রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব স্থানীয় সরকারব্যবস্থা শক্তিশালী হচ্ছে না বিশেষজ্ঞদের অভিমত : শক্তিশালী করতে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি * মহিলা ভাইস চেয়ারম্যানদের কোনো কর্তৃত্ব নেই


অথর
র্নিবাচন নিউজ ডেক্স   ডোনেট বাংলাদেশ
প্রকাশিত :৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১০:৪০ পূর্বাহ্ণ | পঠিত : 127 বার
রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব স্থানীয় সরকারব্যবস্থা শক্তিশালী হচ্ছে না বিশেষজ্ঞদের অভিমত : শক্তিশালী করতে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি * মহিলা ভাইস চেয়ারম্যানদের কোনো কর্তৃত্ব নেই

স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করতে কোনো সরকারই কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি বলে অভিমত স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞদের। তারা জানান, স্থানীয় সরকার কমিশন গঠন হলেও সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর অনীহার কারণে পরবর্তী সময়ে সেটা বাতিল হয়ে যায়। তবে ক্ষমতার ঢাল হিসাবে ব্যবহার করতে স্থানীয় সরকারের স্তরগুলো এখনো ঠিক রাখা হয়েছে। যারা যখন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন, তারা ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠানে নিজেদের প্রতিনিধি বসান। নিজেদের মতো করে সেসব প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন। এ প্রসঙ্গে স্থানীয় সরকার গবেষক, কলাম লেখক ও সাবেক সচিব আবদুল লতিফ মণ্ডল বলেন, স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় যে নাজুক অবস্থা বিরাজ করছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে এ অবস্থা থেকে উত্তরণ সম্ভব। এজন্য কয়েকটি কাজ করার প্রয়োজন। এগুলোর দিকে রাজনৈতিক দলগুলোকে মনোযোগ দিতে হবে। তিনি বলেন, ‘স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণে চারটি কাজ করা দরকার। প্রথমত, রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকতে হবে। অর্থাৎ, সরকার ও বিরোধী দলে যারা থাকবেন, সবারই সদিচ্ছা থাকতে হবে। রাজনৈতি সদিচ্ছা ছাড়া পৃথিবীর কোনো দেশে ভালো কিছু হয়েছে, এমন নজির নেই। দ্বিতীয়ত, আর্থিকভাবে স্বনির্ভর হওয়া। সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ আর্থিকভাবে স্বনির্ভর নয়। সরকারের অনুদানের দিকে চেয়ে থাকতে হয়। নিজেদের রাজস্ব বৃদ্ধির চেষ্টা করতে চায় না এসব প্রতিষ্ঠানে নির্বাচিত হয়ে আসারা। তাদের ধারণা, রাজস্ব বৃদ্ধির চেষ্টা করলে তারা অজনপ্রিয় হয়ে পড়বেন। এজন্যই আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে স্থানীয় সরকারের লেজুড়বৃত্তিতা কমাতে হবে। চতুর্থ, স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধি বা সদস্য যে দলের হোক না কেন, তার সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচারণ করা যাবে না। তাকে কাজের সুযোগ ও পর্যাপ্ত বরাদ্দ দিতে হবে।’ এ প্রসঙ্গে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, দেশের স্থানীয় সরকারব্যবস্থার কোনো শক্তিই নেই। দেশে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা আছে, সেটাও বলার সুযোগ নেই। শুধু স্থানীয় সরকারের স্তরগুলো রয়েছে। তিনি বলেন, ‘স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় যে সমস্যা রয়েছে, তা থেকে উত্তরণের কোনো উপায়ও দেখি না। এটা এভাবেই চলবে। সামনের দিনগুলোয় অবস্থা আরও খারাপ হবে। কেননা দেশের জাতীয় সরকারব্যবস্থা ঠিক না থাকলে স্থানীয় সরকার ঠিক থাকে না।’ দেশের স্থানীয় সরকার ও নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে কাজ করে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্রতী। এর প্রধান নির্বাহী শারমিন মুর্শিদ বলেন, স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করতে সত্যিকারার্থে আমাদের দেশে কোনো কাজই হয়নি। স্থানীয় সরকার কমিশন করা হলেও সেটা বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণে কোনো ইচ্ছা, আগ্রহ ও নীতি সহায়তা নেই। যদিও স্থানীয় সরকার শক্তিশালী না হলে গণতন্ত্র শক্তিশালী হওয়া সম্ভব নয়। তিনি বলেন, উপজেলায় মহিলা ভাইস চেয়ারম্যানদের একটি পদ রয়েছে। কিন্তু তাদের কোনো কর্তৃত্ব নেই। ইউপিতে ১৩টি কমিটি থাকলেও সেগুলো কার্যকর নেই। তাছাড়া নির্বাচন প্রক্রিয়া ত্রুটিপূর্ণ হওয়ায় স্থানীয় সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষমতাসীনরা নিজেদের ঢাল হিসাবে ব্যবহার করছেন। এতকিছুর পরও স্থানীয় সরকারের স্তর বিন্যাস ঠিক আছে, এটা একটা আশার দিক। এছাড়া ইতিবাচক কোনো কিছু দেখি না আমি। এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ এবং জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, আইন প্রণয়ন করে স্থানীয় সরকারকে অনেক ক্ষমতা দেওয়া হলেও এর বাস্তবায়ন নেই। স্থানীয় সরকার কমিশন গঠন করা হলেও সেটা বাতিল করা হয়েছে। সরকার, রাজনীতিবিদদের সদিচ্ছা এবং জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা শক্তিশালী হবে না। তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে হলে চাহিদার আলোকে বাজেট বরাদ্দ করা দরকার। বাস্তবতা হচ্ছে-প্রতিনিয়ত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোয় বাজেট বরাদ্দ কমাচ্ছে সরকার। এছাড়া যে কোনো ছোটখাটো সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্যও মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন বাধ্যতামূলক করে দেওয়া হচ্ছে। উপজেলা পরিষদের সংসদ সদস্যরা উপদেষ্টা থাকার কথা থাকলেও তারা নির্বাহী ক্ষমতার চর্চা করছেন। এ কারণে উপজেলা চেয়ারম্যান ও সংসদ সদস্যদের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছে। উপজেলার উন্নয়নের চেয়ে তারা ভোট বাড়ানোর প্রতিযোগিতার মধ্যে রয়েছেন। আর উপজেলা, ইউনিয়ন পরিষদ, জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনে স্বচ্ছতা ও জবাদিহিতা নিশ্চিতকরণে কয়েকটি কমিটি থাকলেও সেটা বাস্তবায়নে কার্যকর কোনো ভূমিকা লক্ষ করা যাচ্ছে না। স্থানীয় সরকার বিভাগের তথ্যমতে, দেশে স্থানীয় সরকারের স্তর ৫টি রয়েছে। সেগুলো হলো-সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ। স্থানীয় সরকারের এসব স্তরের মোট প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৫ হাজার ৪৬৫টি। এসব প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পদে বর্তমানে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি রয়েছেন ৬৬ হাজার ৫৬৪ জন। এর মধ্যে দেশের ১২ সিটি করপোরেশনে মেয়র ১২ জন, সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলর ৪৬৫ জন এবং সংরক্ষিত মহিলা ওয়ার্ড কাউন্সিলর রয়েছেন ১৬৬ জন। আর পৌরসভার সংখ্যা ৩২৯টি। এর মধ্যে ৩১৬টি পৌরসভায় মেয়র ৩১৬ জন, সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলর ২ হাজার ৯৪৬ জন ও সংরক্ষিত ওয়ার্ড কাউন্সিলর রয়েছেন ৯৮২ জন। ৬১টি জেলা পরিষদে (পার্বত্য অঞ্চলের ৩টি ব্যতীত) ৬১ জন চেয়ারম্যান, সাধারণ সদস্য ৯১৫ জন এবং সংরক্ষিত সদস্য ৩০৬ জন রয়েছেন। উপজেলা পরিষদ রয়েছে ৪৯২টি। এসব প্রতিষ্ঠানে ৪৯২ জন চেয়ারম্যান, ৪৯২ জন ভাইস চেয়ারম্যান (পুরুষ) এবং ৪৯২ জন ভাইস চেয়ারম্যান (মহিলা) রয়েছেন। মোট ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে ৪ হাজার ৫৭১টি। এর মধ্যে নির্বাচিত চেয়ারম্যান রয়েছেন ৪ হাজার ৫৭১ জন, সাধারণ সদস্য ৪১ হাজার ১৩৯ জন এবং সংরক্ষিত নারী সদস্য ১৩ হাজার ৭১৩ জন। স্থানীয় সরকারের ২৩টি প্রতিষ্ঠানে ভোটের তারিখ ৭ অক্টোবর নির্ধারণ করে বৃহস্পতিবার তপশিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। স্থানীয় সরকারের ২৩ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১২টি উপজেলা পরিষদ, ছয়টি পৌরসভা ও চারটি সিটি করপোরেশনের ৫টি ওয়ার্ডের উপনির্বাচন রয়েছে। করোনায় আটকে থাকা প্রথম ধাপের স্থগিত ১৬১টি ইউনিয়ন পরিষদ ও ৯টি পৌরসভায় ২০ সেপ্টেম্বর ভোটের দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। আর ডিসেম্বরের মধ্যে সারা দেশের কমবেশি সাড়ে ৩ হাজার ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও উপজেলায় নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসি।







No Comments