সত্যতে অস্বস্তি, স্বস্তিতে বিভ্রান্তি – ডোনেট বাংলাদেশ

সত্যতে অস্বস্তি, স্বস্তিতে বিভ্রান্তি

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়
আপডেটঃ ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২২ | ১১:১০ 28 ভিউ
যে সত্য প্রকাশিত হয় তা আমাদের জন্য স্বস্তিদায়ক হয় না, ক্ষেত্রবিশেষে হতাশার জন্ম দেয়। পাশাপাশি যেসব খবর আমাদের মনে স্বস্তি বয়ে আনে তাতে আবার তথ্য-বিভ্রান্তি রয়েছে। গত সপ্তাহের সেরকম দুটি সংবাদ আলোচনার দাবি রাখে। প্রথম পীড়াদায়ক খবর হলো, আমরা দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে পারছি না। দিনকে দিন এর ব্যাপ্তি বেড়েই চলেছে। দ্বিতীয়টি হলো, গত অর্থবছরে রপ্তানির মাইলফলক অতিক্রম করার যে উচ্ছাস প্রকাশ করেছিলাম তাতে তথ্য-বিভ্রান্তি আছে। যে পরিমাণ রপ্তানি করেছি তার চেয়ে প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার কম অর্থ বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোতে জমা পড়েছে। তাহলে এই অর্থ গেল কোথায়? স্বাভাবিকভাবেই রপ্তানির উচ্ছাসটা মিলিয়ে গেল। অর্থাৎ আমাদের জীবনে খারাপ সংবাদের বেদনা তো আছেই,

যেটুকু ভালো সংবাদ পেয়েছি তাতে তথ্যগত বিভ্রান্তি রয়েছে। সারা বিশ্বের ১৮০টি দেশের দুর্নীতি নিয়ে কাজ করে জার্মানির বার্লিনভিত্তিক সংস্থা ‘ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল’। ১৯৯৩ সালের ৪ মে প্রতিষ্ঠিত এ সংস্থা প্রতি বছরই বিভিন্ন দেশের দুর্নীতির প্রতিবেদন প্রকাশ করে থাকে। বাংলাদেশে সংস্থাটির একটি শাখা কাজ করে-নাম তার ‘ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ’ (টিআইবি)। গত প্রায় তিন দশকে এ প্রতিষ্ঠানটি সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়েছে। তবে রাজনৈতিকভাবে যারা সরকার পরিচালনার দায়িত্বে থাকে তারা টিআইবি’র প্রতিবেদনকে প্রত্যাখ্যান করার প্রবণতা প্রদর্শন করে। অপরদিকে রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্যেই বিরোধী দলের কাছে প্রতিবেদনগুলো গ্রহণযোগ্যতা পায়। বিএনপি সরকারের আমলে টিআইবির প্রতিবেদনেই বাংলাদেশকে এক নম্বর দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। সেই

সময় বিএনপি’র তা পছন্দ হয়নি। কিন্তু বিরোধী দলে থাকা আওয়ামী লীগ তা লুফে নিয়েছিল এবং নির্বাচনের মাঠে সফল প্রয়োগ করেছিল। বর্তমানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে। স্বাভাবিকভাবেই এ দলের নেতাকর্মীদের কাছে প্রতিবেদনগুলো ভালো লাগবে না, বিপরীতভাবে বিএনপি’র নেতাকর্মীরা সেসব প্রতিবেদন রাজনৈতিক সুবিধায় কাজে লাগতে পারে। কিন্তু আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কাছে দুর্নীতির চিত্র রাজনৈতিক ক্ষমতায় টিকে থাকা কিংবা রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের কোনো বিষয় নয়। আমাদের কাছে দুর্নীতির প্রতিবেদনগুলো একটি সামাজিক দুরারোগ্য ব্যাধি হিসাবে পরিচিত এবং এর প্রতিপালনকারী হলো শাসকগোষ্ঠী; কিন্তু ভুক্তভোগী সর্বসাধারণ। টিআইবি দুর্নীতির সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে যে পদ্ধতি ব্যবহার করে তার নাম হলো ‘করাপশান পারসেপশান ইনডেক্স’ (সিপিআই)। এ সূচক দেখেই বোঝা

যাবে কোন দেশ কতটা দুর্নীতিগ্রস্ত। সার্বিক দুর্নীতির বাইরে পৃথকভাবে ‘সেবা খাতের দুর্নীতি, জাতীয় খানা জরিপ’ নামে গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে টিআইবি। এসব প্রতিবেদনে উঠে আসে সাধারণ মানুষ সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কিংবা সংস্থার সেবা নিতে গেলে কতখানি হয়রানি বা দুর্নীতির শিকার হয় সেই চিত্র। বাংলাদেশে টিআইবি ১৯৯৭, ২০০২, ২০০৫, ২০০৭, ২০১০, ২০১২, ২০১৫, ২০১৭ ও ২০২১ সালে খানা জরিপের ওপর প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সর্বশেষ ২০২১ সালের জরিপটি করা হয়েছে ২০২০ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে ২০২১ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত সময়কে বিবেচনায় নিয়ে। ১৭টি খাত ধরে এ গবেষণা কর্মটি পরিচালিত হয়। এ জরিপের প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয় ৩১ আগস্ট। প্রতিবেদনের সারকথা উদ্বেগজনক। দেশের

৭০ দশমিক ৯ শতাংশ বা প্রায় ৭১ শতাংশ পরিবার বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি খাত বা প্রতিষ্ঠানের সেবা নিতে গিয়ে দুর্নীতির শিকার হয়েছে। ২০২১ সালের সর্বোচ্চ দুর্নীতিগ্রস্ত খাত হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে পাসপোর্ট অফিস, তৃতীয় স্থানে রয়েছে বিআরটিএ (বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি)। এর পরের স্থানগুলোতে আছে যথাক্রমে-বিচারিক সেবা, সরকারি স্বাস্থ্যসেবা, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও ভ‚মি সেবা-শতকরা হার হিসাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ৭৪ দশমিক ৪ শতাংশ, পাসপোর্ট ৭০ দশমিক ৫ শতাংশ, বিআরটিএ ৬৮ দশমিক ৩ শতাংশ, বিচারিক সেবা ৫৬ দশমিক ৮ শতাংশ, সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে ৪৮ দশমিক ৭ শতাংশ, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে ৪৬ দশমিক ৬ শতাংশ

এবং ভ‚মি সেবায় ৪৬ দশমিক ৩ শতাংশ দুর্নীতির উপস্থিতি রয়েছে। সেবা নিতে গিয়ে খানা বা পরিবারগুলোকে সারা বছরে ঘুস দিতে হয়েছে ১০ হাজার ৮৩০ কোটি টাকা। এ দুর্নীতি ও ঘুসের মাত্রা বছর বছর বেড়েই চলছে। জরিপ বলছে, ২০১২ সালে দুর্নীতির শিকার পরিবারের হার ছিল ৬৭ দশমিক ৩ শতাংশ, ২০১৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৭ দশমিক ৮ শতাংশে এবং ২০২১ সালে ৭০ দশমিক ৯ শতাংশে। অন্যদিকে ২০১২ সালে পরিবারপ্রতি গড় ঘুসের পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৫৪২ টাকা, ২০১৭ সালে তা বেড়ে হয়েছিল ৫ হাজার ৯৩০ টাকা, আর ২০২১ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৪৬০ টাকায়। দুর্নীতির পরিমাণ আমাদের উদ্বেগের কারণ

নিশ্চয়ই। কিন্তু তার চেয়েও বেশি উদ্বেগের কারণ হলো দুর্নীতি বৃদ্ধির প্রবণতা। প্রতি বছরই দুর্নীতির হার ও পরিমাণ তার পূর্ববর্তী বছরকে অতিক্রম করছে। এর শেষ কোথায়? আমরা জানি, সরকারি মহলের পক্ষ থেকে ‘ভিত্তিহীন ও বানোয়াট’ বলার মধ্য দিয়েই এর পরিসমাপ্তি ঘটানো হবে। টিআইবির খানা জরিপে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দুর্নীতির শীর্ষে অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা সচিব বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে দুর্নীতি কমিয়ে আনার ব্যাপারে নানাবিধ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে পুলিশ সুপার থেকে শুরু করে অন্যান্য পদে বাছাই করা অফিসার নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।’ কোনো কিছুর উপস্থিতি থাকলেই তো তা কমিয়ে আনার প্রশ্ন আসে। তাই দুর্নীতির অভিযোগগুলোকে উপেক্ষা করা গেলেও অস্বীকার করা যাবে

না। বরং দুর্নীতি প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ লাঘব হতো। এ বিষয়ে টিআইবি প্রতিবেদনে ১০টি সুপারিশ করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে উলে­খযোগ্য হলো-দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) সক্রিয় করা, বিভিন্ন সেবা ডিজিটাইজড করা, ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু করা, দুর্নীতিতে জড়িতদের শুদ্ধাচার পুরস্কার বন্ধ করা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতে গণশুনানির আয়োজন করা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা। তবে এ জরিপে শুধু সেবা খাতের দুর্নীতির কথাই উলে­খ করা হয়েছে। সার্বিক দুর্নীতি বিচেনায় নিলে এর সঙ্গে যুক্ত হবে বড় বড় প্রকল্প ও সরকারি কেনাকাটার দুর্নীতিও। আমাদের দুর্ভোগের সময়কাল যতখানি দীর্ঘতর, স্বস্তি বা উচ্ছ¡াসের সময়কাল ততখানিই স্বল্পতর। আগস্টের গোড়ার দিকে ফলাও করে প্রচার করা হলো-২০২১-২২ অর্থবছরে আমাদের রপ্তানি রেকর্ড ছাড়িয়ে নতুন মাইলফলক সৃষ্টি করেছে। কারও কারও উচ্ছাসের মাত্রা এতটাই ছিল যে, তা আরেকটি সত্যকে ঢেকে দিয়েছিল। আমাদের রপ্তানি আয় ৫০ বিলিয়ন পেরিয়ে রেকর্ড পরিমাণ ৫২ বিলিয়ন ডলার হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু পাশাপাশি আমদানি ব্যয় রেকর্ড ছাড়িয়ে ৮৪ বিলিয়ন ডলার হয়েছিল। সে হিসাবে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ ৩২ বিলিয়ন ডলার। তারপরও রপ্তানি আয়কে একটি সন্তোষজনক স্তরে বিবেচনা করেছি। কিন্তু মাত্র এক মাস পেরোতে না পেরোতে উচ্ছাসের শিখায় জল ঢেলে দেওয়া হলো। দেখা দিয়েছে তথ্য-বিভ্রান্তি। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো বলছে, গত অর্থবছরে ৫২ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, পণ্য রপ্তানি বাবদ ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে আসা প্রাপ্ত অর্থের পরিমাণ ৪৩ বিলিয়ন ডলার। তাহলে বাদবাকি ৯ বিলিয়ন ডলার কোথায় গেল? অপরদিকে, ব্যালেন্স অব পেমেন্টে রপ্তানি দেখানো হয়েছে ৪৯ বিলিয়ন ডলার। একই বিষয়ে তিন রকমের তথ্য আমাদের বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলেছে। বাণিজ্য ও বাংলাদেশ ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনেক সময় শিপমেন্টের পরেও পণ্যের ওপর ডিসকাউন্ট দেওয়া হয়। তবে সে ক্ষেত্রে ১০ শতাংশের বেশি হেরফের হওয়ার কথা নয়। আমাদের ক্ষেত্রে অর্থপ্রাপ্তির পার্থক্য ১৬ শতাংশ। তাই অর্থ পাচারের আশঙ্কাকে নাকচ করা যায় না। প্রকৃত রপ্তানির চেয়ে প্রাপ্ত অর্থের পরিমাণ কম হওয়াকে যত যুক্তি দিয়েই উপস্থাপন করা হোক না কেন, প্রকৃত সত্য হলো আমরা গত অর্থবছরে ৫২ বিলিয়ন ডলারের বিপরীতে ৪৩ বিলিয়ন ডলার আয় করতে পেরেছি। আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার তহবিলে ৯ বিলিয়ন ডলার কম সংযুক্ত হয়েছে। সুতরাং আমরা রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিকভাবে সামান্যতম স্বস্তির ভেতরে নেই। কোনো জায়গাতেই জবাবদিহিতার কোনো ছিটেফোঁটা উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। সামাজিকভাবে প্রতিরোধে এগিয়ে আসতে না পারলে এ পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।

দৈনিক ডোনেট বাংলাদেশ সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ট্যাগ:

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:


শীর্ষ সংবাদ:
ওডেসায় সামরিক স্থাপনায় আঘাত হানল রাশিয়ার ড্রোন হাজারীবাগে আ.লীগ-বিএনপি সংঘর্ষ রাশিয়ার স্কুলে ভয়াবহ হামলায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৩ বিপিএলে খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক কত, জানাল বিসিবি ‘বড় ভাইদের আশ্বাসে’ অনশন বাতিল করে ক্যাম্পাসে ফিরলেন ইডেনের সেই নেত্রীরা উপস্থাপনায় অপু বিশ্বাসের অভিষেক উন্মুক্ত হলো ‘শেখ হাসিনা- অ্যা ট্রু লিজেন্ড’ প্রামাণ্য চলচ্চিত্র খালেদা জিয়াকে নিয়ে এবার স্প্যানিশ শিল্পীর গান সাংবাদিক রণেশ মৈত্র না ফেরার দেশে সাগর-রুনি হত্যা: ৯২ বারের মতো পেছাল তদন্ত প্রতিবেদন গুণগতমান সম্পন্ন বীজআখ উৎপাদন ও বিস্তারের কৌশল শীর্ষক ফরিদপুর চিনিকলে দিন ব্যাপি কর্মশালা কেন্দুয়ায় কৃষকলীগের ত্রি- বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত করোনায় একদিনে ছয়জনের মৃত্যু, শনাক্ত ৭১৮ করতোয়ায় নৌকাডুবিতে মৃ‌ত বেড়ে ৩৯ জাইকার ৬০ কোটি ডলার বাজেট সাপোর্টের আশা রাশিয়ায় স্কুলে বন্দুক হামলায় নিহত ৬, আহত ২০ হারুন পেলেন মোটরসাইকেল, বাহার আনারস, দারা চশমা বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি বাস্তবায়ন শীর্ষে জনপ্রশাসন, তলানিতে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় ব্লক মার্কেটে ৭৭ কোটি টাকার লেনদেন আমরণ অনশনের হুমকি ইডেন ছাত্রলীগের বহিষ্কৃতদের