স্বাস্থ্যসেবার বেহাল দশা আর কতকাল? – ডোনেট বাংলাদেশ

স্বাস্থ্যসেবার বেহাল দশা আর কতকাল?

মনজু আরা বেগম : সাবেক মহাব্যবস্থাপক, বিসিক
আপডেটঃ ৫ নভেম্বর, ২০২২ | ৫:১৫ 54 ভিউ
দেশে স্বাস্থ্যসেবা খাতের দৈন্যদশা, দুর্নীতি ও মানবতাবিবর্জিত কার্যকলাপের কারণে আমরা জনসাধারণ হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা-সেবা নিতে গিয়ে প্রতিদিন নানা হয়রানি ও সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছি। এ সংক্রান্ত খবর কিছুটা হলেও পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে। এসব খবরের কোনো কোনোটি মানুষকে এমনভাবে নাড়া দেয়, যা ভাষায় প্রকাশ করতে কষ্ট হয়। একটি খবরের শিরোনাম ছিল ‘হাসপাতালে ভুল চিকিৎসা, একমাত্র সন্তান হারিয়ে পাগলপ্রায় মা’। খবরে বলা হয়েছে, জোবাইদা আলম নামে এক নারী গত ৮ সেপ্টেম্বর তার আট বছরের একমাত্র সন্তান মরিয়ম জামানকে জ্বরের কারণে বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালের (শ্যামলী, ঢাকা) জরুরি বিভাগে ভর্তি করান। ভর্তি করানোর পর থেকেই তার সন্তানের রোগ নির্ণয় না করেই দু’জন ডাক্তার (আমি নাম উল্লেখ করছি

না) একটার পর একটা হাইপাওয়ার অ্যান্টিবায়োটিক ইনজেকশন ছোট্ট শিশুটির শরীরে পুশ করতে থাকেন। শিশুটির শারীরিক অবস্থা ক্রমাগত খারাপের দিকে যেতে থাকলে জোবাইদা তার সন্তানের জীবন রক্ষার্থে ডাক্তারের পা জড়িয়ে ধরে কাকুতি-মিনতি করলেও তারা তার কথায় কর্ণপাত করেননি। ভর্তির দু’দিন পর অর্থাৎ ১০ সেপ্টেম্বর শিশুটি মৃত্যুবরণ করে। শুধু তাই নয়, জোবাইদা আলম আরও অভিযোগ করেন, যে টেস্টের কথা বলে বিল ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেই টেস্ট আদৌ করা হয়নি। জোবাইদা আলম ওই হাসপাতালের দুজন ডাক্তারের বিরুদ্ধে তার মেয়েকে হত্যার অভিযোগ আনলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কোনো সাড়া দেয়নি। তিনি মেডিকেল কাউন্সিলসহ বিভিন্ন জায়গায় তার মেয়ের হত্যার বিচারের জন্য ঘুরছেন। জানি না তিনি তার প্রাণপ্রিয় একমাত্র

সন্তান হারানোর বিচার পাবেন কিনা। এ বছরের জানুয়ারি মাসে আমার এক স্বজনকে একই হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছিল। করোনার কথা বলে একটা ইনজেকশন দিতে হবে জানিয়ে রাত ১২টায় রোগীর সন্তানকে এক লাখ টাকা নিয়ে হাসপাতালে আসতে বলা হয়। তাদের কথামতো সে রাতেই এক লাখ টাকা এনে তাদের হাতে দেওয়া হয়। কিন্তু পরে জানা যায়, সেই ইনজেকশন দেওয়া হয়নি। এখানে মাত্র একটি হাসপাতালের দুটি ঘটনার কথা তুলে ধরলাম। এরকম বহু ঘটনার কথা কম-বেশি সবাই আমরা জানি। কিন্তু এসবের কোনো প্রতিকার হচ্ছে না। দেশের প্রায় প্রতিটি হাসপাতালের সার্বিক চিত্র প্রায় এরকম। অপরাধ করেও অপরাধীরা শাস্তি না পাওয়ায় এ ধরনের অপরাধের মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলেছে।

তার পরও তাদের কাছে আমাদের যেতে হয়। পরিবারের কোনো সদস্য অসুস্থ হয়ে পড়লে হাসপাতালে বা ডাক্তারের কাছে না নেওয়া ছাড়া অন্য কোনো উপায় থাকে না। তখন জমিজমা বিক্রি করে হলেও চিকিৎসা করাতে হয়। যাদের অর্থ আছে, তারা দেশের বাইরে গিয়ে উন্নত চিকিৎসা করান। দেশে সরকারি-বেসরকারি সব হাসপাতালের অবস্থা কম-বেশি প্রায় একই রকম। সরকারি হাসপাতালে ডাক্তার আছে তো নার্স নেই। নার্স আছে তো যন্ত্রপাতি নেই। হাসপাতালের জন্য বরাদ্দকৃত ওষুধ গরিব রোগীরা পায় না, কিন্তু বাজারে কিনতে পাওয়া যায়। অধিকাংশ বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসা বিল সাধারণ মানুষের আয়ত্তের বাইরে। এসব হাসপাতালে আমজনতা চিকিৎসা নিতে ভয় পায়। রোগী মারা গেলে লাশ আটকে রেখে বিল আদায়

করা হয়। এরা স্বাস্থ্যসেবার নামে রমরমা বাণিজ্য খুলে বসেছে। ব্যাঙের ছাতার মতো যত্রতত্র ডায়াগনস্টিক সেন্টার খুলে বসেছে। এ ছাড়া পত্রিকার খবরে প্রকাশ- ‘অপ্রোয়জনীয় অস্ত্রোপচার বাড়ছে শিশুজন্মে’। বিআইডিএসের এক গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে সিজারিয়ানের হার বাড়ছে আশঙ্কাজনকভাবে। এতে মানুষের পকেট থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকা। সরকারি হাসপাতালে এজন্য ব্যয় হয় ৬৫ শতাংশ আর বেসরকারিতে শতভাগ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দিকনির্দেশনা অনুযায়ী একটি দেশে ডেলিভারির ক্ষেত্রে সিজার ১৫ শতাংশ হতে পারে। কিন্তু দেশে ২০১৭-১৮ সালের হিসাব অনুযায়ী এ হার ৩২.২২ শতাংশ। ২০০৩-০৪ সালের দিকে ছিল ৩.৯৯ শতাংশ। প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে বছরে যেখানে ৩২.২২ শতাংশ সিজার হয়, সেখানে ভারতে এ

হার ২২ শতাংশ, পাকিস্তানেও ২২ শতাংশ, নেপালে ১৬ ও মিয়ানমারে ১৭ শতাংশ। হাসপাতালগুলোতে নির্ধারিত কোনো ফি বেঁধে দেওয়া নেই। যার যা খুশি তা-ই আদায় করছে। পত্রিকান্তরে জানা যায়, দেশে দুই যুগে বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক বেড়েছে শতকরা ৮০৯ ভাগ। ৩৭টি সরকারি মেডিকেল কলেজের বিপরীতে স্থাপিত হয়েছে ৭২টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ। অনেক বেসরকারি মেডিকেল কলেজ চলছে মানহীন অবস্থায়। একথা অস্বীকার করার উপায় নেই, দেশে স্বাস্থ্য খাতের অনেক উন্নতি হয়েছে। উন্নতি হয়েছে বলে শিশুমৃত্যু, নারী মৃত্যুর হার অনেক কমেছে। আমাদের গড় আয়ু বেড়েছে। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, কিছু দুর্নীতিবাজ মানুষের অতিরিক্ত লোভ-লালসা, অনৈতিক কার্যকলাপ আমাদের সব অর্জনকে অনেকটাই ম্লান করে দিচ্ছে। আমরা যে পরিমাণ ট্যাক্স

দেই, সে তুলনায় সেবা পাই না। সরকারি হাসপাতালে অনিয়ম, দুর্নীতি, দালালের দৌরাত্ম্য ছাড়াও ডাক্তার, যন্ত্রপাতির ঘাটতি রয়েছে। তাছাড়া অধিকাংশ হাসপাতাল নোংরা-অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় থাকার কারণে মানুষের আস্থা কম। অনেকে অনন্যোপায় হয়ে সরকারি হাসপাতালে যেতে বাধ্য হয়। দ্রব্যমূল্যের চাপে এমনিতেই আমরা প্রতিনিয়ত পিষ্ট হচ্ছি, তার ওপর জীবন রক্ষাকারী ওষুধের নিয়ন্ত্রণহীন মূল্যবৃদ্ধি আমাদের জীবনকে আরও পর্যুদস্ত করে দিচ্ছে। সরকার ৫৩ ধরনের ওষুধের দাম বেঁধে দিলেও বাজারে তা অকার্যকর। এর সঙ্গে ভেজালে ভরা ওষুধ তো আছেই। সম্প্রতি অন্তত ৫০ ধরনের ওষুধের দাম বাড়ানো হয়েছে। অনেক ওষুধের দাম বেঁধে না দেওয়ায় কোম্পানিগুলো যার যা খুশি তা-ই আদায় করছে। ওষুধের বাজার ঘিরে নৈরাজ্য থামছে না। এভাবে আর

কতকাল সাধারণ মানুষ নৈরাজ্যের জাঁতাকলে পিষ্ট হবে? এ অবস্থা থেকে কি কোনো পরিত্রাণ নেই? ওষুধসহ কারসাজির মাধ্যমে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি রোধ এবং বাজার নিয়ন্ত্রণ করে সাধারণ মানুষের জীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।

দৈনিক ডোনেট বাংলাদেশ সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ট্যাগ:

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:


শীর্ষ সংবাদ:
নাগেশ্বরীরতে ম্যাগনেট পিলার দিয়ে প্রতারণার অভিযোগে খেলনা পিস্তলসহ এক নারী আটক। নোয়াখালীতে তিন মামলায় জামিন পেলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব খোকন কুড়িগ্রামে এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলীকে স্যার না বলে ভাইয়া বলে সম্বোধন করায় সাংবাদিকের উপর চড়াও তারাকান্দা উপজেলা আওয়ামীলীগের বর্ধিত সভা নোয়াখালীতে ইটভাটা আইন সংশোধনের দাবিতে মানববন্ধন নোয়াখালীতে গৃহবধূ হত্যা:স্বামীর মৃত্যুদণ্ড বাগমারায় জেলা কৃষক লীগের সম্মেলন স্থল পরিদর্শন চাতরার দোলায় দিনব্যাপী মাছ ধরা বাওয়া উৎসবে মানুষের ঢল নাটোরে ইটভাটা মলিকদের মানববন্ধন বেনাপোলে ৯৪ লাখ টাকার স্বর্ণ উদ্ধার বেনাপোলে শিশু ধর্ষণের অভিযোগে চটপটি বিক্রেতা গ্রেফতার সিরাজগঞ্জের বেলকুচিতে জেলা প্রশাসক ড.ফারুক আহাম্মদকে বিদায়ী সংবর্ধনা সিরাজগঞ্জের সলঙ্গায় আগুনে পুড়লো ৪ দোকান, ৩৫ লাখ টাকা ক্ষতি মাগুরা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাথে মাগুরা পুলিশ সুপারের মতবিনিময় ধানক্ষেত থেকে মুয়াজ্জিনের হাত-পা বাঁধা লাশ উদ্ধার আপনারা ধরছেন চুনোপুঁটি, রাঘববোয়ালদের ধরবে কে: দুদককে হাইকোর্ট জ্যাকুলিনের জবানবন্দি ‘ফখরুল সাহেব, মানুষকে ধোঁকা দিয়ে বোকা বানাতে পারবেন না’ ইউক্রেন বিশ্বের খাদ্য নিরাপত্তা দিয়ে যাবে: জেলেনস্কি যে কারণে হচ্ছে না পদ্মা-মেঘনা বিভাগ