নয়ন যেন শীতের আনন্দ - ডোনেট বাংলাদেশ

শীতকাল এলে গ্রামের ছেলেপুলেদের ঘুম ভাঙে একজনের মিষ্টি মধুর ডাকে। ‘মোয়া লাগবে, মোয়া…এই মোয়া লাগবে…মোয়া…।’ আশ্চর্য হলেও সত্য, ২০ বছরের বেশি সময় ধরে প্রতিবছর কুয়াশাঢাকা, শিশিরভেজা শীতের সকালে গ্রামের মেঠোপথে হেঁটে হেঁটে মাথায় ঝাঁকাভর্তি ‘আনন্দ’ নিয়ে বাড়িতে বাড়িতে হাজির হন নয়ন মজুমদার (৪০)। তাঁর ডাকে ঘুম ভেঙে মোয়ার ঝুড়ির চারপাশে ঘিরে ধরেন ছেলে-বুড়ো সবাই।

নয়নের বাড়ি চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ উপজেলার মগধরা ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডে। শারীরিক প্রতিবন্ধী নয়ন পড়াশোনা বেশি দূর করতে পারেননি। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর লেগে পড়েন বাবার সঙ্গে মোয়া বানানো ও বিক্রির কাজে। অন্য কোনো কাজ করতে না পারায়, ছোটবেলা থেকে এখন অবধি এ কাজটাই তিনি করে আসছেন।

১২ নভেম্বর শুক্রবার বিকেলে নয়নদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, শীতবিকেলের মিঠে হয়ে আসা রোদে উঠোনে দুটি মাটির চুলার সামনে মোয়া তৈরির জন্য মিঠাই গরম করছেন নয়নের মা বিপুল মজুমদার (৬০)।

চুলায় জ্বাল দিতে দিতে তিনি জানান, তিন বছর বয়সে নয়নের নিউমোনিয়া হয়েছিল। ছয় মাস হাসপাতালে জীবন-মরণ যুদ্ধের পর নয়ন বেঁচে ফিরলেও, তাঁর মুখে জড়তা এসে যায়। স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন তিনি। শারীরিক প্রতিবন্ধী হলেও তিনি কোনো ধরনের সরকারি-বেসরকারি সুযোগ-সুবিধা পান না।

মা, বাবা, স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে নয়নের ছোট সংসার। মোয়া বানানোর কৌশল পুরোপুরি রপ্ত করতে না পারলেও তিনি জানেন কাগজ-আঠা দিয়ে ঠোঙা তৈরির কৌশল। মায়ের পাশে মাদুর পেতে ঠোঙা বানাতে বানাতে নয়ন জানান, অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত তিনি গ্রামের বাড়ি বাড়ি গিয়ে মোয়া বিক্রি করেন। এ কাজটা করতে তাঁর আনন্দ লাগে। মূলত মুড়ির মোয়া, চিড়ার মোয়া ও টফি বিক্রি করেন তিনি। অবসর সময়ে ঠোঙা বানান, বিকেলে বাজারে বাবার সঙ্গে দোকানে সময় দেন।

কথার ফাঁকে ফাঁকে শীতের কাপড় পরে, মাথায় তেল মেখে ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন নয়নের বাবা ছিদাম মজুমদার (৭০)। এতক্ষণ বানানো মোয়া নিয়ে স্থানীয় গুপ্তছড়া বাজারে সন্ধ্যার হাটে যাবেন তিনি। সেখানে তাঁর ছোট একটা দোকান আছে। ছিদাম বলেন, ৪০ বছর ধরে তিনি এ পেশায় আছেন। এখন শরীরে আর কুলোয় না, চোখে কম দেখেন, কানে কম শোনেন। আগের তুলনায় বিক্রি এখন কম। মোয়া-মুড়ির মতো খাবারের প্রতি মানুষের আগ্রহ এখন কমে গেছে।

২০ বছর আগে কোনো এক শীতের সকালে নয়নের ডাকে ঘুম ভেঙে লেপ-কাঁথা থেকে দুই হাতে চোখ কচলাতে কচলাতে বেরিয়ে আসা ছোট্ট শিশুটি আজ ৩০ বছরের যুবক আহসান। চাকরি করছেন স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তিনি বলেন, ‘আমার মতো আমার ছোট মেয়েটিরও সকালে মাঝে মাঝে ঘুম ভাঙে নয়নের ডাকে। এ এক অন্য রকম অভিজ্ঞতা। ছোটবেলায় নয়ন ভাইয়ের ডাকে সকালে আমাদের ঘুম ভাঙত। উঠোনে যেন আনন্দের জোয়ার বয়ে যেত তখন। সবাই তাঁকে ঘিরে ধরে হইচই করে মোয়া কিনতাম। সে এক অন্য রকম সুখের সময় ছিল।’

সময় বয়ে যায়। পাল্টে যায় পারিপার্শ্বিক। তবু প্রজন্মের পর প্রজন্ম সমুদ্রঘেরা এক পাড়াগাঁয়ে, খালি পায়ে শীতের শিশির মেখে খুব সকালে বাড়ি বাড়ি মুঠো মুঠো আনন্দ বিলিয়ে দিতে নয়নের বয়স যেন বাড়ে না।

লেখক: শিশু সাহিত্যিক

শীতকাল এলে গ্রামের ছেলেপুলেদের ঘুম ভাঙে একজনের মিষ্টি মধুর ডাকে। ‘মোয়া লাগবে, মোয়া…এই মোয়া লাগবে…মোয়া…।’ আশ্চর্য হলেও সত্য, ২০ বছরের বেশি সময় ধরে প্রতিবছর কুয়াশাঢাকা, শিশিরভেজা শীতের সকালে গ্রামের মেঠোপথে হেঁটে হেঁটে মাথায় ঝাঁকাভর্তি ‘আনন্দ’ নিয়ে বাড়িতে বাড়িতে হাজির হন নয়ন মজুমদার (৪০)। তাঁর ডাকে ঘুম ভেঙে মোয়ার ঝুড়ির চারপাশে ঘিরে ধরেন ছেলে-বুড়ো সবাই।

নয়নের বাড়ি চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ উপজেলার মগধরা ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডে। শারীরিক প্রতিবন্ধী নয়ন পড়াশোনা বেশি দূর করতে পারেননি। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর লেগে পড়েন বাবার সঙ্গে মোয়া বানানো ও বিক্রির কাজে। অন্য কোনো কাজ করতে না পারায়, ছোটবেলা থেকে এখন অবধি এ কাজটাই তিনি করে আসছেন।

১২ নভেম্বর শুক্রবার বিকেলে নয়নদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, শীতবিকেলের মিঠে হয়ে আসা রোদে উঠোনে দুটি মাটির চুলার সামনে মোয়া তৈরির জন্য মিঠাই গরম করছেন নয়নের মা বিপুল মজুমদার (৬০)।

চুলায় জ্বাল দিতে দিতে তিনি জানান, তিন বছর বয়সে নয়নের নিউমোনিয়া হয়েছিল। ছয় মাস হাসপাতালে জীবন-মরণ যুদ্ধের পর নয়ন বেঁচে ফিরলেও, তাঁর মুখে জড়তা এসে যায়। স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন তিনি। শারীরিক প্রতিবন্ধী হলেও তিনি কোনো ধরনের সরকারি-বেসরকারি সুযোগ-সুবিধা পান না।

মা, বাবা, স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে নয়নের ছোট সংসার। মোয়া বানানোর কৌশল পুরোপুরি রপ্ত করতে না পারলেও তিনি জানেন কাগজ-আঠা দিয়ে ঠোঙা তৈরির কৌশল। মায়ের পাশে মাদুর পেতে ঠোঙা বানাতে বানাতে নয়ন জানান, অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত তিনি গ্রামের বাড়ি বাড়ি গিয়ে মোয়া বিক্রি করেন। এ কাজটা করতে তাঁর আনন্দ লাগে। মূলত মুড়ির মোয়া, চিড়ার মোয়া ও টফি বিক্রি করেন তিনি। অবসর সময়ে ঠোঙা বানান, বিকেলে বাজারে বাবার সঙ্গে দোকানে সময় দেন।

কথার ফাঁকে ফাঁকে শীতের কাপড় পরে, মাথায় তেল মেখে ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন নয়নের বাবা ছিদাম মজুমদার (৭০)। এতক্ষণ বানানো মোয়া নিয়ে স্থানীয় গুপ্তছড়া বাজারে সন্ধ্যার হাটে যাবেন তিনি। সেখানে তাঁর ছোট একটা দোকান আছে। ছিদাম বলেন, ৪০ বছর ধরে তিনি এ পেশায় আছেন। এখন শরীরে আর কুলোয় না, চোখে কম দেখেন, কানে কম শোনেন। আগের তুলনায় বিক্রি এখন কম। মোয়া-মুড়ির মতো খাবারের প্রতি মানুষের আগ্রহ এখন কমে গেছে।

২০ বছর আগে কোনো এক শীতের সকালে নয়নের ডাকে ঘুম ভেঙে লেপ-কাঁথা থেকে দুই হাতে চোখ কচলাতে কচলাতে বেরিয়ে আসা ছোট্ট শিশুটি আজ ৩০ বছরের যুবক আহসান। চাকরি করছেন স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তিনি বলেন, ‘আমার মতো আমার ছোট মেয়েটিরও সকালে মাঝে মাঝে ঘুম ভাঙে নয়নের ডাকে। এ এক অন্য রকম অভিজ্ঞতা। ছোটবেলায় নয়ন ভাইয়ের ডাকে সকালে আমাদের ঘুম ভাঙত। উঠোনে যেন আনন্দের জোয়ার বয়ে যেত তখন। সবাই তাঁকে ঘিরে ধরে হইচই করে মোয়া কিনতাম। সে এক অন্য রকম সুখের সময় ছিল।’

সময় বয়ে যায়। পাল্টে যায় পারিপার্শ্বিক। তবু প্রজন্মের পর প্রজন্ম সমুদ্রঘেরা এক পাড়াগাঁয়ে, খালি পায়ে শীতের শিশির মেখে খুব সকালে বাড়ি বাড়ি মুঠো মুঠো আনন্দ বিলিয়ে দিতে নয়নের বয়স যেন বাড়ে না।

লেখক: শিশু সাহিত্যিক

কয়েক ছত্র

নয়ন যেন শীতের আনন্দ

সাজিদ মোহন
আপডেটঃ ১৮ নভেম্বর, ২০২১ | ৮:২৪ 73 ভিউ
শীতকাল এলে গ্রামের ছেলেপুলেদের ঘুম ভাঙে একজনের মিষ্টি মধুর ডাকে। ‘মোয়া লাগবে, মোয়া...এই মোয়া লাগবে...মোয়া...।’ আশ্চর্য হলেও সত্য, ২০ বছরের বেশি সময় ধরে প্রতিবছর কুয়াশাঢাকা, শিশিরভেজা শীতের সকালে গ্রামের মেঠোপথে হেঁটে হেঁটে মাথায় ঝাঁকাভর্তি ‘আনন্দ’ নিয়ে বাড়িতে বাড়িতে হাজির হন নয়ন মজুমদার (৪০)। তাঁর ডাকে ঘুম ভেঙে মোয়ার ঝুড়ির চারপাশে ঘিরে ধরেন ছেলে-বুড়ো সবাই। নয়নের বাড়ি চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ উপজেলার মগধরা ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডে। শারীরিক প্রতিবন্ধী নয়ন পড়াশোনা বেশি দূর করতে পারেননি। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর লেগে পড়েন বাবার সঙ্গে মোয়া বানানো ও বিক্রির কাজে। অন্য কোনো কাজ করতে না পারায়, ছোটবেলা থেকে এখন অবধি এ কাজটাই তিনি করে আসছেন। ১২ নভেম্বর শুক্রবার বিকেলে নয়নদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, শীতবিকেলের মিঠে হয়ে আসা রোদে উঠোনে দুটি মাটির চুলার সামনে মোয়া তৈরির জন্য মিঠাই গরম করছেন নয়নের মা বিপুল মজুমদার (৬০)। চুলায় জ্বাল দিতে দিতে তিনি জানান, তিন বছর বয়সে নয়নের নিউমোনিয়া হয়েছিল। ছয় মাস হাসপাতালে জীবন-মরণ যুদ্ধের পর নয়ন বেঁচে ফিরলেও, তাঁর মুখে জড়তা এসে যায়। স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন তিনি। শারীরিক প্রতিবন্ধী হলেও তিনি কোনো ধরনের সরকারি-বেসরকারি সুযোগ-সুবিধা পান না। মা, বাবা, স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে নয়নের ছোট সংসার। মোয়া বানানোর কৌশল পুরোপুরি রপ্ত করতে না পারলেও তিনি জানেন কাগজ-আঠা দিয়ে ঠোঙা তৈরির কৌশল। মায়ের পাশে মাদুর পেতে ঠোঙা বানাতে বানাতে নয়ন জানান, অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত তিনি গ্রামের বাড়ি বাড়ি গিয়ে মোয়া বিক্রি করেন। এ কাজটা করতে তাঁর আনন্দ লাগে। মূলত মুড়ির মোয়া, চিড়ার মোয়া ও টফি বিক্রি করেন তিনি। অবসর সময়ে ঠোঙা বানান, বিকেলে বাজারে বাবার সঙ্গে দোকানে সময় দেন। কথার ফাঁকে ফাঁকে শীতের কাপড় পরে, মাথায় তেল মেখে ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন নয়নের বাবা ছিদাম মজুমদার (৭০)। এতক্ষণ বানানো মোয়া নিয়ে স্থানীয় গুপ্তছড়া বাজারে সন্ধ্যার হাটে যাবেন তিনি। সেখানে তাঁর ছোট একটা দোকান আছে। ছিদাম বলেন, ৪০ বছর ধরে তিনি এ পেশায় আছেন। এখন শরীরে আর কুলোয় না, চোখে কম দেখেন, কানে কম শোনেন। আগের তুলনায় বিক্রি এখন কম। মোয়া-মুড়ির মতো খাবারের প্রতি মানুষের আগ্রহ এখন কমে গেছে। ২০ বছর আগে কোনো এক শীতের সকালে নয়নের ডাকে ঘুম ভেঙে লেপ-কাঁথা থেকে দুই হাতে চোখ কচলাতে কচলাতে বেরিয়ে আসা ছোট্ট শিশুটি আজ ৩০ বছরের যুবক আহসান। চাকরি করছেন স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তিনি বলেন, ‘আমার মতো আমার ছোট মেয়েটিরও সকালে মাঝে মাঝে ঘুম ভাঙে নয়নের ডাকে। এ এক অন্য রকম অভিজ্ঞতা। ছোটবেলায় নয়ন ভাইয়ের ডাকে সকালে আমাদের ঘুম ভাঙত। উঠোনে যেন আনন্দের জোয়ার বয়ে যেত তখন। সবাই তাঁকে ঘিরে ধরে হইচই করে মোয়া কিনতাম। সে এক অন্য রকম সুখের সময় ছিল।’ সময় বয়ে যায়। পাল্টে যায় পারিপার্শ্বিক। তবু প্রজন্মের পর প্রজন্ম সমুদ্রঘেরা এক পাড়াগাঁয়ে, খালি পায়ে শীতের শিশির মেখে খুব সকালে বাড়ি বাড়ি মুঠো মুঠো আনন্দ বিলিয়ে দিতে নয়নের বয়স যেন বাড়ে না। লেখক: শিশু সাহিত্যিক

দৈনিক ডোনেট বাংলাদেশ সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ট্যাগ:

সংশ্লিষ্ট সংবাদ: