বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের পর এনসিপির সংঘর্ষ: ভোটের আগেই ক্ষমতার লড়াইয়ে কি সংঘাত বাড়ছে?

প্রকাশিতঃ জানুয়ারি ৩০, ২০২৬ | ৭:১১ পূর্বাহ্ণ
অনলাইন নিউজ ডেক্স

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনীতি এখন আর কেবল দলীয় প্রতিযোগিতার ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই। আওয়ামী লীগ অনুপস্থিত এমন এক নির্বাচনি বাস্তবতায় ভোটের মাঠ ক্রমেই পরিণত হচ্ছে সংঘাতের ময়দানে—যেখানে সম্ভাব্য ক্ষমতাসীন দল হিসেবে বিবেচিত বিএনপি একের পর এক প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে। তিন দশকের রাজনৈতিক মিত্র জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে শুরু হওয়া টানাপোড়েনের রেশ কাটতে না কাটতেই স্থানীয় পর্যায়ে বিএনপির সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছে জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এসব ঘটনায় বিএনপি যেমন রাজনৈতিকভাবে চাপে পড়ছে, তেমনি নির্বাচনি পরিবেশ নিয়েও বাড়ছে অনিশ্চয়তা। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এসব সংঘর্ষকে শুধু বিচ্ছিন্ন বা তাৎক্ষণিক উত্তেজনা হিসেবে ব্যাখ্যা করা কঠিন। বরং নির্বাচনের আগেই রাজনৈতিক মাঠে শক্তির ভারসাম্য বদলে যাওয়ার একটি চাপা প্রবণতা এখানে কাজ করছে—যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে ভোটার উপস্থিতি ও নির্বাচনি পরিবেশের ওপর। শেরপুরের সংঘাতে মৃত্যুর ঘটনা: কাকতাল নয়, একটি সতর্ক সংকেত শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে উপজেলা প্রশাসনের আয়োজিত এক সরকারি অনুষ্ঠানে চেয়ার বসাকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সংঘর্ষে জামায়াত নেতা রেজাউল করিম নিহত হওয়ার ঘটনা প্রথমে স্থানীয় উত্তেজনা বলেই মনে হয়েছিল। কিন্তু ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটে, যখন দেশজুড়ে প্রশাসনিক পর্যায়ে নির্বাচনি প্রস্তুতির কার্যক্রম চলছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, প্রশাসনের আয়োজিত কর্মসূচিতেই যদি দলীয় সংঘাত এড়ানো না যায়, তবে নির্বাচনি মাঠে সহিংসতার ঝুঁকি যে বাড়ছে—তা স্পষ্ট। পুলিশ, প্রশাসন ও রিটার্নিং কর্মকর্তার উপস্থিতির মধ্যেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না থাকা প্রশ্ন তুলছে, এই সংঘাতগুলো কতটা আকস্মিক এবং কতটা পূর্বানুমেয়। এই ঘটনায় বিএনপি সরাসরি কোনো সংগঠিত সহিংস পরিকল্পনার অভিযোগে না পড়লেও, রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলটি এমন এক সংঘাতের মধ্যে পড়ে যায়, যার দায় ও অভিঘাত উভয়ই তাদের ওপর এসে পড়ে। জামায়াতের পর এনসিপির সাথে সংঘাত: বিএনপির জন্য নতুন চাপ জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যেই নোয়াখালীর হাতিয়ায় বিএনপি ও জাতীয় নাগরিক পার্টির সংঘর্ষ নতুন করে রাজনৈতিক সমীকরণে উত্তাপ যোগ করেছে। শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) বিকেলে নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় ফেরি উদ্বোধনী অনুষ্ঠানকে ঘিরে বিএনপি ও এনসিপির সমর্থকদের মধ্যে দফায় দফায় ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ১০ জন আহত হয়েছে। সংঘর্ষের সময় দিকবিদিক ছুঁটতে থাকে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আসা হাজার হাজার লোক। এর আগে গত ৯ জানুয়ারী নোয়াখালীর হাতিয়ায় ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ১৬ জন আহত হয়েছেন। স্থানীয় একটি সড়ক কাটাকে কেন্দ্র করে অপপ্রচার ও পাল্টা অভিযোগের জেরে এই সহিংসতার সূত্রপাত হয়েছে বলে দাবি করেছে দুই পক্ষই। স্থানীয় পর্যায়ের এই সংঘাত দেখাচ্ছে, আওয়ামী লীগ অনুপস্থিত থাকায় তৈরি হওয়া রাজনৈতিক শূন্যতায় একাধিক শক্তি নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতিতে বিএনপি একদিকে সম্ভাব্য ক্ষমতাসীন শক্তি হিসেবে বাড়তি প্রত্যাশা ও নজরদারির মুখে, অন্যদিকে নতুন ও পুরোনো প্রতিদ্বন্দ্বীদের চাপ সামলাতে গিয়ে ক্রমাগত সংঘাতের কেন্দ্রে চলে আসছে। এটি শুধু দলীয় দ্বন্দ্ব নয়; বরং নির্বাচনের আগেই রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের একটি প্রতিযোগিতা—যেখানে সংঘাত কার্যত একটি দৃশ্যমান উপাদান হয়ে উঠছে। আওয়ামী লীগ অনুপস্থিততে কৃত্রিম প্রতিযোগিতা, না নতুন সংঘাতের সমীকরণ? এই নির্বাচন এমন এক বাস্তবতায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যেখানে দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কার্যত ভোটের বাইরে। দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় মাঠে নেই তাদের সাংগঠনিক উপস্থিতি। ২০০৮ সালের সর্বশেষ প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রায় ৪৮ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, দলটির ঐতিহাসিক ভোটব্যাংকের একটি বড় অংশ এবারের নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে অনুপস্থিত থাকতে পারে। এই শূন্যতার মধ্যেই প্রধান প্রতিযোগিতা গড়ে উঠেছে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে। তবে দুই দলের রাজনৈতিক কাঠামো ভিন্ন। বিএনপি নির্ভর করে বড় পরিসরের সাধারণ ও নিরপেক্ষ ভোটারের ওপর, অন্যদিকে জামায়াতের ভরসা তুলনামূলক ছোট কিন্তু অত্যন্ত সংগঠিত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ ভোটব্যাংক। এই বাস্তবতায় সংঘাতপূর্ণ নির্বাচনি পরিবেশ বিএনপির জন্য একটি বাড়তি চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে—কারণ সাধারণ ভোটাররা সহিংস পরিস্থিতিতে ভোটকেন্দ্রে যেতে অনাগ্রহী হন। সংঘাত কেন কৌশল হয়ে উঠছে নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সহিংস পরিবেশে ভোটার উপস্থিতি কমে যাওয়াই স্বাভাবিক। ভোটার আচরণ নিয়ে গবেষণায় দেখা যায়, সংঘাত হলে সাধারণ ভোটাররা হয় ভোট দিতে যান না, নয়তো পুরো রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। ঝিনাইগাতীর ঘটনার পর স্থানীয়দের মধ্যে যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে, তা এই মনস্তত্ত্বকেই সামনে আনে। অনেকেই প্রকাশ্যে বলছেন, ভোট দিতে গিয়ে নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ার চেয়ে দূরে থাকাই নিরাপদ। এই প্রবণতা বিএনপির মতো গণভিত্তিনির্ভর দলের জন্য উদ্বেগজনক—কারণ দলটির নির্বাচনি সাফল্য অনেকাংশেই ভোটার উপস্থিতির ওপর নির্ভরশীল। নির্বাচন বিশ্লেষক ড. আব্দুল আলীম বলেন, বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনো সন্তোষজনক নয়। দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে ভোটারদের আস্থা ফেরানো কঠিন হবে। জুলাই-আগস্টের লুটের অস্ত্র যেন আতঙ্ক-নিরাপত্তাহীনতার প্রতিশব্দ নির্বাচনের আগের এই সংঘাতপূর্ণ বাস্তবতায় নিরাপত্তা পরিস্থিতিও নতুন করে প্রশ্ন তুলছে। বিবিসি বাংলার তথ্য অনুযায়ী, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় লুট হওয়া বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ এখনও উদ্ধার হয়নি। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আ ন ম মুনীরুজ্জামান বলেন, ভোটের আগে এসব অস্ত্র উদ্ধার না হলে ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হবে। আর নিরাপত্তা নিয়ে আস্থা না ফিরলে ভোটকেন্দ্রে সাধারণ মানুষের উপস্থিতি নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। লাভ কার, ক্ষতি কার? এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে সাধারণ ভোটার ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার। তবে রাজনৈতিকভাবে কে কতটা লাভবান হবে—সে বিষয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে এক্যমত্য নেই। তবে এটুকু স্পষ্ট, সংঘাতপূর্ণ পরিবেশ বিএনপির মতো বড় গণভিত্তিনির্ভর দলের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে। বিপরীতে, কম ভোটার উপস্থিতির নির্বাচন সংগঠিত ও ক্যাডারভিত্তিক দলগুলোর জন্য তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক হয়ে উঠতে পারে। এই বাস্তবতায় প্রশ্ন থেকেই যায়—সংঘাত কি অনিচ্ছাকৃত পরিণতি, নাকি নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক সমীকরণ বদলের এক ধরনের অনিবার্য পর্ব? আওয়ামী লীগবিহীন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেই প্রশ্নের উত্তর বুঝতে সময় লাগবে বহুদিন।