ইরানে সম্ভাব্য সামরিক হস্তক্ষেপ নিয়ে সুর নরম করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তেহরানও পিছু হটে জানিয়েছে, তারা বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করবে না। স্থগিত করা হয়েছে বিক্ষোভে সহিংসতার অভিযোগে আটক এরফান সোলতানির মৃত্যুদণ্ডও। পাঁচ ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর আকাশসীমা খুলে দিয়েছে ইরান। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘পেছনের দ্বারে’ যে যোগাযোগ হতো, সেই কূটনৈতিক চ্যানেল আবার চালুর খবর মেলেনি। পাশাপাশি দক্ষিণ চীন সাগর থেকে বিমানবাহী রণতরী মধ্যপ্রাচ্যে নিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। তাই আপাতদৃষ্টিতে উত্তেজনা কমছে মনে হলেও যুদ্ধের শঙ্কা কাটেনি।
দ্য গার্ডিয়ান অনলাইন লিখেছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে হামলার হুমকি থেকে সাময়িকভাবে সরে এসেছেন। তিনি জানান, তাঁকে বিক্ষোভকারী হত্যা বন্ধের বিষয়ে আশ্বস্ত করা হয়েছে। গত বুধবার রাতে হোয়াইট হাউসে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘ইরানে হত্যা বন্ধের কথা আমাদের জানানো হয়েছে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই।’ ট্রাম্প জানান, তিনি ‘অন্য পক্ষের (ইরান) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জায়গা’ থেকে আশ্বাস পেয়েছেন– তেহরান বিক্ষোভকারীদের ওপর প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহার করবে না।
‘অনেক মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার কথা ছিল’ উল্লেখ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমরা প্রক্রিয়াটি কী তা পর্যবেক্ষণ করব। তবে মার্কিন প্রশাসন ইরানের কাছ থেকে খুব ভালো বিবৃতি পেয়েছে।’ ওয়াশিংটন ডিসি থেকে আলজাজিরার মাইক হান্না বলেন, গত বুধবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এ মন্তব্য ইরানের প্রতি তাঁর সুর নরম করার ইঙ্গিত।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন জানায়, ইরানে হামলা না চালানোর জন্য দেশটির প্রতিবেশী মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর কঠোর চাপ ছিল। বিশেষ করে সৌদি আরব এতে অগ্রণী ভূমিকায় ছিল। তাদের আশঙ্কা, ইরানের হামলা হলে পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে তাদের দেশে থাকা ঘাঁটিগুলো লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। সম্প্রতি ইরানও এ ধরনের হুমকি দিয়ে বলেছিল, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক অভিযান চালালে ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালাবে তেহরান।
গত বুধবার বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের সম্ভাব্য পদক্ষেপের জন্য প্রস্তুত ছিল ইসরায়েল। ইসরায়েলের কর্মকর্তারা মূলত নীরব ছিলেন। কারণ, তাদের দৃশ্যমান ভূমিকা তেহরানের বিক্ষোভ-আন্দোলনকে বিদেশি-সমর্থিত হিসেবে চিত্রিত করার সুযোগ করে দিতে পারে। তবুও মিছিলে মুখোশ পরা সশস্ত্র বিক্ষোভকারীর অংশগ্রহণ নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
হারেৎজ ও ওয়াশিংটন পোস্ট জানায়, গত বুধবার সন্ধ্যায় ইসরায়েলের কর্মকর্তারা রাশিয়ার মাধ্যমে ইরানকে জানিয়েছিলে, ইরান যদি প্রথমে হামলা না করে, তবে ইসরায়েল প্রথমে হামলা করবে না। দ্য নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছে, বুধবার বিকেলে ট্রাম্পের মন্তব্যের পর পেন্টাগন সেনা প্রত্যাহার ও সেনাদের ঘাঁটিতে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। মার্কিন জ্যেষ্ঠ এক সামরিক কর্মকর্তা ইরান নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মন্তব্যকে ‘সংশ্লিষ্টতা থেকে বেরিয়ে আসা’র চেষ্টা বলে বর্ণনা করেছেন।
কিন্তু এ পেছনে ফেরার বিষয়টি কি আদৌ যুদ্ধে শঙ্কাকে উড়িয়ে দেয়? যুক্তরাষ্ট্র বেশ ভালো করেই প্রস্তুতি নিয়েছিল। মার্কিন পত্রিকাটি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের দূরপাল্লার বোমারু বিমানগুলোকে সম্ভাব্য হামলার জন্য সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছিল। কিন্তু পরে তা স্থগিত করা হয়।
গত মঙ্গলবার এনবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আরব ও ইসরায়েলের কর্মকর্তারা সম্প্রতি মার্কিন প্রশাসনকে বলেন, ইরানের শাসনব্যবস্থা এখনও এতটা দুর্বল নয়, মার্কিন হামলার মাধ্যমে এটিকে উৎখাত সম্ভব।
গত কয়েক সপ্তাহে ট্রাম্পের বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডের ভিন্নতা দেখা গেছে। সামরিক হামলার হুমকি ও হঠাৎ বিরতির মধ্যে তীব্রভাবে বাঁক পরিবর্তনের বিষয়ও লক্ষণীয়। বিশ্লেষকরা এমন অপ্রত্যাশিত হয়ে ওঠাকে কৌশল হিসেবেও দেখছেন।
দক্ষিণ চীন সাগর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে যাচ্ছে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী
যুক্তরাষ্ট্রের কেবল নিউজ নেটওয়ার্ক নিউজ ন্যাশন জানিয়েছে, পেন্টাগন ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন বিমানবাহী রণতরী ও তার স্ট্রাইক গ্রুপকে দক্ষিণ চীন সাগর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের খবরে বলা হয়, অক্টোবরে ভূমধ্যসাগর থেকে ক্যারিবিয়ানে ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড ক্যারিয়ার গ্রুপ পাঠানোর ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের অর্থ হলো, ইরানের ওপর সম্ভাব্য কোনো হামলায় ভূমিকা রাখার মতো অবস্থানে বর্তমানে কোনো বিমানবাহী রণতরী স্ট্রাইক গ্রুপ নেই। এ ঘটনা তেহরানের সঙ্গে আগের উত্তেজনার সময়ও হয়েছিল।
মধ্যপ্রাচ্যের রণতরীর নিয়ে আসা এক ধরনের যুদ্ধ প্রস্তুতির আভাস দেয়। এ কারণে ইরানের হামলার শঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। মার্কিন নৌবাহিনীর এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমটি জানায়, ক্যারিবীয় অঞ্চলে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ১২টি যুদ্ধজাহাজ রয়েছে, যেখানে মধ্যপ্রাচ্যে রয়েছে ছয়টি।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরিকল্পনা নেই, বললেন আরাগচি
উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ ভেঙে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ফক্স নিউজকে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। এতে তিনি অনেকগুলো বিষয় নিয়ে খোলাখুলি কথা বলেন। তিনি সুর নরম করে বলেন, সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পরিকল্পনা ইরানের নেই।
বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যার নতুন তথ্য দেন আরাগচি। হত্যাকাণ্ডের জন্য তিনি ‘ইসরায়েলের ষড়যন্ত্র’কে দায়ী করেন। বুধবার সন্ধ্যায় ‘স্পেশাল রিপোর্ট উইথ ব্রেট বেয়ার’-এ তিনি নিহতের সংখ্যা কয়েকশ হতে পারে বলে উল্লেখ করেন। আরাগচি বলেন, ‘সন্ত্রাসীরা বাইরে থেকে এসে বিক্ষোভে প্রবেশ করে এবং পুলিশ বাহিনী, কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা বাহিনীকে গুলি করতে শুরু করে। আর সেখানে সন্ত্রাসী সেল ছিল। তারা ভেতরে ঢুকে, তারা আইএসআইএস-ধাঁচের সন্ত্রাসী অভিযান চালায়। তারা পুলিশ কর্মকর্তাদের জীবন্ত পুড়িয়ে মেরেছে; শিরশ্ছেদ করেছে; তারাও জনগণের ওপর গুলি চালিয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘তিন দিন ধরে আমরা আসলে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি, প্রতিবাদকারীদের সঙ্গে নয়। এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন গল্প ছিল।’ আরাগচির মতে, এ দুর্বৃত্ত, সন্ত্রাসী-সদৃশ ব্যক্তিরা একটি কারণে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর গুলি চালিয়েছে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রকে সংঘাতে টেনে আনা যায়। তারা মৃত্যুর সংখ্যা বাড়াতে চেয়েছিল। কারণ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, ‘যদি হত্যাকাণ্ড ঘটে, তবে তিনি হস্তক্ষেপ করবেন।’ ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এটি ছিল ইসরায়েলের চক্রান্ত।’
পাহলভির সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ট্রাম্পের
ইরানে বিক্ষোভ হলেও যুক্তরাষ্ট্রে থাকা এক ব্যক্তির নাম সামনে আসে। তিনি রেজা পাহলভি। ইসরায়েলপন্থি এ নেতা ইরানের শাহ রাজবংশের প্রতিনিধি। তিনি উত্তেজনার আগুনে ঘি ঢালতে পছন্দ করেন। এবারের বিক্ষোভেও তিনি এটা করেছিলেন। বিক্ষোভ চালিয়ে যেতে বলে তিনি ইরানের ফেরার আশার বাণীও শুনিয়েছিলেন। তবে ট্রাম্প বলছেন ভিন্ন কথা। তিনি পাহলভির জনসমর্থন আদায় ও দেশ পরিচালনার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বুধবার দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ইরানের বিরোধীদলীয় নেতা রেজা পাহলভিকে ‘বেশ চমৎকার মানুষ’ বলে মনে হয়। তবে তিনি শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা দখলের জন্য ইরানের অভ্যন্তরে জনসমর্থন আদায় করতে পারবেন কিনা, তা নিয়ে তাঁর অনিশ্চয়তা রয়েছে। তিনি বলেন, ইরানের ধর্মীয় সরকারের পতন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আল-উদেইদে সতর্কতার মাত্রা কমানো হয়েছে
পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত তিনটি সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, কাতারে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের আল-উদেইদ বিমানঘাঁটিতে নিরাপত্তা সতর্কতার মাত্রা বৃদ্ধির পর গতকাল বৃহস্পতিবার তা কমিয়ে আনা হয়েছে। ইরানে হামলার বিবেচনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র– এমন উত্তেজনার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের সর্বোচ্চ সংখ্যক মার্কিন সেনা আবাসস্থল আল-উদেইদ ত্যাগ করেন কিছু সামরিক কর্মী। কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থাটি বলছে, ঘাঁটি ছেড়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া কিছু কর্মীকে আবার ফেরার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। অনেকেই ফিরতে শুরু করেছেন।
আরাগচি-জয়শঙ্করের ফোনালাপ
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি ফোনে কথা বলেছেন। এ সময় আরাগচি তেহরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ‘মার্কিন কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপকারী ও উস্কানিমূলক নীতি’র বর্ণনা করে নিন্দা জানান। ভারতের সংবাদ সংস্থা আইআরএনএ জানিয়েছে, বুধবার গভীর রাতে তারা ফোনালাপ করেন। আরাগচি দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ইরানের জনগণের ঐক্য ও দৃঢ় সংকল্পের ওপর জোর দেন।