দৃষ্টান্তমূলক লজ্জাদানের ব্যবস্থা চাই – ডোনেট বাংলাদেশ

দৃষ্টান্তমূলক লজ্জাদানের ব্যবস্থা চাই

আশাফা সেলিম : ছড়াকার, সংস্কৃতিকর্মী
আপডেটঃ ১০ জুন, ২০২২ | ১০:৩৪ 35 ভিউ
ব্যবসায় বা পণ্য কেনাবেচায় মুনাফার ক্ষেত্রে একটা নির্ধারিত সর্বোচ্চ সীমা বা মুনাফা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা থাকা উচিত। কোন্ পণ্যে শতকরা সর্বোচ্চ কত টাকা পর্যন্ত মুনাফা করা যাবে, সেটা রাষ্ট্র কর্তৃক নির্ধারিত থাকা দরকার। বেশিরভাগ ব্যবসায়ী মুনাফার মাত্রা, মন চাইলেই অযৌক্তিকভাবে বাড়িয়ে দেন! অতিমাত্রায় মুনাফাটাকে কোনো অপরাধ মনে করেন না! কোনোকিছুর দাম বিশ্ববাজারে ১০ টাকা বাড়লে, তারা হয়তো ৩০/৪০ টাকা বাড়ান! মজুত করে করে বাড়ান। রমজানে বাড়ান। পাইকারি বাজারে প্রতিটি হাঁস/মুরগির ডিম ৯-১০ টাকা। শ্রেণিভেদে সাধারণ হোটেল-রেস্টুরেন্টে একটি ডিম পোচ/মামলেট বিক্রি হচ্ছে ২৫-৫০ টাকায়! ১ কেজি রুই মাছ ৪০০-৫০০ টাকায় কিনে, ১০ টুকরো রান্না করা মাছ বিক্রি করছেন দোকানের স্তরভেদে প্রতি টুকরো ১৫০-৩০০ টাকা!

১৮০ টাকা কেজির ব্রয়লার মুরগি কেজিতে ১০/১২ পিস বানিয়ে প্রতি পিস বেচেন ১০০-২৫০ টাকায়! বিভাগীয় শহরের মাঝারি মানের একটি রেস্তোরাঁয় সম্প্রতি দুপুরে তিনজন খেলাম। মেনু: চিকন চালের ভাত। সঙ্গে তিন/চার ধরনের ভর্তা, শাক, ডাল আর এক পিস করে খাসির মাংস। বিল এলো প্রায় ১৮০০ টাকা (ঢাকার মধ্যমমানের কোনো কোনো রেস্টুরেন্টে এ বিল ৩-৪ হাজার টাকারও বেশি হতে পারে)! এক ব্যবসায়ী বললেন, গত ঈদে তার পাশের দোকানদার নাকি একটি থ্রিপিস বেচেছেন ১২ হাজার ৭০০ টাকায় (কেনা দাম ২৮শ টাকা)! অর্থাৎ, বেচেছেন কেনা দামের প্রায় ৪/৫ গুণ বেশি দামে! সেই দোকানদার বাহাদুর আবার খুব কৃতিত্ব ও গর্বের সঙ্গেই নাকি পাশের দোকানির কাছে গল্পটি করছিলেন।

গ্রাহকরা ‘বেশি চালাক’ বা ‘ঘুসখোর’ হলে নাকি তারা সেই গ্রাহকের কাছে এভাবে বিক্রি করেন। এ গল্পটির সঙ্গে যুক্ত যতগুলো চরিত্র, সবাইকে আমার পিকে হালদার-পাপিয়া-সম্রাট-শাহেদ-জিকে শামীম, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মালেক ড্রাইভার কিংবা প্রশ্নপ্রত্র ফাঁসকারীদের চেয়েও নির্লজ্জ মনে হয়। মনে হয়, এ অপরাধে যুক্ত সবার মুখই নিজ নিজ আয়নায় খুবই বীভৎস ও নির্লজ্জ-অপরাধী দেখাবে! একশ্রেণির ব্যবসায়ী নিয়মিতই ফলমূল, মাছ-মাংস-সবজি ইত্যাদি খাদ্যে ঝুঁকিপূর্ণ মাত্রায় কেমিক্যাল বা বিষ মেশাচ্ছেন! ভেজাল ওষুধ উৎপাদন করছেন! কতটা নির্মম-নির্লজ্জ অপরাধী হলে একজন মানুষ খাদ্যে বা জীবন রক্ষাকারী ওষুধে ভেজাল মেশাতে পারেন! তাদের লাজলজ্জা ভয় থাকলে, সরকারের ভেজালবিরোধী অভিযানে ধরা পড়ে মিডিয়ায় প্রচারের পর তো তারা আর মানুষকে মুখ দেখাতে পারতেন

না। পুরো জাতিকে নীরবে ধ্বংসের মতো অপরাধ প্রমাণের পর, নর্দমার কীট হয়ে যাওয়ার পর স্ত্রী-পুত্র-কন্যা-শ্বশুর-শাশুড়ি-বন্ধুবান্ধব কারও সামনেই তো আর তাদের মুখ দেখানোর মতো মুখ থাকার কথা নয়। কিন্তু থাকে! কারণ, লজ্জাশরম ব্যাপারটি তাদের যেমন নেই, যাদের সামনে মুখ দেখাচ্ছেন, তাদেরও নেই। অথচ, অন্যায়কারী আর বরদাস্তকারী বা প্রশ্রয়দানকারী দুজনই তো সমান অপরাধী! সমান নির্লজ্জ! কবির ভাষায় ‘...অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে/তব ঘৃণা যেন তারে তৃণ সম দহে..’। খাদ্যে বিষ বা ভেজাল যারা মেশাচ্ছেন, তারা তো মঙ্গলগ্রহে গিয়ে এ কাজটি করছেন না; করছেন এ সমাজে বাস করে, সবার চোখের সামনে! অথচ কেউ সেভাবে বাধা দিচ্ছে না! বরং ধীরে ধীরে এ বিষাক্ত

সংস্কৃতি যেন আমাদের গা সওয়া হয়ে গেছে! লজ্জাশরম নামের অনুভূতির রিপুটি হয়তো আমরা কেটেই ফেলে দিয়েছি! সম্প্রতি ভোজ্যতেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য অতিমাত্রায় বেড়ে যাওয়ায় মানুষের নাভিশ্বাস চরমে। তখন কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারী অসাধু ব্যবসায়ীদের/মজুতদারদের বিরুদ্ধে সরকার অভিযান চালায়। অভিযানে ধরা পড়া অসাধু মজুতদারদের ২/৩ লাখ টাকা করে জরিমানাও করা হয়। যদিও অবৈধ মজুতদারির বিরুদ্ধে আইনে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে (অনেকের মতে, সেই বিধানই কার্যকর করা উচিত)। কিন্তু সাম্প্রতিক অভিযানে (এ লেখাকালীন পর্যন্ত) একটি মামলাও করা হয়নি। অভিযানকারীদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছিল ‘মামলা করার কথা ভাবা হচ্ছে’। এ অভিযান মানুষের মনে পুরোটা না হলেও কিছুটা স্বস্তি এনে দিচ্ছিল। কিন্তু এর বিপরীতে দেখা গেল ব্যবসায়ীদের শীর্ষস্থানীয়

সংগঠন থেকে এ অভিযান বন্ধের দাবি জানানো হচ্ছে (একাত্তর টিভি, দুপুর দুইটার সংবাদ, ১৩ মে ২০২২)! দুর্নীতি করতে বিশেষত দুটি বিষয় দরকার-এক. মাত্রাতিরিক্ত/বেমানান লোভ বা যোগ্যতার অধিক চাহিদা; দুই. মানবিক মূল্যবোধহীন চক্ষুলজ্জাশরমহীন অসৎ ও নির্মম মন। এ দুটির কোনো একটির অভাব থাকলে, তার পক্ষে দুর্নীতি বা নির্মমতা করা সহজ নয়। ‘মূল্যবোধের অবক্ষয়’ বা ‘মানবতা-নীতিনৈতিকতার অভাব’ কথাগুলো প্রায়ই শোনা যায়। কিন্তু লজ্জাশরম উন্নয়নের কথা অফিসিয়ালি কেউ তেমন বলেন না। কারণ, তাদের অনেকেরই ধারণা লাজলজ্জাশরম-সততা-সংকোচ-সম্মানবোধ-মূল্যবোধ-বিনয় ও মানবতাবোধ এসবই দরিদ্র বা মধ্যবিত্তের সস্তা সেন্টিমেন্ট বা অসুখ। স্বভাবদোষ! সুযোগের অভাবে খারাপ হতে না পারার আফসোসসমৃদ্ধ সান্ত্বনা। ধনী বা অতিদরিদ্র শ্রেণির মানুষের মধ্যে কিন্তু এসব ‘স্বভাবদোষ’ নেই। ধনীরা

তো দরিদ্র আর নিম্নমধ্যবিত্তের কাছ থেকে তেমন কিছুই নেন না, শুধু বিনামূল্যে অথবা স্বল্পমূল্যে শ্রম নেওয়া ছাড়া! তাই একটা অনুরোধ-অনুগ্রহ করে তারা এ কয়েকটা জিনিসও (লাজলজ্জাশরম-সততা-সংকোচ-সম্মানবোধ-মূল্যবোধ-বিনয় ও নীতিনৈতিকতা এবং মানবতাবোধ) নিন। বিনামূল্যেই নিন। তাহলে অন্তত কিছু অপরাধ সমাজ থেকে দূর হবে, এটি বলা যায়। তাই দুর্নীতিসহ অন্যান্য অপরাধ কমানোর পরীক্ষামূলক পদ্ধতি হিসাবে ‘লজ্জাশরম উন্নয়ন প্রকল্পটি হাতে নেওয়া যেতে পারে। এ প্রকল্পের লক্ষ্যভুক্ত জনগোষ্ঠী হবে সারা দেশের সব মানুষ। একদম ভ্রূণ পর্যায় থেকে শুরু করে বয়োবৃদ্ধ শ্রেণির সবাই। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর অনেক প্রকল্পের মধ্যে দুটি প্রকল্পের নাম ‘আর্লি চাইল্ডহুড ডেভেলপমেন্ট (ইসিডি)’, ও ‘আর্লি চাইল্ডহুড কেয়ার অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ইসিসিডি)’। এ প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর

একটি নেটওয়ার্কও রয়েছে। নেটওয়ার্কটির নাম ‘বাংলাদেশ ইসিডি নেটওয়ার্ক (বিইএন)’। সরকার ২০১৬ সালে এ কর্মসূচির অনুমোদনও দিয়েছে। অনেকটা ইসিসিডি কার্যক্রমের আদলে এ প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু করতে হবে পরিবার থেকে। একটি শিশু মায়ের পেটে থাকতেই, একদম ভ্রূণ পর্যায় থেকেই বাবা-মা শিশুটির কানে পৌঁছে দেবে আদর্শ মানুষ হয়ে গড়ে ওঠার বার্তা। মানুষ কেন নির্লজ্জ অর্থলোভী ও নির্মম হয়, কীভাবে এসব প্রবণতা কমিয়ে আনা সম্ভব, সব ক্লাসের জন্য (প্লে গ্রুপ-বিশ্ববিদ্যালয়) এসব বিষয়ে সহজ ভাষায় পাঠ লিখে তা অবশ্যপাঠ হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সরকার এ ব্যাপারে সংসদে বিল উত্থাপন ও পাশ করবে। সারা দেশে এ প্রকল্প কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে দুদকের চেয়েও শক্তিশালী মনিটরিং টিম থাকবে। সেই টিমের সদস্যরা হবেন সমাজের সর্বমহলে মোটামুটি গ্রহণযোগ্য সুশিক্ষিত মানুষ। বয়স পঞ্চাশের ওপরে। সামাজিক বা আইনগত অপরাধমুক্ত ব্যক্তি হিসাবে কমপক্ষে ৩০ বছরের ট্র্যাক রেকর্ড থাকতে হবে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোকেও এ বিষয়ে কার্যক্রম/প্রকল্প হাতে নিতে হবে। সরকারি-বেসরকারি সব গণমাধ্যমে (প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক) এ বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টিমূলক বার্তা আবশ্যিকভাবে, নিয়মিত পুনঃপুনঃ প্রচার করতে হবে। একই বার্তা বিটিআরসির উদ্যোগে সব মোবাইল অপারেটরের মাধ্যমে সারা দেশে পৌঁছাতে হবে। সম্ভাব্য সব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিশেষ পেজ খুলে (ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম, লিংকড-ইন ও ইউটিউবে), সেই পেজের মাধ্যমে সারা দেশে ব্যাপকভাবে পুনঃপুনঃ প্রচারের ব্যবস্থা নিতে হবে। এ কার্যক্রমে সব ধর্মীয় উপাসনালয়ের ইমাম/ঠাকুর/ফাদার/পুরোহিত/ভিক্ষুদের যুক্ত করতে হবে। তারা তাদের নিজ নিজ ধর্মীয় আলোচনায় এ বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টিমূলক বক্তব্য রাখবেন। সংসদীয় কমিটি গঠনের মাধ্যমে এমপিদের এ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। সংস্কৃতিকর্মী ও জনপ্রতিনিধিদের যুক্ত করতে হবে। নির্লজ্জতা ও অপরাধমুক্তদের জন্য পুরস্কার এবং নির্লজ্জ-অপরাধীদের জন্য সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে অভিনব কায়দায় দৃষ্টান্তমূলক লজ্জাদানের ব্যবস্থা চালু করতে হবে। কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড, এমনকি মৃত্যুদণ্ডও অপরাধ দমনে অনেক ক্ষেত্রে ব্যর্থ হচ্ছে! এবার ‘লজ্জাদণ্ড’ চালু করে দেখা যেতে পারে। অপরাধপ্রবণতা কিছুটা কমলেও কমতে পারে। লজ্জাদণ্ডের রূপরেখা নিয়ে পরবর্তী সময়ে লেখার ইচ্ছা রইল। ashafa.salim@gmail.com

দৈনিক ডোনেট বাংলাদেশ সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ট্যাগ:

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:


শীর্ষ সংবাদ:
টেক্সাসে লরি থেকে ৪৬ জনের মরদেহ উদ্ধার ফিলিপাইনে নোবেল জয়ী সাংবাদিক মারিয়া রেসার নিউজ সাইট বন্ধের নির্দেশ ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন বহুদূর বন্যা : বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাসে ফের শঙ্কা তবু থামছে না দামের ঘোড়া সুইডেন এবং ফিনল্যান্ডের ন্যাটোর সদস্যপদ পেতে সমর্থন দেবে তুরস্ক ক্ষোভে ফুঁসছে সারাদেশ শিক্ষক হেনস্তা ও হত্যা আইএমএফ থেকে ঋণ নিতে চাচ্ছে সরকার বুস্টার ডোজে গতি নেই সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী জাতিসংঘের মহাসাগর সম্মেলনে বাংলাদেশ করোনার সামাজিক সংক্রমণের শঙ্কা পুতিনকে জিততে দেবে না জি-৭ রাশিয়ার হামলায় সেভেরোদনেৎস্কের পর এবার পতনের মুখে লিসিচানস্ক সেন্সরে যাচ্ছে ‘পদ্মার বুকে স্বপ্নের সেতু’ ‘কীর্তিনাশার বুকে অমর কীর্তি’ সিলেটে বন্যার্তদের পাশে বিজিবি সদস্যরা স্বামীকে ছক্কা মারলেন পাকিস্তানের তারকা চরমপন্থা ঠেকাতে বাংলাদেশে স্থানীয় বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দিয়েছে ফেসবুক যেসব কারণে পেপটিক আলসার হয়, চিকিৎসা কলারোয়া পৌর প্রেসক্লাবের কমিটি গঠনঃ সভাপতি ইমরান, সম্পাদক জুলফিকার নির্বাচিত রাণীশংকৈলে​​​​​​​ মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার রোধকল্পে কর্মশালা অনুষ্ঠিত