চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে দেশ থেকে ডলার, দিনার ও রিয়েল পাচার হয় মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ওমান ও দুবাইয়ে। বিমানবন্দরে কর্মরত তিন সিভিল এভিয়েশন কর্মচারীর হাত ধরে তিন বছর ধরে চলে বৈদেশিক মুদ্রা চোরাচালান বাণিজ্য। মুদ্রা পাচারে সিভিল এভিয়েশনের আরও ১০ কমকর্তা-কর্মচারীর নাম এক আসামির জবানবন্দিতে উঠে এলেও পুলিশি তদন্তে দায়মুক্তি পেয়েছেন তারা। চুক্তি করে বিমানবন্দরের গ্রিন চ্যানেল পার করে বিদেশি মুদ্রা মধ্যপ্রাচ্যগামী যাত্রীদের হাতে তুলে দিতেন তারা। চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের কর্মচারী ওসমান সিকদার খুনের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে মুদ্রা পাচারে বিমানের থ্রি স্টার সিন্ডিকেটের চাঞ্চল্যকর তথ্য।
তদন্ত কর্মকর্তা পতেঙ্গা থানার ইন্সপেক্টর ফরিদুল আলম বলেন, খুনের তদন্ত করতে গিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা চোরাচালানের তথ্য-উপাত্ত সামনে আসে। মূলত দুবাই ও ওমানে মুদ্রা পাচারে বিরোধের জের ধরেই বিমানবন্দরের কর্মচারী ওসমানকে খুন করা হয়। খুনের ঘটনায় চোরাকারবারিদের সঙ্গে বিমাবন্দরের দুই কর্মচারীও জড়িত। তারা চোরাচালানকারীদের ওসমানের অবস্থানের তথ্য পাঠান। ওসমানকে খুনের আগে পাহারাও দিয়েছিলেন।
শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইব্রাহীম খলিল (জনসংযোগ) বলেন, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ চোরাচালানসহ যে কোনো অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। খুনের ঘটনায় দুই কর্মচারীর সম্পৃক্ততা পাওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পুলিশ বেশ কয়েকজনের তথ্য চেয়েছিল। তাদের সহযোগিতা করা হয়েছে।
শ্রমিক ভিসায় আসা-যাওয়া, নেপথ্যে মুদ্রা পাচার
চট্টগ্রাম থেকে ২০১৮ সালে শ্রমিক ভিসায় দুবাই ও ওমানে যান জাহেদুল মঞ্জুর সনজু, সোহেল ও সুমন। তারপরই শুরু হয় করোনাকাল। কাজ হারিয়ে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। করোনা শেষ হওয়ার পর পরিবারে সচ্ছলতা ফেরাতে সরকারের দেওয়া সুযোগ কাজে লাগিয়ে অবৈধভাবে ডলার, দিনার ও রিয়েলের ব্যবসা শুরু করেন। দেশ থেকে বৈধভাবে এক হাজার বিদেশি মুদ্রা নেওয়ার সুযোগ থাকলেও তার সুযোগ নেন তারা। সখ্য গড়ে তোলেন শাহ আমানত বিমানবন্দরের নিরাপত্তা প্রহরী বাদল মজুমদারের সঙ্গে। বাদল আগে থেকেই মুদ্রা চোরাচালান চক্রের হয়ে কাজ করছিলেন। সেই সুবাদে প্রবাসী জাহেদুল, সোহেল ও সুমনের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ২০২২ সাল থেকে চট্টগ্রাম থেকে মধ্যপ্রাচ্যে ডলার, দিনার, রিয়েল চোরাচালান শুরু করেন। বাদলের সঙ্গে চক্রে জড়িয়ে পড়েন সিভিল এভিয়েশনের কর্মচারী ভিকটিম মো. ওসমান ও ইব্রাহিম খলিল। জাহেদুল, সোহেল ও সুমন মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে শ্রমিক ভিসায় এক-দুই মাস অন্তর দেশে আসা-যাওয়া শুরু করেন। এর আড়ালে তারা বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা চট্টগ্রাম থেকে মধ্যপ্রাচ্যে পাচার করে আসছিলেন।
ভিকটিম ওসমানকে খুনের এক মাস আগে জাহেদুল, সোহেল, সুমন তিনজনে ১০ লাখ টাকা করে ৩০ লাখ টাকার বৈদেশিক মুদ্রা শাহ আমানত বিমানবন্দরের গ্রিন চ্যানেল পার করে দেওয়ার চুক্তি করেন বাদলের সঙ্গে। যদিও ওই প্রহরী নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে ৩০ লাখ টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আত্মসাৎ করেন। চুক্তিমতো সোহেল ও সুমন বিদেশে যাওয়ার জন্য টিকিট কেটে বিমানবন্দরে গেলেও বিমাবন্দরে মুদ্রা তাদের হাতে দেওয়া হয়নি। মুদ্রা ছাড়াই বিদেশ যেতে হয়। এর পরই তাদের সঙ্গে এভিয়েশন কর্মচারী বাদল, ওসমানদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব ও বিরোধ তৈরি হয়। তার জেরে খুন হন বিমানের কর্মচারী ওসমান সিকদার।
খুনের তদন্তে মুদ্রা পাচার চক্র
শাহ আমানত বিমানবন্দরের আবাসিক এলাকায় ২০২৪ সালের ১১ ডিসেম্বর বিমানের কর্মচারী ওসমান সিকদার খুন হন। ওই দিন মুদ্রা চোরাচালানকারী জাহেদুল, সোহেল, সুমন প্রাইভেটকার নিয়ে বিমানবন্দরের আবাসিক এলাকায় যান। আবাসিকের ব্যাচেলর কোয়ার্টারে ভিকটিম ওসমানকে আত্মসাৎ করা ৩০ লাখ টাকার বিদেশি মুদ্রা ফেরত দিতে চাপ দেন। এ নিয়ে বিতর্কের এক পর্যায়ে জাহেদুল, সোহেল, সুমন ওসমানকে মারধর করলে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মারা যান তিনি। পরে তাদের গাড়িতে লাশ কোয়ার্টার থেকে বের করে পতেঙ্গা সাগরপাড় এলাকায় ফেলে দিয়ে পালিয়ে যান। খুন করার আগে তাঁকে কোয়ার্টারের মধ্যে পাহারা দিয়ে রাখেন বাদল ও আরিফ। তারাই তিন চোরাচালানকারীকে ওসমান কোয়ার্টারে থাকার তথ্য দেন বলে পুলিশের তদন্তে উঠে আসে।
মুদ্রা পাচারে বিমানের ১০ জনের নাম
সিভিল এভিয়েশন কর্মচারী ইব্রাহিম খলিল আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন, বিমানবন্দর পরিচালকের পিএ আবদুল করিম, ফায়ার অফিসার শরীফ, নিরাপত্তা অপারেটর জাবেদ ও জামান, সিকিউরিটি অফিসার নজরুল ইসলাম ও এনাম, নিরাপত্তা অপারেটর মাহফুজ, মহিউদ্দিন, আলাউদ্দিন-১ ও আলাউদ্দিন-২ সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রা পাচারে সম্পৃক্ত। তারা সবাই চোরাচালান সিন্ডিকেটের সদস্য। তাদের সঙ্গে মিলেমিশে মুদ্রা চোরাচালান করছিলেন।
নিরাপত্তা কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম বলেন, আমার নাম মুদ্রা চোরাচালানে কেন বলে, জানি না। আমি অবৈধ কাজে জড়িত নই। একই বক্তব্য দেন নিরাপত্তা অপারেটর মো. আলাউদ্দিন। তবে বিমানবন্দর-সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, বিমানবন্দরে কর্মরত কর্মচারী অনেকেই মুদ্রা, সিগারেট, স্বর্ণ চোরাচালানে কেউ প্রত্যক্ষ, কেউ পরোক্ষভাবে জড়িত। কর্মকর্তা কয়েকজনের বিরুদ্ধে চোরাচালানে জড়িত থাকার অভিযোগও রয়েছে।