আইনশৃঙ্খলা ও দুর্নীতি দমনই অগ্রাধিকার হবে : তারেক রহমান

প্রকাশিতঃ জানুয়ারি ২৫, ২০২৬ | ৫:৪৮ পূর্বাহ্ণ
অনলাইন নিউজ ডেক্স

আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত ও দুর্নীতি দমন করাই তার প্রধান অগ্রাধিকার হবে বলে জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেন, দেশের বহু সমস্যার সমাধানে এ দুটি বিষয়ই কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। শনিবার (২৪ জানুয়ারি) দুপুরে ‘আমার ভাবনা বাংলাদেশ’ শীর্ষক জাতীয় রিল-মেকিং প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের সঙ্গে আলাপচারিতায় তারেক রহমান নিজের পরিকল্পনা এভাবে ব্যক্ত করেন। গুলশানে বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ পার্কের উন্মুক্ত স্থানে এই আলাপচারিতার আয়োজনটি করা হয়। জাতীয় রিল-মেকিংয়ের ১০ বিজয়ীর সঙ্গে কথা বলেন তারেক রহমান। সঙ্গে ছিলেন তার মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। বিজয়ীরা তাদের নানা জিজ্ঞাসা তারেক রহমানকে করেন এবং খোলামেলা জবাবও দেন তিনি। তারেক রহমান বলেন, প্রথমেই আমাদের একটি বিষয় নিশ্চিত করতে হবে- আইনশৃঙ্খলা। অর্থাৎ মানুষ যা বলছে, আপনারা যা বলছেন- সবাই যেন রাস্তায় নিরাপদে থাকতে পারে। আর দুর্নীতি- যেভাবেই হোক, আমাদের এটি মোকাবিলা করতে হবে। বিভিন্ন স্তরে বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতি রয়েছে এবং আমাদের বিভিন্ন উপায়ে তা মোকাবিলার চেষ্টা করতে হবে। আমরা যদি এই দুটি বিষয় সঠিকভাবে সমাধান করতে পারি, তাহলে দেশের আরও অনেক সমস্যার অনেকটাই সমাধান হয়ে যাবে। এটাই আমার পরিকল্পনা। প্রস্তাবিত ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে তারেক রহমান বলেন, একক মা, নানা সমস্যায় পড়া নববধূ, যে সব নারীর স্বামী তাদের ছেড়ে চলে গেছে— আমার যতদূর জানা, বাংলাদেশ সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় বর্তমানে ১৩৮টি প্রকল্প চলছে। কিন্তু সেগুলো সঠিকভাবে কাজ করছে না। সম্পদ অপচয় হচ্ছে। একজন মানুষ তিন ধরনের সহায়তা পাচ্ছে, অথচ আরেকজন কিছুই পাচ্ছে না। আমরা ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে এই ব্যবস্থাকে আরও সুশৃঙ্খল করতে চাই। আমরা এটিকে সর্বজনীন করতে চাই। তিনি বলেন, একজন কৃষকের স্ত্রী যেমন এটি পাবেন, তেমনি একজন ভ্যানচালক কিংবা একজন অফিস কর্মীর স্ত্রীও এই সেবা পাবেন। অনলাইনে নানা নিপীড়ন বিষয়ক এক প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান বলেন, জিনিসটাকে আমরা এভাবে দেখি। দেখেন, আমি একটা ঘটনা বলি। আমাদের পরিচিত একটা ফ্যামিলি। ওদের একটা ছেলে আছে, ১২/১৩ বয়স। এটা আমি আরও পাঁচ-ছয় বছর আগের কথা বলছি। একদিন ওর বাবার সাথে গাড়িতে উঠেছে- ফর সাম রিজন, ওর বাবা সিট বেল্ট লাগায়নি। তখন ছেলেটা বলছে যে, বাবা তুমি সিট বেল লাগাও। বলে যে, না অল রাইট। ছেলেটা বললো, তুমি সিট বেল্ট না লাগালে টিচার বলেছেন, আমি নেমে যাব। এটাকে আমি বোঝাতে চাচ্ছি যে, এই যে সামাজিক মূল্যবোধ- এই জিনিসগুলো আমাদের স্কুলে শেখাতে হবে এবং সে জন্যই কিন্তু আমরা প্রাইমারি এডুকেশনে জোর দিতে চাচ্ছি বেশি। নতুন নতুন তিন তলা-চার-পাঁচতলা স্কুল বিল্ডিং— এটা আমাদের লক্ষ্য নয়, বরং ওই বাজেটটা দিয়ে আমরা আমাদের প্রাইমারি টিচারদের মোর কোয়ালিফাই করতে চাচ্ছি, ট্রেনিং দিতে চাচ্ছি। যেই ট্রেনিংটার মধ্যে একাডেমিক ট্রেনিং থাকবে, একই সাথে সামাজিক এবং ধর্মীয় যে মূল্যবোধগুলো আছে— এই জিনিসগুলো বাচ্চাদের শেখাব। তিনি বলেন, এই যে এখন সাইবার বুলিং, এসিডের ঘটনা- আমরা যদি বাচ্চাদের ছোটবেলা থেকে শেখাই— দিস ইজ রং, দিস ইজ রাইট, দিস ইজ ব্ল্যাক, দিস ইজ হোয়াইট— এভাবে যদি বাচ্চাদের আমরা শিখাতে পারি; আমার ধারণা, একটা বাচ্চা যখন একটা স্টেজে পৌঁছাবে, তখন কিন্তু তার মাথার মধ্যে এই জিনিসটা ঢুকে যাবে যে— কোনটা ন্যায় কোনটা অন্যায়, কোনটা ঠিক কোনটা বেঠিক। এই বাচ্চাগুলো যখন প্রাইমারি হয়ে দ্বাদশ শ্রেণি পার হবে, তখন কিন্তু তারা সমাজের প্রিমিয়াম পার্ট হবে। তখন সমাজের বিভিন্ন জায়গায় তারা আস্তে আস্তে ঢুকবে— সেটা ব্যবসা-বাণিজ্য হোক, চাকরি-বাকরি হোক, বিভিন্ন জবে যাবে। তখন ওই যে সামাজিক মূল্যবোধ, ওরা কিন্তু আস্তে আস্তে এপ্লাই করা শুরু করবে। সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানকে সঙ্গে নিয়ে নিজে গাড়ি ড্রাইভ করে একটি অনুষ্ঠানে যাওয়ার কথা বলতে গিয়ে তারেক রহমান বলেন, একদিন আমি এবং আপনাদের ভাবি যাচ্ছিলাম, আমি ড্রাইভ করছিলাম, উনি পাশে বসে ছিলেন। সাধারণত গাড়িতে উঠলে আমরা গান শুনি, ওইদিন আমরা বিবিসির একটা প্রোগ্রাম শুনেছিলাম— ওখানে বিবিসি একটা সাবজেক্ট নিয়ে আলোচনা করেছিল, তারা একটা রিসার্চ করেছিল এ ধরনের সামাজিক মূল্যবোধ নিয়ে। তারা দুটি গ্রুপ— একটা গিয়ে কিছু বাচ্চাদের শিখিয়েছে এবং আরেকটি গ্রুপ গিয়ে কিছু গার্জিয়ানদের শিখিয়েছে। যখন রিসার্চটা শেষ হলো রেজাল্ট যেটা পাওয়া গেল— যেখানে বাচ্চাদের শিখিয়েছে, ওখানে দেখা গেছে— ওই ফ্যামিলিতে ইমপ্লিমেন্টেশনটা ভালো হবে। আর যেখানে গার্জিয়ানদের শিখিয়েছে— সেখানে গার্ডিয়ানরা একটু গা ছাড়া ভাব। তার মানে ব্যাপারটা হচ্ছে, বাচ্চাদের যখন শিখিয়ে দেওয়া হচ্ছে যে— এটা ভালো, এটা মন্দ বা এটা এভাবে করতে হবে, ওটা ওইভাবে করতে হবে, সকালে উঠে দাঁত ব্রাশ করতে হবে। এ রকম জিনিসগুলো যখন শিখিয়ে দিচ্ছে, বাবা-মা যখন করছে না, বাচ্চারা কমপ্লেইন করছে। না, এটা এভাবে করতে হবে, আমি শিখে এসেছি। তো আমাদেরও এই বিষয়গুলো এরকমভাবে করতে হবে। বাচ্চারা মোবাইলের ওপর আসক্ত হয়ে নেগেটিভ জিনিসগুলো দেখে। সেক্ষেত্রে কী করা যায়— একজন এমন প্রশ্ন করলে তারেক রহমান বলেন, এখানে কাজ করার আছে। দেখুন, আব্বার (জিয়াউর রহমান) সময় নতুন কুঁড়ি নামে একটা অনুষ্ঠান ছিল। এটা অবশ্য বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আবার চালু করেছে। স্পোর্টস নিয়ে আমাদের একটা পরিকল্পনা আছে। স্পোর্টসের পরিকল্পনায় আমরা বলেছি, নতুন কুঁড়ির সাথে আমরা স্পোর্টসটা যুক্ত করতে চাইছি। স্কুল পর্যায় সিলেবাসে ক্রীড়া, তৃতীয় ল্যাংগুয়েজ, আবৃত্তি, কলা, গান, শিল্প-সংস্কৃতি বিষয় যুক্ত করার বিষয়টি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, আপনি যখন একটা বাচ্চাকে এই জায়গায় ব্যস্ত করবেন, তখন কিছুটা হলেও তাকে এদিকে সময় দিতে হবে। কারণ, পাস-ফেলের ব্যাপার আছে। আমরা ইনশাআল্লাহ গভর্নমেন্ট ফর্ম করলে এডুকেশন মিনিস্ট্রি, কালচারাল মিনিস্ট্রি, সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি মিনিস্ট্রি, স্পোর্টস মিনিস্ট্রি এই চারটা মন্ত্রণালয়কে একটি টিম করে কাজ করব। আমরা চাচ্ছি, বছরে মোটামুটি ১২ মাসের মধ্যে ১০ মাস যাতে বাচ্চাদের ব্যস্ত রাখতে পারি। তিনি আরও বলেন, পড়ালেখাটাকে আমরা ইজি করে আনতে চাচ্ছি। আমি খুব সিরিয়াস স্টুডেন্ট কখনোই ছিলাম না। পড়ালেখাটাকে ইজি করতে চাই- যাতে বাচ্চারা ইন্টারেস্ট পায়। আপনি যখন ইন্টারেস্ট তৈরি করতে পারবেন, তখন স্বাভাবিকভাবে অন্য জায়গাতে কিন্তু মাইন্ড টাইট হবে। তখন এগুলোতে ইন্টারেস্ট পাবে। এভাবে আমরা জিনিসটাকে সাজাতে চাই। অনলাইনে হেরেজমেন্ট বিষয়ে তারেক রহমানের কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমান নিজের ভাবনা তুলে ধরে বলেন, কীভাবে অনলাইনে নিজেকে নিরাপদ রাখা যায়, সে বিষয়ে মানুষকে শিক্ষা দেওয়া উচিত। অনলাইনে হয়রানি বন্ধে ডিজিটাল শিক্ষা দেওয়া যেতে পারে। ছোটবেলা থেকেই অনলাইনে হয়রানির নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো গেলে এই সমস্যা কমানো সম্ভব। তিনি আরও বলেন, হ্যাকিং প্রতিরোধ, কীভাবে ঘটনার রিপোর্ট করতে হয়, সে বিষয়ে মানুষকে শেখানো এবং কমিউনিটি ডেস্ক স্থাপনের মতো পদক্ষেপ অনলাইনে হয়রানি মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। কোনো এলাকায় কিছু হলে স্থানীয় মানুষই তা সামাল দিতে পারবে। জাইমা রহমান আরও বলেন, ২০০২ ও ২০০৩ সালের এসিড সন্ত্রাসবিরোধী বিজ্ঞাপনের মতোই এই বিষয়টিতেও গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে। আমাদের সংগঠিতভাবে কাজটি করতে হবে। এই বিষয় নিয়ে আলোচনা না হলে কোনো সমাধান আসবে না। সে কারণেই সবাইকে এই বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। ঢাকার যানজট নিরসন সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান বলেন, আমি লাস্ট যেটা শুনেছিলাম— তিন কোটি প্লাস মানুষ ঢাকায় বসবাস করেন। এই ট্রাফিক জ্যাম হবার বেশ কয়েকটি কারণ আছে। প্রথমত আমাদের রোড ডিজাইনিং, দ্বিতীয়ত আমাদের পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ম্যানেজমেন্ট— পাবলিক ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম আর তৃতীয়ত হচ্ছে বেশ কতগুলো ফ্যাসিলিটি। ফ্যাসিলিটির মধ্যে এডুকেশন আছে, হেলথ আছে, সিকিউরিটি আছে, জব সিকিউরিটি আছে। এই সবকিছুই কম-বেশি ঢাকা কেন্দ্রে গড়ে উঠেছে। যদি আমরা ঢাকা থেকে রেলগাড়িতে পাশের জেলাগুলোতে যেতে পারি, রেলগাড়ির স্পিড হবে অ্যাভারেজে ৬০/৭০ মাইল। আপনি ইজিলি এক ঘণ্টায় ময়মনসিংহে পৌঁছাতে পারবেন, এক ঘণ্টায় মুন্সিগঞ্জ পৌঁছাতে পারবেন, মানিকগঞ্জ-টাঙ্গাইল পৌঁছাতে পারবেন। এই জেলাগুলোতেও ছোট ছোট শহর আছে, জেলা শহর আছে বা সদর শহর আছে। এগুলো আমাদের পরিকল্পনার মধ্যে আছে— কীভাবে করব ডিটেল ওয়ার্কিং। আমাদের চিন্তা আছে যে, এখানে আমরা ছোট ছোট স্যাটেলাইট টাউন গড়ে থাকব। আমরা যেটা করতে চাইছি, সেটা হচ্ছে যে, আমরা নতুন জায়গা নিব না। যেই জায়গায় অলরেডি শহরটা আছে, এই জায়গাতেই আমরা জিনিসটা তৈরি করব। ওখানে বেসিক সাপোর্টগুলো থাকবে। বেসিক সাপোর্টের মধ্যে স্কুল থাকবে ভালো, এডুকেশন থাকবে, চিকিৎসা সুবিধা থাকবে, গ্রোসারি মার্কেট থাকবে, সিকিউরিটি এনসিউর করার চেষ্টা করা হবে। ১০ বিজয়ীরা হলেন— তৌফিকুর রহমান, রাফায়েতুল আহমেদ রাবিত, শেখ রিফাত মাহমুদ, ফাতিমা আয়াত, মো. ইসরাফিল, শাজেদুর রহমান, শেখ মো. ইকরাতুল ইসলাম, যারিন নাজনীন, মো. রিফাত হাসান ও রমেসা আনজুম রোশমী।