প্রস্তাবিত বেতন স্কেল বাস্তবায়নে BASA’র বক্তব্য

প্রকাশিতঃ ফেব্রুয়ারি ৮, ২০২৬ | ৬:৫৬ পূর্বাহ্ণ
অনলাইন নিউজ ডেক্স

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার সরকারি কর্মচারীদের যুগোপযোগী ও স্থিতিশীল জীবনমান উন্নয়নের জন্য যথাযথ অভিজ্ঞ এবং দক্ষ জনবলের সমন্বয়ে বেতন কমিশন গঠন করেছে। ইতোমধ্যে বেতন কমিশন মাননীয় প্রধান উপদেষ্টার নিকট রিপোর্ট দাখিল করেছে। বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস এসোসিয়েশন (BASA) বেতন কমিশনের রিপোর্ট পর্যালোচনা করেছে। যদিও বর্তমান মূল্যস্ফীতির হার বিবেচনায় প্রস্তাবিত বেতন স্কেল প্রত্যাশার চেয়েও কম, তবুও BASA মনে করে বেতন কমিশন রাষ্ট্রের সকল দিক বিবেচনায় এ বেতন স্কেল প্রস্তাব করেছে। BASA এ বেতন স্কেলের প্রস্তাবনাকে রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষমতা বিবেচনায় অত্যন্ত সানন্দের সাথে গ্রহণ করেছে। একইভাবে অন্যান্য সরকারি কর্মচারীগণও প্রস্তাবিত বেতন স্কেল বাস্তবায়নে দৃঢ় প্রত্যাশায় আছে। উল্লেখ্য, বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে জানা যায় যে, প্রস্তাবিত বেতন স্কেল বাস্তবায়িত হলে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পাবে এমন অজুহাতে বিভিন্ন মহল বেতন স্কেলটির বাস্তবায়নের বিরোধিতা করছে যা BASA’র নজরে এসেছে। এ-প্রেক্ষিতে BASA’র বক্তব্য নিম্নরূপ: একই দেশে বসবাসকারী সরকারি ও বেসরকারি খাতে নিয়োজিত জনবলের বেতন বৈষম্য ক্ষেত্র-বিশেষে ১৫ হতে ১৭ গুণ (মধ্যম পর্যায়ের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সিইও/চেয়ারম্যান ও সরকারের সচিব)। এ কারণে সরকারি চাকুরিতে মেধাসম্পন্ন জনবলকে আকৃষ্ট করা সম্ভব হচ্ছে না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো কর্তৃক প্রকাশিত উপাত্ত থেকে দেখা যায়, ব্যয় পদ্ধতিতে (expenditure method) পরিমাপকৃত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জিডিপি\'র ৭৬.৭৫ শতাংশ ভোগ দ্বারা এবং ২৯.৩৮ শতাংশ বিনিয়োগের দ্বারা নির্ধারিত হয় । এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, বাংলাদেশের জিডিপি\'তে ভোগের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি নতুন বেতন কাঠামো প্রণীত হলে তা সরকারি চাকুরিজীবীদের ভোগ উৎসাহিত করবে এবং এর ফলে অর্থনীতির গতি বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে। উল্লেখ্য, বিগত এক দশকে মোট সরকারি ব্যয় প্রায় ৩ গুণ বৃদ্ধি পেলেও জিডিপি\'র অনুপাতে তা ক্রমান্বয়ে কমেছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে মোট সরকারি ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ২ লক্ষ ৮ হাজার ৮৫৪ কোটি টাকা, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বৃদ্ধি পেয়ে ৫ লক্ষ ৯০ হাজার ৫৬৩ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ বৃদ্ধির পরিমান ২৮২.৭৬%। এ বর্ধিত ব্যয়ে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা অন্তর্ভুক্ত নেই। তথা এ সময়ে নতুন কোনো পে-স্কেল ঘোষণা করা হয়নি। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে তথা জাতীয় বেতন স্কেল, ২০১৫-এ সরকারি কর্মচারীদের বেতন ভাতা ছিল জিডিপির ১.৯৩% যা ২০২৪-২৫-এ হ্রাস পেয়ে ১.২৫%-এ দাড়িয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর উপাত্ত হতে আরো জানা যায় যে, জিডিপির ২৩.২৫% দেশজ সঞ্চয় অর্থাৎ ফিসকাল মাল্টিপ্লায়ারের মান ৪.৩। এর অর্থ দাঁড়ায় প্রতি ১ টাকা খরচের ফলে অর্থনীতির উপর ৪.৩ টাকা খরচের সমপরিমান ধনাত্মক প্রভাব পড়ে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকারি চাকুরিজীবীদের বেতন-ভাতা বাবদ ব্যয় হয়েছে ৬৯ হাজার ৩৫৫ কোটি টাকা। বেতন-ভাতার পরিমাণ প্রস্তাবিত বেতন স্কেল অনুযায়ী দ্বিগুন বৃদ্ধি পেলে অর্থনীতির উপর সামগ্রিক ধনাত্বক প্রভাব পড়বে ৫ লক্ষ ৯৬ হাজার কোটি টাকার সমান। কেননা এতে ভোগ, সঞ্চয় ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে। অধিকন্তু, বিপুল সংখ্যক সরকারি কর্মচারীগণ নতুন করে আয়করের আওতায় আসবে। যেহেতু সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতন হতে উৎসে আয়কর অগ্রীম কর্তন করা হয়, সেহেতু নিয়মিত অগ্রীম রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি পাবে। এতে সার্বিক ভাবে রাজস্ব বৃদ্ধি পাবে এবং ভোগের খাতে অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে ভ্যাট হতে সংগৃহীত রাজস্বের পরিমান বৃদ্ধি পাবে। যা রাজস্ব খাতের কলেবর ও পরিমান উভয়ই বৃদ্ধি করবে। পূর্ববর্তী বেতন স্কেল ঘোষণার পর অর্থ বিভাগ কর্তৃক পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, বেতন বৃদ্ধির সাথে মূল্যস্ফীতির কোনো সম্পর্ক ছিল না। দেশের মোট জনসংখ্যার তুলনায় সরকারি চাকুরিজীবীদের সংখ্যা মাত্র ১ শতাংশ এবং জিডিপি\'র অনুপাতে তাদেরকে প্রদত্ত বেতন-ভাতার পরিমাণ মাত্র ১.২৫ শতাংশ- যা অতি নগন্য। এই নগন্য পরিমান বেতন ভাতা বৃদ্ধির ফলে মূল্যস্ফীতির কোনো প্রভাবই পড়বে না মর্মে প্রতীয়মান হচ্ছে। অধিকন্তু, প্রস্তাবিত বেতন স্কেল বাস্তবায়নে বেতন কমিশন ৩ বছর সময় বেঁধে দিয়েছে। পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো থেকে প্রাপ্ত উপাত্তে গত এক দশকে বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৬.৮ শতাংশ। মূল্যস্ফীতির এ হার এবং present value (PV) এর সূত্র ব্যবহার করে দেখা যায়, ২০১৫ সালের ১০০ টাকার ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পেয়ে ২০২৫ সালে ৫১.৮ টাকায় দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ ২০১৫ সালের ১০০ টাকায় যে পরিমাণ পণ্য ক্রয় করা যেত ২০২৫ সালে একই পরিমাণ পণ্য ক্রয় করতে হলে একজন ভোক্তাকে ১৮৭.৭১ টাকা খরচ করতে হয়েছে। ফলে ২০১৫ সালের বেতন স্কেলের যে কোন ধাপের একজন সরকারি চাকুরিজীবীর বেতনের ক্রয়ক্ষমতা ২০২৫ সালে অপরিবর্তিত রাখতে হলে তার বেতন কমপক্ষে ১.৯৩ গুণ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। এ হিসাব অনুযায়ী ২০১৫ সালের বেতন স্কেলের প্রথম গ্রেডের একজন সরকারি চাকুরিজীবীর বেতন ৭৮,০০০ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ২০২৫ সালে ১,৫১,০০০ টাকায় উন্নীত করা প্রয়োজন ছিল। একইভাবে ২০১৫ সালের বেতন স্কেলের ২০তম গ্রেডের একজন চাকুরিজীবীর বেতন ৮২৫০ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ২০২৫ সালে কমপক্ষে ১৬,০০০ টাকায় উন্নীত করা প্রয়োজন। উল্লেখ্য, এতে প্রতি বছর কর্মকালীন যে ইনক্রিমেন্ট দেয়া হয়ে থাকে তা হিসাবে নেয়া হয়নি। ইনক্রিমেন্টের পরিমাণ হিসাবে নেয়া হলে যৌক্তিক বেতন বৃদ্ধির পরিমাণ বিবেচনায় প্রথম গ্রেডের একজন কর্মকর্তার বেতন বর্তমানে ২ লক্ষ টাকার উপরে এবং ২০তম গ্রেডের একজন কর্মচারীর বেতন ২২ হাজার টাকার উপরে নির্ধারিত হওয়া উচিত। বর্তমানে প্রচলিত বেতন স্কেলের অর্থ দিয়ে একজন সরকারি কর্মচারীর ৪ সদস্য বিশিষ্ট ১টি পরিবার বর্তমান বাজারে মানসম্মত জীবন যাপন সম্ভব নয় এটা অনুধাবন করা খুব কঠিন নয়। অনানুষ্ঠানিক হিসাব অনুযায়ী একজন রিক্সাচালক/দৈনিক শ্রমিকের মাসিক আয় ৩০,০০০ টাকার উপরে। অথচ, একজন ২০তম গ্রেডের কর্মচারীর মোট বেতন ১৫,০০০ টাকারও কম। এর পরও কোনো কোনো মহল সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির বিরুদ্ধে নানা যুক্তি দিয়ে থাকেন। ইতোমধ্যে আমাদের বক্তব্যে পরিসংখ্যান সহযোগে নতুন বেতন স্কেল ঘোষিত হলে মূল্যস্ফীতি হবে না- তা বোধগম্যভাবে উপস্থাপন করেছি। BASA’র যুক্তিসঙ্গত বক্তব্য এই যে, সরকারের সর্বস্তরে একটি দক্ষ, সৎ ও জনমুখী প্রশাসন গড়ে তোলার জন্য ন্যূনতম এ বেতন কাঠামো অত্যন্ত যৌক্তিক। উপরোক্ত বিষয়গুলি যুক্তিসঙ্গত ভাবে বিবেচনায় আনলে খুব সহজে প্রতীয়মান হয় যে, প্রস্তাবিত বেতন স্কেল- যা ঘোষণার জন্য অপেক্ষমান রয়েছে- তা কোনোভাবেই প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়। তবে রাষ্ট্র তথা সরকারের সামর্থের দিকে লক্ষ্য রেখে এবং ত্যাগের আলোকে জনপ্রশাসনের আদর্শ সমুন্নত রাখতে বেতন কমিশন কর্তৃক প্রস্তাবিত এ অপ্রতুল বেতন কাঠামোই সরকারি কর্মচারিরা স্বাগত জানাচ্ছে।