বন্যাজয়ী বিনা ধান-১১ লাভবান করছে কৃষকদের - ডোনেট বাংলাদেশ

বর্ষার প্রতিকূলতা কোনোভাবেই কাটিয়ে উঠতে পারেন না ময়মনসিংহ জেলার সদর উপজেলার কৃষকেরা। আমন মৌসুমে ধান চাষ করে অর্ধেক ফলনও ঘরে ওঠে না তাদের। মাস দুয়েকের বেশি সময় পতিত থাকে জমি। এভাবে প্রতিবছরই লোকসানের মুখে পড়েন তারা।

তবে চলতি বছরের আমন মৌসুম একেবারে ভিন্নভাবে ধরা দিয়েছে ময়মনসিংহ সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলা গ্রামের কৃষকদের কাছে। ধানের ক্ষেত বন্যায় তলিয়ে গেলেও শতভাগ ফলন ঘরে তুলছেন সেখানকার কৃষক।
ওই এলাকার কৃষকদের কাছে আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিয়েছে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত বিনা ধান-১১। বন্যাসহিষ্ণু স্বল্পমেয়াদি এ ধানের চাষ করে কৃষকের মুখের হাসি চওড়া হয়েছে। সঙ্গে বাড়তি হিসেবে মিলেছে সরিষা আবাদের সুযোগ।

সম্প্রতি ময়মনসিংহ সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলা গ্রামে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মাঠে সোনালি রঙের বিনা ধান-১১ দোল খাচ্ছে। কিছু জমিতে ইতোমধ্যে ধান কাটা শেষ হয়েছে। মাঠে পৌঁছাতেই কৃষকদের চোখে মুখে গেল দারুণ আত্মতৃপ্তি।
ময়মনসিংহ শহর থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার দূরে ছাতিয়ানতলা গ্রামের কৃষকেরা এ প্রতিবেদককে জানান, ব্রহ্মপুত্র তীরের এ চরে বন্যা-বৃষ্টিতে ধানের ফলন একেবারেই পাওয়া যায় না। সারা বছর শুধু বোরো ধানেরই ভালো আবাদ হয়। কিন্তু এ বছর অনেকেই বিনা ধান-১১ আবাদ করে ভালো ফলন ঘরে তুলছেন। বোরো মৌসুম শুরুর আগে সরিষার আবাদও করতে পারবেন তারা।
বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) বিজ্ঞানীরা জানান, এ জাতটি বন্যা সহনশীল। এ ধান ২৫ দিন পর্যন্ত পানিতে ডুবে থাকলেও কোনো ক্ষতি হয় না। আর ফলনও বেশি। আবার উৎপাদন খরচও তুলনামূলক অনেক কম। মাত্র ১০৫ থেকে ১১০ দিনের মধ্যে ফলন ঘরে তোলা যায়। ফলে কৃষক বছরে অন্তত তিনটি ফসল করতে পারবেন এসব জমিতে।

কৃষকদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, একই জমি থেকে বছরে তিন ফসল চাষের সুযোগে তারা যেন নতুন করে জেগে উঠেছেন। এখন আর তাদের বন্যায় ধান ডুবে যাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হবে না। পড়তে হবে না আর্থিক ক্ষতিতে। অতীতের সব ক্ষতি এখন পুষিয়ে নেওয়ার পালা।

ছাতিয়ানতলা গ্রামের কৃষক আব্দুল আজিজ ঢাকা পোস্টকে বলেন, এবার দুই বিঘা জমিতে বিনা ধান-১১ চাষ করেছি। আমার জমির আশপাশের সবার চেয়ে আগে ধান ঘরে তুলতে পেরেছি। আমার ধান কাটা হয়ে গেছে কিন্তু পাশের জমির ধানে এখনো শীষ আসেনি। আমরা সবাই অবাক হয়ে গেছি এত ভালো জাতের ধান দেখে।

তিনি জানান, বিনার কর্মকর্তারা এ এলাকার কয়েকজন কৃষককে বিনা ধান-১১ চাষ করার পরামর্শ দেন। যারা এ ধান আবাদ করেছেন তারা সবাই লাভবান হয়েছেন। তাদের দেখে এবার অনেকেই এ ধান চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। বন্যাপ্রবণ এমন এলাকায় এ যেন সোনা পাওয়ার মতো বিষয়। এখন সরিষা রোপণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। এরপর বোরো ধান চাষ করবেন।

পাশ থেকে ওই গ্রামের সাঈদ নামে এক কৃষক বলেন, প্রচলিত জাতের চেয়ে এ জাতের ধানের ফলন চার থেকে পাঁচ মণ বেশি পেয়েছি। খরচ কম অথচ ফলন বেশি। এমন জাত সত্যিই আমাদের ভাগ্য বদল করে দেবে। বিনাকে অনেক ধন্যবাদ তারা আমাদের কাছে এসে ধানের জাতটি আবাদ করার কৌশল হাতে কলমে শিখিয়েছেন। তারা না বললে হয়তো অতীতের মতো বছরের পর বছর ক্ষতিতেই পড়তে হতো আমাদের।

গত দুই বছর বিনা তাদের ধানের বীজ দিয়েছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, বিনার প্রশিক্ষণ পাওয়া সব কৃষকেরা নিজেই বীজ উৎপাদন শিখেছে। এই ধান চাষ চরাঞ্চলের সব কৃষকদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারলেএ অঞ্চলের মানুষের অভাব থাকবে না।

বিনার বিজ্ঞানীরা জানান, শুধু ময়মনসিংহ নয়, চলতি বছর উত্তরের জনপদ রংপুরের বিভিন্ন এলাকা, বরেন্দ্রভূমি, গোপালগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কয়েক হাজার হেক্টর জমিতে জলমগ্নতাসহিষ্ণু, উচ্চফলনশীল ও আগাম আমন ধানের এ জাত চাষ হয়েছে।

কৃষি বিজ্ঞানীদের মতে, দেশে প্রতি বছর অতিবৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতা ও বন্যায় প্রায় ২০ লাখ হেক্টর জমির ধান কোনো না কোনোভাবে আংশিক বা সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাছাড়া জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়ের কারণে আকস্মিক বন্যা, অতি বন্যা, জোয়ারের বন্যা, পাহাড়ি ঢলের বন্যার কারণে আবাদি জমি ক্রমাগত কমছে। এসব বিষয় মাথায় রেখে বিনার বিজ্ঞানীরা উদ্ভাবন করেছেন জলমগ্নতাসহিষ্ণু ধানের জাত বিনা-১১। আমনের এ জাত ২০-২৫ দিন জলমগ্নতা সহ্য করার পরও বন্যা আক্রান্ত জমিতে হেক্টরপ্রতি পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ টন এবং বন্যামুক্ত স্বাভাবিক জমিতে ছয় থেকে সাড়ে ছয় টন পর্যন্ত ফলন দিতে সক্ষম।

বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) মহাপরিচালক ও বিনা ধান-১১ জাতটির উদ্ভাবক ড. মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম বলেন, দেশের টেকসই খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিনা ধান-১১ বিশেষ ভূমিকা রাখছে এবং ভবিষ্যতে আরও ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। স্থানীয় জাতের চেয়ে বিনা-১১ চাষে সার, পানিসহ বিভিন্ন খরচ ৫০ শতাংশ কম লাগে।

এ কৃষি বিজ্ঞানী বলেন, এ জাতটি আবাদে অনেক বড় সাড়া পাওয়া গেছে। কোথাও কোথাও বিঘাপ্রতি ২৭ মণ ধান উৎপাদন হয়েছে। এ ধানের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো পানির নিচে ২৫ দিন থাকলে, এমনকি পানিতে তলিয়ে পচে গেলেও শুকানোর পর ধানের গোড়া থেকে ফের ডগা বা পাতা গজায়। অর্থাৎ নতুন করে ধান রোপণ করতে হয় না।

তিনি জানান, দেশে প্রায় ৫২ লাখ হেক্টর জমিতে আমন ধান চাষ হয়েছে। এর মধ্যে বিনা-১১ জাতটি চাষ হয়েছে ছয়-সাত শতাংশ জমিতে। স্বল্প জীবনকাল বিশিষ্ট এসব জাত চাষ করে কৃষক দুই ফসলি জমিকে তিন-চার ফসলি জমিতে রূপান্তর করেছেন।

বিনা সূত্র জানায়, মধ্য আশ্বিন মাস থেকে এই ধান কাটা হয়। ফলে এ সময় ধানের খড় থেকে গো-খাদ্যের চাহিদা মেটে। কৃষক খড় বিক্রি করেও বাড়তি আয় করতে পারছেন। বিনা-১১ কৃষকের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে বর্তমানে সারা দেশে এক হাজারেরও বেশি মাঠ প্রদর্শনী করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (সম্প্রসারণ) মো. হাসানুজ্জামান কল্লোল ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমাদের দেশে কৃষিতে সবচেয়ে বড় সমস্যা বন্যা ও ঝড়-বৃষ্টি। এ প্রতিকূলতাকে জয় করতে বিনা ধান-১১ অগ্রণী ভূমিকা রাখছে। কৃষকদের মাঝ থেকেও ভালো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। যা খুবই ইতিবাচক। বন্যা সহনশীল এ ধানটির চাষ চরাঞ্চলসহ বন্যাকবলিত এলাকার কৃষকদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে।

বর্ষার প্রতিকূলতা কোনোভাবেই কাটিয়ে উঠতে পারেন না ময়মনসিংহ জেলার সদর উপজেলার কৃষকেরা। আমন মৌসুমে ধান চাষ করে অর্ধেক ফলনও ঘরে ওঠে না তাদের। মাস দুয়েকের বেশি সময় পতিত থাকে জমি। এভাবে প্রতিবছরই লোকসানের মুখে পড়েন তারা।

তবে চলতি বছরের আমন মৌসুম একেবারে ভিন্নভাবে ধরা দিয়েছে ময়মনসিংহ সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলা গ্রামের কৃষকদের কাছে। ধানের ক্ষেত বন্যায় তলিয়ে গেলেও শতভাগ ফলন ঘরে তুলছেন সেখানকার কৃষক।
ওই এলাকার কৃষকদের কাছে আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিয়েছে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত বিনা ধান-১১। বন্যাসহিষ্ণু স্বল্পমেয়াদি এ ধানের চাষ করে কৃষকের মুখের হাসি চওড়া হয়েছে। সঙ্গে বাড়তি হিসেবে মিলেছে সরিষা আবাদের সুযোগ।

সম্প্রতি ময়মনসিংহ সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলা গ্রামে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মাঠে সোনালি রঙের বিনা ধান-১১ দোল খাচ্ছে। কিছু জমিতে ইতোমধ্যে ধান কাটা শেষ হয়েছে। মাঠে পৌঁছাতেই কৃষকদের চোখে মুখে গেল দারুণ আত্মতৃপ্তি।
ময়মনসিংহ শহর থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার দূরে ছাতিয়ানতলা গ্রামের কৃষকেরা এ প্রতিবেদককে জানান, ব্রহ্মপুত্র তীরের এ চরে বন্যা-বৃষ্টিতে ধানের ফলন একেবারেই পাওয়া যায় না। সারা বছর শুধু বোরো ধানেরই ভালো আবাদ হয়। কিন্তু এ বছর অনেকেই বিনা ধান-১১ আবাদ করে ভালো ফলন ঘরে তুলছেন। বোরো মৌসুম শুরুর আগে সরিষার আবাদও করতে পারবেন তারা।
বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) বিজ্ঞানীরা জানান, এ জাতটি বন্যা সহনশীল। এ ধান ২৫ দিন পর্যন্ত পানিতে ডুবে থাকলেও কোনো ক্ষতি হয় না। আর ফলনও বেশি। আবার উৎপাদন খরচও তুলনামূলক অনেক কম। মাত্র ১০৫ থেকে ১১০ দিনের মধ্যে ফলন ঘরে তোলা যায়। ফলে কৃষক বছরে অন্তত তিনটি ফসল করতে পারবেন এসব জমিতে।

কৃষকদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, একই জমি থেকে বছরে তিন ফসল চাষের সুযোগে তারা যেন নতুন করে জেগে উঠেছেন। এখন আর তাদের বন্যায় ধান ডুবে যাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হবে না। পড়তে হবে না আর্থিক ক্ষতিতে। অতীতের সব ক্ষতি এখন পুষিয়ে নেওয়ার পালা।

ছাতিয়ানতলা গ্রামের কৃষক আব্দুল আজিজ ঢাকা পোস্টকে বলেন, এবার দুই বিঘা জমিতে বিনা ধান-১১ চাষ করেছি। আমার জমির আশপাশের সবার চেয়ে আগে ধান ঘরে তুলতে পেরেছি। আমার ধান কাটা হয়ে গেছে কিন্তু পাশের জমির ধানে এখনো শীষ আসেনি। আমরা সবাই অবাক হয়ে গেছি এত ভালো জাতের ধান দেখে।

তিনি জানান, বিনার কর্মকর্তারা এ এলাকার কয়েকজন কৃষককে বিনা ধান-১১ চাষ করার পরামর্শ দেন। যারা এ ধান আবাদ করেছেন তারা সবাই লাভবান হয়েছেন। তাদের দেখে এবার অনেকেই এ ধান চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। বন্যাপ্রবণ এমন এলাকায় এ যেন সোনা পাওয়ার মতো বিষয়। এখন সরিষা রোপণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। এরপর বোরো ধান চাষ করবেন।

পাশ থেকে ওই গ্রামের সাঈদ নামে এক কৃষক বলেন, প্রচলিত জাতের চেয়ে এ জাতের ধানের ফলন চার থেকে পাঁচ মণ বেশি পেয়েছি। খরচ কম অথচ ফলন বেশি। এমন জাত সত্যিই আমাদের ভাগ্য বদল করে দেবে। বিনাকে অনেক ধন্যবাদ তারা আমাদের কাছে এসে ধানের জাতটি আবাদ করার কৌশল হাতে কলমে শিখিয়েছেন। তারা না বললে হয়তো অতীতের মতো বছরের পর বছর ক্ষতিতেই পড়তে হতো আমাদের।

গত দুই বছর বিনা তাদের ধানের বীজ দিয়েছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, বিনার প্রশিক্ষণ পাওয়া সব কৃষকেরা নিজেই বীজ উৎপাদন শিখেছে। এই ধান চাষ চরাঞ্চলের সব কৃষকদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারলেএ অঞ্চলের মানুষের অভাব থাকবে না।

বিনার বিজ্ঞানীরা জানান, শুধু ময়মনসিংহ নয়, চলতি বছর উত্তরের জনপদ রংপুরের বিভিন্ন এলাকা, বরেন্দ্রভূমি, গোপালগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কয়েক হাজার হেক্টর জমিতে জলমগ্নতাসহিষ্ণু, উচ্চফলনশীল ও আগাম আমন ধানের এ জাত চাষ হয়েছে।

কৃষি বিজ্ঞানীদের মতে, দেশে প্রতি বছর অতিবৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতা ও বন্যায় প্রায় ২০ লাখ হেক্টর জমির ধান কোনো না কোনোভাবে আংশিক বা সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাছাড়া জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়ের কারণে আকস্মিক বন্যা, অতি বন্যা, জোয়ারের বন্যা, পাহাড়ি ঢলের বন্যার কারণে আবাদি জমি ক্রমাগত কমছে। এসব বিষয় মাথায় রেখে বিনার বিজ্ঞানীরা উদ্ভাবন করেছেন জলমগ্নতাসহিষ্ণু ধানের জাত বিনা-১১। আমনের এ জাত ২০-২৫ দিন জলমগ্নতা সহ্য করার পরও বন্যা আক্রান্ত জমিতে হেক্টরপ্রতি পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ টন এবং বন্যামুক্ত স্বাভাবিক জমিতে ছয় থেকে সাড়ে ছয় টন পর্যন্ত ফলন দিতে সক্ষম।

বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) মহাপরিচালক ও বিনা ধান-১১ জাতটির উদ্ভাবক ড. মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম বলেন, দেশের টেকসই খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিনা ধান-১১ বিশেষ ভূমিকা রাখছে এবং ভবিষ্যতে আরও ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। স্থানীয় জাতের চেয়ে বিনা-১১ চাষে সার, পানিসহ বিভিন্ন খরচ ৫০ শতাংশ কম লাগে।

এ কৃষি বিজ্ঞানী বলেন, এ জাতটি আবাদে অনেক বড় সাড়া পাওয়া গেছে। কোথাও কোথাও বিঘাপ্রতি ২৭ মণ ধান উৎপাদন হয়েছে। এ ধানের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো পানির নিচে ২৫ দিন থাকলে, এমনকি পানিতে তলিয়ে পচে গেলেও শুকানোর পর ধানের গোড়া থেকে ফের ডগা বা পাতা গজায়। অর্থাৎ নতুন করে ধান রোপণ করতে হয় না।

তিনি জানান, দেশে প্রায় ৫২ লাখ হেক্টর জমিতে আমন ধান চাষ হয়েছে। এর মধ্যে বিনা-১১ জাতটি চাষ হয়েছে ছয়-সাত শতাংশ জমিতে। স্বল্প জীবনকাল বিশিষ্ট এসব জাত চাষ করে কৃষক দুই ফসলি জমিকে তিন-চার ফসলি জমিতে রূপান্তর করেছেন।

বিনা সূত্র জানায়, মধ্য আশ্বিন মাস থেকে এই ধান কাটা হয়। ফলে এ সময় ধানের খড় থেকে গো-খাদ্যের চাহিদা মেটে। কৃষক খড় বিক্রি করেও বাড়তি আয় করতে পারছেন। বিনা-১১ কৃষকের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে বর্তমানে সারা দেশে এক হাজারেরও বেশি মাঠ প্রদর্শনী করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (সম্প্রসারণ) মো. হাসানুজ্জামান কল্লোল ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমাদের দেশে কৃষিতে সবচেয়ে বড় সমস্যা বন্যা ও ঝড়-বৃষ্টি। এ প্রতিকূলতাকে জয় করতে বিনা ধান-১১ অগ্রণী ভূমিকা রাখছে। কৃষকদের মাঝ থেকেও ভালো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। যা খুবই ইতিবাচক। বন্যা সহনশীল এ ধানটির চাষ চরাঞ্চলসহ বন্যাকবলিত এলাকার কৃষকদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে।

বন্যাজয়ী বিনা ধান-১১ লাভবান করছে কৃষকদের

ডেস্ক নিউজ
আপডেটঃ ২০ নভেম্বর, ২০২১ | ৬:৪৮ 54 ভিউ
বর্ষার প্রতিকূলতা কোনোভাবেই কাটিয়ে উঠতে পারেন না ময়মনসিংহ জেলার সদর উপজেলার কৃষকেরা। আমন মৌসুমে ধান চাষ করে অর্ধেক ফলনও ঘরে ওঠে না তাদের। মাস দুয়েকের বেশি সময় পতিত থাকে জমি। এভাবে প্রতিবছরই লোকসানের মুখে পড়েন তারা। তবে চলতি বছরের আমন মৌসুম একেবারে ভিন্নভাবে ধরা দিয়েছে ময়মনসিংহ সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলা গ্রামের কৃষকদের কাছে। ধানের ক্ষেত বন্যায় তলিয়ে গেলেও শতভাগ ফলন ঘরে তুলছেন সেখানকার কৃষক। ওই এলাকার কৃষকদের কাছে আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিয়েছে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত বিনা ধান-১১। বন্যাসহিষ্ণু স্বল্পমেয়াদি এ ধানের চাষ করে কৃষকের মুখের হাসি চওড়া হয়েছে। সঙ্গে বাড়তি হিসেবে মিলেছে সরিষা আবাদের সুযোগ। সম্প্রতি ময়মনসিংহ সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলা গ্রামে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মাঠে সোনালি রঙের বিনা ধান-১১ দোল খাচ্ছে। কিছু জমিতে ইতোমধ্যে ধান কাটা শেষ হয়েছে। মাঠে পৌঁছাতেই কৃষকদের চোখে মুখে গেল দারুণ আত্মতৃপ্তি। ময়মনসিংহ শহর থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার দূরে ছাতিয়ানতলা গ্রামের কৃষকেরা এ প্রতিবেদককে জানান, ব্রহ্মপুত্র তীরের এ চরে বন্যা-বৃষ্টিতে ধানের ফলন একেবারেই পাওয়া যায় না। সারা বছর শুধু বোরো ধানেরই ভালো আবাদ হয়। কিন্তু এ বছর অনেকেই বিনা ধান-১১ আবাদ করে ভালো ফলন ঘরে তুলছেন। বোরো মৌসুম শুরুর আগে সরিষার আবাদও করতে পারবেন তারা। বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) বিজ্ঞানীরা জানান, এ জাতটি বন্যা সহনশীল। এ ধান ২৫ দিন পর্যন্ত পানিতে ডুবে থাকলেও কোনো ক্ষতি হয় না। আর ফলনও বেশি। আবার উৎপাদন খরচও তুলনামূলক অনেক কম। মাত্র ১০৫ থেকে ১১০ দিনের মধ্যে ফলন ঘরে তোলা যায়। ফলে কৃষক বছরে অন্তত তিনটি ফসল করতে পারবেন এসব জমিতে। কৃষকদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, একই জমি থেকে বছরে তিন ফসল চাষের সুযোগে তারা যেন নতুন করে জেগে উঠেছেন। এখন আর তাদের বন্যায় ধান ডুবে যাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হবে না। পড়তে হবে না আর্থিক ক্ষতিতে। অতীতের সব ক্ষতি এখন পুষিয়ে নেওয়ার পালা। ছাতিয়ানতলা গ্রামের কৃষক আব্দুল আজিজ ঢাকা পোস্টকে বলেন, এবার দুই বিঘা জমিতে বিনা ধান-১১ চাষ করেছি। আমার জমির আশপাশের সবার চেয়ে আগে ধান ঘরে তুলতে পেরেছি। আমার ধান কাটা হয়ে গেছে কিন্তু পাশের জমির ধানে এখনো শীষ আসেনি। আমরা সবাই অবাক হয়ে গেছি এত ভালো জাতের ধান দেখে। তিনি জানান, বিনার কর্মকর্তারা এ এলাকার কয়েকজন কৃষককে বিনা ধান-১১ চাষ করার পরামর্শ দেন। যারা এ ধান আবাদ করেছেন তারা সবাই লাভবান হয়েছেন। তাদের দেখে এবার অনেকেই এ ধান চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। বন্যাপ্রবণ এমন এলাকায় এ যেন সোনা পাওয়ার মতো বিষয়। এখন সরিষা রোপণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। এরপর বোরো ধান চাষ করবেন। পাশ থেকে ওই গ্রামের সাঈদ নামে এক কৃষক বলেন, প্রচলিত জাতের চেয়ে এ জাতের ধানের ফলন চার থেকে পাঁচ মণ বেশি পেয়েছি। খরচ কম অথচ ফলন বেশি। এমন জাত সত্যিই আমাদের ভাগ্য বদল করে দেবে। বিনাকে অনেক ধন্যবাদ তারা আমাদের কাছে এসে ধানের জাতটি আবাদ করার কৌশল হাতে কলমে শিখিয়েছেন। তারা না বললে হয়তো অতীতের মতো বছরের পর বছর ক্ষতিতেই পড়তে হতো আমাদের। গত দুই বছর বিনা তাদের ধানের বীজ দিয়েছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, বিনার প্রশিক্ষণ পাওয়া সব কৃষকেরা নিজেই বীজ উৎপাদন শিখেছে। এই ধান চাষ চরাঞ্চলের সব কৃষকদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারলেএ অঞ্চলের মানুষের অভাব থাকবে না। বিনার বিজ্ঞানীরা জানান, শুধু ময়মনসিংহ নয়, চলতি বছর উত্তরের জনপদ রংপুরের বিভিন্ন এলাকা, বরেন্দ্রভূমি, গোপালগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কয়েক হাজার হেক্টর জমিতে জলমগ্নতাসহিষ্ণু, উচ্চফলনশীল ও আগাম আমন ধানের এ জাত চাষ হয়েছে। কৃষি বিজ্ঞানীদের মতে, দেশে প্রতি বছর অতিবৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতা ও বন্যায় প্রায় ২০ লাখ হেক্টর জমির ধান কোনো না কোনোভাবে আংশিক বা সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাছাড়া জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়ের কারণে আকস্মিক বন্যা, অতি বন্যা, জোয়ারের বন্যা, পাহাড়ি ঢলের বন্যার কারণে আবাদি জমি ক্রমাগত কমছে। এসব বিষয় মাথায় রেখে বিনার বিজ্ঞানীরা উদ্ভাবন করেছেন জলমগ্নতাসহিষ্ণু ধানের জাত বিনা-১১। আমনের এ জাত ২০-২৫ দিন জলমগ্নতা সহ্য করার পরও বন্যা আক্রান্ত জমিতে হেক্টরপ্রতি পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ টন এবং বন্যামুক্ত স্বাভাবিক জমিতে ছয় থেকে সাড়ে ছয় টন পর্যন্ত ফলন দিতে সক্ষম। বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) মহাপরিচালক ও বিনা ধান-১১ জাতটির উদ্ভাবক ড. মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম বলেন, দেশের টেকসই খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিনা ধান-১১ বিশেষ ভূমিকা রাখছে এবং ভবিষ্যতে আরও ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। স্থানীয় জাতের চেয়ে বিনা-১১ চাষে সার, পানিসহ বিভিন্ন খরচ ৫০ শতাংশ কম লাগে। এ কৃষি বিজ্ঞানী বলেন, এ জাতটি আবাদে অনেক বড় সাড়া পাওয়া গেছে। কোথাও কোথাও বিঘাপ্রতি ২৭ মণ ধান উৎপাদন হয়েছে। এ ধানের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো পানির নিচে ২৫ দিন থাকলে, এমনকি পানিতে তলিয়ে পচে গেলেও শুকানোর পর ধানের গোড়া থেকে ফের ডগা বা পাতা গজায়। অর্থাৎ নতুন করে ধান রোপণ করতে হয় না। তিনি জানান, দেশে প্রায় ৫২ লাখ হেক্টর জমিতে আমন ধান চাষ হয়েছে। এর মধ্যে বিনা-১১ জাতটি চাষ হয়েছে ছয়-সাত শতাংশ জমিতে। স্বল্প জীবনকাল বিশিষ্ট এসব জাত চাষ করে কৃষক দুই ফসলি জমিকে তিন-চার ফসলি জমিতে রূপান্তর করেছেন। বিনা সূত্র জানায়, মধ্য আশ্বিন মাস থেকে এই ধান কাটা হয়। ফলে এ সময় ধানের খড় থেকে গো-খাদ্যের চাহিদা মেটে। কৃষক খড় বিক্রি করেও বাড়তি আয় করতে পারছেন। বিনা-১১ কৃষকের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে বর্তমানে সারা দেশে এক হাজারেরও বেশি মাঠ প্রদর্শনী করা হচ্ছে। এ বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (সম্প্রসারণ) মো. হাসানুজ্জামান কল্লোল ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমাদের দেশে কৃষিতে সবচেয়ে বড় সমস্যা বন্যা ও ঝড়-বৃষ্টি। এ প্রতিকূলতাকে জয় করতে বিনা ধান-১১ অগ্রণী ভূমিকা রাখছে। কৃষকদের মাঝ থেকেও ভালো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। যা খুবই ইতিবাচক। বন্যা সহনশীল এ ধানটির চাষ চরাঞ্চলসহ বন্যাকবলিত এলাকার কৃষকদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে।

দৈনিক ডোনেট বাংলাদেশ সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ট্যাগ:

সংশ্লিষ্ট সংবাদ: