ইরানের বিক্ষোভকারীরা এখন প্রতারিত বোধ করছেন

প্রকাশিতঃ জানুয়ারি ১৯, ২০২৬ | ৫:৫৮ পূর্বাহ্ণ
অনলাইন নিউজ ডেক্স

‘ইরানের শাসকরা বিক্ষোভকারীদের হত্যা করলে যুক্তরাষ্ট্র উদ্ধার অভিযানে যাবে।’ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এমন কথায় বিশ্বাস রেখেছিলেন সিভাস শিরজাদ (৩৮)। পরিবারের সতর্কতা উপেক্ষা করে তিনি বিক্ষোভে যোগ দিয়েছিলেন। কর্তৃপক্ষ এক সময় গুলি চালানো শুরু করে, কিন্তু কেউ আর উদ্ধার করতে যায়নি। ৮ জানুয়ারি তেহরানে গুলিতে নিহত হন শিরজাদ। ১২ বছর বয়সী সন্তান এখনো তাঁর ফেরার অপেক্ষায় আছে। এক আত্মীয় নাম প্রকাশ না করে সম্প্রতি শিরজাদের আন্দোলনে যাওয়ার স্মৃতিচারণ করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা তাঁকে বারণ করেছিলাম। আন্দোলনে গেলে সম্ভাব্য বিপদের কথাও বলেছিলাম। কিন্তু সে শোনেনি। উল্টো বলেছিল, ট্রাম্প আমাদের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন। আমি যাচ্ছি...।’ ১৩ জানুয়ারি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ডোনাল্ড ট্রাম্প বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে নতুন বার্তা দেন। লিখেন, ‘আন্দোলন চালিয়ে যান। সাহায্য যাচ্ছে।’ এমন বার্তাতে বিক্ষোভকারীদের মধ্যে নতুন করে উৎসাহ জেগেছিল। কিন্তু একদিন পরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট নরম সুরে কথা বলেন। জানান, তেহরানের শাসকদের কাছে থেকে বিক্ষোভকারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর না কারার ব্যাপারে আশ্বাস পেয়েছেন। এমন কথা বলার পর তাঁর প্রশাসনও সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের পদক্ষেপ থেকে সরে যায়। এরপর বিক্ষোভকারীরা হতাশ হয়ে পড়ে। ডোনাল্ড ট্রাম্প হত্যাকাণ্ড বন্ধের ব্যাপারে আশ্বস্ত হলেও তা থেমে থাকেনি। তেহরানের রাজপথ খালি হতে শুরু করে। অন্য শহরগুলোতে বিচ্ছিন্নভাবে বিক্ষোভ হলেও ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় সেগুলোর ব্যাপকতা সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। এক অধিকারকর্মীর মাধ্যমে সম্প্রতি দ্য গার্ডিয়ানের কাছে বার্তা পাঠিয়েছেন তেহরানের এক বাসিন্দা। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে গণগ্রেপ্তার অভিযান চলছে। ট্রাম্পের মনোযোগ অন্যদিকে যাওয়া মাত্রই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর শুরু হবে। তেহরানের কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড না দেওয়ার ইঙ্গিত দেয়, ২৬ বছর বয়সী এরফান সোলতানির ফাঁসি স্থগিত করার মাধ্যমে। ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজে সে খবর সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করেন। বর্তমানে বিদেশে অবস্থানরত ইরানি বিক্ষোভকারীরা নিজেদের প্রতারিত মনে করছেন। অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে বসবাসকারী এলহাম বলছেন, ‘এটি চপেটাঘাতের মতো লাগছে। ইরানিরা আগেও হতাশ হয়েছে। কিন্তু এবার মনে হচ্ছিল ভিন্ন কিছু হবে।’ অনেক প্রবাসী ইরানি মনে করছেন, ট্রাম্পের মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে শাসকদের বিজয় হয়েছে। সরকার পতনের আন্দোলনকারীরা ট্রাম্পের কাছে থেকে সাহায্য প্রত্যাশা করেছিলেন। কিন্তু তিনি উল্টো শাসকদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে যাচ্ছিলেন। গত বুধবার ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি যুক্তরাষ্ট্রকে কূটনীতির পথ বেছে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর এই বক্তব্য বিক্ষোভকারীদের সন্দেহকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এলহাম বলেন, ট্রাম্প যদি শাসকদের টিকে থাকার সুযোগ দেন, তাহলে প্রতারণার মনোবেদনা কাটাতে সাধারণ ইরানিদের অনেক সময় লাগবে। তাদের সব আশা শেষ হয়ে যাবে। এলহাম বলেন, অনেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের আচরণকে দ্রুত পরিবর্তনশীল হিসেবে উল্লেখ করেন। কিন্তু তিনি রাজনৈতিক নাটক মঞ্চায়নের জন্য সাধারণ মানুষকে যেভাবে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছেন তা গ্রহণযোগ্য নয়। ইরানের একজন বিশ্লেষক বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক পদক্ষেপ নিলে বিক্ষোভকারীদের কতটা উপকার হতো তা নিয়ে সংশয় আছে। কিন্তু ইরানের শাসকরা যে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ পরায়ণ হতো তা অনেকটা নিশ্চিত। মাঝখান থেকে বিক্ষোভকারীরা বিদেশি সমর্থনপুষ্ট হিসেবে চিহ্নিত হতো। এখনও ইরানের ভেতরে ও বাইরে বসবাসকারীদের কেউ কেউ বিশ্বাস করছেন বিশ্ব একদিন তাদের পাশে দাঁড়াবে। কিন্তু কীভাবে দাঁড়াবে তা নিয়ে তারা নিশ্চিত না। কানাডায় বসবাসকারী আজম জাংরাবি বলছেন, তাঁর খুবই কাছের এক বন্ধু গত সপ্তাহে ইসফাহানে বিক্ষোভে গিয়ে মারা গেছে। ইরানের মানুষ ট্রাম্পকে বিশ্বাস করে। তাঁর কথায় আস্থা রেখেছে। কিন্তু তিনি যদি শেষ পর্যন্ত পদক্ষেপ না নেন তাহলে সেই ভরসা ভেঙে যাবে। মানুষ আজীবন মনে রাখবে; কে তাদের পাশে ছিল, আর কে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র এখনো সামরিক অভিযানের পদক্ষেপ থেকে পুরোপুরি সরে যায়নি বলে উল্লেখ করেছেন মাইক ওয়াল্টজ। যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রতিনিধি গত বৃহস্পতিবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে বলেন, ট্রাম্প সব ধরনের বিকল্প চালু রেখেছেন। মার্কিন বিমানবাহী একটি রণতরী সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের দিকে যাত্রা শুরু করে। ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে সামরিক পুনর্বিন্যাসও দেখা গেছে। এ দুটি ঘটনা ইঙ্গিত দেয় ইরানে মার্কিন হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা এখনও শেষ হয়ে যায়নি। কিন্তু ইরানের আন্দোলনকারীরা আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছেন। সরকার কঠোরভাবে আন্দোলন দমনের অংশ হিসেবে ইন্টারনেট বন্ধ করে মানুষকে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। ফের রাস্তায় নামার ব্যাপারে দ্বিধাদ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। তেহরান থেকে আলবোরজ নামের এক বাসিন্দা দ্য গার্ডিয়ানের কাছে পাঠানো বার্তায় লিখেছেন, বিক্ষোভকারীরা থেমে গেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প কী করেন, মানুষ এখন সেটি দেখার অপেক্ষায়।