মধ্যপ্রাচ্যে, অর্থাৎ পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের আগ্রাসন ক্রমে জটিল আকার ধারণ করছে। ইরানের বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই ঐচ্ছিক যুদ্ধ এখন আর শুধু রণক্ষেত্র বা সেনা ঘাঁটিতে মিসাইল হামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এবার সামরিক সংঘাত ডিজিটাল ও অর্থনৈতিক যুদ্ধে রূপান্তর হচ্ছে।
কারণ, ইরানের আগামী সম্ভাব্য লক্ষ্য হতে চলেছে মাইক্রোসফট, গুগল, এনভিডিয়া, আইবিএম, ওরাকল আর পালানটির মতো প্রথম সারির যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক টেক সংস্থা। এমন হুমকির মধ্যেই ইসরায়েলে তাদের দপ্তর সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে মার্ক জাকারবার্গের সংস্থা মেটা।
টার্গেটে আছে যারা বৈশ্বিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা ও ইরানের সংবাদ সংস্থা তাসনিম প্রকাশিত রিপোর্ট বলছে, ইরান এবারে যুক্তরাষ্ট্রের এমন কিছু প্রযুক্তি সংস্থার তালিকা তৈরি করেছে, যাদের সঙ্গে ইসরায়েলের নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান।
ইরান দাবি করছে, এসব মার্কিন টেক সংস্থাকে সামরিক ও গোয়েন্দা নজরদারির কাজে নিয়োজিত করেছে ইসরায়েল।ঠিক এসব কারণেই এই যুদ্ধের পরিধি দিন দিন জটিল রূপ ধারণ করছে। এসব টেক সংস্থার কয়েকটি অবকাঠামোকে বৈধ লক্ষ্যবস্তু বলে ঘোষণা করেছে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। তাসনিম সংবাদ সংস্থাটি কিন্তু আইআরজিসি অনুমোদিত। কাজেই এমন ঘোষণা একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার তেমন কোনো সুযোগ নেই।
বিপদ আদতে কতটুকু
ইরানের দেওয়া এমন হুমকি যে একেবারে কাগুজে নয়, তার প্রমাণ মিলছে বাস্তব দৃশ্যপটে। চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির আশঙ্কাজনক অবনতি ঘটলে ইসরায়েলের রাজধানী তেল আবিব শহরে নিজেদের দপ্তর পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে ইনস্টাগ্রাম-ফেসবুকের প্রধান সংস্থা মেটা।
কর্মীদের উদ্দেশে পাঠানো বিবৃতিতে সংস্থাটি সুস্পষ্ট করে বলেছে, যেসব কর্মী নিরাপদ আশ্রয়ে (বোম শেল্টার) যেতে পারছেন না, তাদের সুরক্ষাই এখন সবার আগে গুরুত্ব পাবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, টানা যুদ্ধাবস্থা যে মার্কিন মুলুকের করপোরেট জগতে সরাসরি নেতিবাচক প্রভাবে ছাপ ফেলেছে, তা মেটার এমন সিদ্ধান্ত থেকে সহজেই অনুমেয়।
অ্যামাজন ডেটা সেন্টারে আগুন
ইতোমধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতে অ্যামাজনের ডেটা সেন্টারে আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। গত ১ মার্চ অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেসের (এডব্লিউএস) ওই ডেটা সেন্টারে অজ্ঞাত বস্তু আছড়ে পড়ার কারণে এতে তাৎক্ষণিক আগুন ধরে যায়। এ ঘটনায় সংস্থাটির ক্লাউড পরিষেবায় সাময়িক বিঘ্ন ঘটে।
অন্যদিকে, গ্লোবাল ক্যাপিটাল মার্কেটস প্ল্যাটফর্ম দ্য কোবেইসি লেটার ও সোশ্যাল মিডিয়ায় দাবি করছে, দুবাই, ইসরায়েল ও আবুধাবিতে ছড়িয়ে থাকা মাইক্রোসফট, অ্যামাজন ও এনভিডিয়ার ডেটা সেন্টার ছাড়াও অন্যসব অবকাঠামো এখন ভয়ংকর ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
লক্ষ্য আসলে কী
সামরিক ও কৌশলগত বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে মুখোমুখি দাঁড়ানো ইরানের জন্য বেশ ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত। যুদ্ধ বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমানে ইরান এক অসম যুদ্ধ বা বিশেষ ধরনের অর্থনৈতিক যুদ্ধের কৌশলে রণকৌশল পরিচালনা করছে। যার প্রধান ভিত্তি হলো যুক্তরাষ্ট্রকে পরোক্ষভাবে আঘাত করে দেশটির অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া। যেন তাদের আর যুদ্ধ করার মতো অর্থনৈতিক সদিচ্ছা বা সক্ষমতা অবশিষ্ট না থাকে।
ইরান বলছে, ইসরায়েলকে যুদ্ধে সহায়তা করছে বলে এসব মার্কিন টেক সংস্থাকে তারা টার্গেট করেছে। কিন্তু আসল ঘটনা হলো, সিলিকন ভ্যালির এসব টেক সংস্থার বৈশ্বিক ডেটা সেন্টার শুধু যুক্তরাষ্ট্রে নয়, তাবৎ বিশ্বের ডিজিটাল অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি।
মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে এসব সংস্থা ইতোমধ্যে কয়েক বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ করেছে। এসব অবকাঠামোতে সাইবার হামলা বা সরাসরি হামলা হলে সারাবিশ্বে ক্লাউড পরিষেবা ও ব্যবসায়িক কাজ ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অর্থাৎ শুধু সরাসরি মিসাইল ছোড়া নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক আধিপত্যের ওপরে কঠিন আঘাত করাই এখন তেহরানের লক্ষ্য।
অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের টেক বিনিয়োগকারীরা কঠিন ও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির সম্মুখীন হবে, যা পরোক্ষভাবে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে কঠিন চাপ তৈরি করবে।