প্রবাসের ডায়েরিতে বিজয়ের স্মৃতি। - ডোনেট বাংলাদেশ

বিজয়ের মাস ডিসেম্বর। প্রকৃতিতে শীতকাল। চারিদিকে কুয়াশার চাঁদর। আকাশে সূর্য্য নেই বলে চলে। বাংলার পরিবেশে ঠান্ডা হাওয়ায় ছয়লাভ। তবুও তপু এই শহর গর্ভে সবুজের বিশালতার কোন চাপ কখনও অনুভব করেনি। সে শহীদ সাংবাদিক সেলিমা রহমান উচ্চ বিদ্যালয়ের ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রী। সে মায়ের কাছ থেকে গ্রামের অনেক গল্প শুনেছে । কিন্তু বাস্তবে তা কখনও দর্শন করেনি। অনেক সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তাদের গ্রামের বাড়ীতে যাওয়া হয়নি কখনও। কারণ আশির দশকে তার বড় বোনের জন্মের লগ্নে পারিবারিক বিবাদের জন্য যে চলে এসেছে ঢাকায়। তারপর থেকে আর গ্রামে যাওয়া হয়নি। আজ তার বাবা অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে ঢাকা শহরে শীর্ষে অবস্থান করছেন। তবুও

ফেলে আসা গ্রামের মানুষের প্রতি তার অসীম ভালবাসা। এ শহরে এসে অনেকে বিপদে পড়ে। কিন্তু তিনি তাদের সাহায্য করতে পিছু হটেননি। তবে অভিমানে-দুঃখে গ্রামে ক্ষণিকের জন্য ফিরে যেতে ইচ্ছে হয়নি। তপুর বড়বোন শ্যামলি ঢাকা কলেজের অনার্স ২য় বর্ষের ছাত্রী। তার সাথে গ্রামের বাড়ির ফারহানা লেখা-পড়া করছে । কিন্তু হোস্টেলে থেকে লেখা-পড়া খুবই কষ্ট কর। তাই শ্যামলি বন্ধুত্বের এক পর্যায় বাবা-মাকে রাজি করিয়ে বাসায় নিয়ে আসে। ফারহানা তাদের পরিবারে আগমনে তপুর বাবা-মা’র চিন্তা-চেতনা পরিবর্তন হতে শুরু করে। ধীরে ধীরে আত্মীয় স্বজনের সাথে সম্পর্ক শীতল হয়। স্কুল-কলেজে গুলো বিজয় দিবসের জন্য এক মাসের বন্ধ। এই ছুটিতে ছাত্র-ছাত্রীরা গ্রামে ফিরে যাচ্ছে। ফারহানা গ্রামে

চলে যাওয়ার প্রহর গুনছে। তপু বায়না ধরেছে সেও গ্রামে যাবে। বাবা-মাকে তার ইচ্ছার কথা জানিয়েছে। কিন্তু দুজনই কিছু বলছেন না। এদিকে শ্যামলি গ্রামে ছুটি কাটানোর কথা বাবা-মাকে বলার সাহস পাচ্ছে না। তাদেরও গ্রামে বেড়ানোর ইচ্ছা আছে। তবুও দুঃখে যেতে ইচ্ছে করছেন না। সেই চিন্তাময় মুহুর্তে ঘরে ফারহানা এসেছে। সে প্রবেশ করে বললো- চাচা আগামীকাল বাড়ী চলে যাবো। তিনি বললেন -ঠিক আছে মা, যাও। তাড়াতাড়ি ফিরে এসো। কিন্তু চাচা! মাগো থামলে কেন? তোমার কোন অসুবিধা। তা নয়, তবে শ্যামলি ও তপুকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতে চাইছি।

মা-মনি কিন্তু…। না, চাচা কিন্তু বলবেন না। আমার বাড়ি ছাড়া আর অন্য কোন বাড়িতে

যেতে দেবো না। আচ্ছা ঠিক আছে নিয়ে যাও, তবে দুদিনের বেশি থাকা চলবেনা। ঠিক আছে। ফারহানা রুম থেকে চলে এসে পাশের কক্ষে অপেক্ষমান দুজনকে রাজি হওয়ার সংবাদ দেয়া মাত্র তপু হৈ-চৈ আরম্ভ করে দিয়েছে। তার খুশিতে যেন আকাশের প্রতিটি তাঁরা মাটিতে খসে পড়ছে। পরদিন ৬.৪০ মিনিটে সিলেটের উদ্দেশ্যে কমলাপুর রেল ষ্টেশন থেকে পারাবত ট্রেনটি যাত্রা করবে। ইতোমধ্যে টিকেট বুকিং দেয়া হয়েছে। পবিত্র ফজরের নামাজ আদায় করা হয়েছে। ভোর পাঁচটা বাজে, তিন জনই গ্রামে ফিরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে তৈরি হয়ে গেছে। শ্যামলির বাবা এসেছেন কমলাপুর রেলষ্টেশনে গাড়ীতে নিরাপদে তুলে দেওয়ার জন্য। নির্দিষ্ট সমেয় ট্রেনটি ছেড়ে দিলো। তপু জানালার পাশে বসে আছে। বাহিরের

দৃর্শ্য গুলো অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছে। কিন্তু রেললাইনের পাশে দরিদ্র লোকের আবাসস্থল দেখে বুবুকে নানা প্রশ্ন করছে। বিমান বন্দর রেল স্টেশন থেকে মাহিন ট্রেনে উঠেছে। একটি কামরার মাঝে চারটি আসনের মধ্যে একটি তার সীট পড়েছে। সে অবশিষ্ট সীটে তুপরা বসে থাকতে দেখে তল্পি-তল্পা নির্দিষ্ট স্থানে রেখে অন্য কামরায় চলে যায়। ক্যান্টিনে সকালের হালকা নাস্তা খেয়ে সীটে ঘুমাচ্ছে। কয়েকঘন্টা পর আখাউড়া রেলষ্টেশন ট্রেন অতিক্রম করে। তখন এক লোক তাকে জাগিয়ে তুললো। স্যারি ভাই-বিরক্ত করার জন্য,সিটটা আমার। নো, থ্যাঙ্কস্, আপনি বসুন। অন্য কামরায় সিট আছে আমার। মাহিন চল আসলো তার নির্দিষ্ট সিটে। তখন এসে দেখলো তার সিটে তপুরা দখল করে বসে আছে।

শ্যামলি তাকে দেখতেই সিটটা ছেড়ে দিয়ে বসুন বলে পাশের বসে পড়লো। তপু ফারহানার কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে। মাহিন সংকোচবোধ নিয়ে সিটে বসলো। সে ব্যাগ থেকে মোস্তফা সেলিম সম্পাদিত ‘মুক্তিযুদ্ধে বড়লেখা‘ ইতিহাস গ্রন্থটি বের করে পড়ছে। ফারহানা সামনের সিট থেকে মাহিনকে লক্ষ করে বললো-আপনার সাথে পরিচিত হতে পারি কি? জ্বি, আমাকে বলছেন, হ্যাঁ, আপনাকে বলছি। অবশ্যই, আমার নাম মাহিন রহমান আর ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতায় অধ্যায়ন করছি। আপনি কি করছেন?- আমি ফারহানা, ঢাকা কলেজে আমরা দু’জনই অনার্সে পড়ছি। মাহিন ভাই আপনার হাতের বইটা কোথায় পেয়েছেন? কেন? না,এই লেখকের বাড়ি আমাদের এলাকায়। এজন্য প্রশ্ন করছি। ও, তাই। আমি গত বছর তিন বন্ধু

মাধবকুন্ডে বেড়াতে গিয়েছিলাম আর তখন সেই এলাকার শহরের বঙ্গবীর লাইব্রেরী থেকে স্থানীয় লেখকদের নানা বই সংগ্রহ করেছি। এলাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্য সমৃদ্ধ প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে এটা এনেছি। তখন তপুর ঘুম ভেঙ্গে গেলো। সে জেগে উঠেই বলে-ভাইয়া বইগুলো আমি কিভাবে সংগ্রহ করতে পারি? মাহিন বইগুলো সংগ্রহ করার তথ্য দিয়ে দিলো। এতোক্ষণ পাশে বসা শ্যামলি চুপ করে বসেছিল।

 

এই মাত্র কথা বললো,কিন্তু আপনার ব্যাপারে সবজানা হল,তবে বাড়িটা জানা হলো না। মাহিন প্রশ্ন করলো, আপনি কথা বলছেন? কেন ? অবাক হলেন। না সংশয়ে ছিলাম। আর বাড়িটা প্রকৃতির লীলা নিকেতন শ্রীমঙ্গলে। কিন্তু আপনার নামটা জানা হলো না । কেন-এতো কি জানা প্রয়োজন? যতোটা

ভাবছেন ততোটা নয়। যাক, নামটা শ্যামলি আর বাড়িটা সিলেটে হলেও এই প্রথম এখানে আগমন। তবে স্থায়ীভাবে ঢাকায় বসবাস করছি। তপু জানালা দিয়ে পাহাড়ি দর্শনের সময় বার বার প্রশ্ন করছে। শ্যামলি অনেক গুলো প্রশ্নের উত্তর সম্পর্কে ধারণা নেই। মাহিনের সাহায্য চাইলো। মাহিন তাকে পাশে বসিয়ে বিভিন্ন স্থান সম্পর্কে ধারণা দিয়ে চলছে। তখন মাহিনের ফোন বেজে উঠলো। সে ফোনটা রিসিভ করতেই দুঃসংবাদ। মাহিন তুই কোথায়? আমি-তো ট্রেনে আসছি। তুই ট্রেন থেকে থানায় আসিস। কেনো কি হয়েছে? আর বলিস নারে, কি বলবো? তোর বাবার লাশ পাওয়া গেছে। চাচাকে সন্ত্রাসীরা হত্যা করেছে। মাহিন, চাচা আর বেঁচে নেই। কি বলিস? হ্যাঁ, সত্যিই বলছি। মাহিনের চোখ দিয়ে অবিরাম ধারায় জল ঝরছে। এতো সুন্দর হাঁসিমাখা মুখটা লাল হয়ে গেল। সে সেখান থেকে অন্যত্র চল গেলো। তপু তার কান্না দেখে নীরব দর্শক হয়ে গেল। শ্যামলি তার অবস্থা দেখে প্রশ্ন করার ইচ্ছা তাকলেও আর করেনি। মাহিন, ক্যান্টিনে ফিরে গিয়ে আনমনা ভাবে পানি দিয়ে মুখটা ধুয়ে এক কাপ রং চা পান করলো। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে ট্রেনটি শ্রীমঙ্গল স্টেশনে পৌছবে বলে মাইকে ঘোষণা করা হলো। মাহিন চলে আসলো সিটে। ব্যাগ গুলো গুছিয়ে নিলো। বিদায় ক্ষণে,তপুকে সাংবাদিক সৈয়দ ফারুক আহমদ রচিত “মানবতায় সাংবাদিক” বইটি উপহার হিসেবে দিয়ে বললো এই বইটির লেখক আমার বাবা। শ্যামলি আনমনা হয়ে গেল। কৌতুহল রয়ে গেল । জানা হলো না অশ্র সিক্ত নয়নের অদৃশ্য রচনা। মাহিন উভয়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গন্তব্যে চলে গেল। ফারহানা বুঝতে পারলো শ্যামলি অন্তরের আবেদন। তবুও অবুঝের মত পাশ কাটিয়ে গেল। শ্যামলিরা কুলাউড়া রেলস্টেশনে নেমে একটি সিএনজি ভাড়া করে বড়লেখার লঘাটি গ্রামে নিজ বাড়িতে পৌঁছলো। পরদিন তপু গ্রামে ঘুরতে বেরিছে। শত শত বছরের পুরাতন খোঁজার মসজিদটি তাকে মুগ্ধ করেছে এবং এর পাশে বাগান গুলো সৌন্দর্য্য আরো আকর্ষণ করেছে। তপু তার বুবুকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামকরণ নিয়ে প্রশ্ন করলো। এই রাস্তা, সেই রাস্তা কেন শহীদরে নামে নামকরণে করা হলো না। কেন ? এরা কি এটার সমতুল্য? কোন প্রতিষ্ঠানের নামে অন্তর্ভূক্ত হলো না ইত্যাদি- ইত্যাদি। তপুরা নির্দিষ্ট সময় ব্যয় করে আনন্দ উপভোগ করে ফিরে আসলো। সে ঢাকায় ফিরে তার আম্মুকে জানালো একটা ফুলের বাগান করবে। আর এ বাগানের নাম একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার নামে নামকরণ করা হবে। তবে এ বাগান অন্য দিয়ে নয়, সে নিজের হাতে করবে। তার আম্মু বলেছেন-বাবা তুমি এখনো ছোট, তুমি কিভাবে বাগান করবে? আরেকটু বড় হও, তখন না হয় করো। তপু রবীঠাকুরের ছুটি গল্পের নায়কের মত বেপরোয়া। সে বাগান করবেই। কি আর করা। তপুর আম্মু বাসার ছোট্ট একটা জায়গা নির্ধারণ করে দিলেন বাগান করার জন্য। তারপর তপু তার আব্বুসহ বুবুদের সহযোগিতায় ছোট্ট জায়গাটিকে গাছ রোপণের উপযোগি করলো। এরপর বিভিন্ন জাতের পাঁচটি ফুলের চারা লাগালো ও সে আব্বুর সহযোগিতায় আরো গাছ লাগালো। সেই থেকে প্রতিদিন সকালে ও বিকালে তপু বাগানে পানি দেয় এবং সপ্তাহে একবার গাছের আগাছা পরিষ্কার করে। কয়েক মাস পর দেখা গেলো প্রায় প্রতিটি গাছে দু-তিনটা করে ফুল ফুটেছে। তপু এখন মহাখুশি। মুহাম্মদ বিন কাশেম সিন্ধু জয় করে যতটুকু কৃতিত্ব অর্জন করে ছিলেন ও বখতিয়ার খলজি বঙ্গ বিজয় করে যতটুকু সাফল্যের হাসি হেসে ছিলেন । তেমনি তপুর বাগানে ফুল ফোটায় সে তাদের চেয়ে বেশি খুশি হয়েছে। তপুর বাবা-মাও খুব খুশি তার সাফল্য দেখে। সেইদিন ১৯৭৫ সালের ১৪ আগষ্ট বিকেলে তপুর বাবা-মা, বুবু-আপা ছাদে বসে আড্ডা দিচ্ছে। শহীদ সৈয়দ আহমদ গার্ডেন সাইনবোর্ড ও নবফুটন্ত বাগনের ফুল দেখে তার বাবা বলেন-তপু বলতো তোমার বাগান এতা সুন্দুর হলো কিভাবে? তপু বললো-আমি আমার বাগানের যত্ন নিয়েছি, শ্রম দিয়েছি ও কষ্ট করেছি। তাই আমার বাগান এতো সুন্দর হয়েছে।

তপুর বাবা বলেন, তদ্রুপ আমরা আমাদের জন্মভুমি, আমাদের স্বাধীনতা, আমাদের বিজয়ের জন্য পরিশ্রম, মেধা ও সর্বোপরি জীবন দিয়ে আজকের বাংলাদেশ সৃষ্টি করেছি। আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই দেশকে ভালবেসে জীবনের সকল বিলাসিতা ত্যাগ করে স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন। এই মহামানবের আহবানে তোমার দাদা সৈয়দ আহমদ যুদ্ধ করেছেন। তাই তোমার জীবনের জন্য যদি এভাবে কষ্ট কর,পরিশ্রম করো,মনযোগ সহকারে লেখাপড়া করো, নিজে মানবিক নিয়ম-নীতি গুলো মেনে চলো তাহলে তোমার জীবনও হয়ে উঠবে বাগানের মতো সুন্দর মনোহর। তোমার হাত ধরেই আগামীর মুক্তির সংগ্রাম অর্জন করতে পারবো। আর তোমাকে এক নামে চিনবে, তোমার প্রশংসা করবে। তোমার মাধ্যমেই আমরা বিজয়ের স্বাদ উপভোগ করবো। এটাইতো তোমার জীবনের লক্ষ্য হওয়া উচিত নয় কি? তপু বললো হ্যাঁ আব্বু। তবে আব্বু বঙ্গবন্ধু কে? মামনি তিনি আমাদের জাতির পিতা। তুমি আজ বাসার ছাদের উপর স্বাধীন ভাবে বাগান করেছো। কিন্ত তিনি (বঙ্গবন্ধু) না থাকলে এটি সম্ভব হতো না। তুমি সারা জীবন তাকে শ্রদ্ধা করবে। তপু বললো-জ্বি আব্বু। তারপর পরদিন সকালে ফজরের নামাজের পর তপুর বাবার কাছে লেন্ডফোনে একটি কল আসে। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে আওয়াজ আসে জাতির পিতাকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি হতবম্ব হয়ে বাসার সবাইকে ডেকে তুলেন। সবার কাছে ঘটনাটি খোলে বলেন। তারপর আবার ফোন আসলো। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে আওয়াজ আসলো আপনি নিরাপদে চলেন যান। ফোনটা রেখে দুই মেয়ে আর স্ত্রীকে সাথে নিয়ে বন্ধুর বাসায় চলে যান। সেখান থেকে এক আত্বীয়ের মাধ্যমে চট্টগ্রামের জেটিতে তাদের খালার বাসায় পাটিয়েন দেন। সেখান থেকে কয়েক মাস পর নৌপথে জাহাজে করে শেষমেষ ফ্রান্সে চলে। সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করে। এতোক্ষণ সেই তপুর সাথে ফ্রান্সের প্যারিস নগরীতে বসে একজন সাংবাদিক আলাপচারিতায় কথা গুলো স্মৃতিপটে ভেসে আসে। আজ গল্পের সেই ছোট্ট মেয়েটি বয়সের ভারে ভারক্লান্ত। কিন্তু তাদের বাবার আর কোন খুজঁ মিলেনি। বাবা ছিলেন একজন সাংবাদিক। পচাত্তরের পনের আগষ্টের পর তাকে ধরে নিয়ে হত্যা করা হয়। বাবার কথা মনে হতেই সেদিনকার তপু চোখের পানি ধরে রাখতে পারলো না। ফ্রান্সের আলোর উজ্জলতার মাঝেও এতোক্ষণ সব স্বাভাবিক চলছিল। কিন্তু হঠাং বাংলাদেশের বিজয়ের পশ্চাশ বছর উদযাপন টেলিভিশনের পর্দায় দেখে সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তর গুলো দিতে পারেনি। সে থেমে গেলো। শুধু চোখের জ্বলে ভরিয়ে দিলো সাংবাদিকের ডায়েরি। আর বড়বোন শ্যামলি ও মাহিনের কথা রেখে দিলাম আগামীর সূর্যদ্বয়ে।


লেখাটি শুধু মাত্র কল্পনার প্রতিচ্ছবি। বাস্তবতায় তার কোন মিল নেই।

লেখকঃ সৈয়দ মুন্তাছির রিমন

ফ্রি-ল্যান্স সাংবাদিক-প্যারিস, ফ্রান্স

বিজয়ের মাস ডিসেম্বর। প্রকৃতিতে শীতকাল। চারিদিকে কুয়াশার চাঁদর। আকাশে সূর্য্য নেই বলে চলে। বাংলার পরিবেশে ঠান্ডা হাওয়ায় ছয়লাভ। তবুও তপু এই শহর গর্ভে সবুজের বিশালতার কোন চাপ কখনও অনুভব করেনি। সে শহীদ সাংবাদিক সেলিমা রহমান উচ্চ বিদ্যালয়ের ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রী। সে মায়ের কাছ থেকে গ্রামের অনেক গল্প শুনেছে । কিন্তু বাস্তবে তা কখনও দর্শন করেনি। অনেক সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তাদের গ্রামের বাড়ীতে যাওয়া হয়নি কখনও। কারণ আশির দশকে তার বড় বোনের জন্মের লগ্নে পারিবারিক বিবাদের জন্য যে চলে এসেছে ঢাকায়। তারপর থেকে আর গ্রামে যাওয়া হয়নি। আজ তার বাবা অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে ঢাকা শহরে শীর্ষে অবস্থান করছেন। তবুও

ফেলে আসা গ্রামের মানুষের প্রতি তার অসীম ভালবাসা। এ শহরে এসে অনেকে বিপদে পড়ে। কিন্তু তিনি তাদের সাহায্য করতে পিছু হটেননি। তবে অভিমানে-দুঃখে গ্রামে ক্ষণিকের জন্য ফিরে যেতে ইচ্ছে হয়নি। তপুর বড়বোন শ্যামলি ঢাকা কলেজের অনার্স ২য় বর্ষের ছাত্রী। তার সাথে গ্রামের বাড়ির ফারহানা লেখা-পড়া করছে । কিন্তু হোস্টেলে থেকে লেখা-পড়া খুবই কষ্ট কর। তাই শ্যামলি বন্ধুত্বের এক পর্যায় বাবা-মাকে রাজি করিয়ে বাসায় নিয়ে আসে। ফারহানা তাদের পরিবারে আগমনে তপুর বাবা-মা’র চিন্তা-চেতনা পরিবর্তন হতে শুরু করে। ধীরে ধীরে আত্মীয় স্বজনের সাথে সম্পর্ক শীতল হয়। স্কুল-কলেজে গুলো বিজয় দিবসের জন্য এক মাসের বন্ধ। এই ছুটিতে ছাত্র-ছাত্রীরা গ্রামে ফিরে যাচ্ছে। ফারহানা গ্রামে

চলে যাওয়ার প্রহর গুনছে। তপু বায়না ধরেছে সেও গ্রামে যাবে। বাবা-মাকে তার ইচ্ছার কথা জানিয়েছে। কিন্তু দুজনই কিছু বলছেন না। এদিকে শ্যামলি গ্রামে ছুটি কাটানোর কথা বাবা-মাকে বলার সাহস পাচ্ছে না। তাদেরও গ্রামে বেড়ানোর ইচ্ছা আছে। তবুও দুঃখে যেতে ইচ্ছে করছেন না। সেই চিন্তাময় মুহুর্তে ঘরে ফারহানা এসেছে। সে প্রবেশ করে বললো- চাচা আগামীকাল বাড়ী চলে যাবো। তিনি বললেন -ঠিক আছে মা, যাও। তাড়াতাড়ি ফিরে এসো। কিন্তু চাচা! মাগো থামলে কেন? তোমার কোন অসুবিধা। তা নয়, তবে শ্যামলি ও তপুকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতে চাইছি।

মা-মনি কিন্তু…। না, চাচা কিন্তু বলবেন না। আমার বাড়ি ছাড়া আর অন্য কোন বাড়িতে

যেতে দেবো না। আচ্ছা ঠিক আছে নিয়ে যাও, তবে দুদিনের বেশি থাকা চলবেনা। ঠিক আছে। ফারহানা রুম থেকে চলে এসে পাশের কক্ষে অপেক্ষমান দুজনকে রাজি হওয়ার সংবাদ দেয়া মাত্র তপু হৈ-চৈ আরম্ভ করে দিয়েছে। তার খুশিতে যেন আকাশের প্রতিটি তাঁরা মাটিতে খসে পড়ছে। পরদিন ৬.৪০ মিনিটে সিলেটের উদ্দেশ্যে কমলাপুর রেল ষ্টেশন থেকে পারাবত ট্রেনটি যাত্রা করবে। ইতোমধ্যে টিকেট বুকিং দেয়া হয়েছে। পবিত্র ফজরের নামাজ আদায় করা হয়েছে। ভোর পাঁচটা বাজে, তিন জনই গ্রামে ফিরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে তৈরি হয়ে গেছে। শ্যামলির বাবা এসেছেন কমলাপুর রেলষ্টেশনে গাড়ীতে নিরাপদে তুলে দেওয়ার জন্য। নির্দিষ্ট সমেয় ট্রেনটি ছেড়ে দিলো। তপু জানালার পাশে বসে আছে। বাহিরের

দৃর্শ্য গুলো অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছে। কিন্তু রেললাইনের পাশে দরিদ্র লোকের আবাসস্থল দেখে বুবুকে নানা প্রশ্ন করছে। বিমান বন্দর রেল স্টেশন থেকে মাহিন ট্রেনে উঠেছে। একটি কামরার মাঝে চারটি আসনের মধ্যে একটি তার সীট পড়েছে। সে অবশিষ্ট সীটে তুপরা বসে থাকতে দেখে তল্পি-তল্পা নির্দিষ্ট স্থানে রেখে অন্য কামরায় চলে যায়। ক্যান্টিনে সকালের হালকা নাস্তা খেয়ে সীটে ঘুমাচ্ছে। কয়েকঘন্টা পর আখাউড়া রেলষ্টেশন ট্রেন অতিক্রম করে। তখন এক লোক তাকে জাগিয়ে তুললো। স্যারি ভাই-বিরক্ত করার জন্য,সিটটা আমার। নো, থ্যাঙ্কস্, আপনি বসুন। অন্য কামরায় সিট আছে আমার। মাহিন চল আসলো তার নির্দিষ্ট সিটে। তখন এসে দেখলো তার সিটে তপুরা দখল করে বসে আছে।

শ্যামলি তাকে দেখতেই সিটটা ছেড়ে দিয়ে বসুন বলে পাশের বসে পড়লো। তপু ফারহানার কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে। মাহিন সংকোচবোধ নিয়ে সিটে বসলো। সে ব্যাগ থেকে মোস্তফা সেলিম সম্পাদিত ‘মুক্তিযুদ্ধে বড়লেখা‘ ইতিহাস গ্রন্থটি বের করে পড়ছে। ফারহানা সামনের সিট থেকে মাহিনকে লক্ষ করে বললো-আপনার সাথে পরিচিত হতে পারি কি? জ্বি, আমাকে বলছেন, হ্যাঁ, আপনাকে বলছি। অবশ্যই, আমার নাম মাহিন রহমান আর ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতায় অধ্যায়ন করছি। আপনি কি করছেন?- আমি ফারহানা, ঢাকা কলেজে আমরা দু’জনই অনার্সে পড়ছি। মাহিন ভাই আপনার হাতের বইটা কোথায় পেয়েছেন? কেন? না,এই লেখকের বাড়ি আমাদের এলাকায়। এজন্য প্রশ্ন করছি। ও, তাই। আমি গত বছর তিন বন্ধু

মাধবকুন্ডে বেড়াতে গিয়েছিলাম আর তখন সেই এলাকার শহরের বঙ্গবীর লাইব্রেরী থেকে স্থানীয় লেখকদের নানা বই সংগ্রহ করেছি। এলাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্য সমৃদ্ধ প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে এটা এনেছি। তখন তপুর ঘুম ভেঙ্গে গেলো। সে জেগে উঠেই বলে-ভাইয়া বইগুলো আমি কিভাবে সংগ্রহ করতে পারি? মাহিন বইগুলো সংগ্রহ করার তথ্য দিয়ে দিলো। এতোক্ষণ পাশে বসা শ্যামলি চুপ করে বসেছিল।

 

এই মাত্র কথা বললো,কিন্তু আপনার ব্যাপারে সবজানা হল,তবে বাড়িটা জানা হলো না। মাহিন প্রশ্ন করলো, আপনি কথা বলছেন? কেন ? অবাক হলেন। না সংশয়ে ছিলাম। আর বাড়িটা প্রকৃতির লীলা নিকেতন শ্রীমঙ্গলে। কিন্তু আপনার নামটা জানা হলো না । কেন-এতো কি জানা প্রয়োজন? যতোটা

ভাবছেন ততোটা নয়। যাক, নামটা শ্যামলি আর বাড়িটা সিলেটে হলেও এই প্রথম এখানে আগমন। তবে স্থায়ীভাবে ঢাকায় বসবাস করছি। তপু জানালা দিয়ে পাহাড়ি দর্শনের সময় বার বার প্রশ্ন করছে। শ্যামলি অনেক গুলো প্রশ্নের উত্তর সম্পর্কে ধারণা নেই। মাহিনের সাহায্য চাইলো। মাহিন তাকে পাশে বসিয়ে বিভিন্ন স্থান সম্পর্কে ধারণা দিয়ে চলছে। তখন মাহিনের ফোন বেজে উঠলো। সে ফোনটা রিসিভ করতেই দুঃসংবাদ। মাহিন তুই কোথায়? আমি-তো ট্রেনে আসছি। তুই ট্রেন থেকে থানায় আসিস। কেনো কি হয়েছে? আর বলিস নারে, কি বলবো? তোর বাবার লাশ পাওয়া গেছে। চাচাকে সন্ত্রাসীরা হত্যা করেছে। মাহিন, চাচা আর বেঁচে নেই। কি বলিস? হ্যাঁ, সত্যিই বলছি। মাহিনের চোখ দিয়ে অবিরাম ধারায় জল ঝরছে। এতো সুন্দর হাঁসিমাখা মুখটা লাল হয়ে গেল। সে সেখান থেকে অন্যত্র চল গেলো। তপু তার কান্না দেখে নীরব দর্শক হয়ে গেল। শ্যামলি তার অবস্থা দেখে প্রশ্ন করার ইচ্ছা তাকলেও আর করেনি। মাহিন, ক্যান্টিনে ফিরে গিয়ে আনমনা ভাবে পানি দিয়ে মুখটা ধুয়ে এক কাপ রং চা পান করলো। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে ট্রেনটি শ্রীমঙ্গল স্টেশনে পৌছবে বলে মাইকে ঘোষণা করা হলো। মাহিন চলে আসলো সিটে। ব্যাগ গুলো গুছিয়ে নিলো। বিদায় ক্ষণে,তপুকে সাংবাদিক সৈয়দ ফারুক আহমদ রচিত “মানবতায় সাংবাদিক” বইটি উপহার হিসেবে দিয়ে বললো এই বইটির লেখক আমার বাবা। শ্যামলি আনমনা হয়ে গেল। কৌতুহল রয়ে গেল । জানা হলো না অশ্র সিক্ত নয়নের অদৃশ্য রচনা। মাহিন উভয়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গন্তব্যে চলে গেল। ফারহানা বুঝতে পারলো শ্যামলি অন্তরের আবেদন। তবুও অবুঝের মত পাশ কাটিয়ে গেল। শ্যামলিরা কুলাউড়া রেলস্টেশনে নেমে একটি সিএনজি ভাড়া করে বড়লেখার লঘাটি গ্রামে নিজ বাড়িতে পৌঁছলো। পরদিন তপু গ্রামে ঘুরতে বেরিছে। শত শত বছরের পুরাতন খোঁজার মসজিদটি তাকে মুগ্ধ করেছে এবং এর পাশে বাগান গুলো সৌন্দর্য্য আরো আকর্ষণ করেছে। তপু তার বুবুকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামকরণ নিয়ে প্রশ্ন করলো। এই রাস্তা, সেই রাস্তা কেন শহীদরে নামে নামকরণে করা হলো না। কেন ? এরা কি এটার সমতুল্য? কোন প্রতিষ্ঠানের নামে অন্তর্ভূক্ত হলো না ইত্যাদি- ইত্যাদি। তপুরা নির্দিষ্ট সময় ব্যয় করে আনন্দ উপভোগ করে ফিরে আসলো। সে ঢাকায় ফিরে তার আম্মুকে জানালো একটা ফুলের বাগান করবে। আর এ বাগানের নাম একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার নামে নামকরণ করা হবে। তবে এ বাগান অন্য দিয়ে নয়, সে নিজের হাতে করবে। তার আম্মু বলেছেন-বাবা তুমি এখনো ছোট, তুমি কিভাবে বাগান করবে? আরেকটু বড় হও, তখন না হয় করো। তপু রবীঠাকুরের ছুটি গল্পের নায়কের মত বেপরোয়া। সে বাগান করবেই। কি আর করা। তপুর আম্মু বাসার ছোট্ট একটা জায়গা নির্ধারণ করে দিলেন বাগান করার জন্য। তারপর তপু তার আব্বুসহ বুবুদের সহযোগিতায় ছোট্ট জায়গাটিকে গাছ রোপণের উপযোগি করলো। এরপর বিভিন্ন জাতের পাঁচটি ফুলের চারা লাগালো ও সে আব্বুর সহযোগিতায় আরো গাছ লাগালো। সেই থেকে প্রতিদিন সকালে ও বিকালে তপু বাগানে পানি দেয় এবং সপ্তাহে একবার গাছের আগাছা পরিষ্কার করে। কয়েক মাস পর দেখা গেলো প্রায় প্রতিটি গাছে দু-তিনটা করে ফুল ফুটেছে। তপু এখন মহাখুশি। মুহাম্মদ বিন কাশেম সিন্ধু জয় করে যতটুকু কৃতিত্ব অর্জন করে ছিলেন ও বখতিয়ার খলজি বঙ্গ বিজয় করে যতটুকু সাফল্যের হাসি হেসে ছিলেন । তেমনি তপুর বাগানে ফুল ফোটায় সে তাদের চেয়ে বেশি খুশি হয়েছে। তপুর বাবা-মাও খুব খুশি তার সাফল্য দেখে। সেইদিন ১৯৭৫ সালের ১৪ আগষ্ট বিকেলে তপুর বাবা-মা, বুবু-আপা ছাদে বসে আড্ডা দিচ্ছে। শহীদ সৈয়দ আহমদ গার্ডেন সাইনবোর্ড ও নবফুটন্ত বাগনের ফুল দেখে তার বাবা বলেন-তপু বলতো তোমার বাগান এতা সুন্দুর হলো কিভাবে? তপু বললো-আমি আমার বাগানের যত্ন নিয়েছি, শ্রম দিয়েছি ও কষ্ট করেছি। তাই আমার বাগান এতো সুন্দর হয়েছে।

তপুর বাবা বলেন, তদ্রুপ আমরা আমাদের জন্মভুমি, আমাদের স্বাধীনতা, আমাদের বিজয়ের জন্য পরিশ্রম, মেধা ও সর্বোপরি জীবন দিয়ে আজকের বাংলাদেশ সৃষ্টি করেছি। আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই দেশকে ভালবেসে জীবনের সকল বিলাসিতা ত্যাগ করে স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন। এই মহামানবের আহবানে তোমার দাদা সৈয়দ আহমদ যুদ্ধ করেছেন। তাই তোমার জীবনের জন্য যদি এভাবে কষ্ট কর,পরিশ্রম করো,মনযোগ সহকারে লেখাপড়া করো, নিজে মানবিক নিয়ম-নীতি গুলো মেনে চলো তাহলে তোমার জীবনও হয়ে উঠবে বাগানের মতো সুন্দর মনোহর। তোমার হাত ধরেই আগামীর মুক্তির সংগ্রাম অর্জন করতে পারবো। আর তোমাকে এক নামে চিনবে, তোমার প্রশংসা করবে। তোমার মাধ্যমেই আমরা বিজয়ের স্বাদ উপভোগ করবো। এটাইতো তোমার জীবনের লক্ষ্য হওয়া উচিত নয় কি? তপু বললো হ্যাঁ আব্বু। তবে আব্বু বঙ্গবন্ধু কে? মামনি তিনি আমাদের জাতির পিতা। তুমি আজ বাসার ছাদের উপর স্বাধীন ভাবে বাগান করেছো। কিন্ত তিনি (বঙ্গবন্ধু) না থাকলে এটি সম্ভব হতো না। তুমি সারা জীবন তাকে শ্রদ্ধা করবে। তপু বললো-জ্বি আব্বু। তারপর পরদিন সকালে ফজরের নামাজের পর তপুর বাবার কাছে লেন্ডফোনে একটি কল আসে। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে আওয়াজ আসে জাতির পিতাকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি হতবম্ব হয়ে বাসার সবাইকে ডেকে তুলেন। সবার কাছে ঘটনাটি খোলে বলেন। তারপর আবার ফোন আসলো। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে আওয়াজ আসলো আপনি নিরাপদে চলেন যান। ফোনটা রেখে দুই মেয়ে আর স্ত্রীকে সাথে নিয়ে বন্ধুর বাসায় চলে যান। সেখান থেকে এক আত্বীয়ের মাধ্যমে চট্টগ্রামের জেটিতে তাদের খালার বাসায় পাটিয়েন দেন। সেখান থেকে কয়েক মাস পর নৌপথে জাহাজে করে শেষমেষ ফ্রান্সে চলে। সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করে। এতোক্ষণ সেই তপুর সাথে ফ্রান্সের প্যারিস নগরীতে বসে একজন সাংবাদিক আলাপচারিতায় কথা গুলো স্মৃতিপটে ভেসে আসে। আজ গল্পের সেই ছোট্ট মেয়েটি বয়সের ভারে ভারক্লান্ত। কিন্তু তাদের বাবার আর কোন খুজঁ মিলেনি। বাবা ছিলেন একজন সাংবাদিক। পচাত্তরের পনের আগষ্টের পর তাকে ধরে নিয়ে হত্যা করা হয়। বাবার কথা মনে হতেই সেদিনকার তপু চোখের পানি ধরে রাখতে পারলো না। ফ্রান্সের আলোর উজ্জলতার মাঝেও এতোক্ষণ সব স্বাভাবিক চলছিল। কিন্তু হঠাং বাংলাদেশের বিজয়ের পশ্চাশ বছর উদযাপন টেলিভিশনের পর্দায় দেখে সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তর গুলো দিতে পারেনি। সে থেমে গেলো। শুধু চোখের জ্বলে ভরিয়ে দিলো সাংবাদিকের ডায়েরি। আর বড়বোন শ্যামলি ও মাহিনের কথা রেখে দিলাম আগামীর সূর্যদ্বয়ে।


লেখাটি শুধু মাত্র কল্পনার প্রতিচ্ছবি। বাস্তবতায় তার কোন মিল নেই।

লেখকঃ সৈয়দ মুন্তাছির রিমন

ফ্রি-ল্যান্স সাংবাদিক-প্যারিস, ফ্রান্স

নিউজ ডেক্স
আপডেটঃ ৫ জানুয়ারি, ২০২২
৩:৫২ অপরাহ্ণ
80 ভিউ

প্রবাসের ডায়েরিতে বিজয়ের স্মৃতি।

ডেস্ক নিউজ
আপডেটঃ ৫ জানুয়ারি, ২০২২ | ৩:৫২ 80 ভিউ

বিজয়ের মাস ডিসেম্বর। প্রকৃতিতে শীতকাল। চারিদিকে কুয়াশার চাঁদর। আকাশে সূর্য্য নেই বলে চলে। বাংলার পরিবেশে ঠান্ডা হাওয়ায় ছয়লাভ। তবুও তপু এই শহর গর্ভে সবুজের বিশালতার কোন চাপ কখনও অনুভব করেনি। সে শহীদ সাংবাদিক সেলিমা রহমান উচ্চ বিদ্যালয়ের ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রী। সে মায়ের কাছ থেকে গ্রামের অনেক গল্প শুনেছে । কিন্তু বাস্তবে তা কখনও দর্শন করেনি। অনেক সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তাদের গ্রামের বাড়ীতে যাওয়া হয়নি কখনও। কারণ আশির দশকে তার বড় বোনের জন্মের লগ্নে পারিবারিক বিবাদের জন্য যে চলে এসেছে ঢাকায়। তারপর থেকে আর গ্রামে যাওয়া হয়নি। আজ তার বাবা অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে ঢাকা শহরে শীর্ষে অবস্থান করছেন। তবুও

ফেলে আসা গ্রামের মানুষের প্রতি তার অসীম ভালবাসা। এ শহরে এসে অনেকে বিপদে পড়ে। কিন্তু তিনি তাদের সাহায্য করতে পিছু হটেননি। তবে অভিমানে-দুঃখে গ্রামে ক্ষণিকের জন্য ফিরে যেতে ইচ্ছে হয়নি। তপুর বড়বোন শ্যামলি ঢাকা কলেজের অনার্স ২য় বর্ষের ছাত্রী। তার সাথে গ্রামের বাড়ির ফারহানা লেখা-পড়া করছে । কিন্তু হোস্টেলে থেকে লেখা-পড়া খুবই কষ্ট কর। তাই শ্যামলি বন্ধুত্বের এক পর্যায় বাবা-মাকে রাজি করিয়ে বাসায় নিয়ে আসে। ফারহানা তাদের পরিবারে আগমনে তপুর বাবা-মা’র চিন্তা-চেতনা পরিবর্তন হতে শুরু করে। ধীরে ধীরে আত্মীয় স্বজনের সাথে সম্পর্ক শীতল হয়। স্কুল-কলেজে গুলো বিজয় দিবসের জন্য এক মাসের বন্ধ। এই ছুটিতে ছাত্র-ছাত্রীরা গ্রামে ফিরে যাচ্ছে। ফারহানা গ্রামে

চলে যাওয়ার প্রহর গুনছে। তপু বায়না ধরেছে সেও গ্রামে যাবে। বাবা-মাকে তার ইচ্ছার কথা জানিয়েছে। কিন্তু দুজনই কিছু বলছেন না। এদিকে শ্যামলি গ্রামে ছুটি কাটানোর কথা বাবা-মাকে বলার সাহস পাচ্ছে না। তাদেরও গ্রামে বেড়ানোর ইচ্ছা আছে। তবুও দুঃখে যেতে ইচ্ছে করছেন না। সেই চিন্তাময় মুহুর্তে ঘরে ফারহানা এসেছে। সে প্রবেশ করে বললো- চাচা আগামীকাল বাড়ী চলে যাবো। তিনি বললেন -ঠিক আছে মা, যাও। তাড়াতাড়ি ফিরে এসো। কিন্তু চাচা! মাগো থামলে কেন? তোমার কোন অসুবিধা। তা নয়, তবে শ্যামলি ও তপুকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতে চাইছি।

মা-মনি কিন্তু…। না, চাচা কিন্তু বলবেন না। আমার বাড়ি ছাড়া আর অন্য কোন বাড়িতে

যেতে দেবো না। আচ্ছা ঠিক আছে নিয়ে যাও, তবে দুদিনের বেশি থাকা চলবেনা। ঠিক আছে। ফারহানা রুম থেকে চলে এসে পাশের কক্ষে অপেক্ষমান দুজনকে রাজি হওয়ার সংবাদ দেয়া মাত্র তপু হৈ-চৈ আরম্ভ করে দিয়েছে। তার খুশিতে যেন আকাশের প্রতিটি তাঁরা মাটিতে খসে পড়ছে। পরদিন ৬.৪০ মিনিটে সিলেটের উদ্দেশ্যে কমলাপুর রেল ষ্টেশন থেকে পারাবত ট্রেনটি যাত্রা করবে। ইতোমধ্যে টিকেট বুকিং দেয়া হয়েছে। পবিত্র ফজরের নামাজ আদায় করা হয়েছে। ভোর পাঁচটা বাজে, তিন জনই গ্রামে ফিরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে তৈরি হয়ে গেছে। শ্যামলির বাবা এসেছেন কমলাপুর রেলষ্টেশনে গাড়ীতে নিরাপদে তুলে দেওয়ার জন্য। নির্দিষ্ট সমেয় ট্রেনটি ছেড়ে দিলো। তপু জানালার পাশে বসে আছে। বাহিরের

দৃর্শ্য গুলো অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছে। কিন্তু রেললাইনের পাশে দরিদ্র লোকের আবাসস্থল দেখে বুবুকে নানা প্রশ্ন করছে। বিমান বন্দর রেল স্টেশন থেকে মাহিন ট্রেনে উঠেছে। একটি কামরার মাঝে চারটি আসনের মধ্যে একটি তার সীট পড়েছে। সে অবশিষ্ট সীটে তুপরা বসে থাকতে দেখে তল্পি-তল্পা নির্দিষ্ট স্থানে রেখে অন্য কামরায় চলে যায়। ক্যান্টিনে সকালের হালকা নাস্তা খেয়ে সীটে ঘুমাচ্ছে। কয়েকঘন্টা পর আখাউড়া রেলষ্টেশন ট্রেন অতিক্রম করে। তখন এক লোক তাকে জাগিয়ে তুললো। স্যারি ভাই-বিরক্ত করার জন্য,সিটটা আমার। নো, থ্যাঙ্কস্, আপনি বসুন। অন্য কামরায় সিট আছে আমার। মাহিন চল আসলো তার নির্দিষ্ট সিটে। তখন এসে দেখলো তার সিটে তপুরা দখল করে বসে আছে।

শ্যামলি তাকে দেখতেই সিটটা ছেড়ে দিয়ে বসুন বলে পাশের বসে পড়লো। তপু ফারহানার কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে। মাহিন সংকোচবোধ নিয়ে সিটে বসলো। সে ব্যাগ থেকে মোস্তফা সেলিম সম্পাদিত ‘মুক্তিযুদ্ধে বড়লেখা‘ ইতিহাস গ্রন্থটি বের করে পড়ছে। ফারহানা সামনের সিট থেকে মাহিনকে লক্ষ করে বললো-আপনার সাথে পরিচিত হতে পারি কি? জ্বি, আমাকে বলছেন, হ্যাঁ, আপনাকে বলছি। অবশ্যই, আমার নাম মাহিন রহমান আর ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতায় অধ্যায়ন করছি। আপনি কি করছেন?- আমি ফারহানা, ঢাকা কলেজে আমরা দু’জনই অনার্সে পড়ছি। মাহিন ভাই আপনার হাতের বইটা কোথায় পেয়েছেন? কেন? না,এই লেখকের বাড়ি আমাদের এলাকায়। এজন্য প্রশ্ন করছি। ও, তাই। আমি গত বছর তিন বন্ধু

মাধবকুন্ডে বেড়াতে গিয়েছিলাম আর তখন সেই এলাকার শহরের বঙ্গবীর লাইব্রেরী থেকে স্থানীয় লেখকদের নানা বই সংগ্রহ করেছি। এলাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্য সমৃদ্ধ প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে এটা এনেছি। তখন তপুর ঘুম ভেঙ্গে গেলো। সে জেগে উঠেই বলে-ভাইয়া বইগুলো আমি কিভাবে সংগ্রহ করতে পারি? মাহিন বইগুলো সংগ্রহ করার তথ্য দিয়ে দিলো। এতোক্ষণ পাশে বসা শ্যামলি চুপ করে বসেছিল।

 

এই মাত্র কথা বললো,কিন্তু আপনার ব্যাপারে সবজানা হল,তবে বাড়িটা জানা হলো না। মাহিন প্রশ্ন করলো, আপনি কথা বলছেন? কেন ? অবাক হলেন। না সংশয়ে ছিলাম। আর বাড়িটা প্রকৃতির লীলা নিকেতন শ্রীমঙ্গলে। কিন্তু আপনার নামটা জানা হলো না । কেন-এতো কি জানা প্রয়োজন? যতোটা

ভাবছেন ততোটা নয়। যাক, নামটা শ্যামলি আর বাড়িটা সিলেটে হলেও এই প্রথম এখানে আগমন। তবে স্থায়ীভাবে ঢাকায় বসবাস করছি। তপু জানালা দিয়ে পাহাড়ি দর্শনের সময় বার বার প্রশ্ন করছে। শ্যামলি অনেক গুলো প্রশ্নের উত্তর সম্পর্কে ধারণা নেই। মাহিনের সাহায্য চাইলো। মাহিন তাকে পাশে বসিয়ে বিভিন্ন স্থান সম্পর্কে ধারণা দিয়ে চলছে। তখন মাহিনের ফোন বেজে উঠলো। সে ফোনটা রিসিভ করতেই দুঃসংবাদ। মাহিন তুই কোথায়? আমি-তো ট্রেনে আসছি। তুই ট্রেন থেকে থানায় আসিস। কেনো কি হয়েছে? আর বলিস নারে, কি বলবো? তোর বাবার লাশ পাওয়া গেছে। চাচাকে সন্ত্রাসীরা হত্যা করেছে। মাহিন, চাচা আর বেঁচে নেই। কি বলিস? হ্যাঁ, সত্যিই বলছি। মাহিনের চোখ দিয়ে অবিরাম ধারায় জল ঝরছে। এতো সুন্দর হাঁসিমাখা মুখটা লাল হয়ে গেল। সে সেখান থেকে অন্যত্র চল গেলো। তপু তার কান্না দেখে নীরব দর্শক হয়ে গেল। শ্যামলি তার অবস্থা দেখে প্রশ্ন করার ইচ্ছা তাকলেও আর করেনি। মাহিন, ক্যান্টিনে ফিরে গিয়ে আনমনা ভাবে পানি দিয়ে মুখটা ধুয়ে এক কাপ রং চা পান করলো। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে ট্রেনটি শ্রীমঙ্গল স্টেশনে পৌছবে বলে মাইকে ঘোষণা করা হলো। মাহিন চলে আসলো সিটে। ব্যাগ গুলো গুছিয়ে নিলো। বিদায় ক্ষণে,তপুকে সাংবাদিক সৈয়দ ফারুক আহমদ রচিত “মানবতায় সাংবাদিক” বইটি উপহার হিসেবে দিয়ে বললো এই বইটির লেখক আমার বাবা। শ্যামলি আনমনা হয়ে গেল। কৌতুহল রয়ে গেল । জানা হলো না অশ্র সিক্ত নয়নের অদৃশ্য রচনা। মাহিন উভয়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গন্তব্যে চলে গেল। ফারহানা বুঝতে পারলো শ্যামলি অন্তরের আবেদন। তবুও অবুঝের মত পাশ কাটিয়ে গেল। শ্যামলিরা কুলাউড়া রেলস্টেশনে নেমে একটি সিএনজি ভাড়া করে বড়লেখার লঘাটি গ্রামে নিজ বাড়িতে পৌঁছলো। পরদিন তপু গ্রামে ঘুরতে বেরিছে। শত শত বছরের পুরাতন খোঁজার মসজিদটি তাকে মুগ্ধ করেছে এবং এর পাশে বাগান গুলো সৌন্দর্য্য আরো আকর্ষণ করেছে। তপু তার বুবুকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামকরণ নিয়ে প্রশ্ন করলো। এই রাস্তা, সেই রাস্তা কেন শহীদরে নামে নামকরণে করা হলো না। কেন ? এরা কি এটার সমতুল্য? কোন প্রতিষ্ঠানের নামে অন্তর্ভূক্ত হলো না ইত্যাদি- ইত্যাদি। তপুরা নির্দিষ্ট সময় ব্যয় করে আনন্দ উপভোগ করে ফিরে আসলো। সে ঢাকায় ফিরে তার আম্মুকে জানালো একটা ফুলের বাগান করবে। আর এ বাগানের নাম একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার নামে নামকরণ করা হবে। তবে এ বাগান অন্য দিয়ে নয়, সে নিজের হাতে করবে। তার আম্মু বলেছেন-বাবা তুমি এখনো ছোট, তুমি কিভাবে বাগান করবে? আরেকটু বড় হও, তখন না হয় করো। তপু রবীঠাকুরের ছুটি গল্পের নায়কের মত বেপরোয়া। সে বাগান করবেই। কি আর করা। তপুর আম্মু বাসার ছোট্ট একটা জায়গা নির্ধারণ করে দিলেন বাগান করার জন্য। তারপর তপু তার আব্বুসহ বুবুদের সহযোগিতায় ছোট্ট জায়গাটিকে গাছ রোপণের উপযোগি করলো। এরপর বিভিন্ন জাতের পাঁচটি ফুলের চারা লাগালো ও সে আব্বুর সহযোগিতায় আরো গাছ লাগালো। সেই থেকে প্রতিদিন সকালে ও বিকালে তপু বাগানে পানি দেয় এবং সপ্তাহে একবার গাছের আগাছা পরিষ্কার করে। কয়েক মাস পর দেখা গেলো প্রায় প্রতিটি গাছে দু-তিনটা করে ফুল ফুটেছে। তপু এখন মহাখুশি। মুহাম্মদ বিন কাশেম সিন্ধু জয় করে যতটুকু কৃতিত্ব অর্জন করে ছিলেন ও বখতিয়ার খলজি বঙ্গ বিজয় করে যতটুকু সাফল্যের হাসি হেসে ছিলেন । তেমনি তপুর বাগানে ফুল ফোটায় সে তাদের চেয়ে বেশি খুশি হয়েছে। তপুর বাবা-মাও খুব খুশি তার সাফল্য দেখে। সেইদিন ১৯৭৫ সালের ১৪ আগষ্ট বিকেলে তপুর বাবা-মা, বুবু-আপা ছাদে বসে আড্ডা দিচ্ছে। শহীদ সৈয়দ আহমদ গার্ডেন সাইনবোর্ড ও নবফুটন্ত বাগনের ফুল দেখে তার বাবা বলেন-তপু বলতো তোমার বাগান এতা সুন্দুর হলো কিভাবে? তপু বললো-আমি আমার বাগানের যত্ন নিয়েছি, শ্রম দিয়েছি ও কষ্ট করেছি। তাই আমার বাগান এতো সুন্দর হয়েছে।

তপুর বাবা বলেন, তদ্রুপ আমরা আমাদের জন্মভুমি, আমাদের স্বাধীনতা, আমাদের বিজয়ের জন্য পরিশ্রম, মেধা ও সর্বোপরি জীবন দিয়ে আজকের বাংলাদেশ সৃষ্টি করেছি। আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই দেশকে ভালবেসে জীবনের সকল বিলাসিতা ত্যাগ করে স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন। এই মহামানবের আহবানে তোমার দাদা সৈয়দ আহমদ যুদ্ধ করেছেন। তাই তোমার জীবনের জন্য যদি এভাবে কষ্ট কর,পরিশ্রম করো,মনযোগ সহকারে লেখাপড়া করো, নিজে মানবিক নিয়ম-নীতি গুলো মেনে চলো তাহলে তোমার জীবনও হয়ে উঠবে বাগানের মতো সুন্দর মনোহর। তোমার হাত ধরেই আগামীর মুক্তির সংগ্রাম অর্জন করতে পারবো। আর তোমাকে এক নামে চিনবে, তোমার প্রশংসা করবে। তোমার মাধ্যমেই আমরা বিজয়ের স্বাদ উপভোগ করবো। এটাইতো তোমার জীবনের লক্ষ্য হওয়া উচিত নয় কি? তপু বললো হ্যাঁ আব্বু। তবে আব্বু বঙ্গবন্ধু কে? মামনি তিনি আমাদের জাতির পিতা। তুমি আজ বাসার ছাদের উপর স্বাধীন ভাবে বাগান করেছো। কিন্ত তিনি (বঙ্গবন্ধু) না থাকলে এটি সম্ভব হতো না। তুমি সারা জীবন তাকে শ্রদ্ধা করবে। তপু বললো-জ্বি আব্বু। তারপর পরদিন সকালে ফজরের নামাজের পর তপুর বাবার কাছে লেন্ডফোনে একটি কল আসে। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে আওয়াজ আসে জাতির পিতাকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি হতবম্ব হয়ে বাসার সবাইকে ডেকে তুলেন। সবার কাছে ঘটনাটি খোলে বলেন। তারপর আবার ফোন আসলো। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে আওয়াজ আসলো আপনি নিরাপদে চলেন যান। ফোনটা রেখে দুই মেয়ে আর স্ত্রীকে সাথে নিয়ে বন্ধুর বাসায় চলে যান। সেখান থেকে এক আত্বীয়ের মাধ্যমে চট্টগ্রামের জেটিতে তাদের খালার বাসায় পাটিয়েন দেন। সেখান থেকে কয়েক মাস পর নৌপথে জাহাজে করে শেষমেষ ফ্রান্সে চলে। সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করে। এতোক্ষণ সেই তপুর সাথে ফ্রান্সের প্যারিস নগরীতে বসে একজন সাংবাদিক আলাপচারিতায় কথা গুলো স্মৃতিপটে ভেসে আসে। আজ গল্পের সেই ছোট্ট মেয়েটি বয়সের ভারে ভারক্লান্ত। কিন্তু তাদের বাবার আর কোন খুজঁ মিলেনি। বাবা ছিলেন একজন সাংবাদিক। পচাত্তরের পনের আগষ্টের পর তাকে ধরে নিয়ে হত্যা করা হয়। বাবার কথা মনে হতেই সেদিনকার তপু চোখের পানি ধরে রাখতে পারলো না। ফ্রান্সের আলোর উজ্জলতার মাঝেও এতোক্ষণ সব স্বাভাবিক চলছিল। কিন্তু হঠাং বাংলাদেশের বিজয়ের পশ্চাশ বছর উদযাপন টেলিভিশনের পর্দায় দেখে সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তর গুলো দিতে পারেনি। সে থেমে গেলো। শুধু চোখের জ্বলে ভরিয়ে দিলো সাংবাদিকের ডায়েরি। আর বড়বোন শ্যামলি ও মাহিনের কথা রেখে দিলাম আগামীর সূর্যদ্বয়ে।


লেখাটি শুধু মাত্র কল্পনার প্রতিচ্ছবি। বাস্তবতায় তার কোন মিল নেই।
লেখকঃ সৈয়দ মুন্তাছির রিমন
ফ্রি-ল্যান্স সাংবাদিক-প্যারিস, ফ্রান্স

দৈনিক ডোনেট বাংলাদেশ সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ট্যাগ:

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:


































শীর্ষ সংবাদ:
এবার প্ল্যাকার্ড হাতে আন্দোলনে শাবি শিক্ষকরা আগামী ১৫ দিন তেলের দাম অপরিবর্তিত থাকবে: বাণিজ্যমন্ত্রী কাল থেকে উপজেলায় যাচ্ছে ওএমএসের চাল-আটা টেনিসকে বিদায় জানাচ্ছেন সানিয়া মির্জা বাংলাদেশের বোলিং কোচ হতে আগ্রহী শন টেইট দল বহিষ্কার করলেও কর্মী হিসেবে কাজ করে যাব: তৈমুর বিজেপিতে যোগ দিয়ে আলোচনায় অপর্ণা ভারতে ট্রেন দুর্ঘটনার তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য সিদ্ধিরগঞ্জে সেনাসদস্য হত্যায় ৩ ছিনতাইকারী গ্রেফতার ডাব পাড়া নিয়ে মান্নানকে পিটিয়ে হত্যায় বাবা-ছেলের যাবজ্জীবন তালেবানকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রত্যাশা পূরণ করতে হবে: চীন দোষ থাকলে সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে, তাই মেনে নেব: উপাচার্য মধুখালীতে ইয়াবা ট্যাবলেটসহ মাদক ব্যবসায়ী আটক মধুখালীতে কোভিড পরবর্তী করনীয় বিষয়ক প্রশিক্ষণ রাজশাহীতে অহরহ ছিনতাইয়ের ঘটনায় শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ ডুয়ানি’র এডহক কমিটি ঘোষণা CU Chhatra League clash,wounded 5 leader একদিনে আরও ৩০ লাখ করোনায় আক্রান্ত, মৃত্যু ৮ হাজার ভারতীয় নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজে বিস্ফোরণ, ৩ সেনা নিহত রাজধানীর যেসব এলাকায় গ্যাস থাকবে না আজ