অবৈধ ইটভাটায় পুড়ছে কাঠ গিলে খাচ্ছে ফসলি জমি

প্রকাশিতঃ জানুয়ারি ১৩, ২০২৬ | ৮:১১ পূর্বাহ্ণ
অনলাইন নিউজ ডেক্স

দেশের শস্যভান্ডার হিসেবে পরিচিত উত্তরের জেলা নওগাঁ। এ জেলার উৎপাদিত ধান-চাল ও বিভিন্ন ফসল দিয়ে দেশের মানুষের খাদ্যের চাহিদা মিটে থাকে। কিন্তু দিন দিন কমে যাচ্ছে ফসল ফলানো কৃষি জমি। এর প্রধান কারণ অবৈধ ইটভাটা। সেসব ইটভাটায় অনায়াসে পোড়ানো হচ্ছে খড়ি (কাঠ)। দিন দিন গিলে খাচ্ছে শত শত হেক্টর ফসলি জমি। জেলার পোরশা উপজেলার ইটভাটাগুলোয় সবচেয়ে বেশি কাঠ পোড়ানো হয় বলে দাবি স্থানীয়দের। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উপজেলায় ১১টি ইটভাটা রয়েছে। যেগুলোর নেই পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো অনাপত্তি সনদ। নিয়মবহির্ভূতভাবে গড়ে ওঠা এসব ইটভাটার ৮টিতেই পুড়ছে কাঠ। ফলে পরিবেশ হচ্ছে বিপর্যয়। আবার কৃষকদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে জমি লিজ নিচ্ছে। আশপাশের জমি দেওয়ায় উপায় না পেয়ে এ ছাড়া অনেক কৃষক জমি লিজ দিতে বাধ্য হচ্ছে। এদিকে সদর উপজেলার বরুনকান্দি এলাকায় দিঘা গ্রামের মধ্যে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা এম বি কে নামের একটি ইটভাটা বন্ধের জন্য শতাধিক এলাকাবাসী বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছিল। তারপরও নেওয়া হয়নি কোনো ব্যবস্থা। বরং ইটভাটার মালিক অনায়াসেই চালিয়ে যাচ্ছে কার্যক্রম। তবে ইটভাটার স্বত্বাধিকারী আব্দুল মান্নানের দাবি, আমরা যখন আন্দোলন করলাম, তখন ডিসি অফিস থেকে এ বছরের জন্য মৌখিক অনুমোদন দিয়েছে। আর অন্যরা যেভাবে চালাচ্ছে আমিও সেভাবে শুরু করেছি। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, চোখ বন্ধ করে বসে আছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। লোক দেখানো কিছু ইটভাটায় অভিযান চালালেও অদৃশ্য কারণে সেগুলো ফের তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও ক্ষোভ। এদিকে কাঠ পোড়ানোয় পোরশা উপজেলার ক্ষোদ একজন ভাটার মালিকই বিরক্ত। তিনি জানালেন, এখানে ১১টি ভাটা রয়েছে। এর মধ্যে ৩টি ইটভাটায় কয়লা দিয়ে পোড়ানো হচ্ছে। আর বাকি ৮টিতে একদম কাঠ পুড়ছে। আমি চাই সবাই কয়লা ব্যবহার করুক। আমরা ডিসি অফিসে ওয়াদা করেছিলাম কাঠ পোড়াব না। আমি ইটভাটার মালিক হয়ে স্থানীয় প্রশাসনকে বলতে পারছি না। তারপরও এই কাঠ পোড়ানোর বিষয়ে জেলার নেতাকে অনেক বলেছি। পোরশা ঢুকতেই রাস্তার বাম পাশে চোখে পড়বে কে এম এস ব্রিকস নামক ইটভাটা। পুরো একটি ফসলি মাঠজুড়ে কার্যক্রম চালাচ্ছেন ভাটার মালিক কামরুল হাসান চৌধুরী। ভাটার ম্যানেজার তারেক আজিজ জানালেন, এই ইটভাটা শুরু থেকেই আমি চাকরি করছি। আট বছর আগে শুরু করা এই ইটভাটার এখন কার্যক্রম চলছে ৫৫ বিঘা জমিজুড়ে। সব জমি বিভিন্ন মেয়াদে লিজ নেওয়া আছে। ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা বিঘা প্রতি। পরিবেশ সনদ আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, সরকারি সব বিষয়ে রাজস্ব দেওয়া হয় আর ইটভাটা শুরু করলে কাঠ একটু লাগেই। এম বি কে ইটভাটার বিরুদ্ধে দেওয়া অভিযোগকারীর একাধিক ব্যক্তিসহ স্থানীয়রা বলেন, গ্রামের মধ্যে ইটভাটা কীভাবে সম্ভব। প্রশাসনের পক্ষ থেকে চালু না করার জন্য বলা হয়েছিল। বন্ধ রাখার জন্য বিভিন্ন দপ্তরে ১৩৭ জন লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তারপরও কোনো পদক্ষেপ নেই। এই ইটভাটার কারণে অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায়, যখন বড় বড় গাড়ি চলাচল করে। এ ছাড়া ফসলি জমির মাটি কাটা হচ্ছে। দিন দিন কমে যাচ্ছে ফসলি জমি। জানতে চাইলে কে ই বি সি ইটভাটার স্বত্বাধিকারী ও পোরশা উপজেলা মালিক সমিতির সভাপতি আকবর আলী কালু মোবাইলে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি সরাসরি কথা বলতে বলেন। জেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক নূরে আলম মিঠু বলেন, কোনোভাবেই ইট ভাটাতে খড়ি (কাঠ) পোড়ানো চলবে না। কারণ, আমাদের প্রথম কমিটমেন্টই ছিল কোনো ইটভাটাতে খড়ি পোড়ানো হবে না। যদি কেউ খড়ি ব্যবহার করে থাকে, তাহলে প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে। পোরশা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাকিবুল ইসলাম বলেন, নির্বাচনের বিষয় নিয়ে ব্যস্ত আছি। তারপরও প্রতিনিয়ত মাটি কাটাসহ বিভিন্ন কারণে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা হচ্ছে। আর খড়ি পোড়ানোর বিষয়ে কেউ সহযোগিতা করলে অভিযান চালাতে ভালো হবে। তবে পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে চাইলে ফুল সাপোর্ট দেব। নওগাঁ পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক নাজমুল হোসাইন বলেন, যেসব ইটভাটায় খড়ি পোড়ানো হচ্ছে, সেসব ইটভাটায় অভিযান চালানো হবে। আর যখন অভিযোগ দিয়েছিল, তখন এম বি কে নামক ইটভাটা বন্ধ ছিল। চালু করলে অভিযান চালানো হবে।