মোটরসাইকেলের তেল প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। তাই ফেনী শহরের বেসরকারি চাকরিজীবী কাজী দেলোয়ার হোসেন ঘুরছিলেন অকটেন নিতে। কয়েকটি পাম্পে অকটেন নেই। তিনি শুনেছেন, মেসার্স আবদুল কুদ্দুছ ফিলিং স্টেশনে দেওয়া হচ্ছে। গতকাল রোববার দুপুরে দ্রুত ছুটে আসেন সেখানে। তাঁকে পাম্প কর্তৃপক্ষ জানায়, তাদের অকটেনও শেষ। অনেকটা রাগান্বিত হয়ে সেখান থেকে চলে যান কাজী দেলোয়ার হোসেন।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে ফেনীতে দেখা দিয়েছে অকটেনের তীব্র সংকট। জেলার ২৮টি পেট্রোল পাম্পে দৈনিক পেট্রোল-অকটেল ও ডিজেলের চাহিদা প্রায় আড়াই লাখ লিটার। ২৭টি পাম্পে শুক্রবার থেকেই মিলছিল না পেট্রোল-অকটেন। শনিবার দুপুর ১২টার পর মেসার্স আবদুল কুদ্দুছ ফিলিং স্টেশনেও তেল দেওয়া বন্ধ হয়ে যায়। পাম্প কর্তৃপক্ষ কালো কাপড় লাগিয়ে তেল বিক্রি বন্ধের ঘোষণা দেয়। রোববার বিকেল ৪টার দিকে তারা অকটেন আনতে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা ডিপোতে গাড়ি পাঠিয়েছেন। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গাড়ি তেল নিয়ে ফেনী পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত ৮-৯টা বেজে যাবে। তাদের এখানে ডিজেল থাকলেও অকটেন নেই। এই অবস্থা জেলার সব পাম্পে।
শনিবার দুপুরে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন ফেনীর পরশুরাম উপজেলার ধনিকুন্ডা গ্রামের মোহাম্মদ আলমগীর। তিনি ফেনী শহরে তেলের পাম্প থেকে দুইশ টাকার তেল নিতে পেরেছেন। কিন্তু আলমগীর চিন্তিত ছিলেন, কীভাবে এই তেল দিয়ে ঢাকায় পৌঁছাবেন। তাঁকে পথিমধ্যে আরও কয়কেবার তেল নিতে হবে। তাতে সময় ও টাকা নষ্ট হবে। তাঁর দাবি, সরকার যেন এই সমস্যার দ্রুত সমাধান করেন।
এদিন সকালে পাম্পে লাইনে ছিলেন ফেনী শহরের ব্যবসায়ী মো. মাইন উদ্দিন সোহাগ ও রোটারিয়ান মো. সবুজ। তারা বলেন, পাম্প থেকে প্রতি বাইকে দুইশ টাকার তেল দিচ্ছে। সরকারের কাছে অনুরোধ, প্রতিটি বাইকে অন্তত পাঁচশ টাকার তেল যেন দেওয়া হয়। তা হলে এভাবে দীর্ঘ লাইনে ভোগান্তিতে পড়তে হতো না।
অনেক ক্রেতার প্রশ্ন, ডিপো থেকে জেলার পাম্পগুলোতে বৃহস্পতিবার তেল আনা হয়েছে। শনিবার পর্যন্ত বিক্রি করে হঠাৎ কেন তেল শেষ হয়ে গেল? নাকি ব্যবসায়ীরা অধিক মুনাফার জন্য কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করছেন? বিষয়টি প্রশাসনের খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
নতুন সংকটে চাষি
এদিকে অকটেনচালিত পাম্প নিয়ে নতুন সংকটে পড়েছেন চাষিরা। বোতল বা কনটেইনারে অকটেন দিচ্ছেন না পাম্পের কর্মীরা। বাধ্য হয়ে ১৫ কিলোমিটার দূর থেকে আবদুল কুদ্দুছ ফিলিং স্টেশনে এসেছিলেন কৃষক মো. বাচ্চু মিয়া। তিনি সদর উপজেলার কালিদহ ইউনিয়নের ভালুকিয়া গ্রামের বাড়ির পাশে ইরি ধানের চাষ করেছেন।
বাচ্চু মিয়া বলেন, ‘পানি দেওয়ার পাম্প অকটেনচালিত। তেলের অভাবে মেশিন চালাতে পারছি না। ফলে ফসল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এদিকে তেলের পাম্পগুলোতে বোতলে তেল বিক্রি করছে না। তাই ২০০ টাকা দিয়ে অটোরিকশা ভাড়া করে পাম্পে সেচের মেশিন নিয়ে এসেছি।’
এই কৃষকের ভাষ্য, ফসল বাঁচাতে পাম্প মেশিনের জন্য দিনে তাঁর ৩-৪ লিটার অকটেন লাগে। এভাবে প্রতিদিন রিকশা ভাড়া দিয়ে ফিলিং স্টেশনে সেচ পাম্প নিয়ে আসা সম্ভব?
মেসার্স আবদুল কুদ্দুছ ফিলিং স্টেশনের দায়িত্বরত কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান মোর্শেদ বলেন, মার্চের প্রথম ও দ্বিতীয় সপ্তাহে তেল সরবরাহ স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু তৃতীয় সপ্তাহে ডিপো থেকে চাহিদানুযায়ী তেল পাচ্ছেন না। চাহিদাও তিনগুণ বেড়েছে। চট্টগ্রামের পতেঙ্গা ডিপো থেকে প্রতিদিন বিকেলে পাম্পে তেল পৌঁছালেও তা তিন-চার ঘণ্টার মধ্যে শেষ হয়ে যায়। ডিপোতে অকটেনের চাহিদাপত্র দিলেও তারা ডিজেল দিয়েছে।
তিনি বলেন, শনিবার দুপুরেই অকটেন শেষ হয়ে যায়। তখনই চাহিদাপত্র পাঠানো হয়। চট্টগ্রাম ডিপো থেকে অকটেন দেবে জানালে রোববার বিকেলে গাড়ি পাঠিয়েছেন। গাড়ি এলে বিক্রি করা হবে। জেলা প্রশাসন কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে তেল দিতে বলেছে। তা পাম্প কর্তৃপক্ষের পক্ষে সম্ভব নয়। তারা মোটরসাইকেল মালিকদের কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করতে পারেন না। পুলিশ থাকলে তা করছে।
ফেনী জেলা পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির সভাপতি জাফর উদ্দিন বলেন, পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা ডিপো থেকে জেলা পর্যায়ের পাম্পগুলোতে তেল সরবরাহ করা হয়। বর্তমানে চাহিদার অর্ধেক তেল দেওয়া হচ্ছে। বিপরীতে গ্রাহকরা তিন-চারগুণ বেশি তেল কিনছেন। চাহিদা মেটাতে না পেরে কোনো কোনো পাম্প বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
জেলা প্রশাসক মনিরা হক বলেন, ফেনীতে পেট্রোল পাম্পগুলোতে পর্যাপ্ত তেল পাওয়ার বিষয়ে পাম্প মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে। সে অনুযায়ী কাজ চলছে। তেলের চাহিদা পূরণে চেষ্টা চলছে। রোববার থেকে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ হয়েছে। এপ্রিলের শুরুতে সমস্যাগুলোর সমাধান হতে পারে।