দুই দেশের সমীকরণ কোন পথে

প্রকাশিতঃ জানুয়ারি ১৯, ২০২৬ | ৫:৩২ অপরাহ্ণ
অনলাইন নিউজ ডেক্স

কথায় আছে যুক্তরাষ্ট্র যার বন্ধু তার শত্রুর প্রয়োজন নেই। ইরান যেন সেই প্রবাদের সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ। আমরা এখন দেখি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চিরশত্রু; কিন্তু তাদের সম্পর্কের গল্পটা সবসময় এমন ছিল না। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি ক্ষমতায় এসে তেল সম্পদকে জাতীয়করণ করেন মোহাম্মাদ মোসাদ্দেক। আধুনিক ইতিহাসে তাদের মধ্যে সেই স্বার্থের সংঘাত শুরু। ব্রিটিশ-মার্কিন ষড়যন্ত্রে উৎখাত হয় মোসাদ্দেক সরকার। এরপর পারস্য মুলকের মসনদে বসানো হয় রেজা শাহ পাহলভিকে। সে সময় সামরিক-অর্থনৈতিক সহযোগিতার নামে দুই দেশের বন্ধুত্ব দৃঢ় হয়। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে রুশ প্রভাব রুখতে ইরান হয়ে ওঠে ওয়াশিংটনের কৌশলগত ঘাঁটি। তখন ইসরায়েল ছিল ইরানের পরম মিত্র। ২৬ বছরের সেই বন্ধুত্বে ছেদ পড়ে ইসলামী বিপ্লবে। ১৯৭৯ সাল সেই বিপ্লব মধ্যপ্রাচ্যের সব সমীকরণ বদলে দেয়। তেহরানে শাহের পতন, মার্কিন দূতাবাস জিম্মি সংকট এবং ইসরায়েলবিরোধী আদর্শিক অবস্থান সেই বন্ধুত্বকে রূপ দেয় দীর্ঘস্থায়ী শত্রুতায়। যার কালো ছায়ায় আজও ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘর্ষে লিপ্ত। প্রভাব পড়ছে বিশ্বরাজনীতি, অর্থনীতি ও কূটনীতিতে। এখন যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতময় পরিস্থিতির মোড় কোন দিকে যাবে, তা নিয়ে নানা মত রয়েছে বিশ্লেষকদের। এসবের বিস্তারিত জানাচ্ছেন হুমায়ূন কবির ইরানে টানা কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা ব্যাপক ও সহিংস বিক্ষোভ দেশটির শাসকগোষ্ঠীর জন্য সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম গুরুতর চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিক্ষোভ দমনে কঠোর নিরাপত্তা অভিযান, সব ধরনের ইন্টারনেট ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা এবং নজিরবিহীন প্রাণহানির খবরে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বেড়েছে। এ প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দিয়ে পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখেছেন। পর্যবেক্ষকদের মতে, এসব বিক্ষোভকে আর কেবল সাধারণ জনঅসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দেশটির বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়া এ আন্দোলনে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেয়, যা রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ব্যাপক সহিংস প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। এতে স্পষ্ট হয়ে উঠে, ইরানের নেতৃত্ব পরিস্থিতিকে কতটা হুমকি মনে করছে। বিক্ষোভকারীদের হত্যাকাণ্ড বা মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলে তার ‘পরিণতি’ ভোগ করতে হবে—এমন হুঁশিয়ারির মাধ্যমে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ইরানের অভ্যন্তরীণ দমন-পীড়ন আর আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার বাইরে থাকবে না। যদিও হোয়াইট হাউস সাম্প্রতিক সময়ে তাৎক্ষণিক সামরিক অভিযানের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে, তবুও শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি নাকচ হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, এই কৌশল ট্রাম্প প্রশাসনের পরিচিত ‘চাপ ও অনিশ্চয়তা’ নির্ভর নীতিরই অংশ। এতে একদিকে যেমন ইরানকে সতর্ক বার্তা দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র নিজের সময় ও শর্তে পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগও ধরে রাখছে। এ হুঁশিয়ারি এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ইরান কৌশলগতভাবে বেশ দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলা, আঞ্চলিক সংঘাতে ইরানের মিত্রদের ক্ষয়ক্ষতি এবং গত গ্রীষ্মে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি হামলায় তেহরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও প্রতিরোধ শক্তি প্রশ্নের মুখে পড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দেশের ভেতরের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ। বিক্ষোভ দমন করতে গিয়ে সরকারের কঠোরতা সাময়িকভাবে আন্দোলন স্তিমিত করলেও, পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া সহজ হবে না বলেই মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক। তারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী ও ধারাবাহিক চাপই ইরানকে আগের অবস্থানে ফিরে যেতে বাধা দিতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসনের দ্বিতীয় মেয়াদে ইরান নীতি মূলত চাপ, সামরিক শক্তির প্রদর্শন এবং কৌশলগত অনিশ্চয়তার সমন্বয়। লক্ষ্য সরাসরি সরকার পরিবর্তন নয়, বরং ইরানকে তার পারমাণবিক কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ও আঞ্চলিক প্রভাব সীমিত করতে বাধ্য করা। একই সঙ্গে বার্তা দেওয়া হচ্ছে—যুক্তরাষ্ট্রের ‘লাল রেখা’ অতিক্রম করলে আকস্মিক ও কঠোর প্রতিক্রিয়া আসতে পারে। এরই মধ্যে অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে ওয়াশিংটন। ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করা দেশ বা প্রতিষ্ঠানের ওপর আরও ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দিয়ে ওয়াশিংটন স্পষ্ট করেছে যে, তেহরানকে সহায়তা করলে তার মূল্য দিতে হবে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী মোতায়েনের খবরে সামরিক উত্তেজনাও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে চাপের পাশাপাশি আলোচনার দরজাও পুরোপুরি বন্ধ করেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, ইরান যদি স্থায়ী ও যাচাইযোগ্যভাবে তার পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে সীমা মেনে নেয় এবং আঞ্চলিক নীতিতে পরিবর্তন আনে, তবে অর্থনৈতিক স্বস্তি ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পুনঃসম্পৃক্ততার সুযোগ থাকতে পারে। সব মিলিয়ে বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান কতটা এ বাস্তবতা অনুধাবন করতে পারছে, তার ওপরই নির্ভর করবে দেশটির ভবিষ্যৎ পথচলা—আর সেইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের গতিপথ। বিরোধের ইতিহাস একসময়ের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইরানে ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে দীর্ঘদিন ধরে দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অস্থির বৈরিতায় জড়িয়ে আছে। এ উত্তেজনা বারবার সহিংস সংঘাতে রূপ নিয়েছে ১৯৫৩: সিআইএ সমর্থিত অভ্যুত্থানে ইরানের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক মতাচ্যুত হন। পুনরায় ক্ষমতায় ফেরেন নির্বাসিত শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি। ১৯৬৭: যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে পারমাণবিক চুল্লি ও সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম জ্বালানি সরবরাহ করে ১৯৬৮: ইরান পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) স্বাক্ষর করে। অনুমতি পায় বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচির ১৯৭৯: ইসলামি বিপ্লবে শাহের পতন হয়, ক্ষমতায় আসেন আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি ১৯৭৯-১৯৮১: ইরানি শিক্ষার্থীরা তেহরানে মার্কিন দূতাবাস দখল, ৫২ মার্কিন নাগরিক ৪৪৪ দিন জিম্মি করায় ভেঙে পড়ে কূটনৈতিক সম্পর্ক ১৯৮০-১৯৮৮: ইরান–ইরাক যুদ্ধে ১০ লক্ষাধিক মানুষ নিহত। যুক্তরাষ্ট্র ইরাকের সাদ্দাম হুসেইনকে সমর্থন করে ১৯৮৩: লেবাননে হিজবুল্লাহর বোমা হামলায় ২৪১ মার্কিন সেনা নিহত। যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে ‘সন্ত্রাসে পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্র’ ঘোষণা করে ১৯৮৫: ইরান-কন্ট্রা কেলেঙ্কারিতে ফাঁস হয় রিগ্যান প্রশাসনের গোপনে ইরানের কাছে অস্ত্র বিক্রির তথ্য ১৯৮৮: পারস্য উপসাগরে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইরানি যাত্রীবাহী বিমান ভূপাতিত করে, নিহত হয় ২৯০ জন ১৯৯২-১৯৯৬: যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক ও তেল নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ১৯৯৮-২০০০: সম্পর্ক কিছুটা উষ্ণ হয়। যুক্তরাষ্ট্র ১৯৫৩ সালের অভ্যুত্থানে নিজের ভূমিকা স্বীকার করে ২০০২: প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ইরানকে ‘অশুভ শক্তির অক্ষ’ ঘোষণা করেন ২০০৩: যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক আগ্রাসনে সাম্প্রদায়িক সংঘাত ছড়ায়। ওয়াশিংটনের অভিযোগ, ইরান শিয়া মিলিশিয়াদের সহায়তা করছে ২০০৬: প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ হোয়াইট হাউসে নজিরবিহীন চিঠি পাঠান। একই সঙ্গে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বাড়ান ২০১৩: বারাক ওবামা ও হাসান রুহানি অন্তর্বর্তী পারমাণবিক চুক্তিতে পৌঁছান। এতে সীমিত নিষেধাজ্ঞা শিথিল হয় ২০১৬: চুক্তি বাস্তবায়নের পর বন্দি বিনিময় হয় ২০১৮: প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করেন এবং পুনরায় নিষেধাজ্ঞা দেন ২০১৯: যুক্তরাষ্ট্র ইরাননের আইআরজিসিকে সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণা করে ২০২০: যুক্তরাষ্ট্র কাসেম সোলাইমানিকে হত্যা করে। এতে ইরান ইরাকে মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ২০২২: মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর দেশব্যাপী বিক্ষোভ ২০২৩: হামাসের ইসরায়েলে হামলার ফলে গাজা যুদ্ধ শুরু। হিজবুল্লাহ লেবানন থেকে হামলা এবং ইয়েমেনের হুথিরা লোহিত সাগরে জাহাজে হামলা চালায় ২০২৪: দামেস্কে ইরানি কনস্যুলেটে ইসরায়েলি হামলায় হিজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরাল্লাহ নিহত। ইরান ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করে ইসরায়েলে। যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের ওই বিমান প্রতিরক্ষায় সহায়তা করে এপ্রিল ২০২৫: ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ৭ বছরের মধ্যে প্রথম পারমাণবিক আলোচনা হয় জুন ২০২৫: ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের মধ্যে মার্কিন বি-২ বোমারু বিমান দিয়ে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা হয় ২০২৬: মুদ্রা ধসে দেশজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির বৈধতা নিয়ে স্লোগান ধ্বনিত হয়। সরকারের দমন-পীড়নে হাজারো মানুষ নিহত, ট্রাম্প ‘খুব কঠোর পদক্ষেপের’ হুঁশিয়ারি দেন