রাজধানীর উত্তরা–১১ নম্বর সেক্টরে আবাসিক ভবনে আগুনে দুই পরিবারের ছয়জনের প্রাণহানির ঘটনায় ভবনমালিকের দায় দেখছেন মৃতদের স্বজন ও এলাকাবাসী। তারা বলছেন, আগুন লাগার পর মালিক নিজের ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে গেলেও ভাড়াটেদের কিছু জানাননি। সেইসঙ্গে তিনি ছাদের দরজা বন্ধ রাখায় ভাড়াটেরা ছাদেও যেতে পারেননি। এদিকে আগুনে হতাহতের ঘটনায় আজ শনিবার পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি।
উত্তরা পশ্চিম থানার ওসি কাজী মো. রফিক আহমেদ বলেন, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গতকাল শুক্রবার একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। ভুক্তভোগীদের কেউ যদি এ বিষয়ে মামলা করতে চান, তাহলে মামলা নেওয়া হবে। তবে এখনও কেউ পুলিশের কাছে কোনো অভিযোগ করেননি।
গতকাল শুক্রবার সকালে রাজধানীর উত্তরা–১১ নম্বর সেক্টরের ১৮ নম্বর সড়কের ৩৪ নম্বর ভবনে আগুনে প্রাণ হারান ফল ব্যবসায়ী হারিছ উদ্দিন (৫২), তার ছেলে হিসান উদ্দিন রাহাব (১৭), ভাতিজি রোদেলা আক্তার (১৪), এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের উপব্যবস্থাপক ফজলে রাব্বী রিজভী (৩৮), তার স্ত্রী স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ আফরোজা আক্তার (৩৭) ও তাদের দুই বছর বয়সী ছেলে কাজী ফাইয়াজ রিশান। দুটি পরিবারই ভবনের পঞ্চম তলায় থাকতো। আগুন তৃতীয় তলার ওপরে না গেলেও ধোঁয়ার কারণে তারা মারা যান।
মৃত হারিছ উদ্দিনের ভায়রা শেখ তাহের রহমান বলেন, তিন শিশুসহ ছয়জনের মৃত্যুর পেছনে বাড়িওয়ালার অবশ্যই দায় আছে। তাদের ফ্ল্যাটে আগুন লাগায় তিনি দ্রুত বিষয়টি জানতে পারেন। এরপর তিনি সপরিবারে বেরিয়ে গেছেন, কিন্তু ভাড়াটেদের কথা চিন্তা করেননি। আমরা এ বিষয়ে মামলা করার কথা ভাবছি। উত্তরা সোসাইটির নেতারাও আমাকে আশ্বাস দিয়েছেন, তারা আমাদের পাশে থাকবেন।
তিনি আরও বলেন, দোতলা–তিনতলা মিলে করা ডুপ্লেক্সে ভবন মালিক জুয়েল মোল্লা থাকেন। ওই দুটি তলায় ইনটেরিয়র ডিজাইনের কারণে প্রচুর দাহ্যবস্তু ছিল। তাই, আগুন দ্রুত ছড়িয়েছে। আমি শুনেছি, ফ্ল্যাটে ইনভার্টার এসি থেকে গরম বাতাস বের হচ্ছিল। এর একপর্যায়ে অতিরিক্ত উত্তপ্ত হয়ে আগুন ধরে যায়।
নিহত রাব্বীর ফুফাতো ভাই কাজী নাহিদ বলেন, ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, ভবন মালিক ছাদের দরজায় তালা দিয়ে রেখেছিলেন। তালা না থাকলে ভবনের বাসিন্দারা ছাদে গিয়ে জীবন বাঁচাতে পারতেন। অবহেলায় এমন মৃত্যু মেনে নেওয়া যায় না।
ঘটনাস্থলের আশপাশের বাসিন্দারাও মর্মান্তিক এই ঘটনায় ভবন মালিকের ভূমিকায় ক্ষুব্ধ। তারা মনে করেন, প্রতিটি ভবনের ছাদে যাওয়ার দরজায় যেন তালা না দেওয়া হয়, সে ব্যাপারে সরকারের উদ্যোগ নেওয়া উচিত। কারণ অনেক ঘটনাতেই দেখা যায়, দরজা বন্ধ থাকায় ছাদে উঠতে না পেরে হতাহতের ঘটনা ঘটে। বাড়ির মালিকের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করেন তারা।
পাশাপাশি তিন কবরে বাবা–মা–সন্তান
কুমিল্লা প্রতিনিধি জানান, উত্তরার আগুনে নিহত দুই বছরের শিশু রিশান, তার বাবা কাজী ফজলে রাব্বী রিজভী ও মা আফরোজা আক্তার সুবর্ণার মরদেহ আজ শনিবার কুমিল্লায় দাফন করা হয়েছে। সকালে চৌদ্দগ্রাম উপজেলার চিওড়া ইউনিয়নের কাজীবাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে জানাজা শেষে পাশাপাশি তিনটি কবরে তাদের দাফন করা হয়। এর আগে সবার কাছে দোয়া চেয়ে বক্তব্য দেন রাব্বির বাবা খোরশেদ আলম।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, রাব্বীর প্রথম স্ত্রী তিথি প্রায় দুই বছর আগে মারা যান। পরিবার ও আত্মীয়দের অনুরোধে তিথির বান্ধবী সুবর্ণাকে বিয়ে করতে রাজি হন তিনি। তাদের কোলজুড়ে এসেছিল একমাত্র ছেলে রিশান।
এর আগে শুক্রবার রাতেই ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে হারিছ, রাহাব ও রোদেলাকে দাফন করা হয় বলে জানা গেছে।