ফান্সের কারাগারে দেশটির এক প্রবীণ শিক্ষককে আটকে রাখা হয়েছে। তার বয়স এখন ৭৯ বছর। বয়োবৃদ্ধ এই শিক্ষাগুরুর এখন অবকাশ জীবন কাটানোর কথা থাকলেও তিনি কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর অপেক্ষায় আছেন। শিগগিরই তাকে ফরাসি আদালতে তোলা হবে।
ইতোমধ্যে তার বিরুদ্ধে ৮৯টি শিশুকে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগ এনেছে পুলিশ। এই অপরাধ তিনি ৬২ বছরের মধ্যে করেন। তবে তার বিরুদ্ধে যথেষ্ট প্রমাণ হাজির করতে হিমশিম খাচ্ছে প্রসিকিউশন। এতেই বেধেছে বিপত্তি। খবর দ্য গার্ডিয়ানের।
১৯৬০-এর দশক থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত পাঁচটি মহাদেশজুড়ে ৮৯টি শিশুকে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগে অভিযুক্ত প্রাক্তন শিক্ষক জ্যাক লেভেউগ্ল-এর মামলার ক্ষেত্রে ফরাসি পুলিশ ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের জন্য একটি বিরল আন্তর্জাতিক আবেদন করেছে।
ফ্রান্সের দক্ষিণপূর্বাঞ্চলের গ্রেনোবল শহরের পুলিশ জানায়, লেভেউগ্ল, যিনি ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ফ্রান্সে আটক আছেন, তিনি ছিলেন একজন সিরিয়াল যৌন অপরাধীর ‘পাঠ্যপুস্তকীয় উদাহরণ’। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে জার্মানি থেকে ভারত পর্যন্ত বিস্তৃত অনেক দেশে এই অস্বাভাবিক এবং বিশাল মামলাটি ছড়িয়ে আছে।
স্থানীয় প্রসিকিউটর এতিয়েন মান্তক্স বলেছেন, লেভেউগ্ল পুলিশকে জানিয়েছেন যে, তিনি তার মরণব্যাধিতে আক্রান্ত মা এবং পরবর্তীতে তার বৃদ্ধা খালাকে বালিশ দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছেন।
সম্ভাব্য ভুক্তভোগী এবং সাক্ষীদের ফরাসি পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করার আবেদন জানিয়ে মান্তক্স বলেন, লেভেউগ্ল ১৯৬০-এর দশক থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, মরক্কো, নাইজার, আলজেরিয়া, ফিলিপাইন, ভারত, কলম্বিয়া ও ফ্রান্সের সমুদ্রতীরবর্তী অঞ্চল নিউ ক্যালেডোনিয়াতে শিশুদের সঙ্গে কাজ করেছেন।
মান্তক্স বলেন, ‘তিনি এই বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করেছেন এবং যেখানেই গৃহশিক্ষক বা শিক্ষক হিসেবে কাজ করার জন্য থিতু হয়েছেন, সেখানেই তিনি তরুণদের সঙ্গে মিশেছেন। আল্পাইন শহর অ্যানসিতে জন্মগ্রহণকারী লেভেউগ্ল দেখতে ‘সংস্কৃতিবান ও ক্যারিশম্যাটিক’ ছিলেন এবং শিশুদের ফুসলিয়ে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতেন।’
কখনও আনুষ্ঠানিক শিক্ষকতার যোগ্যতা অর্জন না করা সত্ত্বেও লেভেউগ্ল ১৯৬০-এর দশক থেকে একজন শিক্ষাবিদ হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি ক্যানিওনিং, স্পিলিওলজি এবং যুব শিবিরের স্পোর্টস মনিটর হিসেবেও কাজ করেছেন। তিনি জার্মানিতে তরুণ অপরাধীদের সঙ্গেও মিশেছেন। দীর্ঘ সময় গৃহশিক্ষকতা করেছেন এবং কলম্বিয়ার বোগোটার একটি শিশু সদনে শিক্ষাবিদ ছিলেন।
ফরাসি আধা-সামরিক বাহিনী জেন্ডারমারি অনলাইনে একটি আবেদন জারি করেছে, যেখানে বিভিন্ন বয়সে লেভেউগ্ল-এর ছবি এবং তিনি যেসব দেশে বসবাস করেছিলেন সেগুলোর নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে অপ্রাপ্তবয়স্কদের ওপর গুরুতর ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের জন্য লেভেউগ্ল-এর বিরুদ্ধে ফ্রান্সে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হয় এবং গত এপ্রিল থেকে তাকে বিচারের আগে হাজতি হিসেবে আটকে রাখা হয়েছে।
মামলাটি শিশুদের সঙ্গে লেভেউগ্ল-এর নিজের কার্যকলাপ নিয়ে লেখালেখির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, তিনি একটি ডিজিটাল ‘স্মৃতিচারণ’ তৈরি করেছিলেন, যা তার এক ভাগ্নে ইউএসবি ড্রাইভে খুঁজে পান এবং কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেন।
প্রসিকিউটররা বলছেন, লেভেউগ্ল-এর লেখা ১৫ খণ্ডের পাঠ্য তদন্তকারীদের ১৯৬৭ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ৮৯ জন কথিত ভুক্তভোগীকে শনাক্ত করতে সাহায্য করেছে, যারা সেসময় ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সী কিশোর ছিল।
ফরাসি পুলিশ এখন লেভেউগ্ল যেসব দেশে কাজ করেছেন সেখানে আরও সম্ভাব্য ভুক্তভোগী বা সাক্ষীদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। মান্তক্স বলেন, ‘যদি ভুক্তভোগীরা সামনে আসতে চান, তবে তাদের এখনই তা করা উচিত, কারণ একটি যুক্তিসঙ্গত সময়ের মধ্যে বিচার নিশ্চিত করতে আমাদের ২০২৬ সালের মধ্যে এই তদন্ত শেষ করতে হবে।’
লেভেউগ্ল-এর কম্পিউটারে রেকর্ড রাখার বিষয়টি গত বছরের প্রাক্তন ফরাসি সার্জন জোয়েল লে স্কোয়ারনেক-এর মামলার কথা মনে করিয়ে দেয়, যিনি শত শত রোগীর (যাদের বেশিরভাগই ১৫ বছরের কম বয়সী) যৌন নির্যাতনের জন্য ২০ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছিলেন। সেটি ছিল ফ্রান্সের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিশু নির্যাতনের বিচার। লে স্কোয়ারনেকও তার কম্পিউটারে রেকর্ড রাখতেন। ভুক্তভোগী এবং শিশু অধিকার রক্ষাকারীরা বলেছেন, লে স্কোয়ারনেকের মামলাটি সেই পদ্ধতিগত ত্রুটিগুলোকে সামনে এনেছে, যার কারণে তিনি ধরা না পড়ে বারবার যৌন অপরাধ করতে পেরেছিলেন।
প্রসিকিউটরের মতে, লেভেউগ্ল পুলিশকে বলেছেন যে, তিনি ১৯৭০-এর দশকে তার মাকে (যিনি ক্যান্সারের শেষ পর্যায়ে ছিলেন) বালিশ চাপা দিয়ে হত্যা করেছিলেন। তিনি এও বলেছেন যে, ১৯৯০-এর দশকে তিনি তার ৯২ বছর বয়সী খালাকেও একইভাবে বালিশ চাপা দিয়ে হত্যা করেন।
মান্তক্স জানান, লেভেউগ্ল বর্ণনা করেছেন যে, তিনি তার খালার সঙ্গে দেখা করার পর বাড়ি ফিরতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তার খালা তাকে থেকে যাওয়ার জন্য মিনতি করছিলেন। প্রসিকিউটর বলেন, ‘তিনি তাকেও মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন, তাই তিনি যখন ঘুমিয়ে ছিলেন, তখন তিনি একটি বালিশ নিয়ে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন।’
মান্তক্স আরো বলেন, লেভেউগ্ল তার ‘স্মৃতিচারণে’ লিখেছিলেন যে তিনি ‘দুজন মানুষকে হত্যা করেছেন’।
প্রসিকিউটর বলেন, সন্দেহভাজন ব্যক্তি ‘তার কর্মকাণ্ডের ন্যায্যতা দিয়ে বলেন যে, তিনি যদি কখনও জীবনের শেষ পর্যায়ে এমন পরিস্থিতিতে পড়েন, তবে তিনিও চাইবেন কেউ যেন তার জন্য একই কাজ করে।’