নারীদের শত্রু সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা – ডোনেট বাংলাদেশ

নারীদের শত্রু সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
আপডেটঃ ১৮ নভেম্বর, ২০২১ | ৮:২৩ 285 ভিউ
নাটকে-উপন্যাসে, প্রবচনে, কথোপকথনে, আমরা অনেক সময় উল্লেখ পাই, নারীর শত্রু নারী নিজে। এই ধারণার সামাজিক ভিত্তি আছে। সেটা হলো এই—নারীদের নিজেদের মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি দেখা যায়। শাশুড়ি ঘরের বউয়ের প্রতি বিরূপ আচরণ করেন। ঘরের বউও শাশুড়িকে পছন্দ করেন না। এখন অবশ্য পরিবারগুলো আর আগের মতো নেই; ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র হয়ে গেছে, নারীরা কর্মক্ষেত্রে চলে এসেছেন। কর্মক্ষেত্রে নারীরা একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে কথা বলেন। বোনে-বোনে ঝগড়া হয়। কিন্তু এই যে ধারণা, নারীরাই নারীদের শত্রু, সেটা অবশ্যই ভ্রান্ত। কেবল ভ্রান্ত নয়, ক্ষতিকরও। আরও যেটা আপত্তিকর সেটা হলো, আসল শত্রুকে আড়ালে রাখা। নির্মম সত্য হলো এই যে, নারীদের সঙ্গে শত্রুতা করে গোটা সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা। সমাজে যখন

সামন্তবাদী ব্যবস্থা ছিল, তখনো নারী ওই ব্যবস্থার দ্বারা নির্যাতিত হতেন। এখন যখন পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় আমরা পৌঁছে গেছি, তখনো নারী নির্যাতিত হচ্ছেন। শাশুড়ি ও গৃহবধূ উভয়ই ব্যবস্থার শিকার। কিন্তু বিক্ষোভ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে না নিয়ে চলে যাচ্ছে পরস্পরের বিরুদ্ধে। পরিসংখ্যান বলে, শতকরা ৮০ জন নারী নির্যাতিত হচ্ছেন। এই নির্যাতন গৃহে, কর্মক্ষেত্রে, পথেঘাটে—সর্বত্রই ঘটে। যেখানে সরাসরি নির্যাতন নেই, সেখানেও বৈষম্য আছে। নারীরা এখন বিপুল সংখ্যায় কর্মক্ষেত্রে নিয়োজিত। তাঁদের উপস্থিতি সর্বত্রই লক্ষ করার মতো। কিন্তু তাঁদের বেতন ও মজুরির ব্যাপারে নারী-পুরুষের পার্থক্য বেশ স্পষ্ট। তদুপরি একজন কর্মনিযুক্ত নারীকে ঘরের সাংসারিক-পারিবারিক কাজ করতে হয়। পুরুষের তুলনায় এ কাজের পরিমাণ অধিক। কিন্তু এই গৃহকর্মকে যতই আদর্শায়িতই করা

হোক না কেন, এটা ভয়ানকভাবে একঘেয়ে ও ক্লান্তিকর। কিন্তু এই যে প্রতিদিনের কাজ, এর কোনো মূল্যায়ন করা হয় না। অধিক মূল্যায়নের তো প্রশ্নই ওঠে না। পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যায়নও নেই। কেউ বলবে না যে বাংলাদেশের মানুষ এখন ভালো অবস্থায় আছে। কিন্তু এই খারাপ অবস্থার ভেতর নারীদের অবস্থা আরও খারাপ। এর কারণ নারী দুর্বল। আমাদের এই নিপীড়নমূলক সমাজের নিয়মই এই যে প্রবল দুর্বলের ওপর অত্যাচার করবে। নারী মোটেই দুর্বল নন। তাঁকে দুর্বল করে রাখা হয়। সন্তানের জন্মদান ও প্রতিপালনের ক্ষেত্রে নারীদের যে ভূমিকা, তা পুরুষের পক্ষে সম্ভব নয়। সেবা ও চিকিৎসাক্ষেত্রে নারীরা সব সময় দক্ষতা প্রদর্শন করে আসছেন। শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁরা পুরুষের সঙ্গে

কেবল প্রতিযোগিতা করেন তা-ই নয়, অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা পুরুষের চেয়ে ভালো ফল করেন। অনেক কঠিন কাজ নারীরা করছেন। তাঁরা কারখানায় আছেন, পোশাকশিল্পে নারীরাই অধিক। সামরিক বাহিনীতে, পুলিশ বাহিনীতে, প্রশাসনে, বিচার বিভাগে, গণমাধ্যমে তাঁরা দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছেন। কিন্তু তাঁদের হয়রানির শিকার হতে হয় এবং সামাজিকভাবেও হেয় বিবেচনা করার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। পুঁজিবাদী সমাজ নিজেকে গণতান্ত্রিক বলে দাবি করে। কিন্তু এই ব্যবস্থা পুরোপুরি পিতৃতান্ত্রিক। নারীকে সে যতটা পারে দুর্বল করে রাখতে চায়। এটাই তার স্বভাব। এ দেশে মানুষের নিরাপত্তার ভীষণ অভাব। কিন্তু এর মধ্যে নারীরা বিশেষভাবে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। প্রতারণা, যৌন হয়রানি, লাঞ্ছনা ইত্যাদি নিত্যকারের বাধা। পথেঘাটে বখাটে যুবকেরা উৎপাত করে। নারী ধর্ষণ

আগেও ছিল। কিন্তু এখন সেটা মাত্রায় অনেক বেড়েছে। গণধর্ষণ আমাদের দেশে অপরিচিত ছিল। সেটাও চলছে। নারীরা পাচার হয়ে যাচ্ছেন। নারী নির্যাতনে এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও অভিযুক্ত হচ্ছেন। অসহায় নারীরা আত্মহত্যা করছেন। ধর্মীয় মৌলবাদীরা নারীর মানবিক অধিকারগুলোকে স্বীকৃতি দিতে কুণ্ঠা প্রকাশ করে। যৌতুকের জন্য নিপীড়ন এখনো চলছে। নারীরা যে এখন হিজাব ও বোরকা পরিধান করছেন, তার পেছনে একটা বড় কারণ নিরাপত্তাহীনতা। গোটা ব্যবস্থাটাই নারীদের দুর্বল করে রেখেছে। যদিও নারীরা যোগ্যতায়, কর্মদক্ষতায় অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন, কিন্তু সবকিছু সত্ত্বেও তাঁদের কোণঠাসা করে রাখা হচ্ছে। আমাদের সমাজ বৈষম্যমূলক। এই সমাজে নারীরা দুই দফায় বৈষম্যের শিকার হন। প্রথম বৈষম্য শ্রেণিগত, দ্বিতীয় বৈষম্য নারী-পুরুষের। নিম্নবিত্ত ও

দরিদ্র ঘরের নারীদের তো কথাই নেই। বিত্তবান পরিবারেও নারীদের প্রতি আচরণ বৈষম্যমূলক। সব মিলিয়ে সত্য এই, সমাজ ও রাষ্ট্রই আসলে শত্রু। নারীমুক্তির আন্দোলন আসলে এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলন। এ ক্ষেত্রে সংস্কার, নতুন আইন প্রণয়ন, আইনের প্রয়োগ অনেক কিছুর কথা ভাবা হয়। এদের উপযোগিতা অবশ্যই আছে। কিন্তু সংস্কারের মধ্য দিয়ে এ ব্যবস্থাকে পরিবর্তন করা যাবে না। নির্মম বটে, তবে সত্য এই যে, সংস্কার ব্যবস্থাকে দীর্ঘস্থায়ী করতে সাহায্য করে। আমরা অবশ্যই সংস্কার চাইব। কিন্তু এ সত্যকে ভুললে চলবে না যে, বৈষম্যমূলক ব্যবস্থাকে বদলাতে না পারলে নারীমুক্তি অসম্ভব। আন্দোলনের লক্ষ্যও তাই গোটা ব্যবস্থা পরিবর্তনের। এই ব্যবস্থা পরিবর্তনের স্বপ্ন আমরা দীর্ঘকাল দেখেছি, এখনো দেখছি। কিন্তু

ব্যবস্থা বদলায়নি। অন্যায় ও অমানবিক এই ব্যবস্থার প্রকোপে বাংলাদেশের সব মানুষ আজ নিতান্ত দুর্দশাগ্রস্ত ও হতাশায় আক্রান্ত। এই ব্যবস্থাকে বদলানোর কাজটা কেবল নারীদের নয়। নারী-পুরুষ সবারই। নারীমুক্তি আন্দোলনকে সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখতে হবে। না দেখলে তা দূরদর্শী হবে না এবং লক্ষ্য অর্জনের দিকেও এগোতে পারবে না। আবারও বলি, সমাজ পরিবর্তনের দায়িত্ব নারী-পুরুষ সবারই এবং আন্দোলন ছাড়া পরিবর্তন সাধনের অন্য কোনো উপায় নেই। যেকোনো আন্দোলনেরই সাফল্যের একেবারে প্রথম শর্তটি হচ্ছে শত্রুকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করা। নারীমুক্তির প্রশ্নে পুঁজিবাদী সমাজ ও রাষ্ট্রকে মূল শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করতে আমরা যেন ভুল না করি।

দৈনিক ডোনেট বাংলাদেশ সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ট্যাগ:

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:


শীর্ষ সংবাদ:
বিবিসি বাংলা রেডিওর জনপ্রিয় অনুষ্ঠানের সেই দিন এই দিন বিদ্যুতের দাম এবার বাড়ছে উৎসবের আবহে শারদীয় দুর্গোৎসব শুরু যে কারণে হ্রাস পেয়েছে ফল বিক্রি ও আমদানি আইফেল টাওয়ার বন্ধ ফাইভ জি যুগে ভারত নয়া ব্রিটিশ মুদ্রার ছবি প্রকাশ ডিমের হালি ফের ৫০-৫৫ টাকা আকর্ষণীয় প্রবৃদ্ধি অর্জন বাংলাদেশের লাইমান ছেড়ে চলে গেছে রুশ সেনারা, জানাল রাশিয়াই ‘ইমরান খানকে গ্রেফতার করা হবে না’ পারমাণবিক কেন্দ্রের প্রধানকে আটক করেছে রাশিয়া ইসরাইলিদের হামলায় এ বছর ১০০ ফিলিস্তিনির মৃত্যু ছাত্রলীগ নেতার পা কেটে নেওয়ার হুমকি সাবেক এমপির বেলারুশে নতুন করে সেনা অস্ত্র পাঠাতে যাচ্ছে রাশিয়া পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের অনুরোধ রমজান কাদিরভের রাজশাহীতে এক ছিনতাইকারী আটক সিরাজগঞ্জের বেলকুচিতে মা ও দুই ছেলের মৃতদেহ উদ্ধার কুড়িগ্রামে ফেসবুকে প্রেম করে তরুণীকে ধর্ষণ ও অর্থ হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ শালিখায় প্রবীণ দিবস উপলক্ষে বর্নাঢ্য র‌্যালি