যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ নাগরিক মনে করেন, ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের সামরিক পদক্ষেপ অনেক দূর গড়িয়েছে। চলমান যুদ্ধের কারণে তারা পেট্রল ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধির উদ্বেগের মধ্যে আছেন।
মার্কিনিরা তাদের এই মতামত দিয়েছেন একটি জরিপের মাধ্যমে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পবিরোধী এই মতামত রাজপথের স্লোগানেও পরিণত হয়েছে। স্থানীয় সময় শনিবার কয়েক লাখ মানুষ সড়কে নেমেছিলেন বিক্ষোভ করতে। যেখানে তারা ইরান যুদ্ধ নিয়ে ক্ষোভ ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের পদত্যাগ দাবি করেছেন।
পদত্যাগের এই দাবি এমন সময়ে উঠলো, যখন ইরানে স্থল অভিযান অনুমোদনের দ্বারপ্রান্তে আছেন ট্রাম্প। তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা না দিলেও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, অভিযানের পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়েছে। এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়েছে কয়েক হাজার সেনা। গত শুক্রবার ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছিল, সম্ভাব্য সর্বোচ্চ সেনা মোতায়েনের সংখ্যা অন্তত ১০ হাজার হতে পারে।
মার্কিন সেনারা ইরানের ভূখণ্ডে যাবেন আর অক্ষত অবস্থায় লক্ষ্য অর্জন করে চলে আসবেন- বিষয়টা অতটা সরল নয়। সম্ভাব্য স্থল অভিযানের খবরে ইরানের পক্ষ থেকেও হুমকি দেওয়া হয়েছে। পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ রোববার বলেছেন, ইরানের সশস্ত্রবাহিনী অপেক্ষা করছে। অভিযান হলে আঞ্চলিক মার্কিন মিত্ররা কঠিন শাস্তির মুখে পড়বে।
যুক্তরাষ্ট্র মূলত স্থল অভিযানের কথা বিবেচনা করছে ইরানের খার্গ দ্বীপ ও হরমুজ প্রণালির কেশম দ্বীপ ঘিরে। গত শুক্রবার রয়টার্স তাদের এক প্রতিবেদনে লিখেছিল, স্থল অভিযানের ক্ষেত্রে মার্কিন সৈন্যরা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে। সম্ভাব্য ড্রোনের মধ্যে আছে- ক্যামেরাযুক্ত ‘ফার্স্ট-পারসন ভিউ ড্রোন’। যেকোনো সফল হামলার পর ইরানি প্রশাসন সেই আক্রমণের ভিডিও অনলাইনে প্রকাশ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মার্কিন সেনাদের মর্মান্তিক মৃত্যুর দৃশ্যগুলো প্রচার হলে তা সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে ট্রাম্পবিরোধী ক্ষোভ আরও তীব্র করতে পারে।
ইতোমধ্যে অনেক মার্কিন সেনা সদস্যদের পক্ষ থেকে যুদ্ধে যেতে না চাওয়ার খবরও সামনে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা ‘সেন্টার অন কনশিয়েনশস অ্যান্ড ওয়ার’-এর বরাত দিয়ে গত ৯ মার্চ মিডল ইস্ট আই জানিয়েছিল, অনেক সেনা সদস্য সংস্থাটির কাছে কল করে তাদের আপত্তির কথা জানিয়েছেন। সংস্থাটি মূলত বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগের বিরোধীতা নিয়ে কাজ করে।
রাজপথ ও জরিপের বার্তা
ট্রাম্পের বর্তমান মেয়াদে তৃতীয়বারের মতো বিক্ষোভটি হলো গত শনিবার। প্রথমটি হয় গত বছরের জুনে তাঁর ৭৯তম জন্মদিন এবং ওয়াশিংটনে আয়োজিত এক সামরিক কুচকাওয়াজের দিনে। একই বছরের অক্টোবরে হওয়া দ্বিতীয় দফার বিক্ষোভে ৭০ লাখ মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। আর শনিবারের কর্মসূচিতে যোগ দেওয়া মানুষের সংখ্যা ছিল ৮০ লাখের বেশি। এবার যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে অতিরিক্ত ৬০০টি স্থানে বিক্ষোভ হয়েছে।
বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, বিক্ষোভকারীরা ট্রাম্প প্রশাসনের ইরান যুদ্ধে জড়ানো নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। সংবিধানের ওপর হস্তক্ষেপের অভিযোগও তুলেছেন। পাশাপাশি ট্রাম্পকে ফ্যাসিস্ট উল্লেখ করে পদত্যাগ দাবি করেছেন।
এই বিক্ষোভের ঠিক চারদিন আগে একটি জরিপের তথ্য প্রকাশ করেছিল বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস। সেন্টার ফর পাবলিক অ্যাফেয়ার্স রিসার্চ-এর জরিপের ফলাফল ইঙ্গিত দিচ্ছে, চলমান সংঘাত ট্রাম্পের রিপাবলিকান সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রশাসনের জন্য খুব দ্রুত একটি বড় রাজনৈতিক দায় বা বোঝায় পরিণত হতে যাচ্ছে। জরিপে প্রায় ৬১ শতাংশ মার্কিনি ট্রাম্পের যুদ্ধ পরিচালনার সমালোচনা করেছেন।
যুদ্ধ, বিক্ষোভ, নির্বাচন
মার্কিন গণমাধ্যমগুলোর খবর অনুযায়ী, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে ট্রাম্প প্রশাসন ইতোমধ্যে রাজনৈতিক চাপে আছে। এমন অবস্থায় স্থল অভিযান চালানো হলে যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হবে বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
গত বৃহস্পতিবার ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসির লং ওয়ার জার্নালে দুই গবেষক রায়ান ব্রবস্ট ও ক্যামেরন ম্যাকমিলান লিখেন, স্থল অভিযানটি অত্যন্ত দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হলেও এটি মার্কিন সেনাদের চরম ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। যুদ্ধও তখন শেষ হওয়ার পরিবর্তে আরও দীর্ঘায়িত হবে। সেটি হলে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রিপাবলিকান পার্টি ও ডোনাল্ড ট্রাম্প বড় ধরনের রাজনৈতিক ঝুঁকির মুখে পড়বেন।
রোববার যুক্তরাজ্যের প্রথম জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা লর্ড রিকেটসও একই মত দিয়েছেন। স্কাই নিউজকে তিনি বলেছেন, আলোচনার মাধ্যমে কোনো মীমাংসার লক্ষণ আপাতত নেই। এখন এটি ট্রাম্পের ওপর নির্ভর করছে যে, তিনি যুদ্ধবিরতির দিকে যাবেন নাকি আমেরিকান সৈন্য পাঠিয়ে উত্তেজনা আরও বাড়াবেন।
লর্ড রিকেটস বলেছেন, স্থল অভিযান ট্রাম্পের জন্য একটি বিশাল এবং নিশ্চিতভাবেই প্রেসিডেন্সির ভাগ্য নির্ধারণকারী ঝুঁকি হতে যাচ্ছে।
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প কয়েক দফায় ইরানের শাসনব্যবস্থা বদলের হুমকি দিয়েছেন। অভিযানে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যা করতে পারলেও ইসলামিক শাসনব্যবস্থা এখনো টিকে আছে। যেটিকে যুদ্ধে ট্রাম্পের নৈতিক হার হিসেবে দেখছেন অনেকে।
অপরদিকে দেশজুড়ে এক-দুই দিনের ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভ হয়তো তাৎক্ষণিক কোনো ফলাফল বয়ে আনবে না। কিন্তু নভেম্বরের নির্বাচনের আগে বড় ধরনের বিক্ষোভ ইতোমধ্যে ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টিকে ভাবিয়ে তুলেছে। রোববার এএফপি তাদের এক প্রতিবেদনে লিখেছে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে জয়ের জন্য আদর্শিক বিশুদ্ধতা নাকি বৃহত্তর জনমত- কোন পথটি সবচেয়ে ভালো হবে, তা নিয়ে দলটির সক্রিয় কর্মীদের মধ্যে বিতর্ক চলছে।
সম্প্রতি হওয়া দুটি জরিপের (পিউ রিসার্চ ও এপি) ফলাফল ইঙ্গিত দিচ্ছে, অংশগ্রহণকারী অধিকাংশ মানুষ বর্তমান প্রশাসনের পক্ষে নেই। শনিবার ৮০ লাখ মানুষের বিক্ষোভ থেকেও পরিবর্তনের ডাক এসেছে। এ অবস্থায় ইরানে স্থল অভিযানের সিদ্ধান্ত ভুল প্রমাণিত হলে তা কি মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্প ও তাঁর দলের পরাজয়ের ঝুঁকি তীব্র করবে?