ডায়াবেটিক সেবা দিবসের ভাবনা


অথর
স্বাস্থ্য কথন ডেক্স   ডোনেট বাংলাদেশ
প্রকাশিত :৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৬:৩৬ পূর্বাহ্ণ | পঠিত : 133 বার
ডায়াবেটিক সেবা দিবসের ভাবনা

জাতীয় অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিমের মৃত্যুদিবসটিকে দেশে ডায়াবেটিস সেবা দিবস হিসাবে পালন করা হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে ডা. ইব্রাহিম সম্পর্কে কিছু স্মৃতিচারণ করতে চাই। ১৯৮৬ সালের মার্চ মাসের এক সকাল। আমি তখন তদানীন্তন ইনস্টিটিউট অব পোস্ট গ্র্যাজুয়েট মেডিসিন অ্যান্ড রিসার্চ বা পিজি হাসপাতাল, বর্তমান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেন্টাল বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। তখন পিজি হাসপাতালের পরিচালক ছিলেন জাতীয় অধ্যাপক নুরুল ইসলাম। একদিন সকালে ডেন্টাল বিভাগে ফোন এলো- বারডেম থেকে জাতীয় অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম দাঁত পরীক্ষা করাতে আসছেন। সেদিন আমাদের বিভাগীয় প্রধান ছুটিতে ছিলেন। সুতরাং দায়িত্ব পড়ল আমার ওপর। যথারীতি ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম স্যার এলেন বিভাগে। আমি সালাম দিয়ে আমার পরিচয় দিলাম। তিনি বললেন, ‘আমার দাঁতের একটি ধারালো অংশের জন্য জিহ্বাতে ঘা হয়েছে, একটু দেখে দাও তো আর কোনো সমস্যা আছে কিনা।’ আমি স্যারকে ডেন্টাল চেয়ারে বসিয়ে দাঁত ও মুখ পরীক্ষা করে দেখলাম, সত্যিই তার একটি দাঁত ভেঙে ধারালো হয়ে গেছে, সেই সঙ্গে মাড়িতেও প্লাক জমা হয়ে প্রদাহ হচ্ছে। এ অবস্থায় তার দাঁতের ধারালো অংশ তাৎক্ষণিকভাবে ঘষে মসৃণ করে দিলাম, সেই সঙ্গে ডেন্টাল স্কেলিং করে দিলাম, দাঁতগুলো পরিষ্কার হয়ে গেল। সঙ্গে একটি প্রেসক্রিপশনও করলাম। তিনি খুব খুশি হয়ে আমার নাম-পরিচয় জেনে গেলেন। পিজি থেকে বারডেমে পৌঁছেই তিনি তদানীন্তন স্বাস্থ্যমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. মতিনকে ফোন করলেন এবং আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। অধ্যাপক ডা. মতিন আমার সংগীত জীবন ও পেশার প্রতি নিষ্ঠা সম্পর্কে তাকে অনেক কিছু জানালেন। ইব্রাহিম স্যার তখন স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে বললেন, ‘এক কাজ করো, ডা. অরূপরতনকে বারডেমে দিয়ে দাও’। অধ্যাপক ডা. মতিন তখন বললেন, ‘স্যার, অরূপ তো সরকারি চাকরিতে পিজিতে আছে, ওকে কীভাবে দেব?’ ডা. ইব্রাহিম স্যার সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন- ‘ডেপুটেশনে দাও’। এর দুই দিন পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে একটি অর্ডার এলো এরকমভাবে- আমি সপ্তাহে দু’দিন পিজিতে চাকরিরত অবস্থাতেই বারডেমে এসে ডায়াবেটিক রোগীদের মুখ ও দাঁত পরীক্ষা করে চিকিৎসা দেব। আমি অর্ডারটি নিয়ে বারডেমে এসে ইব্রাহিম স্যারের সঙ্গে দেখা করে কৃতজ্ঞতার কথা জানালাম এবং বললাম, স্যার আমি আজ ধন্য, আপনি আমার জন্য স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে সুপারিশ করে বারডেমে ডায়াবেটিক রোগীদের কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছেন। ইব্রাহিম স্যার বললেন, ‘এতে তো আমাদের লাভ হলো, তুমি কাজ শুরু করে দাও।’ পরদিন আমার চেম্বার থেকে একটি ডেন্টাল চেয়ার নিয়ে এসে বারডেমের নিচতলায় এখন যেখানে এক্স-রে করা হয়, সেখানকার একটি ছোট রুমে বসালাম। সঙ্গে চেম্বার থেকে কিছু যন্ত্রপাতিও নিয়ে এলাম। এভাবেই চলল প্রতি সপ্তাহে দুই দিন বারডেমে ডায়াবেটিক রোগীদের মুখ ও দাঁতের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার কাজ। ইব্রাহিম স্যারের প্রতি আমার এতই শ্রদ্ধাবোধ জাগল যে, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার ভাষা পাচ্ছিলাম না। তাই স্যারকে একটিবারও জিজ্ঞাসা করিনি, আমার ডেন্টাল চেয়ার বা যন্ত্রপাতি কোথা থেকে পাবো। তার প্রতি আমার শ্রদ্ধাবোধ আর কৃতজ্ঞতা থেকে ১৯৮৬ সালেই নিজের চেম্বারের ডেন্টাল চেয়ার আর যন্ত্রপাতি নিয়ে এসে বারডেমে রোগী দেখা শুরু করি। ইব্রাহিম স্যারও আমার এই কর্মকাণ্ডের ভূয়সী প্রশংসা করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি জাপান-বাংলাদেশ সহযোগিতা চুক্তির মাধ্যমে যে সিটি স্ক্যান মেশিনটি এনেছিলেন তার সঙ্গে একটি ডেন্টাল চেয়ারও জাপান থেকে আমাকে এনে দিয়েছিলেন কাজ করার জন্য। ধীরে ধীরে আমার রোগীর সংখ্যাও বাড়তে লাগল। এর ঠিক এক বছর পর তিনি আবার স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে সরাসরি ফোন করে ১৯৮৭ সালে আমাকে পূর্ণাঙ্গভাবে পিজি হাসপাতাল থেকে ডেপুটেশনে নিয়ে এলেন। ওই বছর থেকে আমি বারডেমে ফুলটাইম কাজ শুরু করি। সবচেয়ে বড় কথা, ইব্রাহিম স্যারের সান্নিধ্যে আসার পর থেকে আমার পেশাগত জীবনেরও অনেক পরিবর্তন শুরু হয়। আমি এখানে কাজ করার সঙ্গে সঙ্গে ইব্রাহিম স্যারের অনুপ্রেরণায় গবেষণা কাজও শুরু করি। পরবর্তী সময়ে আমার ডায়াবেটিস ও মুখের রোগের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে প্রায় ৩৮টি গবেষণা প্রবন্ধ বিশ্বের ২৪টি দেশে উপস্থাপন করার সুযোগ পাই। মুখ ও দাঁতের যত্ন এবং চিকিৎসার ফলে এখন অসংখ্য ডায়াবেটিক রোগী যেমন মুখ ও দাঁতের যত্ন সম্পর্কে সচেতন হয়েছেন, তেমনি তারা তাদের ডায়াবেটিসও নিয়ন্ত্রণে রেখে সুস্থ আছেন। চিন্তা করলে অবাক লাগে, মরহুম ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম সেই তখন প্রমাণ করেছিলেন- ডায়াবেটিক রোগীদের ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ শুধু নয়, তাদের সুস্থভাবে বাঁচতে হলে এবং অন্যান্য জটিলতা যেমন হার্ট ডিজিজ, ফুসফুসের রোগ, লিভার ও কিডনি রোগ, নাক-কান-গলার বিভিন্ন রোগ, এমনকি ক্যান্সার থেকে বাঁচতে হলে মুখের ও দাঁতের যত্ন তাদের অবশ্যই নিতে হবে। আজ পৃথিবীতে প্রায় প্রতিটি দেশেই ডায়াবেটিসের সঙ্গে মুখের রোগের সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা হচ্ছে এবং মাড়ির রোগকে বর্তমানে ডায়াবেটিস রোগের পাঁচটি জটিলতার সঙ্গে যুক্ত করে ষষ্ঠ জটিলতা হিসাবে চিহ্নিত করেছে আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিক ফেডারেশন ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। আজ আমি গর্বের সঙ্গে বলতে পারি, রোগীদের প্রতি ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিমের আন্তরিকতা ও সহমর্মিতার জন্যই এখন আমাদের ডেন্টাল বিভাগ আগের চেয়ে অনেক বড় হয়েছে। এখানে প্রায় প্রতিটি ডেন্টাল বিষয়ের বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন বিভাগে কাজ করছেন। সেই সঙ্গে ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজের সঙ্গে খোলা হয়েছে ডেন্টাল ইউনিট। যেখানে প্রতিবছর প্রায় ২৫ জন ছাত্রছাত্রী ভর্তি হচ্ছে এবং প্রতিবছরই নতুন ডেন্টাল সার্জনদের ব্যাচ বেরিয়ে আসছে এ কলেজ থেকে। যে ছয়টি বিশেষ বিষয়ে চিকিৎসকরা এখন এখানে কাজ করছেন, সেগুলো হলো- মেক্সিলো ফেসিয়াল সার্জারি, পেরিওডেন্টলজি, প্রস্থডনসিয়া, চিলড্রেন ডেনটিস্ট্রি, অর্থডনসিয়া ও কনসারডেটিভ ডেন্টিস্ট্রি ইত্যাদি। সুতরাং বারডেম হাসপাতালে বিভিন্ন বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা যেমন চিকিৎসা দিচ্ছেন, তেমনি ডেন্টাল বিভাগের বিভিন্ন ক্ষেত্রেও বিশেষজ্ঞরা চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন। কলেজ থেকে প্রতিবছর নতুন ডেন্টিস্টরা বের হয়ে আসছেন। ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিমের এ দূরদৃষ্টি না থাকলে আজ অগণিত ডায়াবেটিক রোগী মুখের ও দাঁতের চিকিৎসাসেবা থেকে শুধু যে বঞ্চিত থাকতেন তা নয়, তারা অনেক জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে অকালে মৃত্যুবরণ করতেন। আজ যে পরিবর্তন এসেছে, এর সবই সম্ভব হয়েছে ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিমের মতো একজন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মহান চিকিৎসকের কারণে। আজ তার মৃত্যুবার্ষিকীতে আমি স্যারকে স্মরণ করছি শ্রদ্ধাভরে। ড. অরূপরতন চৌধুরী : অধ্যাপক, ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজ, ডেন্টাল ইউনিট







Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Ok