সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদে অস্থির চট্টগ্রাম

প্রকাশিতঃ মার্চ ২, ২০২৬ | ৯:৫৪ পূর্বাহ্ণ
অনলাইন নিউজ ডেক্স

ভারতে বসে শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের অপকর্মে অস্থির চট্টগ্রাম। শুধু নগরী নয়, জেলা পুলিশের ৫ থানাও তটস্থ তার অনুসারীদের আতঙ্কে। বিভিন্ন ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে শিল্পপতি-কেউ রেহাই পাচ্ছেন না তার অনুসারীদের হাত থেকে। বিদেশে বসেই টার্গেট ব্যক্তির সঙ্গে ফোনে কথা বলে চাঁদাবাজি করছে বড় সাজ্জাদ। অথবা মেসেজ দিয়ে ভয়ভীতি এমনকি হত্যার হুমকি-ধমকি দিয়ে চাঁদা আদায় করছে। চাঁদ না দিলে হত্যার শিকার হতে হচ্ছে। চাঁদা না দিলে তার অনুসারীরা বাড়িঘরে গিয়েও প্রকাশ্যে গুলিবর্ষণ করে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। গত শনিবার সকালে স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ও এমডি সাবেক এমপি মুজিবুর রহমানের বাসভবন লক্ষ্য করে মুহুর্মুহু গুলিবর্ষণ করে তার অনুসারীরা। ১২ কোটি টাকা চাঁদার দাবিতে দ্বিতীয় দফায় ওই বাসায় গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটায় বড় সাজ্জাদ। এদিকে একের পর এক অপকর্মের পরও সাজ্জাদকে ফেরাতে কার্যকর কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করছে না পুলিশ প্রশাসন। তবে সিএমপি বলছে, সাজ্জাদের অনুসারীদের গ্রেফতারে তাদের টিম কাজ করছে। এর আগে সাজ্জাদের অন্যতম প্রধান অনুসারী ছোট সাজ্জাদকে সিএমপি ঢাকা থেকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। বড় সাজ্জাদের বাহিনীর খুন, চাঁদাবাজি, টার্গেট কিলিংয়ে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন চট্টগ্রামের মানুষ। তার বাহিনীর অপরাধ কর্মকাণ্ডের লাগাম টানতে না পেরে দিশেহারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর অন্তত ১০টি হত্যাকাণ্ডে এই বাহিনী সরাসরি জড়িত রয়েছে বলে পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে। সর্বশেষ শনিবার সকালের নগরীর চকবাজার থানার চন্দনপুরা এলাকায় অবস্থিত স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমানের বাসায় ভারী অস্ত্র দিয়ে মুহুর্মুহু গুলি করার ঘটনা ঘটে। এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। এরপর পর থেকে আবারও আলোচনায় আসে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদ। পুলিশের তথ্য মতে, চট্টগ্রামে ৫ আগস্টের পর বেশ কিছু হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের পরিকল্পনায়। এর মধ্যে সরোয়ার হোসেন বাবলা হত্যাকাণ্ডে করা মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে বড় সাজ্জাদ বা সাজ্জাদ আলীকে। তাকে এ হত্যাকাণ্ডের ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। নিহতের পরিবার ও পুলিশের দাবি-বড় সাজ্জাদের পরিকল্পনায় চট্টগ্রাম নগরীতে একের পর এক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। দুই যুগ ধরে বিদেশে বসে চট্টগ্রামের অপরাধ জগৎ নিয়ন্ত্রণ করছে পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদ। একসময় শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকায় বড় সাজ্জাদ ‘শিবির ক্যাডার’ হিসাবে পরিচিত। নগরীর পাঁচলাইশ, বায়েজিদ বোস্তামী, বাকলিয়া, চকবাজার এলাকা থেকে এবং জেলার হাটহাজারী, রাউজান, রাঙ্গুনিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় তার পরিকল্পনায় নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চলছে। পকর্মের মধ্যে রয়েছে মুক্তিপণ আদায়, চাঁদাবাজি, বালুমহাল-ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, ভবন নির্মাণে ইট-বালুসহ নির্মাণসামগ্রী সরবরাহে প্রভাব বিস্তার। বড় সাজ্জাদের সেকেন্ড কমান্ড ছিল ছোট সাজ্জাদ। গত ১৫ মার্চ ঢাকার বসুন্ধরা থেকে পুলিশ সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদকে গ্রেফতার করে। এর পর থেকে সে কারাগারে আছে। বর্তমানে বড় সাজ্জাদের সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসাবে কাজ করছে রায়হান। রায়হানের বিরুদ্ধে ১৪ মাসে ৯টি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। এর পরও তাকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। গত বছরের ১৪ ডিসেম্বর নগরের পাঁচলাইশ হামজারবাগ এলাকায় মুরাদপুর-অক্সিজেন সড়কের পাশে একটি নির্মাণাধীন ভবনে হামলা করে সন্ত্রাসীরা। এর আগে ভবন মালিকের কাছে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। এ ঘটনায়ও বড় সাজ্জাদের সহযোগীদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠে আসে। এর আগে একই বছরের ১ আগস্ট রাত সাড়ে ১০টার দিকে চান্দগাঁও মোহরা এলাকায় মোহাম্মদ ইউনুস নামে এক ব্যবসায়ীর বাসায় গুলিবর্ষণ করে সাজ্জাদের অনুসারীরা। পুলিশ জানায়, বড় সাজ্জাদের বাহিনীর ২০-২২ জন সন্ত্রাসী চট্টগ্রামে সক্রিয়। একসময় এই বাহিনীর মূল নেতৃত্বে ছিল ১৭ মামলার আসামি সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ। সে গত বছর ১৫ মার্চ কারাগারে যাওয়ার পর তার হয়ে বর্তমানে বাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছে আট খুনসহ ১৫ মামলার আসামি মোহাম্মদ রায়হান। বড় সাজ্জাদের অনুসারীদের মধ্যে রায়হানসহ পাঁচজন আলোচিত। তারা হলো-মোবারক হোসেন ইমন, খোরশেদ, বোরহান ও হাসান। এর মধ্যে গত বছরের ৩০ মার্চ নগরের চন্দনপুরা এলাকায় সংঘটিত জোড়া খুনের মামলায় ‘সন্ত্রাসী’ হাসান এখন কারাবন্দি। তবে দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী রায়হানসহ বাকি চারজন অধরা। দেশে বড় সাজ্জাদের দলের নেতৃত্বে থাকা ছোট সাজ্জাদ কারাগারে থাকলেও বেশির ভাগ সদস্য এখনো ধরা পড়েনি। ছোট সাজ্জাদ কারাগারে যাওয়ার পর বেপরোয়া হয়ে ওঠে তার প্রধান দুই সহযোগী মোহাম্মদ রায়হান ও মোবারক হোসেন ইমন। সাজ্জাদ আলী খান চট্টগ্রামের বহদ্দারহাটে আট ছাত্রলীগ নেতা খুনের মামলার যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। ২০০০ সালের ১২ জুলাই এইট মার্ডারের ঘটনা ঘটেছিল। এর আগে নিজ এলাকার জনপ্রিয় ওয়ার্ড কমিশনার লিয়াকত আলীকেও প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করেছিল সাজ্জাদ ও তার সহযোগীরা। বহদ্দারহাটে সংঘটিত চাঞ্চল্যকর এইট মার্ডারের নেতৃত্ব দিয়েছিল এই সাজ্জাদ। একটি ক্যাম্পাসে দখল প্রতিষ্ঠা করতেই দিন-দুপুরে ব্রাশফায়ার করে আটজনকে হত্যা করেছিল এই সাজ্জাদ। পরে বন্দুকযুদ্ধের পর একে-৪৭ রাইফেলসহ গ্রেফতার হয়ে দীর্ঘদিন জেলে ছিল সে। জামিনে বের হয়েই পালিয়ে যায় ভারতে। অধরা বড় সাজ্জাদের সেকেন্ড ইন কমান্ড রায়হান : একাধিক হত্যাকাণ্ডে নাম এলেও এখনো অধরা ভয়ংকর সন্ত্রাসী রায়হান। সে এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরের। তার বিরুদ্ধে সাতটি হত্যাসহ ১৫টি মামলা রয়েছে। পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাউজান ও চট্টগ্রাম নগরীতে যেকটি টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনা ঘটেছে সবক’টিতেই নেতৃত্ব দেয় রায়হান। গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে চট্টগ্রাম মহানগরী ও জেলায় একের পর এক হত্যা মামলা হয় তার বিরুদ্ধে। রাউজান, ফটিকছড়ি ও রাঙ্গুনিয়ার পাহাড়ি এলাকায় তার গোপন আস্তানাও রয়েছে বলে জানা গেছে। রোববার বিকালে সিএমপি সহকারী কমিশনার (গণসংযোগ) আমিনুর রশীদ বলেন, সিএমপি বরাবরই সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর। সব সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। গোলাগুলিসহ অস্থিরতা সৃষ্টিকারী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পুলিশ মাঠে কাজ করছে। আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদকে বিদেশ থেকে ফেরাতে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কিনা, এ বিষয়ে কিছু বলতে রাজি হননি এই পুলিশ কর্মকর্তা।