আন্তর্জাতিক সমুদ্র বাণিজ্যের ব্যবসায় টিকে থাকতে নতুন জাহাজ কিনে বহর সম্প্রসারণ করতে চায় বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি)। আর এ জন্য চীনের অর্থায়নে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে চায় রাষ্ট্রায়ত্ত এ সংস্থাটি। যদিও প্রকল্পটি অনুমোদনের ৩২ মাসেও চীনের সঙ্গে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি ঋণচুক্তি, অথচ বাস্তবায়নে হাতে সময় আছে আর মাত্র দুই মাস।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাহাজ কেনার এ প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্নীতি হলে তার বিচার হবে চীনের আদালতে, আর বাংলাদেশের সরকারি দুই প্রতিষ্ঠানের চুক্তি আগে মূল্যায়ন করবে চীন; এমন দুই শর্তের কারণেই বিএসসির জন্য জাহাজ কেনার ঋণ পাওয়ার পথ বড্ড কঠিন হয়ে উঠেছে। আগামী মার্চের মধ্যে নতুন চারটি জাহাজ কেনার এ প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার কথা ছিল, তা না হওয়ায় ঝুঁকি এড়াতে প্রকল্পের মেয়াদ আরও এক বছর বাড়িয়ে রাখা হচ্ছে। তবে ভোটের আগে ঋণচুক্তি হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই দেখছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তবুও ঋণ নিশ্চিত করতে চীনের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব নূরুন্নাহার চৌধুরীর সভাপতিত্বে গত ২৩ ডিসেম্বর মন্ত্রণালয়ে প্রকল্পের স্টিয়ারিং কমিটির (পিএসসি) সভা হয়। ওই সভায় ঋণ না পাওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদন পাওয়ার পর অর্থায়নের বিষয়ে নিজেদের মত জানিয়ে সম্মতিপত্র (ইন্টেনশন টু সাপোর্ট) দিয়েছিল চীন। তাতে ১ দশমিক ৭০৬ আরএমবি (চীনের জনগণের অর্থ) ঋণ হিসেবে এ প্রকল্পে দেওয়ার আলোচনা হয়। এরপর চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য প্রয়োজনীয় সব কাগজসহ ঋণের আবেদন করে ইআরডি। কিন্তু দীর্ঘ ৩২ মাসেও আবেদনের পরের ধাপ আর এগোয়নি।
মূলত প্রকল্পের আওতায় ‘জি-টু-জি’ ভিত্তিতে দুটি ক্রুড ওয়েল মাদার ট্যাংকার এবং দুটি মাদার বাল্ক ক্যারিয়ার জাহাজ সংগ্রহের কথা। জাহাজ কেনার জন্য যেসব কারিগরি ও অর্থনৈতিক আলোচনা (নেগোসিয়েশন) দরকার ছিল, সেগুলো শেষ করা হয়। তারপর আলোচনার ফলের ওপর ভিত্তি করে ২০২৩ সালের ১৮ এপ্রিল জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুমোদন করা হয়। ওই বছরের ২০ জুলাই চারটি নতুন জাহাজ কেনার প্রস্তাব সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে (সিসিজিপি) অনুমোদন পায়। একই বছরের ১৪ অক্টোবর ঠিকাদারের সঙ্গে জাহাজ নির্মাণের চুক্তি করে সরকার; কিন্তু ঋণ না পাওয়ার সব কার্যক্রম থেমে আছে।
জানতে চাইলে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘আমরা (সরকার) সময় পেয়েছি ঠিকই; কিন্তু জি-টু-জি ঋণ চুক্তি করা আমাদের (মন্ত্রণালয়) কাজ নয়। মন্ত্রণালয় প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ করবে। এখনো কেন ঋণ চুক্তি করা গেল না—সেটি ইআরডিকে জিজ্ঞেস করুন। এর বেশি কিছু আমি বলতে চাচ্ছি না।’
ইআরডির একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে এ বিষয়ে যোগাযোগ করলে তারা আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তবে ইআরডি ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, মূলত শর্তের জটিলতার কারণে ঋণ চুক্তি করতে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার রাজি হচ্ছে না। বড় দুই শর্তে সরকার আপত্তি জানিয়েছে। সেগুলো হলো—চীন চায়, তাদের ঋণে করা প্রকল্পে যদি কোনো দুর্নীতি হয়, তাহলে তার বিচার হবে চীনের আদালতে। এক্ষেত্রে শুধু চীনের নাগরিক নয়, প্রকল্প সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশের নাগরিকের বিরুদ্ধেও যদি দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে, তার বিচারও চীনের আদালতে হবে। অন্যটি হলো—ইআরডি চীন থেকে ঋণ নিয়ে সেই অর্থ বিএসসিকে কীভাবে দিচ্ছে এবং বিএসসির সঙ্গে ইআরডির চুক্তি কেমন হচ্ছে—সেটি ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান মূল্যায়ন করবে। এক্ষেত্রে অবশ্য মূল ঋণচুক্তির আগেই ইআরডি ও বিএসসির মধ্যকার চুক্তি দেখতে চায় চীন। এই দুই শর্তে কোনোভাবেই বাংলাদেশ সরকার রাজি হচ্ছে না। তাই ঋণ চুক্তিও চূড়ান্ত হচ্ছে না।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তা বলেন, ‘ঋণের শর্তের ধরন দেখে মনে হচ্ছে চীন আসলে এখন ঋণ দিতে চাচ্ছে না। দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, নির্বাচনের পর নতুন সরকার এলে এসব শর্ত খুঁজেও পাওয়া যাবে না। তখন আরও সহজ শর্তেই ঋণ পাওয়া যাবে।’
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, গত ৮ এপ্রিল চীনা এক্সিম ব্যাংকের একটি প্রতিনিধিদল ঢাকা সফর করেছে। তখন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক হয়। সে বৈঠকে এক্সিম ব্যাংকের চাহিদা অনুযায়ী সব তথ্য সরবরাহ করা হয়েছে। প্রকল্পে ঋণচুক্তির ধরন কেমন হতে পারে—সেটির খসড়া ইআরডি তৈরি করেছে। সেইসঙ্গে ঋণচুক্তির ধরন নিয়ে গত ১২ নভেম্বর ইআরডির সংশ্লিষ্ট শাখায় বৈঠক হয়েছে।
সর্বশেষ পিএসসি সভায় মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মো. গোলাম রাব্বী বলেন, ‘প্রকল্পের জন্য বাংলাদেশ পক্ষের সব দাপ্তরিক কাজ সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু চায়না এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে এখনো ঋণ চুক্তি না হওয়ায় প্রকল্পের বাস্তব কাজ শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না।’
একই সভায় মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) মো. মুহিদুল ইসলাম বলেন, ‘অনুমোদিত ডিপিপি অনুযায়ী প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৬ সালের মার্চে সমাপ্ত হবে। এখনো চীন সরকারের সঙ্গে প্রকল্পের অন্তর্গত ঋণ চুক্তি স্বাক্ষর না হওয়ায় জাহাজ নির্মাণ কার্যক্রম শুরু করা যায়নি। তাই প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর পদক্ষেপ নিতে হবে।’
৫৩ বছর আগে যাত্রা শুরু করা সমুদ্র পরিবহন বাণিজ্যের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বিএসসির বহরে শুরুর দিকে জাহাজ ছিল কেবল দুটি। এরপর বিভিন্ন সময়ে আরও ৪৪টি যুক্ত হয়। তবে আয়ুষ্কাল ফুরিয়ে যাওয়ায় নব্বইয়ের দশকের শেষে ৩৬টিকেই পাঠানো হয় ছুটিতে। কমতে কমতে জাহাজের সংখ্যা আবারও দুটিতে নেমে আসে। ২০১৮ সালে চীনের কাছ থেকে কেনা ছয়টি যুক্ত হলে বিএসসির বহরে জাহাজের সংখ্যা দাঁড়ায় আটটিতে। তবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় ইউক্রেনে ‘বাংলার সমৃদ্ধি’ জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গত বছরের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে অগ্নিকাণ্ডের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ‘এমটি বাংলার জ্যোতি’ ও ‘এমটি বাংলার সৌরভ’। পরে এ দুটি জাহাজ স্ক্র্যাপ হিসেবে বিক্রি করে দেওয়া হয়। এরপর নিজস্ব অর্থায়নে বিএসসির বহরে দুটি জাহাজ যুক্ত করা হয়। ফলে বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত এ প্রতিষ্ঠানের জাহাজের সংখ্যা সাতটি।
জানতে চাইলে বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক বলেন, ‘সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমাদের জাহাজের সংখ্যা কম। আয় বাড়ানোর জন্য জাহাজ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। অন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তুলনায় আমাদের বিএসসির জাহাজ সংখ্যা তলানিতে। নিজস্ব অর্থায়নে এরই মধ্যে দুটি জাহাজ কেনা হয়েছে। সরকারি অর্থায়নে আরও তিনটি জাহাজ কেনা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। আশা করছি, চীনের সঙ্গে সরকারের ঋণ চুক্তি দ্রুত হবে—এতে বিএসসির বহরে আরও চারটি জাহাজ যুক্ত হবে।’