গণভোটের ফলাফল অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বানে আলোচনার জন্য গতকাল রোববার সংসদে মুলতবি নোটিশ দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। নোটিশের বৈধতা এবং আলোচনার সময় নির্ধারণে সরকারি ও বিরোধী দলের উত্তপ্ত বিতর্ক হয়। ডেপুটি স্পিকার আগামী মঙ্গলবার দিনের কার্যসূচি শেষে আলোচনার জন্য দুই ঘণ্টা সময় নির্ধারণ করেছেন। অন্যান্য কার্যক্রম মুলতবি না হলেও বিরোধী দলের নোটিশে তিন দশকের বেশি সময় পর আলোচনার সুযোগ দিয়েছেন স্পিকার।
এই রুল জারির পর স্পিকারের চেয়ারে থাকা ব্যারিস্টার কায়সার কামাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের মাইক বন্ধ করে তাঁকে নিজ আসনে বসার অনুরোধ করেন। সালাহউদ্দিন আহমেদ নোটিশের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলায় এ সময় বিরোধী দলের এমপিরা দাঁড়িয়ে তাঁর বক্তব্যের প্রতিবাদ জানান। দুই পক্ষের হট্টগোলের মধ্যে কায়সার কামাল স্পিকারের আসন থেকে বলেন, ইতোমধ্যে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে। আগামী মঙ্গলবার আলোচনা হবে।
সালাহউদ্দিন আহমেদ এরপরও নিজ আসনে দাঁড়িয়ে মাইক ছাড়াই কয়েক মিনিট বক্তৃতা করেন। যদিও তা শোনা যায়নি। বিরোধী দলের এমপিরাও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী না বসা পর্যন্ত আসন গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান। বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান এ সময় বলেন, তারা স্পিকারের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছেন। স্পিকার তখন উভয় পক্ষকে শান্ত করেন। রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপর আলোচনা শুরু করেন।
স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রমের অনুপস্থিতিতে রোববার সংসদ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল। এই হট্টগোলের সময় নিজ আসনে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি পুরো ঘটনাপ্রবাহ চুপচাপ দেখেন।
দ্বিতীয় সংসদে বিরোধী দলের প্রস্তাবে ২১ বার সংসদের কার্যক্রম মুলতবি করে আলোচনা হয়েছিল। পঞ্চম সংসদে পাঁচবার আলোচনা হয়। দুবারই বিরোধী দলের আসনে ছিল আওয়ামী লীগ। সরকারে ছিল বিএনপি। পরের সাতটি সংসদে বিরোধী দলের মুলতবি প্রস্তাবে সংসদে আলোচনার নেই। ১৯৯৪ সালের পর এবার প্রথম আলোচনা হতে যাচ্ছে। যদিও সংসদের অন্যান্য কার্যক্রম মুলতবি করে নয়, দিনের সব কাজ শেষে আলোচনা হবে।
কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী, মুলতবি প্রস্তাবে আলোচনার পর ভোট হবে সংসদে। বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় এই প্রস্তাবে বিরোধী দলের জয়ের সম্ভাবনা নেই সংসদে।
বিরোধী দলের মুলতবি নোটিশ
রোববার অধিবেশন শুরুর আগে জামায়াত-এনসিপি জোটের ৭৭ এমপির সংসদীয় দল সভা করে। এর আগে কার্যপ্রণালি বিধির ৬২ ধারা অনুযায়ী, মুলতবি নোটিশ দেন জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান।
এতে বলা হয়েছে, সংবিধান সংস্কার পরিষদ জরুরি-জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়ায় সংসদের অন্যান্য কার্যক্রম মুলতবি করে এ বিষয়ে আলোচনা হোক। ৬৪ ধারায় প্রশ্নোত্তর পর্বের পর এ নোটিশ উত্থাপন করেন বিরোধীদলীয় নেতা। এ সময় সরকারদলীয় চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেন, দিনের কার্যক্রম চলাকালে মুলতবি নোটিশ উত্থাপনের রীতি নেই।
মাগরিবের নামাজের বিরতির আগে বিরোধীদলীয় নেতা ফ্লোর নিয়ে নোটিশ উত্থাপন শুরু করেন, যা বিরতির পর সমাপ্ত করেন। তিনি প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদ আদেশ জারির প্রেক্ষাপট, গণভোট ও তার পরিপ্রেক্ষিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করার বিষয় তুলে ধরেন। জামায়াত আমির বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশের ১০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে পরিষদের প্রথম অধিবেশন আহ্বানের বিধান থাকলেও এখন পর্যন্ত তা হয়নি। জাতির প্রত্যাশাকে পাশ কাটিয়ে এ ধরনের অচলাবস্থা সৃষ্টি করা কাম্য নয়।
আইনমন্ত্রী সময় চাইলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রশ্ন তুললেন
বিরোধীদলীয় নেতা প্রস্তাবটি উত্থাপন করার পর ফ্লোর নিয়ে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, প্রস্তাবটি যৌক্তিক এবং সময়োপযোগী। এ বিষয়টি আলোচনার দাবি রাখে। তবে আলোচনার আগে একটু সময় প্রয়োজন। আলোচনা করতে প্রত্যেক সংসদ সদস্যের সামনে সংবিধান, জুলাই সনদ, বাস্তবায়ন আদেশ এবং গণভোট অধ্যাদশের কপি থাকা প্রয়োজন। যদি সম্ভব হয় মদিনা সনদ, হবস, লকস এবং রুশোর সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট থিওরির বই এবং ১৯৭২ সালের গণপরিষদ আদেশ ও তার প্রেক্ষাপটও থাকা উচিত।
আইনমন্ত্রী আরও বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে জাতি এক ধরনের বিভ্রান্তির মধ্যে রয়েছে। জাতি চায়, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন হোক এবং সরকার সে পথ ধরেই হাঁটছে। জুলাই সনদের প্রতিটি ধারা-উপধারা ধরে কীভাবে সরকার এগিয়ে চলছে, তা আমরা দেখাব। এটাও দেখাতে চাই, বিরোধী দল ইতোমধ্যে জুলাই সনদের কোন কোন ধারা লঙ্ঘন করেছে।
তাই আলোচনার জন্য সময় নির্ধারণে স্পিকারকে অনুরোধ জানান আইনমন্ত্রী। এরপর ফ্লোর নেন সালাহউদ্দিন আহমেদ। এতে বিরোধীদলীয় এমপিরা আপত্তি জানান। তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মঙ্গলবারের আলোচনার সঙ্গে সমর্থন করছি। আইনমন্ত্রী অত্যন্ত সহৃদয় ব্যক্তি। তিনি এক কথায় আলোচনার জন্য রাজি হয়ে গেছেন। কিন্তু বিরোধীদলীয় নেতা যে নোটিশ দিয়েছেন, তা ৬২ নয় ৬৮ ধারায় দিতে হবে। জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এ নোটিশ দেওয়া যায় ৬৮ ধারায়। বিরোধীদলীয় নেতা চাইলে নোটিশ সংশোধন করতে পারেন। স্পিকার চাইলে বিরোধীদলীয় নেতাকে নোটিশ সংশোধনের প্রস্তাব দিতে পারেন। বৈধভাবে নোটিশ হলে তারপর আলোচনা হবে।
বিরোধীদলীয় এমপিরা এর প্রতিবাদ জানালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পিকারের উদ্দেশে বলেন, ‘মাননীয় স্পিকার আপনার প্রোটেকশন চাচ্ছি। আমরা যেন আগের কালচারে ফিরে না যাই।’
স্পিকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বক্তব্য চালিয়ে যেতে বললে সালাহউদ্দিন বলেন, জুলাই সনদ, বাস্তবায়ন আদেশ নিয়ে আলোচনার সুযোগ নেই। কারণ বিধি ৬৩-তে বলা আছে, এমন কোন প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার সুযোগ নেই, যার প্রতিকার কেবল আইন প্রণয়নের মাধ্যমে হতে পারে। এই প্রস্তাবের প্রতিকারে সংবিধান সংশোধন করতে হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তখন সংবিধান সংশোধনে সরকারি ও বিরোধী দল মিলে কমিটি গঠনের কথা বলেন। বিরোধী দল এই বক্তব্যেরও প্রতিবাদ জানায়। এমপিরা বলতে শুরু করেন, গণভোট অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার করতে হবে, সংশোধন করতে হবে। তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংসদের ক্ষমতা সংবিধান প্রণয়ন, বাতিল ও রহিতের। সংস্কারের নয়। জুলাই সনদ অনুযায়ী সংশোধন হবে। বিএনপি ৫১ শতাংশ জনগণের ম্যান্ডেট পেয়েছে। দলের ইশতেহার অনুযায়ী সংশোধন করবে।
সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, আলোচনায় মুলতবি প্রস্তাব গ্রহণ করা হলেও ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোটে নাকচ হয়ে গেল, সেখানে যাব? সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে যেতে চাই না। সমঝোতার ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধন করতে চাই, যা জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের শহীদের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করতে পারে।
সংবিধান সংস্কার চায় বিরোধীরা
পরে বক্তৃতায় দাঁড়িয়ে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, এক দিনে দুই ভোট হয়েছে। সংবিধান সংশোধন নয়, সংস্কার করতে জনগণ আমাদের সংসদে পাঠিয়েছে।
জুলাই সনদ নিয়ে আলোচনার জন্য মঙ্গলবার সময় নির্ধারিত হলেও নাহিদ কেন বক্তৃতা করছেন– এ প্রশ্ন তোলেন সরকারি দলের চিফ হুইপ এবং দলটির এমপি জয়নুল আবদিন ফারুক। তখন স্পিকার নাহিদকে দিনের কার্যসূচি অনুযায়ী বক্তৃতা করতে বলেন।
নাহিদের পর এনসিপির আরেক এমপি আবদুল হান্নান মাসউদ জানান, সর্বকনিষ্ঠ এমপি হিসেবে তিনি সংসদে জেন-জির প্রতিনিধিত্ব করছেন। জেন-জি বাহাত্তরের সংবিধান চায় না।
ট্রেজারি বেঞ্চ থেকে তখন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, জেন-জি পুরো বাংলাদেশ না। জবাবে হান্নান মাসউদ বলেন, জেন-জি তরুণরা রক্ত দিয়েছিল বলেই আপনারা আজ প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী হতে পেরেছেন।