দায়মুক্তির আইনের ফাঁকে বেপরোয়া চিকিৎসক – ডোনেট বাংলাদেশ

দায়মুক্তির আইনের ফাঁকে বেপরোয়া চিকিৎসক

ডেস্ক নিউজ
আপডেটঃ ২১ জানুয়ারি, ২০২৩ | ৮:৫৭ 19 ভিউ
গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার বাসিন্দা অন্তঃসত্ত্বা তানিয়া আক্তার। স্বাভাবিক সন্তান প্রসবে জটিলতা দেখা দেওয়ায় স্থানীয় বেসরকারি ক্লিনিক আমরাইদ জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কর্তৃপক্ষ সিজারিয়ান অপারেশনের পরামর্শ দেয়। চিকিৎসক জাহিদুল ইসলাম আকন্দ ও রেজোয়ান আহমদের সার্জারিতে পুত্রসন্তান জন্ম দিলেও পৃথিবী থেকে বিদায় নেন তানিয়া। তাঁর স্বজনরা ভুল চিকিৎসায় মৃত্যুর অভিযোগ এনে ২০২০ সালে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলে (বিএমডিসি) লিখিত অভিযোগ করেন। সংস্থার তদন্তে ভুল চিকিৎসা প্রমাণিত হওয়ায় দুই চিকিৎসকের নিবন্ধন এক বছর স্থগিত করা হয়। তবে আবারও কর্মস্থলে ফিরেছেন সেই চিকিৎসকরা। এ ছাড়া কুড়িগ্রামের ছয় বছর বয়সী শিশু মারুফা জাহান মাইশা। তার ডান হাতের আঙুল ৯ মাস বয়সে পুড়ে বাঁকা হয়ে

যায়। মাইশার বাবা মোজাফফর হোসেন মেয়ের চিকিৎসার জন্য গত ২৮ নভেম্বর মিরপুর ১১-এর ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে আসেন। ওই হাসপাতালে জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক (সার্জারি) ডা. আহসান হাবীব মাইশার হাতে অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দেন। গত ৩০ নভেম্বর সকালে যাত্রাবাড়ীর আলম মেমোরিয়াল হাসপাতালে মাইশার অস্ত্রোপচার শুরু হয়। হাতের আঙুলে প্রতিস্থাপনের জন্য চামড়া নেওয়া হয়েছে ওই শিশুর পেট থেকে। পরে সকাল সাড়ে ১১টার দিকে ডা. হাবীবের অপারেশন থিয়েটারে তার মৃত্যু হয়। চিকিৎসকদের অবহেলায় ছয় বছর বয়সী মাইশার মৃত্যুর ঘটনায় তিন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন শিশুটির বাবা মোজাফফর হোসেন। তবে চিকিৎসকের বিরুদ্ধে প্রতিকার চেয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও বিএমডিসিতেও যে অভিযোগ জানানো

যায় তা জানেন না তাঁর স্বজনরা। গত পাঁচ বছরে এমন হাজারো চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ভুল চিকিৎসার অভিযোগ উঠলেও বিএমডিসির তদন্তে মাত্র সাতজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়েছে। যাদের শাস্তি শুধু ৬ মাস বা ১ বছরের নিবন্ধন সাময়িকভাবে স্থগিত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিনিয়ত অবহেলা ও ভুল চিকিৎসার অভিযোগ উঠলেও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়া, নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা, আইনে কিছু ত্রুটি থাকায় সরকারি প্রতিষ্ঠান বিএমডিসির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ফলে 'হত্যা'র মতো ঘটনা ঘটিয়েও সহজেই দায়মুক্তি পাচ্ছেন চিকিৎসকরা। স্বাধীনতার পর কত চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বা কত অভিযোগ জমা পড়েছে, সে হিসাব নেই বিএমডিসির কাছে। এমন পরিস্থিতিতে ২০১৬ সালে 'রোগী চিকিৎসক ও প্রতিষ্ঠান সুরক্ষা আইন' তৈরির উদ্যোগ

গ্রহণ করে সরকার। তবে চিকিৎসকদের প্রবল আপত্তি থাকায় এটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে রোগীর সুরক্ষা নিশ্চিতে আইন হচ্ছে। সেখানে জেল-জরিমানার বিধানও থাকছে। আইনটি বাস্তবায়ন হলে কমে আসবে এই পরিস্থিতি। দেশে প্রায়শই চিকিৎসকের অবহেলা বা ভুল চিকিৎসা নিয়ে রোগীর আত্মীয়দের সঙ্গে হাসপাতাল সংশ্নিষ্টদের বাদানুবাদ বা ভাঙচুরের খবর শোনা যায়। তবে এসব অভিযোগের প্রমাণ মিলছে না তদন্তে। বিএমডিসির তথ্য বলছে, গত ৫ বছরে ১০৭টি লিখিত অভিযোগ এসেছে বিএমডিসিতে। এর মধ্যে ৩১টি ঘটনার নিষ্পত্তি হয়েছে। মাঝপথেই অর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে ১৪টি অভিযোগ সমঝোতা হয়েছে। দুই চিকিৎসককে অভিযোগের বিষয়ে জানাতে চিঠি দিলেও উত্তর মেলেনি। মাত্র ৭ অভিযোগের প্রমাণ

পেয়েছে চিকিৎসকদের অভিভাবক এই প্রতিষ্ঠানটি। তবে শাস্তি দেওয়া হয়েছে একেবারেই নগণ্য। এমন বিচারে সরকারি এই প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া গত দুই বছরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে এমন ২০০ অভিযোগ জমা পড়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি ঘটনা তদন্ত করে হাসপাতাল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তবে আইনে উল্লেখ না থাকায় চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেনি সংস্থাটি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিএমডিসি সংশ্নিষ্টরা জানান, চিকিৎসায় ভুল বা অবহেলার অভিযোগ কম। স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত দু'জন চিকিৎসকের নিবন্ধন বাতিল হয়েছে। শৃঙ্খলা কমিটির সভাপতি মাহমুদুর হাসান বলেন, প্রতিটি অভিযোগই গুরুত্ব দেয় বিএমডিসি। অভিযোগ আসার পরই বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। আইন

অনুযায়ী সব অভিযোগ নিষ্পত্তি করা হয়। সংস্থাটির ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার ডা. লিয়াকত হোসেন বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ভুল চিকিৎসার অভিযোগের হার বেড়েছে। একটিমাত্র প্রতিষ্ঠানে সারাদেশ থেকে অভিযোগ আসে। এটি তদন্তে সময় লাগে। অনেক চিকিৎসক বা রোগীর স্বজন শুনানিতে আসতে ও ব্যাখ্যা দিতেও চান না। যে কারণে দেরি হয়। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান বলেন, প্রচলিত আইনে কেউ ভুল চিকিৎসার শিকার হলে সেই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে বিএমডিসিতে অভিযোগ করতে পারেন। তদন্ত করে চিকিৎসকের সনদ স্থগিত বা বাতিল করতে পারেন। কিন্তু সমস্যা হলো, সেখানেও বড় ধরনের অবহেলার বিষয়টি পুরোপুরি পরিস্কার করা হয়নি। তবে চিকিৎসকদের নানা সংগঠন শক্তিশালী হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধেও বড় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় না।

প্রতিকার পেতে হলে আগে ভুল চিকিৎসা বা অবহেলা আদালতে প্রমাণ করতে হবে। কিন্তু একজন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে আরেকজন সেই সাক্ষ্য দিতে চান না। এখানেই বিপত্তি বাধে। এমন হাজারো মামলা চিকিৎসকের সাক্ষ্য গ্রহণের অভাবে ঝুলে আছে। দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠান ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, চিকিৎসক নেতাদের দিয়েই পরিচালিত হচ্ছে বিএমডিসি। যে কারণে 'ভুল বা অবহেলার অভিযোগ প্রমাণ করা খুব কঠিন। রোগীর সুরক্ষা ও চিকিৎসাসেবার গুণগতমান এবং সেবাপ্রাপ্তিতে পরিধি সুদৃষ্টি দেওয়া উচিত। এ জন্য রোগী সুরক্ষা আইন দ্রুত সময়ে বাস্তবায়ন জরুরি। যে কোনো অপরাধের শাস্তি যদি পর্যাপ্ত না হয় তাহলে সেই অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। চিকিৎসায় অবহেলা ও ভুল চিকিৎসাকে

অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে শাস্তির বিধান রাখা উচিত। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক রশীদ-ই-মাহবুব বলেন, বিএমডিসি শুধু নৈতিক প্রশ্ন তোলে। তারা ইচ্ছা করলেই চিকিৎসকের জেল বা জরিমানা করতে পারে না। যদি ভুল চিকিৎসা প্রমাণিত হয় সর্বোচ্চ শাস্তি নিবন্ধন বাতিল। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ৬ মাসের বা এক বছরের জন্য ডাক্তারি নিবন্ধন স্থগিত রাখা হয়। এ ছাড়া অভিযোগ অধিকাংশই প্রমাণ করা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, চিকিৎসকের অদক্ষতা, ভুল বা অবহেলায় রোগীর মৃত্যু হয়। বর্তমান ব্যবস্থায় এর বিচার সাধারণ মানুষ পাচ্ছে না। অন্যদিকে ডাক্তারও পার পেয়ে যাচ্ছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. শামিউল ইসলাম বলেন, চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নেই। অধিদপ্তর হাসপাতালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে।

দৈনিক ডোনেট বাংলাদেশ সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ট্যাগ:

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:


শীর্ষ সংবাদ:
বইয়ে যা নেই তা দিয়ে গুজব ছড়ানো হচ্ছে : শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি নোয়াখালীর গান্ধী আশ্রম পরিদর্শনে ভারতীয় হাই কমিশনার নাটোরে জেলা গুড় তৈরির অপরাধে ৩জনকে জরিমানা ও কারাদন্ড ঠাকুরগাঁওয়ে পঞ্চম শ্রেনীর ছাত্রী ধর্ষন মামলায় যুবক গ্রেফতার।। বুড়িপোতা ইউনিয়নে আইন সহায়তা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত ফতুল্লায় ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার ২ জন মেহেরপুরে ৮০০ বোতল ফেনসিডিল রাখার দায়ে ২ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড গাংনীতে ইজিবাইক ও অবৈধ ইঞ্জিন চালিত লাটা হাম্বারের মুখোমুখি সংঘর্ষে আহত ৬ চাঁপাইনবাবগঞ্জ নাচোল উপজেলায় পালিত হলো বিশ্ব কুষ্ঠ দিবস আগামীকাল রাজশাহী আসছেন শিক্ষামন্ত্রী রাজশাহীতে ২৬ টি উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী নওগাঁর নিয়ামতপুর থেকে হাজারো মানুষ যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর জনসভায়। নওগাঁ জেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি কায়েস, সম্পাদক পদে ছোটন নির্বাচিত। নোয়াখালীতে দেশীয় অস্ত্রসহ কিশোর গ্যাংয়ের ৫ সদস্য গ্রেফতার তরুণরা স্মার্ট বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দেবে উৎপাদনে ফিরছে ॥ রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রধানমন্ত্রীর জনসভায় ৫ থেকে ৭ লাখ মানুষের জনসমাগম হবে : খায়রুজ্জামান লিটন প্রধানমন্ত্রীর জনসভা উপলক্ষ্যে যানবাহন চলাচলে আরএমপি’র নির্দেশনা চাঁপাইনবাবগঞ্জে বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি লাঘব করতে- প্রধান বিচারপতির বার্তা রোজার পণ্য আমদানি ‘বড়দের’ কবজায়