নগর নদীর মতো স্মৃতিময় জনপদ রজত কান্তি রায় - ডোনেট বাংলাদেশ

এই মাসের শুরুর দিকে এক রাতে অফিস থেকে ফার্মগেট দিয়ে বাসায় ফিরতে হয়েছিল এক বন্ধুর সঙ্গে। অনেক দিন যাওয়া হয় না সেদিকে। স্মৃতিতে ছিল, ফার্মগেট মানে আনন্দ সিনেমা হল, রাজধানীর ব্যস্ততম ফুটওভারব্রিজ, সুপার মার্কেট, সেদ্ধ ডিম, ঝালবাদাম, বাইছা লন ১০০ টাকার দোকানদার, চা-অলা, ইমিটেশনের গয়না বিক্রেতা, বিচিত্র পদের ভিক্ষুক, পকেটমার, রিকশা আর লেগুনাঅলা, ট্রাফিক পুলিশ, বাসের ভিড়, গিজগিজে মানুষ, নগরবধূ ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু তেজগাঁও ট্রাক স্ট্যান্ডের পাশ দিয়ে ফার্মগেটে পৌঁছানোর পর এক বিশাল ধাক্কা খেতে হলো। সঙ্গে থাকা বন্ধু বললেন, ‘আরে, ওভারব্রিজ তো নাই!’ তাকিয়ে দেখি তার একদিক ভেঙে ফেলা হয়েছে।

অন্যদিক ভাঙার তোড়জোড় চলছে। যে অংশ তখনো ভাঙা হয়নি, সেই অংশ দিয়ে ওভারব্রিজে উঠে গেলাম অভ্যস্ত পায়ে। সেই চিরচেনা দৃশ্য। লেবু বিক্রেতা, ওজন মাপার মেশিন নিয়ে বসে থাকা কিশোর ও বৃদ্ধ, ভিক্ষুক, টুকরিতে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে থাকা সস্তার মানুষ। একদিকে চড়া মেকআপে বসে থাকা এক নারীকে গান শোনাচ্ছেন ভ্রুক্ষেপহীন ক্লিন শেভড এক যুবক। দূরে ঘরহীন ভিক্ষুকের ঘুমানোর আয়োজন। দেখে নিই সব। দেখে নিই, কারণ ওভারব্রিজটা থাকবে না। থাকবে না শহুরে জীবনের এই বিচিত্র আয়োজন। আমরা ধীরে ধীরে হাঁটতে থাকি আমাদের স্মৃতি ভাগাভাগি করে নিতে নিতে। সুপার মার্কেটের দিকে নেমে গিয়ে একবার ফিরে তাকাই। সত্যি থাকবে না?

না। থাকার কোনো অবকাশ নেই বুড়ো হয়ে যাওয়া ওভারব্রিজটির। মেট্রোরেলের কাঠামো বিরাট অজগরের মতো আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে তাকে। আশির দশকে গড়ে ওঠা এ ওভারব্রিজটি দুমড়েমুচড়ে যাওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র।

সেই ঘটনার দিন দশেক পর ইচ্ছা করেই ফার্মগেট দিয়ে অফিসের পথে চললাম। উদ্দেশ্য, আলোকিত দিনে খয়েরি রঙের ওভারব্রিজহীন ফার্মগেট দেখতে কেমন লাগে, সেই ধারণা নেওয়া। চুল ছাড়া বনলতা সেনকে দেখে যেমন কষ্ট হতো জীবনানন্দের, ওভারব্রিজ ছাড়া ফার্মগেট দেখে তেমনি কষ্ট হলো। কিছু ছবি তুলে রাখলাম। কিছু ভিডিও। থাক। বেঁচে থাকলে হেমন্তের কোনো বিষণ্ন দুপুরে ছবি আর ভিডিও দেখে খানিক চড়িয়ে নেওয়া যাবে স্মৃতির পারদ। ছবি আর ভিডিওর ফ্রেমে নিজেদের অজান্তে ধরা পড়া মানুষগুলোর দাবিদার তো কেউ থাকবে না। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে স্বগত বলা যাবে, কেমন আছ ফার্মগেট?

এই শহর গত দেড় দশকে আমাদের কতখানি স্মৃতিময় করে রেখেছে, সে হিসাব করেছিলাম সেদিন বন্ধুর সঙ্গে। মন্দ নয়। সেই কবেকার ভিস্তিঅলা বইয়ের পাতা থেকে উঠে এসে কথা বলে আমাদের সঙ্গে। চামড়ার ভিস্তিতে করে পানি বহন ছিল তাদের পেশা। শোনা যায়, এখন যেখানে জাদুঘর সেই শাহবাগে একসময় চরে বেড়াত হরিণ। হাতিরঝিলের বুকের ভেতর ঢুকে যাওয়া বেগুনবাড়িতে নাকি চা-চাষ করেছিলেন ঢাকার নবাবেরা। পেয়েছিলেন আড়াই মণ চা। বলাকা সিনেমার সামনে ছিল ধানখেত, এক বিখ্যাত শিল্পী এঁকেছিলেন সেই ছবি। মিরপুর গড়ে উঠেছে অনেকের চোখের সামনে। পুরান ঢাকার গণ্ডি পেরিয়ে বাড়তে বাড়তে শহর গেছে গুলশান ছাড়িয়ে উত্তরা। সচল ট্রাফিক লাইট খুব একটা সচল নয় এখন। পুলিশকে হাত দেখিয়ে পার করতে হয় গাড়ি-ঘোড়া। এ শহরে একসময় ভলভোর দোতলা বাস চলত। দোতলা বাসের কথা উঠলে এখনো মানুষ সেগুলোর কথা বলে। একসময় ছিল টিকিট কেটে বাসে ওঠার লাইন। উধাও। এখন টিকিট চেকার বাসে উঠে যাত্রী গোনেন। একসময় চা খেতে গেলে ফ্রিতে পাওয়া যেত পানি। এখন প্রতি গ্লাস ১-২ টাকা। পাড়া-মহল্লার সেলুনে উচ্চ শব্দে পুরোনো দিনের হিন্দিগান বাজত একসময়। এক কাপ চা নিয়ে দীর্ঘক্ষণ আড্ডা মারার ট্রেডমার্ক খাবারের পুরোনো দোকানগুলো প্রায় সব উঠে গেছে। ইট বিছানো রাস্তা চকচকে কালো পিচের কার্পেটে মসৃণ হয়েছে। সিনেমা হলগুলো হয়েছে শপিং মল। উড়ালসেতুর পর এখন মেট্রোরেলের বিশাল বপুর কাঠামো ধরা পড়ছে চোখে। দুদিন পরেই দ্রুতগতির ট্রেন চলবে তার ওপর। শহর হবে আরও গতিময়। নিউরনে রিনঝিন করে উঠবে নতুন স্মৃতি।

এই বিবিধ বিস্তৃত জিনিসগুলো নিয়েই শহর ঢাকা। নিরন্তর বয়ে চলা নগরজীবনে এগুলোই স্মৃতি তৈরি করে বাঁচিয়ে রাখে ঝিম ধরা নাগরিকদের। নগর নদীর মতো স্মৃতিময় জনপদ। নদীর মতো নগরেও চলতে থাকে ভাঙাগড়ার খেলা। আর নাগরিকদের মনে তৈরি হয় বিবিধ স্মৃতি। গত দেড় দশকের বিভিন্ন ঘটনা আমাদের মনে নাড়া দিয়ে গেছে। তৈরি করেছে স্থায়ী কিংবা অস্থায়ী স্মৃতি। কিছু মলিন হয়ে গেছে সময়ের প্রবাহে। কিছু এখনো তাজা। কিছু স্মৃতি ক্ষত তৈরি করেছে আর কিছু রঙিন। স্মৃতি যেমনই হোক না কেন, ক্ষণে ক্ষণে যে ঝিলিক দিয়ে উঠবে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

এই মাসের শুরুর দিকে এক রাতে অফিস থেকে ফার্মগেট দিয়ে বাসায় ফিরতে হয়েছিল এক বন্ধুর সঙ্গে। অনেক দিন যাওয়া হয় না সেদিকে। স্মৃতিতে ছিল, ফার্মগেট মানে আনন্দ সিনেমা হল, রাজধানীর ব্যস্ততম ফুটওভারব্রিজ, সুপার মার্কেট, সেদ্ধ ডিম, ঝালবাদাম, বাইছা লন ১০০ টাকার দোকানদার, চা-অলা, ইমিটেশনের গয়না বিক্রেতা, বিচিত্র পদের ভিক্ষুক, পকেটমার, রিকশা আর লেগুনাঅলা, ট্রাফিক পুলিশ, বাসের ভিড়, গিজগিজে মানুষ, নগরবধূ ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু তেজগাঁও ট্রাক স্ট্যান্ডের পাশ দিয়ে ফার্মগেটে পৌঁছানোর পর এক বিশাল ধাক্কা খেতে হলো। সঙ্গে থাকা বন্ধু বললেন, ‘আরে, ওভারব্রিজ তো নাই!’ তাকিয়ে দেখি তার একদিক ভেঙে ফেলা হয়েছে।

অন্যদিক ভাঙার তোড়জোড় চলছে। যে অংশ তখনো ভাঙা হয়নি, সেই অংশ দিয়ে ওভারব্রিজে উঠে গেলাম অভ্যস্ত পায়ে। সেই চিরচেনা দৃশ্য। লেবু বিক্রেতা, ওজন মাপার মেশিন নিয়ে বসে থাকা কিশোর ও বৃদ্ধ, ভিক্ষুক, টুকরিতে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে থাকা সস্তার মানুষ। একদিকে চড়া মেকআপে বসে থাকা এক নারীকে গান শোনাচ্ছেন ভ্রুক্ষেপহীন ক্লিন শেভড এক যুবক। দূরে ঘরহীন ভিক্ষুকের ঘুমানোর আয়োজন। দেখে নিই সব। দেখে নিই, কারণ ওভারব্রিজটা থাকবে না। থাকবে না শহুরে জীবনের এই বিচিত্র আয়োজন। আমরা ধীরে ধীরে হাঁটতে থাকি আমাদের স্মৃতি ভাগাভাগি করে নিতে নিতে। সুপার মার্কেটের দিকে নেমে গিয়ে একবার ফিরে তাকাই। সত্যি থাকবে না?

না। থাকার কোনো অবকাশ নেই বুড়ো হয়ে যাওয়া ওভারব্রিজটির। মেট্রোরেলের কাঠামো বিরাট অজগরের মতো আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে তাকে। আশির দশকে গড়ে ওঠা এ ওভারব্রিজটি দুমড়েমুচড়ে যাওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র।

সেই ঘটনার দিন দশেক পর ইচ্ছা করেই ফার্মগেট দিয়ে অফিসের পথে চললাম। উদ্দেশ্য, আলোকিত দিনে খয়েরি রঙের ওভারব্রিজহীন ফার্মগেট দেখতে কেমন লাগে, সেই ধারণা নেওয়া। চুল ছাড়া বনলতা সেনকে দেখে যেমন কষ্ট হতো জীবনানন্দের, ওভারব্রিজ ছাড়া ফার্মগেট দেখে তেমনি কষ্ট হলো। কিছু ছবি তুলে রাখলাম। কিছু ভিডিও। থাক। বেঁচে থাকলে হেমন্তের কোনো বিষণ্ন দুপুরে ছবি আর ভিডিও দেখে খানিক চড়িয়ে নেওয়া যাবে স্মৃতির পারদ। ছবি আর ভিডিওর ফ্রেমে নিজেদের অজান্তে ধরা পড়া মানুষগুলোর দাবিদার তো কেউ থাকবে না। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে স্বগত বলা যাবে, কেমন আছ ফার্মগেট?

এই শহর গত দেড় দশকে আমাদের কতখানি স্মৃতিময় করে রেখেছে, সে হিসাব করেছিলাম সেদিন বন্ধুর সঙ্গে। মন্দ নয়। সেই কবেকার ভিস্তিঅলা বইয়ের পাতা থেকে উঠে এসে কথা বলে আমাদের সঙ্গে। চামড়ার ভিস্তিতে করে পানি বহন ছিল তাদের পেশা। শোনা যায়, এখন যেখানে জাদুঘর সেই শাহবাগে একসময় চরে বেড়াত হরিণ। হাতিরঝিলের বুকের ভেতর ঢুকে যাওয়া বেগুনবাড়িতে নাকি চা-চাষ করেছিলেন ঢাকার নবাবেরা। পেয়েছিলেন আড়াই মণ চা। বলাকা সিনেমার সামনে ছিল ধানখেত, এক বিখ্যাত শিল্পী এঁকেছিলেন সেই ছবি। মিরপুর গড়ে উঠেছে অনেকের চোখের সামনে। পুরান ঢাকার গণ্ডি পেরিয়ে বাড়তে বাড়তে শহর গেছে গুলশান ছাড়িয়ে উত্তরা। সচল ট্রাফিক লাইট খুব একটা সচল নয় এখন। পুলিশকে হাত দেখিয়ে পার করতে হয় গাড়ি-ঘোড়া। এ শহরে একসময় ভলভোর দোতলা বাস চলত। দোতলা বাসের কথা উঠলে এখনো মানুষ সেগুলোর কথা বলে। একসময় ছিল টিকিট কেটে বাসে ওঠার লাইন। উধাও। এখন টিকিট চেকার বাসে উঠে যাত্রী গোনেন। একসময় চা খেতে গেলে ফ্রিতে পাওয়া যেত পানি। এখন প্রতি গ্লাস ১-২ টাকা। পাড়া-মহল্লার সেলুনে উচ্চ শব্দে পুরোনো দিনের হিন্দিগান বাজত একসময়। এক কাপ চা নিয়ে দীর্ঘক্ষণ আড্ডা মারার ট্রেডমার্ক খাবারের পুরোনো দোকানগুলো প্রায় সব উঠে গেছে। ইট বিছানো রাস্তা চকচকে কালো পিচের কার্পেটে মসৃণ হয়েছে। সিনেমা হলগুলো হয়েছে শপিং মল। উড়ালসেতুর পর এখন মেট্রোরেলের বিশাল বপুর কাঠামো ধরা পড়ছে চোখে। দুদিন পরেই দ্রুতগতির ট্রেন চলবে তার ওপর। শহর হবে আরও গতিময়। নিউরনে রিনঝিন করে উঠবে নতুন স্মৃতি।

এই বিবিধ বিস্তৃত জিনিসগুলো নিয়েই শহর ঢাকা। নিরন্তর বয়ে চলা নগরজীবনে এগুলোই স্মৃতি তৈরি করে বাঁচিয়ে রাখে ঝিম ধরা নাগরিকদের। নগর নদীর মতো স্মৃতিময় জনপদ। নদীর মতো নগরেও চলতে থাকে ভাঙাগড়ার খেলা। আর নাগরিকদের মনে তৈরি হয় বিবিধ স্মৃতি। গত দেড় দশকের বিভিন্ন ঘটনা আমাদের মনে নাড়া দিয়ে গেছে। তৈরি করেছে স্থায়ী কিংবা অস্থায়ী স্মৃতি। কিছু মলিন হয়ে গেছে সময়ের প্রবাহে। কিছু এখনো তাজা। কিছু স্মৃতি ক্ষত তৈরি করেছে আর কিছু রঙিন। স্মৃতি যেমনই হোক না কেন, ক্ষণে ক্ষণে যে ঝিলিক দিয়ে উঠবে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

নগর নদীর মতো স্মৃতিময় জনপদ রজত কান্তি রায়

রজত কান্তি রায়
আপডেটঃ ১৮ নভেম্বর, ২০২১ | ৮:২৬ 46 ভিউ
এই মাসের শুরুর দিকে এক রাতে অফিস থেকে ফার্মগেট দিয়ে বাসায় ফিরতে হয়েছিল এক বন্ধুর সঙ্গে। অনেক দিন যাওয়া হয় না সেদিকে। স্মৃতিতে ছিল, ফার্মগেট মানে আনন্দ সিনেমা হল, রাজধানীর ব্যস্ততম ফুটওভারব্রিজ, সুপার মার্কেট, সেদ্ধ ডিম, ঝালবাদাম, বাইছা লন ১০০ টাকার দোকানদার, চা-অলা, ইমিটেশনের গয়না বিক্রেতা, বিচিত্র পদের ভিক্ষুক, পকেটমার, রিকশা আর লেগুনাঅলা, ট্রাফিক পুলিশ, বাসের ভিড়, গিজগিজে মানুষ, নগরবধূ ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু তেজগাঁও ট্রাক স্ট্যান্ডের পাশ দিয়ে ফার্মগেটে পৌঁছানোর পর এক বিশাল ধাক্কা খেতে হলো। সঙ্গে থাকা বন্ধু বললেন, ‘আরে, ওভারব্রিজ তো নাই!’ তাকিয়ে দেখি তার একদিক ভেঙে ফেলা হয়েছে। অন্যদিক ভাঙার তোড়জোড় চলছে। যে অংশ তখনো ভাঙা হয়নি, সেই অংশ দিয়ে ওভারব্রিজে উঠে গেলাম অভ্যস্ত পায়ে। সেই চিরচেনা দৃশ্য। লেবু বিক্রেতা, ওজন মাপার মেশিন নিয়ে বসে থাকা কিশোর ও বৃদ্ধ, ভিক্ষুক, টুকরিতে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে থাকা সস্তার মানুষ। একদিকে চড়া মেকআপে বসে থাকা এক নারীকে গান শোনাচ্ছেন ভ্রুক্ষেপহীন ক্লিন শেভড এক যুবক। দূরে ঘরহীন ভিক্ষুকের ঘুমানোর আয়োজন। দেখে নিই সব। দেখে নিই, কারণ ওভারব্রিজটা থাকবে না। থাকবে না শহুরে জীবনের এই বিচিত্র আয়োজন। আমরা ধীরে ধীরে হাঁটতে থাকি আমাদের স্মৃতি ভাগাভাগি করে নিতে নিতে। সুপার মার্কেটের দিকে নেমে গিয়ে একবার ফিরে তাকাই। সত্যি থাকবে না? না। থাকার কোনো অবকাশ নেই বুড়ো হয়ে যাওয়া ওভারব্রিজটির। মেট্রোরেলের কাঠামো বিরাট অজগরের মতো আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে তাকে। আশির দশকে গড়ে ওঠা এ ওভারব্রিজটি দুমড়েমুচড়ে যাওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। সেই ঘটনার দিন দশেক পর ইচ্ছা করেই ফার্মগেট দিয়ে অফিসের পথে চললাম। উদ্দেশ্য, আলোকিত দিনে খয়েরি রঙের ওভারব্রিজহীন ফার্মগেট দেখতে কেমন লাগে, সেই ধারণা নেওয়া। চুল ছাড়া বনলতা সেনকে দেখে যেমন কষ্ট হতো জীবনানন্দের, ওভারব্রিজ ছাড়া ফার্মগেট দেখে তেমনি কষ্ট হলো। কিছু ছবি তুলে রাখলাম। কিছু ভিডিও। থাক। বেঁচে থাকলে হেমন্তের কোনো বিষণ্ন দুপুরে ছবি আর ভিডিও দেখে খানিক চড়িয়ে নেওয়া যাবে স্মৃতির পারদ। ছবি আর ভিডিওর ফ্রেমে নিজেদের অজান্তে ধরা পড়া মানুষগুলোর দাবিদার তো কেউ থাকবে না। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে স্বগত বলা যাবে, কেমন আছ ফার্মগেট? এই শহর গত দেড় দশকে আমাদের কতখানি স্মৃতিময় করে রেখেছে, সে হিসাব করেছিলাম সেদিন বন্ধুর সঙ্গে। মন্দ নয়। সেই কবেকার ভিস্তিঅলা বইয়ের পাতা থেকে উঠে এসে কথা বলে আমাদের সঙ্গে। চামড়ার ভিস্তিতে করে পানি বহন ছিল তাদের পেশা। শোনা যায়, এখন যেখানে জাদুঘর সেই শাহবাগে একসময় চরে বেড়াত হরিণ। হাতিরঝিলের বুকের ভেতর ঢুকে যাওয়া বেগুনবাড়িতে নাকি চা-চাষ করেছিলেন ঢাকার নবাবেরা। পেয়েছিলেন আড়াই মণ চা। বলাকা সিনেমার সামনে ছিল ধানখেত, এক বিখ্যাত শিল্পী এঁকেছিলেন সেই ছবি। মিরপুর গড়ে উঠেছে অনেকের চোখের সামনে। পুরান ঢাকার গণ্ডি পেরিয়ে বাড়তে বাড়তে শহর গেছে গুলশান ছাড়িয়ে উত্তরা। সচল ট্রাফিক লাইট খুব একটা সচল নয় এখন। পুলিশকে হাত দেখিয়ে পার করতে হয় গাড়ি-ঘোড়া। এ শহরে একসময় ভলভোর দোতলা বাস চলত। দোতলা বাসের কথা উঠলে এখনো মানুষ সেগুলোর কথা বলে। একসময় ছিল টিকিট কেটে বাসে ওঠার লাইন। উধাও। এখন টিকিট চেকার বাসে উঠে যাত্রী গোনেন। একসময় চা খেতে গেলে ফ্রিতে পাওয়া যেত পানি। এখন প্রতি গ্লাস ১-২ টাকা। পাড়া-মহল্লার সেলুনে উচ্চ শব্দে পুরোনো দিনের হিন্দিগান বাজত একসময়। এক কাপ চা নিয়ে দীর্ঘক্ষণ আড্ডা মারার ট্রেডমার্ক খাবারের পুরোনো দোকানগুলো প্রায় সব উঠে গেছে। ইট বিছানো রাস্তা চকচকে কালো পিচের কার্পেটে মসৃণ হয়েছে। সিনেমা হলগুলো হয়েছে শপিং মল। উড়ালসেতুর পর এখন মেট্রোরেলের বিশাল বপুর কাঠামো ধরা পড়ছে চোখে। দুদিন পরেই দ্রুতগতির ট্রেন চলবে তার ওপর। শহর হবে আরও গতিময়। নিউরনে রিনঝিন করে উঠবে নতুন স্মৃতি। এই বিবিধ বিস্তৃত জিনিসগুলো নিয়েই শহর ঢাকা। নিরন্তর বয়ে চলা নগরজীবনে এগুলোই স্মৃতি তৈরি করে বাঁচিয়ে রাখে ঝিম ধরা নাগরিকদের। নগর নদীর মতো স্মৃতিময় জনপদ। নদীর মতো নগরেও চলতে থাকে ভাঙাগড়ার খেলা। আর নাগরিকদের মনে তৈরি হয় বিবিধ স্মৃতি। গত দেড় দশকের বিভিন্ন ঘটনা আমাদের মনে নাড়া দিয়ে গেছে। তৈরি করেছে স্থায়ী কিংবা অস্থায়ী স্মৃতি। কিছু মলিন হয়ে গেছে সময়ের প্রবাহে। কিছু এখনো তাজা। কিছু স্মৃতি ক্ষত তৈরি করেছে আর কিছু রঙিন। স্মৃতি যেমনই হোক না কেন, ক্ষণে ক্ষণে যে ঝিলিক দিয়ে উঠবে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

দৈনিক ডোনেট বাংলাদেশ সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ট্যাগ:

সংশ্লিষ্ট সংবাদ: