ভেনেজুয়েলা নিয়ে পুতিন কেন চুপ

প্রকাশিতঃ জানুয়ারি ১৬, ২০২৬ | ১০:৪০ অপরাহ্ণ
অনলাইন নিউজ ডেক্স

ইউক্রেনে রাশিয়ার ‘বিশেষ সামরিক অভিযানের’ সবচেয়ে বড় সমর্থক ছিলেন জাতীয়তাবাদী ব্লগার ও যুদ্ধের খবর সংগ্রহ করা সাংবাদিকেরা। কিন্তু তারা এখন ক্ষুব্ধ। ডোনাল্ড ট্রাম্প মস্কোর মিত্র ভেনেজুয়োর প্রেসিডেন্টকে তুলে নিয়ে গেছেন, রাশিয়ার পতাকাবাহী তেলের জাহাজ জব্দ করেছেন। ক্ষুব্ধ ব্লগার ও সাংবাদিকরা মনে করছেন, এর জবাবে রাশিয়ারও উচিত আমেরিকার জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়া কিংবা ‘শত্রুদের’ লক্ষ্য করে পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়া। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এর কোনোটাই করেননি। এমনকি আনুষ্ঠানিক বিবৃতিও দেননি। এর ছাপ ছিল রাশিয়ান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতেও। মার্কিন সশস্ত্র আগ্রাসনের কোনো ধরনের সমালোচনা না করে তারা এটিকে কেবল ‘স্বাধীন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। বলেছে, এমন কাজ অগ্রহণযোগ্য। বড় কোনো ঘটনায় ভ্লাদিমির পুতিনকে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানাতে খুব কমই দেখা যায়। তিনি বরং ঘটনার গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ ও সে অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া দেন। এমন কৌশলকে কখনো কখনো চতুর ও আত্মবিশ্বাসী বলে মনে হতে পারে। কিন্তু ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে তার এমন কৌশল দুর্বলতা ও অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত হিসেবে মনে হচ্ছে। ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলায় আক্রমণের আগে ইউক্রেনে রাশিয়ার অবস্থান সম্পর্কে বেশ আত্মবিশ্বাসী ছিলেন পুতিন। ট্রাম্প রাশিয়ার পক্ষ নিয়ে একটি ‘শান্তি পরিকল্পনা’র কথা বলেছিলেন। কিয়েভের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল থেকে সেনা প্রত্যাহারে ভলোদিমির জেলেনস্কিকে যথেষ্ট চাপ দিচ্ছিলেন ট্রাম্প। অপরদিকে ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর বারবার হামলা করছিল রাশিয়া। পুতিন ভেবেছিলেন, ইউক্রেন শিগগিরই ট্রাম্পের ‘শান্তির শর্তাবলী’ মেনে নেবে। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ পুতিনের সে মূল্যায়নকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। যুক্তরাষ্ট্র এখনও ইউক্রেনে ‘শান্তি পরিকল্পনা’কে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। বলছে, সম্প্রতি ইউক্রেনকে নিরাপত্তা নিশ্চয়তার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে তাতে মার্কিন সেনা মোতায়েন অন্তর্ভুক্ত থাকবে না। পুতিন ঠিক এটাই চেয়েছেন। যদিও যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক রাশিয়ার তেলবাহী ট্যাঙ্কার জব্দের ঘটনাকে পুতিনকে অপমানের চেষ্টা হিসেবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে- তবে ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, এটি ভেনেজুয়েলার জাহাজ ছিল। জব্দ হওয়া এড়াতে জাহাজটিতে রাশিয়ার পতাকা ওড়ানো হয়েছিল। জাহাজে থাকা দুই রাশিয়ান ক্রুকে মুক্তি দেওয়ার কথা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে গত বছরের নভেম্বরে ‘শান্তি পরিকল্পনা’র শর্তাবলী রাশিয়া পুরোপুরি মানতে অস্বীকৃতি জানানোয় ট্রাম্প প্রশাসন নিঃসন্দেহে অসন্তুষ্ট। শান্তি পরিকল্পনার অনেক দিন গরিয়ে যাওয়ায় রাশিয়ার ওপর নতুন পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছেন ট্রাম্প। যেসব দেশ রাশিয়ার তেল বা ইউরেনিয়াম কিনবে; তাদের পণ্যে ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ সংক্রান্ত বিলে অনুমোদন দিয়েছেন। পুতিন অবশ্য এমন কিছু করবেন না, যা তার দুর্বলতাকে প্রকাশ করবে। তিনি আমেরিকার সঙ্গে উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি করার ঝুঁকিও নিতে চান না। এ কারণেই হয়তো নীরব আছেন। তবে এই নীরবতা বজায় রাখারও নিশ্চয় একটি সীমা আছে। এখন প্রশ্ন হলো ট্রাম্প প্রশাসন; সেই সীমা ভাঙার মতো যথেষ্ট কিছু কি করবে? পশ্চিমা অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, রাশিয়ার ওপর কড়াকড়ি আরোপের এখনই সময়। কেবল নিষেধাজ্ঞা আরোপই একমাত্র পথ নয়। বরং ইউক্রেনকে আরও অস্ত্র সরবরাহ করা এমনকি নিষেধাজ্ঞা এড়াতে মস্কো যেসব তেলবাহী ট্যাঙ্কারের প্রক্সি নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে সেগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু বানানো দরকার। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর মতো ভ্লাদিমির পুতিনকেও তুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে উৎসাহিত করছেন জেলেনস্কি। চেচনিয়ার প্রেসিডেন্টকেও তুলে নেওয়ার জন্যও তিনি পরোক্ষভাবে উৎসাহ দিচ্ছেন বলে জানা গেছে। ট্রাম্প রাশিয়ায় সেনা পাঠাবেন- এই ধারণা যদিও কাল্পনিক, তবুও ভেনেজুয়েলায় অভিযানের আপাত সাফল্য তাকে সমর্থন করা নেতাদের মনে সাহস যুগিয়েছে। সম্প্রতি হোয়াইট হাউসের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ স্টিফেন মিলার জোর দিয়ে বলেছেন, ‘আমরা পরাশক্তি। আমরা নিজেদেরকে একটি পরাশক্তি হিসেবে পরিচালনা করছি।’ পুতিন যে বিষয়গুলোকে অগ্রহণযোগ্য বলে মনে করেন, সেগুলোর মধ্যে আছে- রাশিয়ার তেলবাহী জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা, কঠোর শর্ত আরোপের চেষ্টা অথবা অস্থিরতাকে উৎসাহ (ইরানের ক্ষেত্রে যা হয়েছে) দেওয়া। এখন যুক্তরাষ্ট্র যদি আরও বেশি উসকানি বা দাদাগিরি মনোভাব দেখায়, তাহলে তা পুতিনের ‘অগ্রহণযোগ্যতার’ সীমা অতিক্রম করতে পারে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য পুতিনের কাছে বিকল্প খুব কমই আছে। মার্কিন নৌবাহিনী যদি রাশিয়ার কোনো তেল ট্যাঙ্কার জব্দ করতে চায়, রাশিয়া সেটি পাহারা দেওয়া স্বত্ত্বেও থামাতে পারবে না। রাশিয়ার একমাত্র শক্তি হলো তাদের পারমাণবিক অস্ত্রাগার। পুতিন এককভাবে যদি ট্রাম্পকে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের আলটিমেটাম দেন সেটিও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গুরুত্ব নাও পেতে পারে। কেবল চীনের মতো সামরিক শক্তিধর দেশের সঙ্গে মিলে হুমকি দিলে সেটি বিশেষ গুরুত্ব তৈরি করবে। কারণ, চীনের কাছে সামরিক শক্তির পাশাপাশি বিরল খনিজের মতো মূল্যবান বিকল্প আছে। যা তারা যুক্তরাষ্ট্রকে বাগে আনার জন্য ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু পুতিন কেবল নিজেদের পারমাণবিক শক্তি প্রদর্শনের আশ্রয় নিয়েছেন। কোনো কারণে তিনি যদি পারমাণবিক হামলা করেনও, যুক্তরাষ্ট্র সেটির জবাব দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। যতদিন ইউক্রেন যুদ্ধ চলতে থাকবে; ততদিনই এমন পরিস্থিতি তৈরির উচ্চ ঝুঁকি বিরাজ করবে। এমন অবস্থায় জেলেনস্কির নিজের নিরাপত্তা নিয়ে সতর্ক থাকা উচিত। পুতিন হয়তো ট্রাম্পের মুখোমুখি হতে চাইবেন না, কিন্তু তিনি হয়তো মাদুরোকে তুলে নেওয়ার মতো কোনো কাণ্ড ঘটিয়ে নিজের ক্ষমতা দেখাতে চাইবেন। বিশেষ করে, তার বাসভবনে ইউক্রেনের ড্রোন হামলার পর এমন সন্দেহ তীব্র হয়েছে। যদিও কিয়েভ এতে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছে। তবুও মস্কো এ হামলার প্রতিশোধ নেওয়ার হুমকি দিয়েছে। যাই ঘটুক না কেন, ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর রাশিয়ার আক্রমণ অব্যাহত থাকবে, ভেনেজুয়েলা নিয়েও নীরবতা বজায় রাখবেন পুতিন।