এন্টিবায়োটিক ঔষধকে বাঁচান

প্রকাশিতঃ মার্চ ১২, ২০২৬ | ১০:১৬ অপরাহ্ণ
ডা. লকিয়ত উল্যাহ

বিশ্বজুড়ে প্রকট এমন একটি মারাত্বক সমস্যার নাম এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স, যা বাংলাদেশেসহ সারা বিশ্বে মারাত্বক আকার ধারণ করেছে এবং স্বাস্থ্যঝুকি সৃষ্টি করেছে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ২০৫০ সালের মধ্যে সারা বিশ্বে ১০ মিলিয়নের অধিক মানুষ এর কারণে মৃত্যুর মুখে পড়বে। ইতোমধ্যে চিকিৎসা জগতে এটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতেৃ শুরু করেছে।চিকিৎসকগণ রোগীদের জন্য কার্যকরী এন্টিবায়োটিক ঔষধ পছন্দ করতে হিমশিম খাচ্ছেন, কারণ প্রচলিত এন্টিবায়োটিক ঔষধগুলোর বেশিরভাগই রোগীর দেহে অকার্যকর হয়ে পড়েছে। এতে লক্ষ লক্ষ রোগী জীবাণুর ক্রমাগত আক্রমণে দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়ে পড়ছে এবং পড়বে। এখন, এসব রোগীকে বাচানোর উপয় কী? বাংলাদেশে এন্টিবায়োটিক ঔষধের ব্যবহারে প্রচলিত নীতিমালার বাস্তবায়ন নেই বললেই চলে। এখানে প্রেসক্রিপশন দেখিয়ে এন্টিবায়োটিক ঔষধ কেনার কথা রয়েছে, যা খুব কমই মানা হয় ভোক্তা পর্যায়ে। যারা ঔষধের দোকান পরিচালনা করেন তারাও সেটা মেনে চলতে পারেন না। ভোক্তা দোকানে এসে এন্টিবায়োটিক ঔষধ চেয়েছেন, তারাও ঔষধ বিক্রি করে দিয়েছেন। এরপর এসব এন্টিবায়োটিকের কী হলো সেটা কেউ খবর রাখছেন না। ভোক্তা এন্টিবায়োটিক সম্পর্কে কতটা সচেতন তা রীতিমতো গবেষণার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, এখান থেকেই এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স শুরু হয়। এন্টিবায়োটিক ঔষধের অব্যবহার কিংবা অপর্যাপ্ত ব্যবহার থেকেই রেজিস্ট্যান্ট নামক দুর্ঘটনার সূত্রপাত হয়, যা আমরা অনেকেই জানি না। মানুষের দেহে যখন মাইক্রো অর্গানিজম অর্থাৎ ব্যাক্টেরিয়া আক্রমণ করে তখন এই শক্তপোক্ত দেহটা হঠাৎ নেতিয়ে পড়ে। চোখে ব্যাক্টেরিয়ার আক্রমণ হলে চোখ ফুলে যায়, দেখতে অসুবিধা হয়। ফুসফুসে আক্রমণ হলে নিউমোনিয়া রোগ হয়, রোগী শ্বাস নিতে পারে না। পেটে আক্রমণ হলে ডায়রিয়া ও টাইফয়েড রোগ হয়, রোগী অল্পসময়ের ব্যবধানে দুর্বল হয়ে যায়। জীবাণুর এই সংক্রমণ দেহের যে কোনো স্থানে হতে পারে। তখনই দরকার একটা কার্যকর এন্টিবায়োটিক ঔষধ, যার পুরোটা একজন রেজিষ্টার্ড চিকিৎসকের এখতিয়ারে রয়েছে। তিনি ঠিক করে দেবেন রোগীর জন্য কোন ঔষধটা প্রয়োজন এবং কতদিন ধরে খেতে হবে। এখানে চিকিৎসকের কাজটি যদি অন্য কেউ করতে আসেন বা করে বসেন, তাহলে দুর্ঘটনা অনিবার্য, যা বাংলাদেশে অহরহ হচ্ছে। উদারহণস্বরুপ একটি ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে। একজনের ডায়রিয়া হয়েছে। তিনি চিকিৎসকের পূর্বের কোনো প্রেসক্রিপশন অনুসরণ করে অথবা কারো পরামর্শে এন্টিবায়োটিক সেবন শুরু করলেন। কাজটা কি ঠিক করেছেন? মোটেও না। কারণ, তিনি জানেন না ডায়রিয়া দুটি কারণে হতে পারে। একটি হলো বদহজম জনিত কারণে, যার চিকিৎসায় এন্টিবায়োটিক ঔষধের দরকার নেই। দ্বিতীয় কারণটি হলো জীবানুর আক্রমণ, যার নিরাময়ে একটি ভালো এন্টিবায়োটিক দরকার। এখন, তিনি কীভাবে নিশ্চিত হলেন যে তার দেহের ডায়রিয়া জীবাণুর আক্রমণে হয়েছে? এর উত্তর হলো তিনি পুরো বিষয়টি নিশ্চিত নন। আর এভাবেই শুরু হয় এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স অর্থাৎ রোগীর দেহে অবস্থানরত জীবাণুকে দমন করতে ঔষধের ব্যর্থতা বা অইমতা। যখন এন্টিবায়োটিক ঔষধ জীবাণু দমনে ব্যর্থ হয়ে যায়, তখন দেহে জীবাণুদের রাজত্ব বেড়ে যায় এবং এরা সংখ্যায় এতবেশি হয়ে যায় যে এদেরকে প্রতিহত করা বা প্রতিরোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই অবস্থাকে মেডিকেলের ভাষায় বলা হয় সেপটিসেমিয়া। রোগী এই অবস্থায় পৌছলে আর ফিরে আসে না। পাড়ার যে দোকান থেকে এন্টিবায়োটিক ঔষধ কেনা হয় সেখানে এন্টিবায়োটিক ঔষধের সচেতনতা বিষয়ে রোগীকে বা ভোক্তাকে পর্যাপ্ত কাউন্সেলিং বা পরামর্শ দেওয়া হয় না। এখানে প্রাধান্য পায় বিক্রি। তিনি বিক্রি করে পয়সা হাতে পেলেই হলো। বিক্রেতার যেন আর কোনো দায়িত্ব নেই। অথচ রোগীকে এন্টিবায়োটিক ঔষধের ব্যবহার বিধি বুঝিয়ে দেবার বিধান রয়েছে। কিছু দোকানদার এমন যে এরা নিজেরাই রোগীকে অন্যান্য ঔষধের পাশাপাশি এন্টিবায়োটিক ব্যবহারের প্রেসক্রিপশন দিয়ে থাকেন, যা সম্পূর্ণভাবে তার এখতিয়ার বহির্ভূত। তিনি যে অন্যকে এন্টিবায়োটিক প্রেসক্রিপশন দিলেন, তিনি নিজে কতটা সচেতন আছেন? এই প্রশ্নটা তাকে করলে যা বেরিয়ে আসবে তা হলো তিনি এন্টিবায়োটিক সম্পর্কে অতি অল্পই জানেন, যার উপর ভরসা করে তিনি কাউকে প্রেসক্রিপশন দিতে পারেন না। এজন্য প্রতিটা এন্টিবায়োটিক ঔষধের গায়ে লাল রঙ্গের কালিতে লেখা আছে-- এন্টিবায়োটিক, যেন রোগী ও ভোক্তা সহজেই বুঝতে পারে এটি সাধারণ কোনো ঔষধ নয়, এন্টিবায়োটিক, যার ব্যবহারে বিশেষ সতর্কতা আবশ্যক। এখন, এসব দোকানদারকে কে তদারকি করবেন? বাংলাদেশে ড্রাগ এ্যাডমিনিস্ট্রেশন আছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আছে। তাদের দায়িত্ব এন্টিবায়োটিক ঔষধের অব্যবহার, অতিব্যবহার রোধ করা। অনেকেই প্রশ্ন করেন এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট বিষয়টা আসলেই কী? কেন এন্টিবায়োটিকটা জীবাণুর বিরুদ্ধে কাজ করে না? কেন রোগী দীর্ঘদিন ঔষধ সেবনেও আরোগ্য লাভ করে না? এই বিষয়টা আগে চিকিৎসা পেশার সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে জানলেই হতো। অন্যদের এ বিষয়ে মাথা ঘামনোর দরকার ছিলো না। কিন্তু এখন সবাইকে এ বিষয়ে সম্যক ধারণা রাখা প্রয়োজন, কারণ এটি মহামারি আকার ধারণ করতে যাচ্ছে। এর ফলে আমি, আপনিসহ যে কেউ আক্রান্ত হবো–– আজ অথবা কাল। প্রতিটা রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু (অর্থাৎ ব্যাক্টেরিয়া, ভাইরাস, ছপ্পাক) কে প্রতিহত করতে, প্রতিরোধ করতে কিংবা ধ্বংস করতে একটা নির্দিষ্ট সময় লাগে। কারণ, এরা প্রাণী, এদের প্রাণ আছে এবং বাঁচার জন্য বিভিন্ন ধরণের বিবর্তনের মাধ্যমে নিজেদের রক্ষার জন্য ঢাল তৈরি করতে পারে। যখন কোনো এন্টিবায়োটিক ঔষধ অপর্যাপ্ত পরিমানে গ্রহণ করা হয় কিংবা প্রয়োজনের তুলনায় কম সময় ধরে গ্রহণ করা হয়, তখন জীবাণুগুলো বাঁচার জন্য ঢাল তৈরি করে। এই ঢালগুলো এমন যে তখন এন্টিবায়োটিক ঔষধ জীবাণুদের আর কোনো ইতি করতে পারে না। জীবাণুরা তখন মানবদেহে বাড়তে থাকে আর ইতি করতে থাকে। কিছু কিছু ঢাল এমন যে তারা এন্টিবায়োটিক ঔষধগুলোকে নষ্ট করে দেয়। রোগী বুঝতে পারে না তার দেহে কী হচ্ছে। জীবাণুদের এই আচরণ খুবই অদ্ভুত এবং ধ্বংসাত্মক। একবার তারা এভাবে জয়ী হতে পারলে এই এন্টিবায়োটিক ঔষধ দিয়ে তাদেরকে আর কাবু করা যায় না। এদেরকে বলায় রেজিস্ট্যান্ট জীবাণু। এই জীবাণুগুলো সবচেয়ে বেশি মারাত্মক। এদের অবস্থান হাসপাতালে, ক্লিনিকে এবং নোংরা পরিবেশে, যেখানে ঘনবসতী দেখা যায়। এগুলো একজনের দেহ থেকে অন্যজনের দেহে সংক্রমিত হয়। এদেরকে প্রতিহত করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। জীবাণুরা যাতে রেজিস্ট্যান্ট না হয়ে যায়, তার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এন্টিবায়োটিক ঔষধ সেবন করা অত্যন্ত জরুরী, অন্যদের পরামর্শ মতে নয়। কারণ, তারা আপনার জন্য এন্টিবায়োটিক ঔষধের সঠিক মাত্রা নিরুপন করতে পারবে না এবং সঠিক সময় কাল অর্থাৎ কতদিন খেতে হবে তা বলে দিতে পারবেন না। এজন্য এন্টিবায়োটিক ঔষধের ব্যবহারে ও সেবনে সবার সতর্কতা আবশ্যক। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অন্য কারো পরামর্শ গ্রহণ করা যাবে না। এন্টিবায়োটিক ঔষধের অপব্যবহারের কারণে এদের অনেকগুলো এখন আর কাজ করছে না রোগীর দেহে। চিকিৎসকগণ বেকায়দায় পড়ে যাচ্ছেন রোগীকে বাঁচাতে। রোগীর দেহে কাজ করবে এমন এন্টিবায়োটিক খুঁজতে তিনি বিভিন্ন পরীক্ষা দিচ্ছেন যার একটি হলো কালচার সেনসিটিভিটি টেস্ট। সে টেস্টে দেখা যায় দু’য়েকটা ছাড়া সকল এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট অর্থাৎ রোগীকে বাঁচাতে দু’য়েকটা এন্টিবায়োটিক অবশিষ্ট আছে, বাকী সব অকার্যকর হয়ে পড়েছে। এখন, এই অবশিষ্ট ঔষধে যদি রোগী সুস্থ না হোন, তাহলে মৃত্যুর জন্য দিন গোনা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। এজন্য চিকিৎসকগণ এখন যে জিনিসটার উপর জোর দিচ্ছেন তা হলো রোগীকে বাঁচানোর সাথে সাথে এন্টিবায়োটিক ঔষধকে বাঁচাতে হবে। যদি এদেরকে বাঁচানো যায়, তাহলে রোগীকে বাঁচানো যাবে, আর যদি বাঁচানো না যায়, তাহলে রোগীকে বাঁচানো কঠিন হয়ে যাবে। অস্ত্র যদি কাজ না করে তাহলে যুদ্ধে জয় কী করে হয়? আমাদেরকে সবার আগে যুদ্ধাস্ত্র অর্থাৎ এন্টিবায়োটিক ঔষধকে বাঁচাতে হবে। এটি একটি সম্মিলিত প্রক্রিয়া ও দায়িত্ববোধ। এখানে ভোক্তার দায়িত্ব আছে, সাধারণ মানুষের দায়িত্ব আছে, ঔষধের দোকানদারের দায়িত্ব আছে, গ্রামের পল্লী চিকিৎসকের দায়িত্ব আছে, রেজিষ্টার্ড চিকিৎসকের দায়িত্ব আছে, ঔষধ প্রশাসনসহ সরকারের দায়িত্ব আছে, ঔষধ কোম্পানিগুলোর দায়িত্ব আছে। সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে এবং দায়িত্বশীল ভ‚মিকা পালন করতে হবে। উডেশ্য একটাই–– এন্টিবায়োটিক ঔষধকে বাঁচানো। এটি বাঁচলে, মানুষ বাঁচবে, মানুষ বাঁচলে দেশ বাঁচবে, তখন ব্যবসা বাণিজ্য-সব বাঁচবে। আর যদি এন্টিবায়োটিক অকার্যকর ঔষধে পরিণত হয়, তখন এই ভোতা অস্ত্র কেউ নেবে না, কারো কাজে আসবে না। আসুন, এন্টিবায়োটিক ব্যবহারে আমরা দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করি। লেখক: চিকিৎসক ও উদ্যোক্তা