ভারত মহাসাগরে যখন যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী জড়ো হতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই ওমানের মাসকটে জড়ো হন মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিরা।
দুই দেশের উত্তেজনা কমাতে শুক্রবার কূটনৈতিক আলোচনায় বসেন তারা। আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে বলে ঘোষণা দিলেও এখনো এক বিপজ্জনক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে গোটা অঞ্চল।
সাম্প্রতিক সময়ে ভেনিজুয়েলায় ‘চমকপ্রদ সাফল্য’ পাওয়ার পর আত্মবিশ্বাসে ভর করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে আলোচনায় এমন কিছু দাবি তুলেছেন, যেগুলোকে ‘শুরু হওয়ার আগেই ব্যর্থ’ বলে অভিহিত করছেন কূটনীতিকরা।
ইসরাইলি পত্রিকা মারিভের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামনে পাঁচটি অসম্ভব দাবি রেখেছে। এর মধ্যে রয়েছে-৪০০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ধ্বংস করা, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস, সম্পূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির অবসান এবং ইয়েমেন, ইরাক, সিরিয়া ও লেবাননে ইরানের মিত্র বাহিনীগুলোর প্রতি সমর্থন বন্ধ করা।
এগুলো কোনো আলোচনার সূচনাবিন্দু নয়, বরং এগুলো সরাসরি আলটিমেটাম। যা দেওয়া হয়েছে এগিয়ে আসা মার্কিন নৌবহরের কামানের মুখে। মিডল ইস্ট আই।
সম্প্রতি ভেনিজুয়েলার রাজনৈতিক সংকটে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাকে ট্রাম্প প্রশাসন সাফল্য হিসাবে তুলে ধরছে। ট্রাম্পের ধারণা, তিনি ইরানের ক্ষেত্রেও একই কৌশল প্রয়োগ করতে পারবেন। কিন্তু এবার ভুল পথে হাঁটছেন ট্রাম্প। কারণ ইরান ভেনিজুয়েলা নয়।
ট্রাম্পের ইরানকে সামরিক চাপের মাধ্যমে আত্মসমর্পণে বাধ্য করার পরিকল্পনাকে একটি মারাত্মক ও বিপজ্জনক ভুল হিসাবে আখ্যা দিয়েছেন মিডল ইস্ট আইয়ের সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান সম্পাদক ডেভিড হার্স্ট।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে রাজনৈতিকভাবে চাপের মুখে থাকলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ট্রাম্প এখনো নিজেকে শক্ত অবস্থানে ভাবছেন। ট্রাম্প মনে করেন, তিনি ন্যাটোকে গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে একটি কাঠামোতে আনতে পেরেছেন, ইউরোপকে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াতে বাধ্য করেছেন, ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করিয়ে দেশটির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকেও গাজায় যুদ্ধ থামাতে বাধ্য করেছেন।
এই সাফল্যের ধারণা থেকেই ট্রাম্প এবার ইরানের দিকে মনোযোগ দিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ট্রাম্প বিশ্বাস করেন, তিনি ভেনিজুয়েলার মতো করেই ইরানকে চাপে ফেলতে পারবেন। তবে বিশ্লেষক ডেভিড হার্স্টের মতে, এখানেই ভুল করছেন ট্রাম্প।
ভেনিজুয়েলার হাতে আঞ্চলিক প্রভাব বা কৌশলগত শক্তি ছিল না, কিন্তু ইরানের রয়েছে বিস্তৃত আঞ্চলিক প্রভাব। আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি শুধু ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নন, তিনি বিশ্বের কোটি কোটি শিয়া মুসলিমদের আধ্যাত্মিক নেতা।
ইরানের বাইরে ইরাক, লেবানন, বাহরাইন, কুয়েত ও সৌদি আরবে বড় শিয়া জনগোষ্ঠীর ওপর তার প্রভাব রয়েছে। এছাড়া খামেনির সরাসরি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি। এটিই ভেনেজুয়েলার সঙ্গে দ্বিতীয় বড় পার্থক্য।
এই বাহিনীর সদস্যসংখ্যা মার্কিন মেরিন কর্পসের সমান। যার মধ্যে রয়েছে দেড় লাখ স্থলসেনা, বিশ হাজার নৌসদস্য, পনেরো হাজারের মতো বিমানবাহিনী এবং বিশাল বাসিজ মিলিশিয়া (আধাসামরিক বাহিনী)। আইআরজিসি চাইলে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিতে পারে, যা দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের প্রায় দুই কোটি ব্যারেল তেল ও উলেখযোগ্য পরিমাণ তরল প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবাহিত হয়।
ডেভিডের বিশ্লেষণে বলা হয়, ইরানে দ্বিতীয় দফা হামলা হলে দেশটি এটিকে অস্তিত্বের ওপর আঘাত হিসাবে দেখবে। তখন ইরানের প্রতিক্রিয়া সীমিত থাকবে না। তাদের হাতে রয়েছে তিন হাজারের বেশি স্বল্প ও মধ্যপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং তারা পূর্ণ শক্তি প্রয়োগ করতে পারে। যুদ্ধটি শুধু ইরানে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে।