খোলা মতামত : মা-বাবার ঠিকানা যেন না হয় বৃদ্ধাশ্রম!


অথর
পাঠকের কলাম   খোলা মতামত ডেক্স
প্রকাশিত :১ জুলাই ২০২০, ১০:২৯ পূর্বাহ্ণ | পঠিত : 184 বার
0
খোলা মতামত : মা-বাবার ঠিকানা যেন না হয় বৃদ্ধাশ্রম!

"মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত " মা-বাবা হলেন প্রতিটি সন্তানের জন‍্য জীবনের সবচেয়ে কাছের মানুষ। তাদের ধ‍্যান, ধারণা,  চিন্তা, চেতনা আমাদের থেকে অনেক বেশি। তাই আমাদের উচিত তাদের যথাযথ সম্মান দেয়া। পিতা-মাতার অবাধ‍্য সন্তান জীবনে কোনদিন সফলতার মুখ দেখে না। তারা হলো আমাদের পৃথিবীতে নিয়ে আসার মাধ্যম। সন্তানের জন্য পিতা-মাতা হলেন চোখের মণি। একজন মা সন্তান গর্ভে ধারণ করার পর দশ মাস দশ দিন কষ্ট সহ‍্য করে প্রতিটি পদে পদে সন্তানকে সযত্নে আগলে রাখেন বুকে। অগোচরে হাজারো কষ্ট, যন্ত্রণা সহ্য করেন সন্তানকে তা বুঝতে দেন না। সন্তানের গায়ে বিন্দু পরিমাণ আঁচড়ও লাগতে দেন না। সন্তানদের ভরন পোষণের জন্য বাবা

নেমে পড়েন আয় উপার্জনের কাজে। হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে পূরণ করেন সন্তানের আবদার। বাবা যেন বট বৃক্ষের ছায়া। কবি মোয়াজ্জেম বিন আউয়ালের "বাবা"কবিতায় .......

বাবা যেন বটবৃক্ষ
দিচ্ছেন সদা ছায়া,
বাবার মতো এই জগতে
নাহি কারো মায়া।
বাবা আছেন সবই আছে
মিটে সকল আশা,
বাবার মতো এই জগতে
নাহি কারো ভালোবাসা।
বাবা যেন সারাক্ষণ 
রাখে মোদের খোঁজ,
বাবার মতো এই জগতে
নাহি অন‍্য কোন লোক।
বাবার আদর পেয়ে সদা
পাইযে মনে সুখ,
বাবা ছাড়া এই জগতে
অন্ধকার আর দুখ।
এই জগতে বাবা সেরা
মা গর্ভধারীনি,
এই জগতে সন্তানেরা
সকলে ঋণী।
দু-হাত তুলে আল্লাহ্
করি মোর ফরিয়াদ,
সকল পাপ মোচন

করে
বাবা-মা কে করে দিও মাফ।

নবীজি হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) মা-বাবার সাথে উত্তম আচরণের কথা বলেছেন।
একদিন এক লোক রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দরবারে হাজির হয়ে আরজ করল, হে আল্লাহর রাসূল! আমার কাছে সবচেয়ে উত্তম ব্যবহার পাওয়ার অধিকারী কে? তিনি বললেন, ‘তোমার মা।’ লোকটি জিজ্ঞেস করল, তারপর কে? তিনি বললেন, ‘তোমার মা।’ সে লোকটি আবারও প্রশ্ন করল, তারপর কে? তিনি বললেন, ‘তোমার মা।’ লোকটি আবারও জিজ্ঞেস করল, তারপর কে? তিনি বললেন, তারপর তোমার ‘পিতা’ (বুখারি : ৫৯৭১)।

অন্য হাদিসে এসেছে, ‘ওই লোক হতভাগ্য! ওই লোক হতভাগ্য! ওই লোক হতভাগ্য! জিজ্ঞেস করা হল, হে আল্লাহর রাসূল! কার ব্যাপারে এ কথা বললেন? নবী করিম

(সা.) বললেন, ‘যে লোক পিতা-মাতার একজন বা দুজনকে তাদের বৃদ্ধ বয়সে পেল অথচ জান্নাত কামাতে পারল না, সে হতভাগ্য।’ (মুসলিম : ২৫৫১)।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তিনটি দোয়া নিঃসন্দেহে কবুল হয়। ১. মাতা-পিতার দোয়া ২. মুসাফিরের দোয়া ৩. মজলুমের দোয়া।’ (আবু দাউদ : ১৫৩৬)।

সুতরাং সন্তানের পক্ষে বা সন্তানের বিরুদ্ধে মা-বাবার যে কোনো দোয়া নিঃসন্দেহে আল্লাহর নিকট কবুল হয়ে যায়। অতএব, এ বিষয়ে পিতা-মাতা ও সন্তানদের সর্বদা সাবধান থাকতে হবে, যেন সন্তানের কোনো আচরণে বা ব‍্যবহারে মা-বাবার অন্তর থেকে ‘উহ্’ শব্দ বেরিয়ে না আসে। সে জন্য এইসব বিষয়ে মা-বাবা দুজনকেই ধৈর্য্য ধরতে হবে।

মা-বাবার প্রতি খেয়াল

রাখা ও সেবাযত্ন করা প্রতিটি সন্তানের অবশ্যই কর্তব্য। তবে মা-বাবা যখন বার্ধক্যে পৌঁছবে, তখন তারা অনেক সময় বাচ্চাদের মতো হয়ে যায়।

বৃদ্ধ বয়সে সন্তান থেকে মা-বাবা সেবাযত্নের আশা করে থাকেন। কেননা, বার্ধক্য হল, মানবজীবনের এক অনিবার্য বাস্তবতা। বেঁচে থাকলে প্রত্যেকেই বুড়ো হতে হয়, এটা আল্লাহর অমোঘ নিয়ম। তাই প্রত্যেক সন্তানের উপর মা-বাবার বৃদ্ধকালীন সময়ে তাদের সেবা করা দায়িত্ব। আল্লাহতায়ালা কোরআনে মা-বাবা বার্ধক্যে উপনীত হলে তাদের সঙ্গে সুন্দর আচরণের নির্দেশনা দিয়েছেন। মা-বাবা আল্লাহর পক্ষ থেকে সন্তানের জন্য নেয়ামত।

তিনি বলেন, ‘তাদের একজন বা দুজনে বুড়ো হলে তাদেরকে ‘উহ্’ শব্দটিও বল না, তাদেরকে ধমক দিও না, তাদেরকে সম্মান দিয়ে কথা বল। তাদের

সামনে ভালোবাসার সঙ্গে মাথা নত করে দাও এবং বল, হে প্রতিপালক! তাদের দুজনকে দয়া কর; যেমন তারা আমাকে শৈশবকালে লালন-পালন করেছেন।’ (বনি ইসরাইল : ২৩/২৪)।

আজ যে সন্তান, সেই আগামীদিনের পিতা কিংবা মা। বৃদ্ধ বয়সে এসে মা-বাবারা যেহেতু শিশুদের মতো আচরণ করে তাই তাদের জন্য সুন্দর পরিবেশ তৈরি করাই সন্তানের কর্তব্য। সন্তানের ব‍্যবহার কিংবা আচরণে যেন মা-বাবা মুগ্ধ হয়ে যায়।

কিন্তু দূর্ভাগ‍্য দিন দিন পাল্টে যাচ্ছে সমাজ ও পরিবেশ। আজকের ছেলে মেয়েরা আধুনিকতার  নামে বাবা মা কে বাসায় রেখে নিজরা বাহিরে  রেষ্টুরেন্টে খেয়ে নিচ্ছে। মা বাবার খবরাখবর নিচ্ছে না। যৌথ পরিবার এখন আর ভালো লাগে না। বিয়ের অল্প দিনেই মা-বাবা

থেকে আলাদা হয়ে যাচ্ছে সন্তানেরা।

আর অন্য দিকে দিনের পর দিন সন্তানের কথা চিন্তা করে মা-বাবা দ্রুত অসুস্থ হয়ে পরছে। দিন-রাত ঝড়ে পরছে মা-বাবার চোখের পানি। এক নজর সন্তানকে দেখার জন্য ব‍্যাকুল হয়ে অধীর আগ্রহে পথের দিকে তাকিয়ে থাকে মা-বাবা। কিন্তু সন্তান মা-বাবার খোঁজ খবর নেয় না। অনেকের কাছে বোঝার পাত্র হয়ে পরে মা-বাবা।

আবার এদেশে অনেক নামী-দামী বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিক্ষক, চাকরিজীবী যারা এক সময় খুব বর্ণাঢ্য বা আরাম আয়েশের জীবনের অধিকারী ছিলেন, বৃদ্ধ বয়সে এসে নিজের সন্তানের দ্বারাই অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার হয়ে শেষ ঠিকানা হচ্ছে বৃদ্ধাশ্রম। বৃদ্ধাশ্রমে অসহায় মা-বাবা ফ‍্যাল ফ‍্যাল করে তাকিয়ে থাকে সন্তানের অপেক্ষায়।

কিন্তু আধুনিক ছেলে মেয়েরা মা-বাবাকে দেখতে যায় না। এক সময় মনের কষ্ট নিয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়ে কবরে চলে যায় হতভাগা মা-বাবা।

তাই আজ থেকে একটাই দাবী বাংলার ঘরে ঘরে আব্দুল কাদির জিলানী(রাঃ) মতো সন্তানের জন্ম হউক। আমরা আর কোন মা-বাবা কে বৃদ্ধাশ্রমে দেখতে চাই না। প্রতিটা সন্তানের হৃদয়ে জায়গা হউক প্রতিটা মা-বাবার।

মোয়াজ্জেম বিন আউয়াল
কবি ও সাংবাদিক
দৈনিক ডোনেট বাংলাদেশ।

No Comments

ADD: 1762020