অতীতে অঙ্গীকার বাস্তবায়নের হার কম হলেও এবারের সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে রয়েছে প্রতিশ্রুতির ছড়াছড়ি। বিএনপির ইশেতহারে রয়েছে ৯ অগ্রাধিকার এবং ৫১ পরিকল্পনা ও প্রতিশ্রুতি। জামায়াতে ইসলামী দিয়েছে ২৬ অগ্রাধিকার আর ৪১ পরিকল্পনা। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ইশতেহারে ১২ অগ্রাধিকারে রয়েছে ৩৬ প্রতিশ্রুতি ও পরিকল্পনা। এসব মূল প্রতিশ্রুতির সঙ্গে দলগুলোর ইশতেহারে রয়েছে ছোট ছোট আরও শতাধিক অঙ্গীকার।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বলছে, বিএনপি ও জামায়াতের ইশতেহার বাস্তবতাবিবর্জিত ও অতিমাত্রায় উচ্চাভিলাষী। প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নযোগ্য হতে হলে সবার আগে সুশাসন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও কর ব্যবস্থার আমূল সংস্কার প্রয়োজন। তা না হলে এসব প্রতিশ্রুতি শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।
ইসলামী আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, এবি পার্টি, বাম দলগুলোর জোট গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টও নির্বাচনী ইশতেহার দিয়েছে। সেগুলোতেও দীর্ঘ প্রতিশ্রুতি রয়েছে। বিএনপি কিংবা জামায়াত নেতৃত্বাধীন কোনো জোটই ইশতেহার দেয়নি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ছাত্রনেতাদের গড়া দল এনসিপি ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের শরিক হয়ে ৩০ আসনে লড়লেও আলাদা ও দীর্ঘ ইশতেহার দিয়েছে।
বিএনপির ইশতেহার ৪৪ পৃষ্ঠাজুড়ে বিস্তৃত। জামায়াতের ইশতেহারের আকার ৮৬ পৃষ্ঠা, তবে তা ছবিতে পূর্ণ। এনসিপির ইশতেহারও ৮৬ পৃষ্ঠার।
তিন দলের ইশতেহারে মিল
বিএনপি ও জামায়াত– উভয় দলের ইশতেহারে রয়েছে ক্ষমতায় গেলে ‘ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন’ গঠন করার কথা। এনসিপি অঙ্গীকার করেছে, সরকারে গেলে ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ গঠন করবে। বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি– তিন দলেরই উদ্দেশ্য, কমিশনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের শাসনামলের গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, গণহত্যা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের সত্য উদ্ঘাটন করা।
তবে দলগুলোর সূত্র বলছে, এর মাধ্যমে অনুশোচনা প্রকাশের বিনিময়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীকে রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ দেওয়া হবে। আওয়ামী লীগের যে নেতাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ রয়েছে, তারা এই সুযোগ পাবেন না, তাদের বিচার হবে। দলটির তৃণমূল নেতাকর্মী-সমর্থকদের যাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ নেই, তাদের ক্ষমা প্রার্থনা, অনুশোচনা প্রকাশের সুযোগ দিয়ে অতীতের ক্ষত নিষ্পত্তি করা হবে।
স্বাস্থ্য খাতেও মিল রয়েছে তিন দলের ইশতেহারে। বিএনপি বিনামূল্যে সর্বজনীয় স্বাস্থ্যসেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। জামায়াত শিশু ও বৃদ্ধদের বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবার অঙ্গীকার করেছে। এনসিপির প্রতিশ্রুতি সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা এবং ওষুধের দাম কমানো।
জুলাই সনদ নিয়ে অমিল
তিন দলের ইশতেহারে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে বড় পার্থক্য রয়েছে। বিএনপি জানিয়েছে, গত ১৭ অক্টোবর রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষরিত জুলাই সনদকে অগ্রাধিকার দিয়ে রাষ্ট্র সংস্কার করবে। জামায়াত ও এনসিপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করবে।
বিএনপি ইশতেহারে সংস্কারের যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সেগুলো জুলাই সনদে দলটির দেওয়া ‘নোট অব ডিসেন্ট’ (ভিন্নমত) অনুযায়ী রয়েছে। জুলাই সনদে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত ভোট অনুপাতে ১০০ আসনের সংসদের উচ্চকক্ষ গঠিত হবে। বিএনপি তাতে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছিল। এই মতভিন্নতার কারণে ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের সঙ্গে গণভোটও হচ্ছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে বলা হয়েছে, গণভোটে হ্যাঁ জয়ী হলে সনদ অনুযায়ী উচ্চকক্ষ বাস্তবায়ন করতে হবে। তবে বিএনপির ইশতেহারে বলা হয়েছে, ক্ষমতায় যেতে পারলে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত আসনের অনুপাতে উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে।
ঐকমত্য কমিশনের সংলাপে বড় মতবিরোধ ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠন পদ্ধতি এবং সরকারি কর্মকমিশন, ন্যায়পাল, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, দুর্নীতি দমন কমিশনের নিয়োগ নিয়ে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে বলা হয়েছে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে সনদ অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ হবে।
সনদের এসব প্রস্তাবে নোট অব ডিসেন্ট দেওয়া বিএনপি ইশতেহারেও বলেছে, সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠন পদ্ধতি ঠিক হবে। সরকারি কর্মকমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশনের নিয়োগে আইন করা হবে।
কর্মসংস্থানের জোর, শিক্ষায় ভাতা বৃত্তি ঋণ
তিন দলের ইশতেহারেই পাঁচ বছরে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। বিএনপির ৯ অগ্রাধিকারে রয়েছে– প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবার সুরক্ষায় ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর মাধ্যমে মাসে দুই হাজার ৫০০ টাকা; কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে ‘কৃষক কার্ড’; দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, আনন্দময় ও কর্মমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় নীতি প্রণয়ন এবং ‘মিড-ডে মিল’ চালু; এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কারিগরি ও ভাষা দক্ষতা উন্নয়ন, স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা সহায়তা; ২০ হাজার কিলোমিটার নদী, খাল খনন ও পুনর্খনন এবং ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ; ধর্মীয় নেতাদের জন্য সম্মানী এবং পেপাল চালু, ই-কমার্সের আঞ্চলিক হাব স্থাপন।
জামায়াতের ২৬ অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে– যুবকদের ক্ষমতায়ন এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রাধান্য; নারীর জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্র গঠন; আইনশৃঙ্খলার সার্বিক উন্নয়নের মাধ্যমে মাদক, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসমুক্ত রাষ্ট্র; প্রযুক্তি, নির্মাণ, কৃষি. শিল্পসহ নানা খাতে ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি; ব্যাংকসহ সার্বিক আর্থিক খাতে সংস্কারের মাধ্যমে আস্থা ফিরিয়ে আনা; কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার ও কৃষকদের সহযোগিতা বাড়ানো ও ২০৩০ সালের মধ্যে নিরাপদ খাদ্য নিরাপত্তা; ‘সবুজ ও পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ’ গড়া; ব্যাপক শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান তৈরি; যোগাযোগ ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজতে রাজধানীর সঙ্গে বিভাগীয় শহরগুলোর দূরত্ব পর্যায়ক্রমে দুই-তিন ঘণ্টায় নামিয়ে আনা; নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জন্য স্বল্পমূল্যে আবাসন ইত্যাদি।
এনসিপিও এক কোটি কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। দলটির ইশতেহারে বলা হয়েছে, বছরে ১০০ দিন কাজের নিশ্চয়তা থাকবে। মজুরি হবে ঘণ্টায় অন্তত ১০০ টাকা। জামায়াত এক কোটি তরুণকে প্রশিক্ষিত করতে ‘দক্ষতা’ প্রকল্প চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বিএনপি শিক্ষানীতি প্রণয়নের মাধ্যমে প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থাতেই দক্ষ জনবল সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
বিএনপি শিক্ষিত বেকারদের ভাতা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। জামায়াত দরিদ্র শিক্ষার্থীদের মাসে তিন হাজার টাকা করে বৃত্তির অঙ্গীকার করেছে। শিক্ষার্থীদের জন্য মাসে ১০ হাজার টাকা করে বিনা সুদের ঋণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এনসিপি শিক্ষার্থীদের মাসে পাঁচ হাজার টাকা করে বৃত্তি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
অর্থনীতি ও কর ব্যবস্থা নিয়ে কী অবস্থান
ইশতেহারে বিএনপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের অর্থনীতির আকার হবে এক ট্রিলিয়ন ডলার। জামায়াতের প্রতিশ্রুতি ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে দুই ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির দেশ।
বর্তমানে বাংলাদেশে অর্থনীতির আকার বা জিডিপি ৪৫০ বিলিয়ন ডলার। জামায়াত প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশে উন্নীত করা হবে। কর এবং জিডিপির অনুপাত হবে ১৪ শতাংশ। এনসিপির প্রতিশ্রুতি কর-জিডিপির অনুপাত হবে ১২ শতাংশ।
বিএনপি কর কাঠামো সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। জামায়াত করপোরেট করসহ সব ধরনের কর কমিয়ে ২০ শতাংশের নিচে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আয়করমুক্ত করসীমা সাড়ে ৬৫ লাখ টাকায় উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রেও গুরুত্ব
এবারের নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে পররাষ্ট্রনীতি এবং প্রতিরক্ষা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। বিএনপি জানিয়েছে, তাদের পররাষ্ট্রনীতি হবে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। দলটি সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়ন, চতুর্থ মাত্রার বাহিনী গড়ার পরিকল্পনা জানিয়েছে।
জামায়াত জানিয়েছে, তাদের পররাষ্ট্রনীতি ‘সমতা ও সমমর্যাদা’। এনসিপির প্রতিশ্রুতি হচ্ছে, দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে হবে পররাষ্ট্রনীতি। জামায়াত ও এনসিপি উভয় দলই দেশের তরুণ-তরুণীকে বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রেখেছে ইশতেহারে। বিএনপির এমন পরিকল্পনা নেই। তবে তিন দলই প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে সমরাস্ত্র উৎপাদনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।