ইরান এখন ইতিহাসের এক কঠিন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট থেকে শুরু হওয়া জনবিক্ষোভ এরই মধ্যে রূপ নিয়েছে রাজনৈতিক আন্দোলনে। এতে প্রাণ হারিয়েছে প্রায় ২ হাজার মানুষ—সরকারিভাবে এই প্রথম এত বড় সংখ্যক নিহতের কথা স্বীকার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার হয়েছে অন্তত ১০ হাজার ৭২১ জন। চারদিকে প্রশ্ন জেগেছে—এই সরকার কি টিকতে পারবে? এদিকে বিদ্রোহ দমনের জন্য সরকার একজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে, যা আজ বুধবার কার্যকর করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
এ পরিস্থিতে ইরানের বিক্ষোভকারীদের ‘দেশপ্রেমিক’ অভিহিত করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাদের বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছেন, ‘সাহায্য আসছে’।
গতকাল মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে এ কথা বলেন ট্রাম্প। এমন সময় তিনি এমন আহ্বান জানালেন, যখন বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ইরানের সরকারবিরোধী বিক্ষোভ স্তিমিত হয়ে যাওয়ার খবর আসছে। গত ২৮ ডিসেম্বর বিক্ষোভ শুরুর পর থেকেই তেহরানকে নানা হুমকি দিয়ে আসছেন ট্রাম্প।
ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লেখেন, ‘ইরানের দেশপ্রেমিকরা, আপনারা বিক্ষোভ চালিয়ে যান। আপনাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর দখল নেন। হত্যাকারী ও নিপীড়নকারীদের নাম মনে রাখুন। তাদের বড় মূল্য দিতে হবে। বিক্ষোভকারীদের ওপর হত্যাকাণ্ড না থামা পর্যন্ত আমি ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সব বৈঠক বাতিল করেছি। সাহায্য আসছে।’
এদিকে, বিক্ষোভ ঘিরে ইরানের বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্তের জন্য স্থানীয় সময় মঙ্গলবার উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠকে বসার কথা রয়েছে ট্রাম্পের।
ইরানে এ আন্দোলনের পেছনে ছিল অর্থনৈতিক দুরবস্থা। ইরানি রিয়ালের দাম পড়ে গেছে, খাবারদাবারসহ নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে কয়েক গুণ। শুরুটা হয় তেহরানের দোকানিদের ধর্মঘট দিয়ে। ধীরে ধীরে তা ছড়িয়ে পড়ে পুরো দেশে।
সরকার বলছে, তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখছে। সরকারি মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজারানি বলেছেন, সরকার আন্দোলনকারীদের সন্তান মনে করে এবং তাদের কথা শুনতে চায়। তবে সরকার একই সঙ্গে এই আন্দোলনকে ‘সন্ত্রাসী গোষ্ঠী’ কর্তৃক দখলের চেষ্টা বলেও বর্ণনা করছে।
এদিকে, সহিংসতা বেড়েই চলেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, হাসপাতালগুলোতে আহতদের জায়গা নেই, মরদেহ রাখা হচ্ছে অস্থায়ী মর্গে। ইন্টারনেট কার্যত বন্ধ, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। তেহরানের রাস্তায় এখন খালি ব্যাগে মোড়া মরদেহের সারি আর নিরাপত্তা বাহিনীর বন্দুকধারীরা।
অন্যদিকে, পশ্চিমাবিশ্ব থেকে চাপও বাড়ছে। জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মের্জ বলেন, ‘এই সরকার টিকে আছে শুধু সহিংসতার মাধ্যমে। আমরা তাদের শেষ দিন ও সপ্তাহ দেখছি।’ তার ভাষ্য অনুযায়ী, যদি কোনো সরকার টিকে থাকতে শুধু সহিংসতার ওপর নির্ভর করে, তাহলে সেটি কার্যত তার শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
এর মধ্যে ইরানের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর জাহেদানে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত ‘সন্ত্রাসী গোষ্ঠী’র কয়েকজন সদস্যকে আটক করার দাবি করেছে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি এই মন্তব্যের কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘জার্মানি দ্বিচারিতা করছে।’ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরও এক ধাপ এগিয়ে ঘোষণা দিয়েছেন, যারা ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করবে, তাদের পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক বসাবে তার দেশ। প্রয়োজনে সামরিক হস্তক্ষেপের কথাও বলেছেন তিনি।
এদিকে, নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী মালালা ইউসুফজাই ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, ইরানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে সে দেশের জনগণ। এক্সে (সাবেক টুইটার) মালালা লিখেছেন, ‘ইরানের এই বিক্ষোভকে শিক্ষা ও জনজীবনের সব ক্ষেত্রে মেয়েদের ও নারীদের স্বাধীনতার ওপর দীর্ঘকাল ধরে চাপিয়ে দেওয়া রাষ্ট্রীয় বিধিনিষেধ থেকে আলাদা করে দেখা যাবে না। সব জায়গার মেয়েদের মতোই ইরানি মেয়েরাও মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপন করতে চান।’
ইরানের শাসকগোষ্ঠী এমন সংকটে অতীতেও পড়েছে, কিন্তু এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। বিক্ষোভ শুধু রাজধানী তেহরানে সীমাবদ্ধ নয়—ছোট শহর, প্রাদেশিক নগর, এমনকি ইরানের দরিদ্র অঞ্চলগুলোতেও মানুষ রাস্তায় নেমেছে। ইসলামী বিপ্লবের পর এই প্রথম এত বিস্তৃত আন্দোলন দেখা যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পর্যবেক্ষক সংস্থা এইচআরএএনএ জানাচ্ছে, নিহতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। সরকারি তথ্যে বলা হচ্ছে, নিরাপত্তা বাহিনী ও সাধারণ জনগণ—উভয়পক্ষ থেকেই হতাহত হয়েছে। তবে কারা, কীভাবে নিহত হয়েছেন, তা এখনো অস্পষ্ট।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার কঠোরভাবে দমন করলেও আসল সংকটটা অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত। জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ভালি নাসর বলেন, ‘এই সরকার অতীতে দমন করে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে। এবারও তাই করছে। কিন্তু এবার সংকট আরও গভীর। কারণ মানুষের জীবনমান এতটাই খারাপ যে, তা শুধু দমন করে সামাল দেওয়া সম্ভব নয়।’
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংলাপ চালিয়ে যাওয়ার কথা বলছে ইরান। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাকচি জানিয়েছেন, মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে তার যোগাযোগ চলছে। হোয়াইট হাউসও বলছে, কূটনীতি এখনো ট্রাম্পের প্রথম পছন্দ।
তবে আলোচনার সম্ভাবনার পাশাপাশি সামরিক হস্তক্ষেপের ছায়াও ঘন হয়ে উঠছে। বাইরের হস্তক্ষেপ ইরানের অভ্যন্তরীণ সংকটকে কীভাবে প্রভাবিত করবে, তা নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, এতে সরকারের ভিত আরও নড়বড়ে হবে। আবার অনেকে বলছেন, এতে শাসকগোষ্ঠী আরও একজোট হয়ে পড়বে।
ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখন—‘বিক্ষোভ দমনকারীরা’ কবে মনে করবে তারা এই ব্যবস্থায় আর লাভবান হচ্ছে না? কারণ, একমাত্র সেই সিদ্ধান্তই শাসন ব্যবস্থার পতনের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
ইরান সরকারের কেন্দ্রবিন্দু এখনো শক্ত। ৮৬ বছর বয়সী আয়াতুল্লাহ খামেনি এখনো চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী। তাকে ঘিরে রয়েছে বিপ্লবী গার্ড বাহিনীসহ অনুগত অংশগুলো। তাই আপাতত সরকারের ভিত ভাঙার কোনো পরিষ্কার চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না।
তবে এটাও সত্য, রাস্তায় নেমে আসা সাধারণ মানুষ আর চুপ করে বসে নেই। তারা পরিবর্তন চায়—কেউ ধীরে, কেউ দ্রুত। এখন দেখার বিষয়, ইরান সরকার মানুষের কণ্ঠ শোনে, নাকি আরও কঠোর হয়। আর এই উত্তাল সময়েই নির্ধারিত হবে ইরান সরকারের ভবিষ্যৎ।
আন্দোলনের মধ্যে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের হুমকি দিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। এরই মধ্যে ২৬ বছর বয়সী বিক্ষোভকারী এরফান সোলতানিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, যা আজ বুধবার কার্যকর করার কথা। এ তথ্য জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থা হেংগাও।
রাষ্ট্রীয় ভাষ্য অনুযায়ী, যারা ভাঙচুর বা সহিংসতায় জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে ‘স্রষ্টার বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ তথা মোহারাবা অভিযোগ আনা হতে পারে—যার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। মানবাধিকার সংগঠনগুলো আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, সরকার এই অভিযোগ ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের ভয় দেখাতে এবং দমন করতে চাইছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর মাধ্যমে ইরান সরকার আরও কঠোর দমননীতির পথে হাঁটছে।