ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে খেলতে যাওয়া শিশু-কিশোরদের কান ধরে উঠবস করিয়েছেন কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) কার্যনির্বাহী সদস্য সর্বমিত্র চাকমা। গত ৬ জানুয়ারি ঘটনাটি ঘটলেও তার ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এর পর থেকে অনেকে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। ক্ষোভের মুখে সর্বমিত্র ডাকসু থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন। তবে নিজের কাজের পক্ষে সাফাইও গেয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের কান ধরিয়ে উঠবস করানো অত্যন্ত গর্হিত কাজ। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত তদন্ত করে সর্বমিত্রের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া এবং ভুক্তভোগী শিশুদের কাউন্সেলিং করানো।
কান ধরে শিশু-কিশোরদের উঠবস করানোর ঘটনায় গতকাল সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সর্বমিত্র চাকমাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, একজন ছাত্র ও ডাকসু সদস্যের এ ধরনের আচরণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি তথা মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়েছে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলার পরিপন্থি। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাঁকে জবাব দিতে বলা হয়েছে।
এদিকে গতকাল সোমবার দুপুরে ফেসবুকে একটি পোস্টে কান ধরানোর দায় নিয়ে সর্বমিত্র চাকমা দুঃখ প্রকাশ করে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। তবে লিখিত পদত্যাগপত্র জমা দেননি তিনি।
গত বছর ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনে সর্বমিত্র চাকমা ছাত্রশিবিরের প্যানেল থেকে কার্যনির্বাহী সদস্য পদে নির্বাচিত হন। এরপর নভেম্বরেই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও সংলগ্ন এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে বিতর্কিত হন তিনি। এখতিয়ার বহির্ভূত সেই অভিযানের সময় ছিন্নমূল মানুষদের মারধর, হেনস্তা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন করার অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। প্রক্টরিয়াল টিমের ভূমিকায় নেমে রাতে সড়কে থাকা বৃদ্ধকে লাঠি হাতে শাসানো নিয়ে সমালোচিত হয়েছিলেন তিনি।
গত তিন দিনে খেলার মাঠে অবৈধ প্রবেশের দায়ে শিশুদের কান ধরানোর দুটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। গতকাল প্রক্টর সাইফুদ্দীন আহমেদের কার্যালয়ে গিয়ে তাঁর সঙ্গে ‘সর্বমিত্র চাকমা কর্তৃক শিশুদের কানধরে উঠবস করানোর প্রেক্ষিতে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের অগ্রগতি’ সম্পর্কে জানতে সাক্ষাৎ করেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। এ সময় ঢাবি ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক মল্লিক ওয়াসী তামি দাবি করেন, সর্বমিত্রের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে হবে।
এ বিষয়ে ঢাবির শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী বলেন, বাচ্চাগুলো একেবারেই শিশুসুলভ আচরণ দিয়ে খেলাধুলা করছিল; উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছিল। এটা এই বয়সের একেবারে সঠিক কাজ করছিল তারা। ডাকসুর নামে কান ধরে উঠবস, লাঠি নিয়ে শাসানো শিশু নিপীড়নের পর্যায়ে পড়ে। এখানে শক্তি প্রদর্শন করা হয়েছে। সেই শক্তিটা হচ্ছে বিধি ও আইনবহির্ভূত।
তিনি বলেন, কান ধরে উঠবস করানো একেবারে গর্হিত অপরাধ হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়া এবং ভার্চুয়াল জগতে ভিজুয়ালাইজেশনের যুগে এই বাচ্চাগুলো যত বড় হবে, বিষয়টা তাদের ট্রমাটাইজ করার আশঙ্কা অনেক বেশি। এ জন্যই এটা আইন এবং নিয়মের মধ্যে এনে তদন্ত করা দরকার এবং এই বাচ্চাগুলোকে কাউন্সেলিং দেওয়া প্রয়োজন হতে পারে।
ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী আরও বলেন, সর্বমিত্র চাকমা এর আগেও এ ধরনের কাজ করেছে। শুধু সর্বমিত্র নয়; ডাকসুর অধিকাংশজন নীতিমালা এবং দায়িত্ববহির্ভূত কাজই করে যাচ্ছিল। সেগুলোর ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় উদাসীন ছিল। সকল ঘটনা তদন্ত করে ডাকসুর কার্যক্রম সীমিত করা উচিত।
নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে দীর্ঘ দিন ধরে কাজ করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম। তিনি বলেন, শিশুদের ওপর যেন কোনোভাবেই শারীরিক নির্যাতন না করা হয়– এ বিষয়টি নিয়ে আমাদের সবাইকে অত্যন্ত সংবেদনশীল হতে হবে। কিছুদিন আগেও আমরা এমন একটি ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছি এবং দুঃখজনকভাবে আবারও দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে এ ধরনের একটি ঘটনা ঘটেছে। সব মিলিয়ে বিষয়টি ভীষণ বেদনাদায়ক ও হতাশাজনক।
তিনি বলেন, দেশ এখনও এক ধরনের অপরিপক্বতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে অনেক অদক্ষ মানুষ দায়িত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন ও প্রয়োগ করছে। এর ফলেই আমরা প্রায় প্রতিটি জায়গায় একের পর এক মানবিকতার বিরুদ্ধে ঘটনা দেখতে পাচ্ছি।
নারীপক্ষের সদস্য জাহানারা খাতুন বলেন, আগে কোনো কিছু না জানিয়ে লাঠি হাতে নিয়ে এভাবে কান ধরে উঠবস করানো এক ধরনের ভয়ভীতি প্রদর্শন। শৃঙ্খলা আনার সমাধান কখনোই কান ধরে উঠবস হতে পারে না।
এদিকে সর্বমিত্র চাকমার পদত্যাগপত্র নিয়ে গতকাল মধুর ক্যান্টিনে এক সংবাদ সম্মেলনে ডাকসুর জিএস এসএম ফরহাদ বলেন, সাধারণত পদত্যাগ-সংক্রান্ত কোনো ইস্যু হলে সেটি আমার কাছে আসবার কথা। এখন পর্যন্ত আমি এ রকম কিছু পাইনি।