। প্লিজ না বলবি না আমাকে।’ আমি আজরা মাহমুদকে না করতে পারিনি। আমি ভেবেছিলাম ওই একটা শো করে আবার গায়েব হয়ে যাব। কিন্তু তা আর হলো না। ২০০২ সালের ২৬ নভেম্বরে র‍্যাম্পে প্রথমবার শো করেছিলাম। সেটায় শাবনূর, পপি, ফেরদৌসসহ আরও অনেক নায়ক-নায়িকা হেঁটেছেন আমাদের সঙ্গে। সেই স্টেজে আমার প্রথম র‍্যাম্পে পা রাখা হয়েছিল। সেখানে আমি প্রথম পেয়ার হিসেবে দাঁড়াই ওয়ান অ্যান্ড ওনলি লিজেন্ডারি মডেল নোবেল ভাইয়ের সঙ্গে। যাকে ছোটবেলা থেকে টিভিতে দেখেছি, সেই মানুষটাকে প্রথমবারের মতো স্টেজে দেখছি, তাঁর সঙ্গে স্টেজে পা রাখছি র‍্যাম্প মডেল হিসেবে—এটা আমার জন্য অনেক বড় অ্যাচিভমেন্ট ছিল। তখন বেছে নিয়েছিলাম র‍্যাম্প হলো আমার প্ল্যাটফর্ম। এর আগে আমি মিউজিক ভিডিওতে কাজ করেছি। তারপর চ্যানেল আইয়ের একটা প্রোগ্রামে আমাকে হোস্ট হিসেবে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর ৭-৮ মাসের মধ্যে আমাকে নিয়ে নাড়াচাড়া শুরু হলো। আমার হাইটটা ভালো ছিল। দেখতে অন্যরকম ছিলাম। এ কারণে সাড়া পড়ে গিয়েছিল। র‍্যাম্পে হেঁটে এত ভালো লেগেছিল, অন্য কোনো কাজে সেটা লাগেনি। আমি মনে করেছিলাম ওটাই আমার প্ল্যাটফর্ম। ২০১৫ সালে ইয়েলোর শোয়ের জন্য আজরা যখন ডাকলেন, আমি ভেবেছিলাম, একটা শো করে গায়েব হয়ে যাব। কিন্তু পরে আর পারিনি। হাঁটতেই থাকলাম। এখনো হাঁটি, কম। ব্যাকগ্রাউন্ডে কাজ শুরু করলেন কবে থেকে? মারিয়া: ২০১৯ সাল থেকে কাজ করা কমিয়ে দিয়েছি। আমার মনে হলো ১৯-২০ বছর তো হয়ে গেল। আর কত? এখন আমরা যদি না সরি, তাহলে নিউ জেনারেশন জায়গা পাবে না। একটা সময় থাকে মডেলিংয়ের। এবং সেই সময়টা আমি পার করে এসেছি। ২০১৯ সালে এসে মনে হলো আমার এখন কাজ কমানো উচিত। ডিরেকশনে যাওয়া উচিত। আমি একটি বিজ্ঞাপন বানাই। ক্যামেরার পেছনে কাজ করি আমি। স্টোরি আমার লেখা ছিল। প্রডিউস করেছি আমি। টিভিসি করলাম। তারপর একটা ফ্যাশন ফিল্ম করলাম। তখন মজাটা পেয়ে গেলাম। ভাবলাম ব্যাকগ্রাউন্ডে কাজ করব। গত বছরের নভেম্বরে আমি গ্রুমিং একাডেমি জেনেসিস লঞ্চ করলাম। এর আগেও বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে গ্রুমিং করাতাম। একটু একটু করে সময় দিয়ে, সবকিছু দিতে পারি না স্টুডেন্টদের। তাই নভেম্বর থেকে গ্রুমিং একাডেমি জেনেসিস লঞ্চ করলাম। এখন সেকেন্ড ব্যাচ চলছে। করোনা মহামারির জন্য অনেক ক্ষতি হয়েছে আমাদের। যেখানে একটা ব্যাচে ২০ জন স্টুডেন্ট থাকে, সেখানে পেয়েছি ১৬ জন স্টুডেন্ট। এর মধ্যে চারজন এই ব্যাচে করবে না। আর দুজনের সার্জারি হয়েছে। তারা পরের ব্যাচে জয়েন করবে। তবে আমি আশাবাদী। মানুষের যে বিশ্বাস অর্জন করছি, সে জায়গাটা তৈরি করার চেষ্টা করছি। এই জায়গা থেকে যে টাকা আসবে, তা দিয়ে ব্যবসা করার প্রয়োজন নেই। যেই টাকাটা আমি চার্জ করছি, তা যথেষ্ট নয়। বাট আমার ইচ্ছা হলো আমার লিগ্যাসি ধরে রাখা। ২০টা বছর মডেলিং করে কী পেলাম! অনেকগুলো অ্যাওয়ার্ড পেয়েছি। অনেকগুলো সম্মাননা স্মারক পেয়েছি। এই মাইলস্টোনগুলো সম্পর্কে শুনি... মারিয়া: ইন্টারন্যাশনালি বিউটি কন্টেস্টে আমি পার্টিসিপেট করেছিলাম ২০০৫ সালে। ৩৯টি দেশের মধ্যে আমি বিজয়ী হয়েছিলাম। তারপর ফ্যাশন টিভির জন্য কাজ করেছি। আমি ডিজেলের জন্য কাজ করেছি। ইউরোপিয়ান ইন্টারন্যাশনাল টপ ব্র্যান্ডের জন্য কাজ করেছি। বাংলাদেশের ডিজাইনারদের নাম না নিলে তো হয়ই না। রীনা লাতিফ, মাহিন খান, মেহরুজ—এরাই টপ ডিজাইনার। বিবি রাসেলের সঙ্গে আমার ক্যারিয়ারের শুরুতে একটা কাজ হয়েছিল। বিবি আপার সঙ্গে আমার একটু ভুল বোঝাবুঝির কারণে কাজ করা হয়নি আর। তবে ভবিষ্যতে আমি কাজ করব তাঁর সঙ্গে। রীনা লাতিফ, মাহিন খান, মেহরুজ, বিপ্লব সাহা, শৈবাল সাহা, শারুখ আমিন—দেশের যত প্রমিনেন্ট ডিজাইনার আছেন, সবার সঙ্গে কাজ করা হয়েছে। শারুখ আমিন আমাকে প্রথম র‍্যাম্পে হাঁটিয়েছিলেন। বাংলাদেশে যখন প্রথম ফ্যাশন টিভি এসেছিল, তখন বাংলাদেশকে আমি প্রতিনিধিত্ব করেছিলাম। সবগুলো মডেল ছিল ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ইতালি, স্পেন থেকে। ওসব দেশ থেকে ২৫ জন মডেল এসেছিল। আমি একমাত্র বাঙালি মেয়ে ছিলাম। ওটা আমার জন্য অনেক সম্মানের ব্যাপার ছিল। এমন ছোট ছোট অনেক মাইলস্টোন পার করে গিয়েছি। আমি সরওয়ার ফারুকি, অমিতাভ রেজার সঙ্গে কাজ করেছি। টিভিসির কাজ করেছি, টেলিফিল্মের কাজ করেছি, অভিনয় করেছি। ইন্টারন্যাশনালি কোনো কাজ হলেই আমাকে ডাকত। অমিতাভ রেজা আমাকে বলতেন, এ দেশের বিদেশি নায়িকা। ক্রিকেটের সঙ্গে আমি বেশ অনেক দিন জড়িত ছিলাম। খুব প্রশংসা পেয়েছি। কেন উত্তরসূরি তৈরি করার আগ্রহ? মারিয়া: একজন মানুষ কত দিনই-বা বাঁচতে পারে! ১০০ বছর! ১২০ বছর! এর থেকে বেশি না। কিন্তু মানুষ চিরঞ্জীব হয় তার কর্ম দিয়ে। তার কাজ এবং সমাজে সে কী অবদান রেখেছে, সেই অবদানের ওপর ভিত্তি করে তার উত্তরসূরি সৃষ্টি হয়। তার অমরত্বটা থেকে যায়। আমি অমর হতে চাই। আমি চাই আমার স্টুডেন্টরা কাজ করবে। আমি মারিয়া যদি মরেও যাই, তারপরেও যেন মানুষ বলে জেনেসিস মারিয়া। কিংবা এই মডেল জেনেসিসের স্টুডেন্ট। মারিয়ার স্টুডেন্ট আজকে বিশ্বজয় করেছে। হতেও তো পারে। আমি আমার ইনস্টিটিউট থেকে পাঠাতেও তো পারি। এই যে এতগুলো বছর পার করে দিয়েছি, আমার নাম নিয়ে, শিক্ষা নিয়ে কেউ যদি বড় কোনো জায়গায় ক্রস ওভার করতে পারে, তাহলে তো আমার নাম হবে। তাই না? তখন তাকেও কেউ জিজ্ঞেস করবে, তোমার মেন্টর কে ছিল? তখন সে আমার নামটা নেবে। এভাবে আমি বেঁচে থাকব। আপনি একেবারে ছোটবেলা থেকেই বাইরে। সচরাচর যারা বাইরে যান তাঁরা ফিরে আসেন না। আপনি কেন ফিরলেন? মারিয়া: বিদেশে যখন কাজ করেছি, ফ্যাশন টিভিতে যখন কাজ করেছি, তখন দেখেছি, সব মডেলের উচ্চতা আমার চেয়ে অনেক বেশি। দেখা যাচ্ছে আমার উচ্চতা ৫ ফিট ১০ ইঞ্চি, সেখানে ৬ ফিট উচ্চতার মডেলও ছিল। তারা যখন হাই হিল পরত, আরও অনেক লম্বা দেখাত। আমিও কিন্তু তাদের সঙ্গে কাজ করেছি। ডিজাইনাররা আমাকে নিয়েছেন। ভালোবেসেছেন। আমি বাংলাদেশের কথা চিন্তা করে দেখলাম, দেশটা আমার। এই দেশের মানুষগুলো আমার। এই দেশের ভালো ও মন্দটাও আমার। বিদেশের তো সবই আছে। এত সুন্দর সুন্দর মডেল আছে। এক হাজারটা মারিয়া ওদের হাতের মুঠোয় আছে। বাংলাদেশে কয়টা মারিয়া আছে? সো আমার মনে হয়েছিল আমার দায়িত্ব, আমার কর্তব্য হলো আমার দেশকে কিছু দেওয়া। আমি যদি আমার দেশকে পথ না দেখাই, তাহলে অন্য কেউ তো এসে পথ দেখাবে না। আমার কর্তব্য এটা। আমার সুযোগ থাকলে আমি দেশকে গ্লোবালি নিয়ে যাব। আমার দেশ সোনার বাংলাদেশ। গুহার মধ্যে লুকিয়ে রাখলে এ দেশকে আলোকিত করা যাবে না। এটা সবাই বলে—নিজের ব্যাপারে চিন্তা না করে, সেলফিশ না হয়ে চলে আসছ! ৮০ শতাংশ লোক সেলফিশ, ২০ শতাংশ লোক সেলফলেস। ২০ শতাংশ লোক সেলফলেস না হলে দেশটা তো টিকে থাকত না। তাই না? সো আমার মতো মারিয়া আরও অনেক কর্নারেই আছে। যারা দেশের জন্য কিছু করতে চায়। দেশপ্রেমের কারণে বারবার দেশে ফিরে আসে। আমাকে যদি এখানে থাকতে দেওয়া না হয়, অন্য কোথাও পাঠিয়ে দেওয়া হয়, পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকি, আমি নিজ দেশের জন্য কাজ করব। কারণ আমার শেকড় এখানে। কেমন লাগছে ২০ বছর আগের ও ২০ বছর পরের অবস্থা? এখনকার জেনারেশন, ইন্ডাস্ট্রি—সবকিছু কেমন দেখছেন? মারিয়া: ১০ বছর আগেও যেমন ছিল, এখনো যদি এমন থাকতাম, তাহলে আমরা অনেক এগিয়ে যেতে পারতাম। অধঃপতন, অবনতি ও বৈষম্য লেগেই আছে। অসম্মান তো আছেই। ১০ বছর আগেও মডেল হিসেবে পরিচয় দিলে ভ্রু কুঁচকে তাকাত লোকজন। অপমানজনক নজর দিত। আজও যখন নিজেকে মডেল বলি, কিছু কিছু মানুষের কাছে অসম্মানিত হতে হয়। কিছু কিছু মানুষ জায়গাটাকে নোংরা করে ফেলেছেন। এ কারণে বাদবাকি যারা পরিষ্কার মানুষ আছেন, তাঁদের গায়েও নোংরা লেগে যাচ্ছে। এখনকার দিনে অসংখ্য মানুষ মডেলিং, অ্যাক্টিং এসবে আগ্রহী হচ্ছে। কিন্তু তাদের আর্ট, কাজ ইত্যাদি পছন্দ না। ফ্যামিলির সঙ্গে যুদ্ধ করে মিডিয়াতে কাজ করেছি। যুদ্ধ করে চলেছি। একা একা চলেছি। কখনো খারাপ পথে যাইনি। বাবা-মায়ের শেখানো নীতিতে চলেছি। অনেক স্ট্রাগল করেছি। প্যাশন ছিল আমার, আর্ট ছিল। এখনকার সবার টাকার প্রতি আগ্রহ অনেক বেশি। তারা কাজ শিখতে চায় না। ভালোমতো কাজ করতে চায় না। কয়েকটা ম্যাগাজিন, টিভিতে চেহারা দেখাবে, স্টেজে কয়েকবার উঠবে এবং ছবিগুলো নিয়ে অনেক টাকা আদায় করবে। এই যে কাজগুলো হচ্ছে, সেগুলো আসলেই ডিসটার্বিং। যারা কাজ করতে চাচ্ছেন, তাঁরা কাজ করতে পারছেন না। যাদের কাজ করার ইচ্ছা নেই, তারা চেহারা দেখিয়ে, ঘুরে বেড়িয়ে অন্যদের থেকে টাকা আয় করার সোর্স বানানোর ইচ্ছা যাদের, তাঁদের দেওয়া হচ্ছে প্রায়োরিটি। এসবের কারণে ইন্ডাস্ট্রিটা নষ্ট হয়ে গেছে। প্রচুর মানুষ আসছেন, কিন্তু কাজের মানুষ তো আমি দেখি না। আমাদের এখনো মানুষ বলে, তোমাদের ফার্স্ট ব্যাচটা অনেক কিছু দেখিয়ে গেছে। সেকেন্ড ব্যাচ ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিকে কামড়ে ধরে আছে। এখনো পর্যন্ত তোমাদের মতো মডেল দেখি না। আরেকটা সেকেন্ড মারিয়া, ইমি, রুমা, আজরা দেখি না। আমি এখন উল্লেখযোগ্য কাউকে দেখি না। প্রত্যেকটা মানুষের একটা সিংহাসন আছে। আমার একটা আছে। আমি যে সিংহাসন থেকে নেমে অন্যকে ওঠার সুযোগ দেব, আমার সিংহাসনে কাউকে বসতে হবে তো। কাউকে তো এসে জায়গাটা দখল করতে হবে। গত পাঁচ বছর ধরে আমি খুঁজে বেড়াচ্ছি। সম্প্রতি আমরা কিছু মডেল দেখছি, যারা ইন্টারন্যাশনালি কাজ করছেন। অনেকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যাচ্ছেন। অনেকে ব্যক্তিগতভাবে যাচ্ছেন। সেটা দেখে তো আরেকটা ইমপ্রেশন তৈরি হয়। মারিয়া: একসময় ‘ফেস অব এশিয়া’ নামে কনটেস্ট হতো। সেখানে যাওয়ার জন্য প্রসেসটা করে দেওয়া হতো। সেখানে ব্যক্তিগত কিছু খরচ হতো। সেখানে আজাদ ফারহানা মিলি নামের একজন মডেল গেছেন। অবনি নামের একজনও গিয়েছেন। সেখানে তাঁরা বিজয়ী হয়েছিলেন। এ রকম কয়েকজন আছেন যারা ‘ফেস অব এশিয়া’ থেকে ক্রাউনগুলো পেয়েছেন। বাদবাকি ইন্টারন্যাশনাল কনটেস্টে কে গিয়েছেন? কোনো জায়গায় যেতে পারেনি তো এখন পর্যন্ত। সিলেক্টেডও হয়নি যাওয়ার জন্য। মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশের খেলাটা তো দেখলেন আপনারা, গত বছর (২০২০) কী হলো? ব্যাঙের ছাতার মতো একাডেমি, গ্রুমিং স্কুল হচ্ছে। ঠিক সেরকম মাশরুমের মতো অনেকগুলো কনটেস্ট ওপেন হচ্ছে। সেই কন্টেস্টে যে পটেনশিয়াল ক্যানডিডেট থাকেন, তাঁর মূল্যায়ন হচ্ছে না। তাঁকে দাম দেওয়া হচ্ছে না। তাঁকে সামনে আসতে দেওয়া হচ্ছে না। প্রপার ওয়েতে রান করা হচ্ছে না। নিজের একাডেমি জেনেসিসে শিক্ষার্থীদের মডেলিংয়ের পাঠ দিচ্ছেন মারিয়া ক্রিসপোট্টা। ছবি: সৈয়দ মাহামুদুর রহমান নিজের একাডেমি জেনেসিসে শিক্ষার্থীদের মডেলিংয়ের পাঠ দিচ্ছেন মারিয়া ক্রিসপোট্টা। ছবি: সৈয়দ মাহামুদুর রহমান প্রপার ওয়েতে রান কেন হচ্ছে না? ইন্ডাস্ট্রির বয়স তো খুব কম নয়। আপনারা তো কাজ করছেন। সময় তো অনেক গেল। আমরা অনেক কিছুই দেখলাম। অনেকগুলো জেনারেশন দেখলাম। এখন কেন বলছেন যে প্রপার ওয়েতে হচ্ছে না? মারিয়া: প্রবলেমটা হচ্ছে নিউ মানি। নিউ পিপল হু হ্যাজ নিউ মানি ইন দিস স্টেজ। হি হ্যাজ নো এডুকেশন, নো ক্লাস, নো নলেজ। দিস ইজ দ্য প্রবলেম। এখন একটা হ্যাচারির মালিক যদি কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে যান, ট্রাক সমিতির মালিক যদি কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে যান, তারপর এসে ইন্ডাস্ট্রিতে ঢুকে ইনভেস্ট করতে চান, তাঁর কিন্তু রুচিটা ওইরকমই থাকবে। তাঁর মনে হবে তিনি নায়িকা দেখবেন, নায়িকার হাত ধরে বসবেন, গল্প করবেন, মডেলদের নিয়ে বিদেশে ঘুরতে যাবেন। কারণ, মডেলরা অনেক সেক্সি ক্লথিং পরে, তারা দেখতে হলিউড-বলিউডের হেরোইনের মতো। তো তাঁরা একটু ঘুরবেন ফিরবেন, আর ফ্রেন্ডদেরকে ছবি দেখিয়ে বলবেন ‘আমার গার্লফ্রেন্ড এটা’। একজন অর্ধশিক্ষিত ট্রাক সমিতির সভাপতি বা হ্যাচারি ব্যবসায়ী কী করে বুঝবেন বিউটি কী, নলেজ কী, আর কোয়ালিফিকেশন কী। আমাদের দেশে তো ক্লাসি, এডুকেটেড, এলিট পিপলের সংখ্যা কম। এসব কারণেই ঘটছে অনেক কিছু। আমিও যেন ওয়ালের মধ্যে ঠেসে যাচ্ছি। মাঝেমধ্যে আমি আবার গা ঝাড়া দিই। ধাক্কা দিই। বলি, এই সরো। জায়গা ছাড়ো। আমার ঘর খালি করো। আমার ঘরে ময়লা এনো না। তোমাদের ঘরে যা করার করো, কিন্তু আমার ঘরে প্রবেশ করো না। আই ডোন্ট লাইক ইট। এটা তো সবাই করতে পারছে না। সংখ্যায় খুব কম হয়ে যাচ্ছি আমরা। যারা সংখ্যায় খুব কম হয়ে যাচ্ছে, তাঁদের ইচ্ছাটাও খুব কম। তারা ইচ্ছাটাকে নিয়ে কাজ করতে চায় না। মাঝেমধ্যে খারাপ লাগে, বিবি আপার ক্ষমতা ছিল অনেক কিছু করার। কিন্তু বিবি আপা করলেন না। এর পেছনে সম্পূর্ণ বিবি আপার দোষও না। এর পেছনে বাঙালির দোষ। দেশের মানুষের দোষ। বিবি রাসেলের মতো একজন ডিজাইনার, যিনি ইন্টারন্যাশনালি এত সম্মানিত হয়েছেন, তাঁকে বাংলাদেশ কিছুই দিতে পারেনি। কতটুকু সম্মান দিয়েছে তাঁকে? দুই পক্ষই দায়ী। বিবি আপার ইচ্ছেটা কম ছিল। তাঁর ইচ্ছা না থাকার কারণ হলো, বাংলাদেশের মানুষ তাঁকে প্রায়োরিটি দিচ্ছিল না। তাঁকে দাঁড়াতে দেওয়া হচ্ছিল না। জেলাসি থেকে তাঁর আশপাশের অনেক মানুষই তাঁকে পুট ডাউনের চেষ্টা করেছে। অ্যান্ড শি লস্ট হার ইন্টারেস্ট। বড় বড় মানুষেরা যদি এভাবে ছেড়ে চলে যান, তাহলে আমাদের দেশের ভালো কী করে হবে? ভালো কিছু হবে না। খারাপই হবে। আরেকটা জিনিস, অনেক কিছুর ইনস্টিটিউট হলো, আমাদের ফ্যাশন মডেলিং—এই ইন্ডাস্ট্রির কোনো ইনস্টিটিউট হলো না। এ বিষয়ে আপনাদের বক্তব্য কী? মারিয়া: আমি শুধু আমারটা বলতে পারি। বাকিদের কথা বলতে পারব না। কেন সরকারিভাবে আমরা স্বীকৃতি পাচ্ছি না, এই প্রশ্ন আমার সব সময় থাকবে। যত দিন পর্যন্ত স্বীকৃতি না পাই। আমাদের কোনো অর্গানাইজেশন কেন নেই, কোনো সোসাইটি কেন নেই, আমাদের নিজের কমিটি নাই, যেখানে আমাদের সঙ্গে হওয়া কোনো অন্যায়ের বিচার হবে, যেখানে আমাদের রুলস অ্যান্ড রেগুলেশন দেওয়া থাকবে। এখন এমন হচ্ছে কেউ একটু জিন্স পরল, নাচানাচি করল—তারাই মডেল হয়ে যাচ্ছে। এই প্রবণতা মারাত্মক। আমার মনে হয় মডেলিংয়ে সবচেয়ে বেশি হিংসেমি কাজ করে। সবাই মিলে খেতে গেলে তো অল্প অল্প ভাগে পড়বে। সবাইকে ফেলে দিয়ে আমি একা যদি খেতে পারি, তাহলে অনেক বেশি খেতে পারব। কমিটি হলে, অর্গানাইজেশন হয়ে গেলে তো সবাই মিলে কাজ করব, একাত্ম থাকতে হবে। তাহলে আমি খুব বেশি এখান থেকে নিতে পারব না। এর জন্য বড় বড় মাথারাও চায় না যে অর্গানাইজেশনটা হোক। বাট আমি স্ট্রংলি চাই অর্গানাইজেশন হোক। চাই সরকারিভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হোক। আমাদের কমিটি হোক। যেখানে আইনটা বাস্তবায়ন করা হবে। ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি ও মডেলদের জন্য নতুন আইন করা হোক। আমি কাজ চালাচ্ছি। সামনে আরও এগিয়ে যাব। আশা করি কিছু একটা করতে পারব। তাহলে কি পুরো ব্যাপারটা শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত বলছেন? মারিয়া: শিক্ষার সাথে অনেক বেশি যুক্ত। আর তারপর তো একটা ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড আসেই। শিক্ষা, প্রপার গাইডলাইন থাকলে নেক্সট জেনারেশন সুন্দর হয়। হবেও। গুরু যদি না জানে কোনো কিছু, কীভাবে শিষ্যদের শেখাবে? আপনি তো অনেকগুলো দেশ ঘুরেছেন। বিদেশে থেকেছেন অনেক দিন। সেসব ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে আমাদের ইন্ডাস্ট্রির বেসিক পার্থক্যটা কী? মারিয়া: আকাশ আর পাতাল সমান পার্থক্য। একটা ফ্যাশন শো, একটা প্রোজেক্ট করতে গেলে, ছোট্ট থেকে ছোট্টতর কিছু করতে গেলেও তারা অনেক বেশি অর্গানাইজড থাকে। একটা ফটোশুটের জন্য ১৫-২৫ দিন সময় নেয়। ওরা লে-আউট তৈরি করে, মডেলকে আগে থেকে বুকিং দিয়ে রাখে, মডেলের ম্যাজারমেন্ট নিয়ে রাখবে, ট্রায়ালের জন্য ডাকবে, মডেলের স্কিন টেস্ট করবে, স্কিন কেয়ারের ব্যাপারে নির্দেশনা দেবে। এর পর প্লেস, ভেন্যু, ব্যাকগ্রাউন্ড কী হবে, ছবির কালার কারেকশন কেমন হবে—সবকিছু তারা ঠিক করে রাখে। পরিকল্পনামাফিক করে। সবকিছু টাইম টু টাইম হবে। আমাদের পাশের দেশ ভারতেও সকাল ৮টা মানে ৮টা। তারা সবকিছু মেনে নেয়। কাজের প্রয়োজনে তারা ছোট পোশাকও পরতে পারে, আবার বোরকাও পরতে পারে। তারা পেশাটাকে সিরিয়াসলি নেয়। এবং তারা খুবই সম্মানের সাথে নেয়। নাচতে নেমে তারা ঘোমটা দেওয়ার চেষ্টা করে না। আর বাঙালি হচ্ছে আমি নাচব এবং ঘোমটাও সরতে পারবে না। বাংলাদেশিদের অ্যাপ্রোচ, বিহেভ, প্রেজেন্টেশন দেখলে অনেক দুঃখ লাগে। নতুন মডেলদের সঙ্গে এমন যাচ্ছেতাই ব্যবহার করা হয়, যা-তা বলা হয়, গালিগালাজও করা হয়। কিন্তু দু-চার-পাঁচ বছর পর সে যখন অনেক বড় মডেল হয়ে যায়, তাকেই ধরে কিন্তু চাটে। নতুন মডেলদের সঙ্গে বিদেশে এমন করা হয় না। বলা হয়, ডোন্ট ডু দিস। আর এ দেশে তো নির্দোষ-চুপচাপ মডেলের সঙ্গেও খারাপ ব্যবহার করা হয়। এ জন্যই দু-চার-পাঁচ বছর পর সেই মডেল বেয়াদব হয়ে যায়। অন্যদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে। কারণ, সে তো শুরুতে ভালো ব্যবহার পায়নি। ওকে তো শেখায়নি আচরণ কেমন হবে। আপনি কী মনে করেন, একটা রাষ্ট্রীয় ইনস্টিটিউট থাকা উচিত? যেমন চারুকলা ইনস্টিটিউট আছে। মারিয়া: অবশ্যই। প্রত্যেকটা দেশে আছে। পাশের দেশ ইন্ডিয়াতেই আছে। বাংলাদেশে কেন নেই? বাংলাদেশের মাটি, ঋতু সবই ভালো। কী নেই! যাদের ট্যালেন্ট আছে, তারা সাংঘাতিক ট্যালেন্টেড হয়। এত ট্যালেন্ট, রিসোর্সেস নিয়ে আমরা বসে আছি। তারপরও কেন হবে না! আমাদের কেন চিনবে না ইন্টারন্যাশনালি? কেন এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের নাম অন্যান্য দেশ জানবে না? এ বিষয়টা তো খারাপ লাগে! যারা সিনিয়র আছেন, একসঙ্গে কাজ করেন, তাদের কি বাংলাদেশে বড় প্ল্যাটফর্ম বানানোর ইচ্ছে আছে? মারিয়া: সবার নেই। আমার ইচ্ছে আছে। আর মডেল আসিফ খানের আছে। আর কারও কাছে এই জিনিসটা পাইনি। টেলিভিশন আর্টিস্টদের অনেক প্ল্যাটফর্ম আছে। আমাদের মডেলদের নেই। কেন জানি মনে হয় জেলাসি কাজ করে। তারা এক জোট হতে চায় না। একসঙ্গে হলেই তারা ইনফ্যারিওরিটি কমপ্লেক্সে ভোগে। তারা ভাবে এখন বুঝি একা চলতে পারব না। এটা আসলে ভুল। নিজের একাডেমি জেনেসিসে শিক্ষার্থীদের মডেলিংয়ের পাঠ দিচ্ছেন মারিয়া ক্রিসপোট্টা। ছবি: সৈয়দ মাহামুদুর রহমান নিজের একাডেমি জেনেসিসে শিক্ষার্থীদের মডেলিংয়ের পাঠ দিচ্ছেন মারিয়া ক্রিসপোট্টা। ছবি: সৈয়দ মাহামুদুর রহমান ভবিষ্যৎ কী? মারিয়া: যদি এভাবেই চলতে থাকে, তাহলে ভবিষ্যৎ খুব খারাপ। সব জায়গায় অন্ধকার। এই ইন্ডাস্ট্রিতে ভালো ফ্যামিলি থেকে কোনো ছেলে কিংবা মেয়ে আসবে না। কাজ করবে না। যদি এখন ইন্ডাস্ট্রির মানুষ সোচ্চার হয়, প্রত্যেকের মধ্যে যদি দায়িত্ববোধ কাজ করে, যদি অ্যাকশন নেয়, তাহলে একেকটা সিঙ্গেল অ্যাকশন যথেষ্ট। আরেকটা জিনিস জানতে চাই, আপনি তো মিউজিক ভিডিওতে কাজ করেছেন, র‍্যাম্প করেছেন, অ্যাক্টিং করেছেন। কোনটা বেশি ভালো লেগেছে? কোনটার প্রতি আগ্রহ বেশি? মারিয়া: অবশ্যই র‍্যাম্প। অ্যাক্টিং কেন নয়? মারিয়া: যারা অ্যাক্টিং করেন, তাঁদের আমি সম্মান জানাই। অভিনয়ে অনেক কষ্ট। অনেক বেশি কষ্ট। ঘরে, বাইরে, বস্তিতে, এখানে-সেখানে অনেক জায়গায় গিয়ে থাকতে হয়। অনেক কষ্ট করতে হয়। আমার দ্বারা এত কষ্ট সম্ভব না।

দৈনিক ডোনেট বাংলাদেশ সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ট্যাগ:

সংশ্লিষ্ট সংবাদ: