বাংলা সাহিত্য ও বর্ষায় বিমুগ্ধতা - ডোনেট বাংলাদেশ

বর্ষা বৃষ্টির ঋতু। বৃষ্টি প্রকৃতির মুখ অনন্য রঙে রাঙিয়ে অপরূপ এক রূপ সৃষ্টি করে। পাতার গা থেকে ধুয়ে যায় ধূলা, মলিন ঘাসের গায়ে আরেকটু জাগে সজীবতা। গ্রীষ্মের খরতাপের পরে নামে একটু স্বস্তি। মেঘ ভেসে যায় সারা বেলা, তার ফাঁকে ফাঁকে রোদের খেলা সে-ও আরেক চমৎকার রূপ। বর্ষায় মাঠে ঘাটে আসে জোয়ারের জল, মুষলধারে বারিপতন রোমাঞ্চিত করে মনের চার কোণ। সে কোণের ঢেউ লাগে গায়কের স্বরে-সুরে, আঁকিয়ের আলপনায়, কবির কবিতায়, কথাসাহিত্যিকের কথার নানান শৈল্পিকতায়।

ষড়ঋতুর মধ্যে বর্ষা ঋতুর বিভা-বৈচিত্র্যের অনুসঙ্গ নিয়ে যত গান, যত কবিতা, যত গল্প, যত চিঠি, যত উপন্যাস আর যত অনুচ্চারিত উচ্চার সাহিত্যের খাতায় রচিত হয়েছে তা আর কোনও ঋতু নিয়ে এতটা হয়নি। শুধু কি সাহিত্য! যাচিত জীবনের বিমুগ্ধতায় বর্ষার যে প্রভাব, তা আর কোনও ঋতু থেকে প্রত্যক্ষ হয় না। বর্ষা যেন অনিন্দ্য আনন্দ নিয়ে আসে প্রকৃতির সন্তান মানুষের মধ্যে। মানুষ যেন অন্য এক আবিরে রঙিন হয়ে ওঠে এই বর্ষায়।

বাংলা সাহিত্যের কাব্যের দিকে যদি তাকাই, তবে দেখতে পাই, সকল যুগের সকল কালে সকল কবির কবিতায় কোথাও না কোথাও, কোনও না কোনও একটি কবিতায় বৃষ্টি এসেছে, মেঘ এসেছে, জোয়ার এসেছে, না হয় এসেছে বর্ষার কোনও ফুল পাখি ফল অথবা বিষণ্ণ মুখ, ঝরঝর ফোঁটা, কাঁদায় পিছল পথের পর্দা। মধ্যযুগের কবি কালীদাসের কবিতায় যেমন বর্ষা পাই; চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে, বিদ্যাপতি, গোবিন্দ দাস, রায়শেখর, মনোহর দাস বাসুদেব ঘোষের বৈষ্ণব পদাবলীতেও বর্ষার বর্ণনা পাই আকুল ও আবেগের স্বরে। ‘দীঘিটি গিয়াছে ভরে/ সিঁড়িটি গিয়েছে ডুবে,/ কাণায় কাণায় কাঁপে জল;/ বৃষ্টি-ঘায়ে… বায়ু-ঘায়ে পড়িতেছে নুয়ে নুয়ে/ আধ-ফোটা কুমুদ কমল।/ তীরে-নারিকেল-মূলে থল্ থল্ করে জল,/ ডাহুক ডাহুকী কূলে ডাকে;/ শ্রেণী দিয়া মরালীর ভাসিছে তুলিয়া গ্রীবা,/ লুকাইছে কভু দাম-ঝাঁকে।’ ( শ্রাবণ, অক্ষুয় কুমার বড়াল)।

কবিতার পর যদি বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় ধারা ছোট গল্পের দিতে চোখ ফেরাই, তবে সেখানেও লক্ষ করব যে, ছোট গল্পে বর্ষা কবিতার চেয়ে কম জোয়ার নিয়ে উল্লেখিত হয়নি। বরং দেখা যায় কবিতার চেয়ে আরও বিস্তৃতভাবে ছোট গল্পে বর্ষার ব্যঞ্জনা ব্যবহৃত হয়েছে হাত-পা ছড়িয়ে। কবিতায় যেহেতু ভাবের সংকোচন থাকে, সেহেতু তার উল্লেখে পরিমিতি বোধ রাখতে হয় বিধায় কবিতায় বর্ষা যতটা আঁকা, গল্পে এসে তা সম্প্রসারিত। শতকে শতকে দশকে দশকে এমন অবস্থা যে, গল্পের পাতা উল্টালেই বর্ষার জল, ঝড়, বর্ষণ উল্লেখিত। এখানে একটি গল্পের কথা বলা যাক; আধুনিক লেখকদের মধ্যে শক্তিশালী লেখক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। তার ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’ ছোট গল্পটি পড়তে গেলে দেখা হয় বর্ষার সাথে। সেখানে বর্ষাকে টের পাই গল্পে চরিত্রের মনের অবস্থা বোঝাতে; “এই মনোরম মনোটোনাস শহরে অনেকদিন পর আজ সুন্দর বৃষ্টি হলো। রাত এগারোটা পার হয় হয়, এখনো রাস্তার রিকশা চলছে ছল ছল করে যেনো গোটিয়ার বিলে কেউ নৌকা বাইছে, ‘তাড়াতাড়ি করো বাহে, ঢাকার গাড়ি বুঝি ছাড়ি যায়।’ আমার জানলায় রোদন-রূপসী বৃষ্টির মাতাল মিউজিক, পাতাবাহারের ভিজে গন্ধভরা সারি, বিষাদবর্ণ দেওয়াল; অনেকদিন পর আজ আমার ভারি ভালো লাগছে। ছমছম করা এই রাত্রি, আমারি জন্যে তৈরি এরকম লোনলী-লগ্ন আমি কতোদিন পাইনি, কতোকাল, কোনোদিন নয়।” প্রবীণ নয়, যান্ত্রিক যুগের নবীনতম গল্পকারকেও বর্ষার কোনও একটি মুহূর্ত মোহিত করে, তার প্রমাণ পাই যখন পড়ি, ‘সন্ধ্যার পর হাতে নিয়েছিলাম গল্পের বই। দুটো গল্প পড়া শেষ করে জানালার পর্দা সরিয়ে ওপাশে তাকালাম। শ্রাবণের রাত। সেই বিকেল থেকে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে। জানালার গ্লাসে জমেছে ফোঁটায় ফোঁটায় জল। আবার গল্পের বইয়ে মনোযোগ দিই। রাত বাড়ে। ঘোর বর্ষার রাত।’ (বৃষ্টির গল্প, নাসির উদ্দীন বাকী)। কথাসাহিত্যের মধ্যে ছোট গল্পে বর্ষা যতটা প্রবল, অন্য স্থানে ততটা না। ছোট গল্পে বর্ষা যেন বাঁধভাঙা।

বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে বড় উঠান বলেই ধরা হয় কথাসাহিত্যের উপন্যাসের উঠানকে। উপন্যাসের কাহিনি বিনির্মাণে, আবহদৃশ্য তৈরিতে, বাঁক বদলে, কথার বিস্তারে বর্ষাকে দেখা যায় প্রকৃতির সঙ্গী হয়ে বার বার আসতে। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া এমন কোনও বাংলা ঔপন্যাসিক তাঁর উপন্যাস তৈরি করেননি, যেখানে বর্ষা ঋতু এপিঠ-ওপিঠ আসেনি। সমরেশ বসুর বিখ্যাত উপন্যাস ‘গঙ্গা’। এ উপন্যাসটির দিকে যদি লক্ষ করি তবে দেখা যায়, একটি মুহূর্তকে জীবন্ত করে তুলতে উপন্যাসটিতে বর্ষার মেঘ আর বৃষ্টির বর্ণনা হয়েছে চমৎকার ভাবে। ‘দুদিন ধরে মহিষকালো আকাশে কেবল বিদ্যুতের ঘটা গেল। বৃষ্টি হল ফিসফিস করে। তারপর মহিষগুলো দাপাদাপি করল। বৃষ্টি এল মুষলধারে। মেঘ নামল গড়িয়ে গড়িয়ে, জড়িয়ে ধরতে আসছে যেন গোটা গঙ্গার বুকখানি। বাজ পড়ল হুঙ্কার দিয়ে। পূবসাগরে রুদ্র ঝড় শুরু হল হঠাৎ।’ (গঙ্গা, সমরেশ বসু)।

এবার মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাসের দিকে লক্ষ করা যাক। উপন্যাসে কুবেরের জীবন-মান ফুটিয়ে তুলতে তার ঘরের অবস্থা বর্ণনায় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বর্ষাকে উপস্থাপন করেছেন এভাবে, ‘রাত্রি বাড়তে থাকে, বৃষ্টি ধরিবার কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। পিসি ঢেঁকি ঘরে গিয়া ঝাঁপ বন্ধ করিয়া গুইয়া পড়ে। ভাইদের পাশে শুইয়া গোপির দুচোখ ঘুমে জড়াইয়া আসে। শ্রান্ত কুবেরের চোয়াল ভাঙ্গিয়া হাই উঠে, বাহিরে চলিতে থাকে অবিরাম বর্ষণ। কিছুক্ষণ বৃষ্টি হইবার পর ঘরের ফুটা কোণ দিয়ে ভিতরে জল পড়িতে আরম্ভ করিয়াছে।’ (পদ্মা নদীর মাঝি, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়)। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’, অদ্বৈত মল্লবর্মণের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’, জহির রায়হানের ‘হাজার বছর ধরে’, হুমায়ূন আহমেদের ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’সহ অসংখ্য উপন্যাসে বর্ষা তার স্বরূপ নিয়ে আবির্ভূত হয়েছে।

উপন্যাস, গল্প, কবিতার মতো প্রবন্ধ প্রবল পাঠকপ্রিয় সাহিত্য নয়। অন্য সাহিত্যের মতো রোমান্টিকও নয়। প্রবন্ধ কাহিনি নির্ভর নয়, চরিত্র নির্ভর নয়। তথ্যনির্ভর, কিছুটা কঠিন। কঠিন হলেও প্রবন্ধে বর্ষা এসেছে। এখানেও বর্ষা প্রভাব বিস্তার করেছে। প্রবন্ধকারগণ মনোগত প্রবন্ধে বর্ষাঋতুর বিভা-ভৈরব কথা না বলে পারেননি। বর্ষা আসলে এমনই মোহিত করে যে, মানবমনকে নাড়িয়ে-চাড়িয়ে চপল-চঞ্চল করে তোলে বৃষ্টির মতোই নূপুর নৃত্যাঙ্গে। তাই প্রত্যক্ষ করা যায়, প্রাবন্ধিকেরাও বর্ষার রূপে প্রভাবিত। তাঁরা সাহিত্যে বর্ষার কথা বলেছেন তাঁদের মতো করে। ‘আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি যে, যে দিকে যতদূর দৃষ্টি যায় সমগ্র আকাশ বর্ষায় ভরে গিয়েছে। মাথার উপর থেকে অবিরাম অবিরল অবিচ্ছিন্ন বৃষ্টির ধারা পড়ছে। সে ধারা এত সূক্ষ্ম নয় যে চোখ এড়িয়ে যায়, অথচ এত স্থূল নয় যে তা চোখ জুড়ে থাকে। আর কানে আসছে তার একটানা আওয়াজ; সে আওয়াজ কখনো মনে হয় নদীর কুলুধ্বনি, কখনো মনে হয় তা পাতার মর্মর।’ (বর্ষা, প্রমথ চৌধুরী)। আবার বৈশ্বয়িক উষ্ণতার কামড়ে ঋতুর পরিবর্তিত রূপের কথা পাই হাসান আজিজুল হকের ‘প্রেম গাঢ় হয় বর্ষায় নয়, শরতে’ প্রবন্ধের মধ্যে, ‘বর্ষা আমার ভীষণ প্রিয়। কিন্তু কয়েক বছর ধরে দেখছি এ সময় যথেষ্ট বর্ষণ হচ্ছে না। আগে ছোটবেলায় দেখেছি একটানা সাত-আট দিন বৃষ্টি হতো। পথ-ঘাট সব ভেসে যেত। রাঢ়ের মাঠ যেগুলো শুকনো খটখট করত, সেগুলো ডুবে যেত। …কিন্তু এখন আর তেমন দেখি না। কোথায় গেল রাতের সেই একটানা বৃষ্টি!’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্যের প্রাণপুরুষ। সাহিত্যের এমন কোনও স্থান নেই, যেখানে এই প্রবাদপুরুষের হাতের ছোঁয়া লাগেনি। তাঁর কথা বলতে গেলে, বাংলা সাহিত্যের সারা সাহিত্যে বর্ষা যতটা বৈচিত্র্য নিয়ে এসেছে কেবল তাঁর একার সাহিত্যেই তার চেয়ে অধিক বৈচিত্র্যময়তা নিয়ে বর্ষা বর্ণিত হয়েছে; তা স্বীকার করে তাঁর চিঠিতে বর্ষার কথা আলাপ করি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অসংখ্য পত্রসাহিত্য রচনা করেছেন। তথ্য পাওয়া যায়, পত্রসাহিত্যে তাঁর ঝোঁক ছিল আলাদা। অবসর আর মনের বেদনা ভাগাভাগি কিংবা যোগাযোগ করতে চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ আশ্রয় নিতেন। তাঁর পত্রসাহিত্যে বর্ষার চিত্র ও চরিত্রের ছায়া পাওয়া যায় বলবার মতো করে। ২১ জুন ১৯২২ সালে কালিদাস নাগের কাছে লেখা এক চিঠিতে দেখা যায় বর্ষায় কবি কেমন নেচে উঠতেন, কেমন অধির হয়ে উঠতেন পুলকে, ‘ঘোর বাদল নেমেছে। তাই আমার মনটা মানব-ইতিহাসের শতাব্দী-চিহ্নিত বেড়ার ভিতর থেকে ছুটে বেরিয়ে গেছে। আকাশ-রঙ্গভূমিতে জলবাতাসের মতনের যুগযুগান্তর-বাহিত স্মৃতি-স্পন্দন আজ আমার শিরায় শিরায় মেঘমল্লারের মীড় লাগিয়েছে। আমার কর্তব্যবুদ্ধি কোথায় ভেসে গেছে, সম্প্রতি আমি আমার সামনেকার ঐ সারবন্দী শালতালমহূয়াছাতিমের দলে ভিড়ে গেছি।’

এই ঋতুটির কথা, সাহিত্যে এই ঋতুটির অঙ্গ, অনুসঙ্গ, রূপ আর বৈচিত্র্যের কথা পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা বললেও শেষ হওয়ার নয়। কেননা, বর্ষা এমনই এক ঋতু, যা প্রকৃতির দশ দিককে বিমোহিত করে তোলে। সৌন্দর্যে ভরে ওঠে প্রকৃতির আপন আঙিনা। আর সে সৌন্দর্যে কখনও আবেগী, কখনও আনন্দে উচ্ছ্বসিত, কখনও বিষাদ বদনের বিরহী, কখনও বিমুগ্ধতায় কলমের কালিতে বাংলার সাহিত্যিক মন লেখার পাতায় লেখেন অমর লেখা। বর্ষার প্রতি এত মুগ্ধতা-বিমুগ্ধতা বলেই সাহিত্যে বর্ষার এত ব্যবহার। বর্ষাকে এত উপস্থাপন। এ কথা সত্য যে সাহিত্যের গুণেই বর্ষাঋতু আমাদের প্রকাশে এতটা সুন্দর, এতটা বর্ণিল। তা না হলে হয়তো বোবার মতো কেবল ভেতরে ভেতরে গুমরে কাঁদত বর্ষাঋতুবৈচিত্র্যের বর্ণালি ভাষার পুরোটা।

বর্ষা বৃষ্টির ঋতু। বৃষ্টি প্রকৃতির মুখ অনন্য রঙে রাঙিয়ে অপরূপ এক রূপ সৃষ্টি করে। পাতার গা থেকে ধুয়ে যায় ধূলা, মলিন ঘাসের গায়ে আরেকটু জাগে সজীবতা। গ্রীষ্মের খরতাপের পরে নামে একটু স্বস্তি। মেঘ ভেসে যায় সারা বেলা, তার ফাঁকে ফাঁকে রোদের খেলা সে-ও আরেক চমৎকার রূপ। বর্ষায় মাঠে ঘাটে আসে জোয়ারের জল, মুষলধারে বারিপতন রোমাঞ্চিত করে মনের চার কোণ। সে কোণের ঢেউ লাগে গায়কের স্বরে-সুরে, আঁকিয়ের আলপনায়, কবির কবিতায়, কথাসাহিত্যিকের কথার নানান শৈল্পিকতায়।

ষড়ঋতুর মধ্যে বর্ষা ঋতুর বিভা-বৈচিত্র্যের অনুসঙ্গ নিয়ে যত গান, যত কবিতা, যত গল্প, যত চিঠি, যত উপন্যাস আর যত অনুচ্চারিত উচ্চার সাহিত্যের খাতায় রচিত হয়েছে তা আর কোনও ঋতু নিয়ে এতটা হয়নি। শুধু কি সাহিত্য! যাচিত জীবনের বিমুগ্ধতায় বর্ষার যে প্রভাব, তা আর কোনও ঋতু থেকে প্রত্যক্ষ হয় না। বর্ষা যেন অনিন্দ্য আনন্দ নিয়ে আসে প্রকৃতির সন্তান মানুষের মধ্যে। মানুষ যেন অন্য এক আবিরে রঙিন হয়ে ওঠে এই বর্ষায়।

বাংলা সাহিত্যের কাব্যের দিকে যদি তাকাই, তবে দেখতে পাই, সকল যুগের সকল কালে সকল কবির কবিতায় কোথাও না কোথাও, কোনও না কোনও একটি কবিতায় বৃষ্টি এসেছে, মেঘ এসেছে, জোয়ার এসেছে, না হয় এসেছে বর্ষার কোনও ফুল পাখি ফল অথবা বিষণ্ণ মুখ, ঝরঝর ফোঁটা, কাঁদায় পিছল পথের পর্দা। মধ্যযুগের কবি কালীদাসের কবিতায় যেমন বর্ষা পাই; চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে, বিদ্যাপতি, গোবিন্দ দাস, রায়শেখর, মনোহর দাস বাসুদেব ঘোষের বৈষ্ণব পদাবলীতেও বর্ষার বর্ণনা পাই আকুল ও আবেগের স্বরে। ‘দীঘিটি গিয়াছে ভরে/ সিঁড়িটি গিয়েছে ডুবে,/ কাণায় কাণায় কাঁপে জল;/ বৃষ্টি-ঘায়ে… বায়ু-ঘায়ে পড়িতেছে নুয়ে নুয়ে/ আধ-ফোটা কুমুদ কমল।/ তীরে-নারিকেল-মূলে থল্ থল্ করে জল,/ ডাহুক ডাহুকী কূলে ডাকে;/ শ্রেণী দিয়া মরালীর ভাসিছে তুলিয়া গ্রীবা,/ লুকাইছে কভু দাম-ঝাঁকে।’ ( শ্রাবণ, অক্ষুয় কুমার বড়াল)।

কবিতার পর যদি বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় ধারা ছোট গল্পের দিতে চোখ ফেরাই, তবে সেখানেও লক্ষ করব যে, ছোট গল্পে বর্ষা কবিতার চেয়ে কম জোয়ার নিয়ে উল্লেখিত হয়নি। বরং দেখা যায় কবিতার চেয়ে আরও বিস্তৃতভাবে ছোট গল্পে বর্ষার ব্যঞ্জনা ব্যবহৃত হয়েছে হাত-পা ছড়িয়ে। কবিতায় যেহেতু ভাবের সংকোচন থাকে, সেহেতু তার উল্লেখে পরিমিতি বোধ রাখতে হয় বিধায় কবিতায় বর্ষা যতটা আঁকা, গল্পে এসে তা সম্প্রসারিত। শতকে শতকে দশকে দশকে এমন অবস্থা যে, গল্পের পাতা উল্টালেই বর্ষার জল, ঝড়, বর্ষণ উল্লেখিত। এখানে একটি গল্পের কথা বলা যাক; আধুনিক লেখকদের মধ্যে শক্তিশালী লেখক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। তার ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’ ছোট গল্পটি পড়তে গেলে দেখা হয় বর্ষার সাথে। সেখানে বর্ষাকে টের পাই গল্পে চরিত্রের মনের অবস্থা বোঝাতে; “এই মনোরম মনোটোনাস শহরে অনেকদিন পর আজ সুন্দর বৃষ্টি হলো। রাত এগারোটা পার হয় হয়, এখনো রাস্তার রিকশা চলছে ছল ছল করে যেনো গোটিয়ার বিলে কেউ নৌকা বাইছে, ‘তাড়াতাড়ি করো বাহে, ঢাকার গাড়ি বুঝি ছাড়ি যায়।’ আমার জানলায় রোদন-রূপসী বৃষ্টির মাতাল মিউজিক, পাতাবাহারের ভিজে গন্ধভরা সারি, বিষাদবর্ণ দেওয়াল; অনেকদিন পর আজ আমার ভারি ভালো লাগছে। ছমছম করা এই রাত্রি, আমারি জন্যে তৈরি এরকম লোনলী-লগ্ন আমি কতোদিন পাইনি, কতোকাল, কোনোদিন নয়।” প্রবীণ নয়, যান্ত্রিক যুগের নবীনতম গল্পকারকেও বর্ষার কোনও একটি মুহূর্ত মোহিত করে, তার প্রমাণ পাই যখন পড়ি, ‘সন্ধ্যার পর হাতে নিয়েছিলাম গল্পের বই। দুটো গল্প পড়া শেষ করে জানালার পর্দা সরিয়ে ওপাশে তাকালাম। শ্রাবণের রাত। সেই বিকেল থেকে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে। জানালার গ্লাসে জমেছে ফোঁটায় ফোঁটায় জল। আবার গল্পের বইয়ে মনোযোগ দিই। রাত বাড়ে। ঘোর বর্ষার রাত।’ (বৃষ্টির গল্প, নাসির উদ্দীন বাকী)। কথাসাহিত্যের মধ্যে ছোট গল্পে বর্ষা যতটা প্রবল, অন্য স্থানে ততটা না। ছোট গল্পে বর্ষা যেন বাঁধভাঙা।

বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে বড় উঠান বলেই ধরা হয় কথাসাহিত্যের উপন্যাসের উঠানকে। উপন্যাসের কাহিনি বিনির্মাণে, আবহদৃশ্য তৈরিতে, বাঁক বদলে, কথার বিস্তারে বর্ষাকে দেখা যায় প্রকৃতির সঙ্গী হয়ে বার বার আসতে। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া এমন কোনও বাংলা ঔপন্যাসিক তাঁর উপন্যাস তৈরি করেননি, যেখানে বর্ষা ঋতু এপিঠ-ওপিঠ আসেনি। সমরেশ বসুর বিখ্যাত উপন্যাস ‘গঙ্গা’। এ উপন্যাসটির দিকে যদি লক্ষ করি তবে দেখা যায়, একটি মুহূর্তকে জীবন্ত করে তুলতে উপন্যাসটিতে বর্ষার মেঘ আর বৃষ্টির বর্ণনা হয়েছে চমৎকার ভাবে। ‘দুদিন ধরে মহিষকালো আকাশে কেবল বিদ্যুতের ঘটা গেল। বৃষ্টি হল ফিসফিস করে। তারপর মহিষগুলো দাপাদাপি করল। বৃষ্টি এল মুষলধারে। মেঘ নামল গড়িয়ে গড়িয়ে, জড়িয়ে ধরতে আসছে যেন গোটা গঙ্গার বুকখানি। বাজ পড়ল হুঙ্কার দিয়ে। পূবসাগরে রুদ্র ঝড় শুরু হল হঠাৎ।’ (গঙ্গা, সমরেশ বসু)।

এবার মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাসের দিকে লক্ষ করা যাক। উপন্যাসে কুবেরের জীবন-মান ফুটিয়ে তুলতে তার ঘরের অবস্থা বর্ণনায় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বর্ষাকে উপস্থাপন করেছেন এভাবে, ‘রাত্রি বাড়তে থাকে, বৃষ্টি ধরিবার কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। পিসি ঢেঁকি ঘরে গিয়া ঝাঁপ বন্ধ করিয়া গুইয়া পড়ে। ভাইদের পাশে শুইয়া গোপির দুচোখ ঘুমে জড়াইয়া আসে। শ্রান্ত কুবেরের চোয়াল ভাঙ্গিয়া হাই উঠে, বাহিরে চলিতে থাকে অবিরাম বর্ষণ। কিছুক্ষণ বৃষ্টি হইবার পর ঘরের ফুটা কোণ দিয়ে ভিতরে জল পড়িতে আরম্ভ করিয়াছে।’ (পদ্মা নদীর মাঝি, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়)। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’, অদ্বৈত মল্লবর্মণের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’, জহির রায়হানের ‘হাজার বছর ধরে’, হুমায়ূন আহমেদের ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’সহ অসংখ্য উপন্যাসে বর্ষা তার স্বরূপ নিয়ে আবির্ভূত হয়েছে।

উপন্যাস, গল্প, কবিতার মতো প্রবন্ধ প্রবল পাঠকপ্রিয় সাহিত্য নয়। অন্য সাহিত্যের মতো রোমান্টিকও নয়। প্রবন্ধ কাহিনি নির্ভর নয়, চরিত্র নির্ভর নয়। তথ্যনির্ভর, কিছুটা কঠিন। কঠিন হলেও প্রবন্ধে বর্ষা এসেছে। এখানেও বর্ষা প্রভাব বিস্তার করেছে। প্রবন্ধকারগণ মনোগত প্রবন্ধে বর্ষাঋতুর বিভা-ভৈরব কথা না বলে পারেননি। বর্ষা আসলে এমনই মোহিত করে যে, মানবমনকে নাড়িয়ে-চাড়িয়ে চপল-চঞ্চল করে তোলে বৃষ্টির মতোই নূপুর নৃত্যাঙ্গে। তাই প্রত্যক্ষ করা যায়, প্রাবন্ধিকেরাও বর্ষার রূপে প্রভাবিত। তাঁরা সাহিত্যে বর্ষার কথা বলেছেন তাঁদের মতো করে। ‘আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি যে, যে দিকে যতদূর দৃষ্টি যায় সমগ্র আকাশ বর্ষায় ভরে গিয়েছে। মাথার উপর থেকে অবিরাম অবিরল অবিচ্ছিন্ন বৃষ্টির ধারা পড়ছে। সে ধারা এত সূক্ষ্ম নয় যে চোখ এড়িয়ে যায়, অথচ এত স্থূল নয় যে তা চোখ জুড়ে থাকে। আর কানে আসছে তার একটানা আওয়াজ; সে আওয়াজ কখনো মনে হয় নদীর কুলুধ্বনি, কখনো মনে হয় তা পাতার মর্মর।’ (বর্ষা, প্রমথ চৌধুরী)। আবার বৈশ্বয়িক উষ্ণতার কামড়ে ঋতুর পরিবর্তিত রূপের কথা পাই হাসান আজিজুল হকের ‘প্রেম গাঢ় হয় বর্ষায় নয়, শরতে’ প্রবন্ধের মধ্যে, ‘বর্ষা আমার ভীষণ প্রিয়। কিন্তু কয়েক বছর ধরে দেখছি এ সময় যথেষ্ট বর্ষণ হচ্ছে না। আগে ছোটবেলায় দেখেছি একটানা সাত-আট দিন বৃষ্টি হতো। পথ-ঘাট সব ভেসে যেত। রাঢ়ের মাঠ যেগুলো শুকনো খটখট করত, সেগুলো ডুবে যেত। …কিন্তু এখন আর তেমন দেখি না। কোথায় গেল রাতের সেই একটানা বৃষ্টি!’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্যের প্রাণপুরুষ। সাহিত্যের এমন কোনও স্থান নেই, যেখানে এই প্রবাদপুরুষের হাতের ছোঁয়া লাগেনি। তাঁর কথা বলতে গেলে, বাংলা সাহিত্যের সারা সাহিত্যে বর্ষা যতটা বৈচিত্র্য নিয়ে এসেছে কেবল তাঁর একার সাহিত্যেই তার চেয়ে অধিক বৈচিত্র্যময়তা নিয়ে বর্ষা বর্ণিত হয়েছে; তা স্বীকার করে তাঁর চিঠিতে বর্ষার কথা আলাপ করি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অসংখ্য পত্রসাহিত্য রচনা করেছেন। তথ্য পাওয়া যায়, পত্রসাহিত্যে তাঁর ঝোঁক ছিল আলাদা। অবসর আর মনের বেদনা ভাগাভাগি কিংবা যোগাযোগ করতে চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ আশ্রয় নিতেন। তাঁর পত্রসাহিত্যে বর্ষার চিত্র ও চরিত্রের ছায়া পাওয়া যায় বলবার মতো করে। ২১ জুন ১৯২২ সালে কালিদাস নাগের কাছে লেখা এক চিঠিতে দেখা যায় বর্ষায় কবি কেমন নেচে উঠতেন, কেমন অধির হয়ে উঠতেন পুলকে, ‘ঘোর বাদল নেমেছে। তাই আমার মনটা মানব-ইতিহাসের শতাব্দী-চিহ্নিত বেড়ার ভিতর থেকে ছুটে বেরিয়ে গেছে। আকাশ-রঙ্গভূমিতে জলবাতাসের মতনের যুগযুগান্তর-বাহিত স্মৃতি-স্পন্দন আজ আমার শিরায় শিরায় মেঘমল্লারের মীড় লাগিয়েছে। আমার কর্তব্যবুদ্ধি কোথায় ভেসে গেছে, সম্প্রতি আমি আমার সামনেকার ঐ সারবন্দী শালতালমহূয়াছাতিমের দলে ভিড়ে গেছি।’

এই ঋতুটির কথা, সাহিত্যে এই ঋতুটির অঙ্গ, অনুসঙ্গ, রূপ আর বৈচিত্র্যের কথা পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা বললেও শেষ হওয়ার নয়। কেননা, বর্ষা এমনই এক ঋতু, যা প্রকৃতির দশ দিককে বিমোহিত করে তোলে। সৌন্দর্যে ভরে ওঠে প্রকৃতির আপন আঙিনা। আর সে সৌন্দর্যে কখনও আবেগী, কখনও আনন্দে উচ্ছ্বসিত, কখনও বিষাদ বদনের বিরহী, কখনও বিমুগ্ধতায় কলমের কালিতে বাংলার সাহিত্যিক মন লেখার পাতায় লেখেন অমর লেখা। বর্ষার প্রতি এত মুগ্ধতা-বিমুগ্ধতা বলেই সাহিত্যে বর্ষার এত ব্যবহার। বর্ষাকে এত উপস্থাপন। এ কথা সত্য যে সাহিত্যের গুণেই বর্ষাঋতু আমাদের প্রকাশে এতটা সুন্দর, এতটা বর্ণিল। তা না হলে হয়তো বোবার মতো কেবল ভেতরে ভেতরে গুমরে কাঁদত বর্ষাঋতুবৈচিত্র্যের বর্ণালি ভাষার পুরোটা।

জোবায়ের মিলন
আপডেটঃ ১৮ নভেম্বর, ২০২১
৮:৪৭ পূর্বাহ্ণ
53 ভিউ

বাংলা সাহিত্য ও বর্ষায় বিমুগ্ধতা

জোবায়ের মিলন
আপডেটঃ ১৮ নভেম্বর, ২০২১ | ৮:৪৭ 53 ভিউ
বর্ষা বৃষ্টির ঋতু। বৃষ্টি প্রকৃতির মুখ অনন্য রঙে রাঙিয়ে অপরূপ এক রূপ সৃষ্টি করে। পাতার গা থেকে ধুয়ে যায় ধূলা, মলিন ঘাসের গায়ে আরেকটু জাগে সজীবতা। গ্রীষ্মের খরতাপের পরে নামে একটু স্বস্তি। মেঘ ভেসে যায় সারা বেলা, তার ফাঁকে ফাঁকে রোদের খেলা সে-ও আরেক চমৎকার রূপ। বর্ষায় মাঠে ঘাটে আসে জোয়ারের জল, মুষলধারে বারিপতন রোমাঞ্চিত করে মনের চার কোণ। সে কোণের ঢেউ লাগে গায়কের স্বরে-সুরে, আঁকিয়ের আলপনায়, কবির কবিতায়, কথাসাহিত্যিকের কথার নানান শৈল্পিকতায়। ষড়ঋতুর মধ্যে বর্ষা ঋতুর বিভা-বৈচিত্র্যের অনুসঙ্গ নিয়ে যত গান, যত কবিতা, যত গল্প, যত চিঠি, যত উপন্যাস আর যত অনুচ্চারিত উচ্চার সাহিত্যের খাতায় রচিত হয়েছে তা আর কোনও ঋতু নিয়ে এতটা হয়নি। শুধু কি সাহিত্য! যাচিত জীবনের বিমুগ্ধতায় বর্ষার যে প্রভাব, তা আর কোনও ঋতু থেকে প্রত্যক্ষ হয় না। বর্ষা যেন অনিন্দ্য আনন্দ নিয়ে আসে প্রকৃতির সন্তান মানুষের মধ্যে। মানুষ যেন অন্য এক আবিরে রঙিন হয়ে ওঠে এই বর্ষায়। বাংলা সাহিত্যের কাব্যের দিকে যদি তাকাই, তবে দেখতে পাই, সকল যুগের সকল কালে সকল কবির কবিতায় কোথাও না কোথাও, কোনও না কোনও একটি কবিতায় বৃষ্টি এসেছে, মেঘ এসেছে, জোয়ার এসেছে, না হয় এসেছে বর্ষার কোনও ফুল পাখি ফল অথবা বিষণ্ণ মুখ, ঝরঝর ফোঁটা, কাঁদায় পিছল পথের পর্দা। মধ্যযুগের কবি কালীদাসের কবিতায় যেমন বর্ষা পাই; চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে, বিদ্যাপতি, গোবিন্দ দাস, রায়শেখর, মনোহর দাস বাসুদেব ঘোষের বৈষ্ণব পদাবলীতেও বর্ষার বর্ণনা পাই আকুল ও আবেগের স্বরে। ‘দীঘিটি গিয়াছে ভরে/ সিঁড়িটি গিয়েছে ডুবে,/ কাণায় কাণায় কাঁপে জল;/ বৃষ্টি-ঘায়ে... বায়ু-ঘায়ে পড়িতেছে নুয়ে নুয়ে/ আধ-ফোটা কুমুদ কমল।/ তীরে-নারিকেল-মূলে থল্ থল্ করে জল,/ ডাহুক ডাহুকী কূলে ডাকে;/ শ্রেণী দিয়া মরালীর ভাসিছে তুলিয়া গ্রীবা,/ লুকাইছে কভু দাম-ঝাঁকে।’ ( শ্রাবণ, অক্ষুয় কুমার বড়াল)। কবিতার পর যদি বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় ধারা ছোট গল্পের দিতে চোখ ফেরাই, তবে সেখানেও লক্ষ করব যে, ছোট গল্পে বর্ষা কবিতার চেয়ে কম জোয়ার নিয়ে উল্লেখিত হয়নি। বরং দেখা যায় কবিতার চেয়ে আরও বিস্তৃতভাবে ছোট গল্পে বর্ষার ব্যঞ্জনা ব্যবহৃত হয়েছে হাত-পা ছড়িয়ে। কবিতায় যেহেতু ভাবের সংকোচন থাকে, সেহেতু তার উল্লেখে পরিমিতি বোধ রাখতে হয় বিধায় কবিতায় বর্ষা যতটা আঁকা, গল্পে এসে তা সম্প্রসারিত। শতকে শতকে দশকে দশকে এমন অবস্থা যে, গল্পের পাতা উল্টালেই বর্ষার জল, ঝড়, বর্ষণ উল্লেখিত। এখানে একটি গল্পের কথা বলা যাক; আধুনিক লেখকদের মধ্যে শক্তিশালী লেখক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। তার ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’ ছোট গল্পটি পড়তে গেলে দেখা হয় বর্ষার সাথে। সেখানে বর্ষাকে টের পাই গল্পে চরিত্রের মনের অবস্থা বোঝাতে; “এই মনোরম মনোটোনাস শহরে অনেকদিন পর আজ সুন্দর বৃষ্টি হলো। রাত এগারোটা পার হয় হয়, এখনো রাস্তার রিকশা চলছে ছল ছল করে যেনো গোটিয়ার বিলে কেউ নৌকা বাইছে, ‘তাড়াতাড়ি করো বাহে, ঢাকার গাড়ি বুঝি ছাড়ি যায়।’ আমার জানলায় রোদন-রূপসী বৃষ্টির মাতাল মিউজিক, পাতাবাহারের ভিজে গন্ধভরা সারি, বিষাদবর্ণ দেওয়াল; অনেকদিন পর আজ আমার ভারি ভালো লাগছে। ছমছম করা এই রাত্রি, আমারি জন্যে তৈরি এরকম লোনলী-লগ্ন আমি কতোদিন পাইনি, কতোকাল, কোনোদিন নয়।” প্রবীণ নয়, যান্ত্রিক যুগের নবীনতম গল্পকারকেও বর্ষার কোনও একটি মুহূর্ত মোহিত করে, তার প্রমাণ পাই যখন পড়ি, ‘সন্ধ্যার পর হাতে নিয়েছিলাম গল্পের বই। দুটো গল্প পড়া শেষ করে জানালার পর্দা সরিয়ে ওপাশে তাকালাম। শ্রাবণের রাত। সেই বিকেল থেকে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে। জানালার গ্লাসে জমেছে ফোঁটায় ফোঁটায় জল। আবার গল্পের বইয়ে মনোযোগ দিই। রাত বাড়ে। ঘোর বর্ষার রাত।’ (বৃষ্টির গল্প, নাসির উদ্দীন বাকী)। কথাসাহিত্যের মধ্যে ছোট গল্পে বর্ষা যতটা প্রবল, অন্য স্থানে ততটা না। ছোট গল্পে বর্ষা যেন বাঁধভাঙা। বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে বড় উঠান বলেই ধরা হয় কথাসাহিত্যের উপন্যাসের উঠানকে। উপন্যাসের কাহিনি বিনির্মাণে, আবহদৃশ্য তৈরিতে, বাঁক বদলে, কথার বিস্তারে বর্ষাকে দেখা যায় প্রকৃতির সঙ্গী হয়ে বার বার আসতে। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া এমন কোনও বাংলা ঔপন্যাসিক তাঁর উপন্যাস তৈরি করেননি, যেখানে বর্ষা ঋতু এপিঠ-ওপিঠ আসেনি। সমরেশ বসুর বিখ্যাত উপন্যাস ‘গঙ্গা’। এ উপন্যাসটির দিকে যদি লক্ষ করি তবে দেখা যায়, একটি মুহূর্তকে জীবন্ত করে তুলতে উপন্যাসটিতে বর্ষার মেঘ আর বৃষ্টির বর্ণনা হয়েছে চমৎকার ভাবে। ‘দুদিন ধরে মহিষকালো আকাশে কেবল বিদ্যুতের ঘটা গেল। বৃষ্টি হল ফিসফিস করে। তারপর মহিষগুলো দাপাদাপি করল। বৃষ্টি এল মুষলধারে। মেঘ নামল গড়িয়ে গড়িয়ে, জড়িয়ে ধরতে আসছে যেন গোটা গঙ্গার বুকখানি। বাজ পড়ল হুঙ্কার দিয়ে। পূবসাগরে রুদ্র ঝড় শুরু হল হঠাৎ।’ (গঙ্গা, সমরেশ বসু)। এবার মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাসের দিকে লক্ষ করা যাক। উপন্যাসে কুবেরের জীবন-মান ফুটিয়ে তুলতে তার ঘরের অবস্থা বর্ণনায় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বর্ষাকে উপস্থাপন করেছেন এভাবে, ‘রাত্রি বাড়তে থাকে, বৃষ্টি ধরিবার কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। পিসি ঢেঁকি ঘরে গিয়া ঝাঁপ বন্ধ করিয়া গুইয়া পড়ে। ভাইদের পাশে শুইয়া গোপির দুচোখ ঘুমে জড়াইয়া আসে। শ্রান্ত কুবেরের চোয়াল ভাঙ্গিয়া হাই উঠে, বাহিরে চলিতে থাকে অবিরাম বর্ষণ। কিছুক্ষণ বৃষ্টি হইবার পর ঘরের ফুটা কোণ দিয়ে ভিতরে জল পড়িতে আরম্ভ করিয়াছে।’ (পদ্মা নদীর মাঝি, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়)। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’, অদ্বৈত মল্লবর্মণের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’, জহির রায়হানের ‘হাজার বছর ধরে’, হুমায়ূন আহমেদের ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’সহ অসংখ্য উপন্যাসে বর্ষা তার স্বরূপ নিয়ে আবির্ভূত হয়েছে। উপন্যাস, গল্প, কবিতার মতো প্রবন্ধ প্রবল পাঠকপ্রিয় সাহিত্য নয়। অন্য সাহিত্যের মতো রোমান্টিকও নয়। প্রবন্ধ কাহিনি নির্ভর নয়, চরিত্র নির্ভর নয়। তথ্যনির্ভর, কিছুটা কঠিন। কঠিন হলেও প্রবন্ধে বর্ষা এসেছে। এখানেও বর্ষা প্রভাব বিস্তার করেছে। প্রবন্ধকারগণ মনোগত প্রবন্ধে বর্ষাঋতুর বিভা-ভৈরব কথা না বলে পারেননি। বর্ষা আসলে এমনই মোহিত করে যে, মানবমনকে নাড়িয়ে-চাড়িয়ে চপল-চঞ্চল করে তোলে বৃষ্টির মতোই নূপুর নৃত্যাঙ্গে। তাই প্রত্যক্ষ করা যায়, প্রাবন্ধিকেরাও বর্ষার রূপে প্রভাবিত। তাঁরা সাহিত্যে বর্ষার কথা বলেছেন তাঁদের মতো করে। ‘আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি যে, যে দিকে যতদূর দৃষ্টি যায় সমগ্র আকাশ বর্ষায় ভরে গিয়েছে। মাথার উপর থেকে অবিরাম অবিরল অবিচ্ছিন্ন বৃষ্টির ধারা পড়ছে। সে ধারা এত সূক্ষ্ম নয় যে চোখ এড়িয়ে যায়, অথচ এত স্থূল নয় যে তা চোখ জুড়ে থাকে। আর কানে আসছে তার একটানা আওয়াজ; সে আওয়াজ কখনো মনে হয় নদীর কুলুধ্বনি, কখনো মনে হয় তা পাতার মর্মর।’ (বর্ষা, প্রমথ চৌধুরী)। আবার বৈশ্বয়িক উষ্ণতার কামড়ে ঋতুর পরিবর্তিত রূপের কথা পাই হাসান আজিজুল হকের ‘প্রেম গাঢ় হয় বর্ষায় নয়, শরতে’ প্রবন্ধের মধ্যে, ‘বর্ষা আমার ভীষণ প্রিয়। কিন্তু কয়েক বছর ধরে দেখছি এ সময় যথেষ্ট বর্ষণ হচ্ছে না। আগে ছোটবেলায় দেখেছি একটানা সাত-আট দিন বৃষ্টি হতো। পথ-ঘাট সব ভেসে যেত। রাঢ়ের মাঠ যেগুলো শুকনো খটখট করত, সেগুলো ডুবে যেত। ...কিন্তু এখন আর তেমন দেখি না। কোথায় গেল রাতের সেই একটানা বৃষ্টি!’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্যের প্রাণপুরুষ। সাহিত্যের এমন কোনও স্থান নেই, যেখানে এই প্রবাদপুরুষের হাতের ছোঁয়া লাগেনি। তাঁর কথা বলতে গেলে, বাংলা সাহিত্যের সারা সাহিত্যে বর্ষা যতটা বৈচিত্র্য নিয়ে এসেছে কেবল তাঁর একার সাহিত্যেই তার চেয়ে অধিক বৈচিত্র্যময়তা নিয়ে বর্ষা বর্ণিত হয়েছে; তা স্বীকার করে তাঁর চিঠিতে বর্ষার কথা আলাপ করি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অসংখ্য পত্রসাহিত্য রচনা করেছেন। তথ্য পাওয়া যায়, পত্রসাহিত্যে তাঁর ঝোঁক ছিল আলাদা। অবসর আর মনের বেদনা ভাগাভাগি কিংবা যোগাযোগ করতে চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ আশ্রয় নিতেন। তাঁর পত্রসাহিত্যে বর্ষার চিত্র ও চরিত্রের ছায়া পাওয়া যায় বলবার মতো করে। ২১ জুন ১৯২২ সালে কালিদাস নাগের কাছে লেখা এক চিঠিতে দেখা যায় বর্ষায় কবি কেমন নেচে উঠতেন, কেমন অধির হয়ে উঠতেন পুলকে, ‘ঘোর বাদল নেমেছে। তাই আমার মনটা মানব-ইতিহাসের শতাব্দী-চিহ্নিত বেড়ার ভিতর থেকে ছুটে বেরিয়ে গেছে। আকাশ-রঙ্গভূমিতে জলবাতাসের মতনের যুগযুগান্তর-বাহিত স্মৃতি-স্পন্দন আজ আমার শিরায় শিরায় মেঘমল্লারের মীড় লাগিয়েছে। আমার কর্তব্যবুদ্ধি কোথায় ভেসে গেছে, সম্প্রতি আমি আমার সামনেকার ঐ সারবন্দী শালতালমহূয়াছাতিমের দলে ভিড়ে গেছি।’ এই ঋতুটির কথা, সাহিত্যে এই ঋতুটির অঙ্গ, অনুসঙ্গ, রূপ আর বৈচিত্র্যের কথা পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা বললেও শেষ হওয়ার নয়। কেননা, বর্ষা এমনই এক ঋতু, যা প্রকৃতির দশ দিককে বিমোহিত করে তোলে। সৌন্দর্যে ভরে ওঠে প্রকৃতির আপন আঙিনা। আর সে সৌন্দর্যে কখনও আবেগী, কখনও আনন্দে উচ্ছ্বসিত, কখনও বিষাদ বদনের বিরহী, কখনও বিমুগ্ধতায় কলমের কালিতে বাংলার সাহিত্যিক মন লেখার পাতায় লেখেন অমর লেখা। বর্ষার প্রতি এত মুগ্ধতা-বিমুগ্ধতা বলেই সাহিত্যে বর্ষার এত ব্যবহার। বর্ষাকে এত উপস্থাপন। এ কথা সত্য যে সাহিত্যের গুণেই বর্ষাঋতু আমাদের প্রকাশে এতটা সুন্দর, এতটা বর্ণিল। তা না হলে হয়তো বোবার মতো কেবল ভেতরে ভেতরে গুমরে কাঁদত বর্ষাঋতুবৈচিত্র্যের বর্ণালি ভাষার পুরোটা।

দৈনিক ডোনেট বাংলাদেশ সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ট্যাগ:

সংশ্লিষ্ট সংবাদ: