অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদের শেষ সময়ে এসে বৈদেশিক ঋণের এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। গত এক বছরে ৯ বিলিয়ন ডলারের বেশি অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণের ফলে দেশের মোট বৈদেশিক ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১১৩ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলারে। যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৪ লাখ কোটি টাকার সমান। অভিযোগ উঠেছে, ইউনূস সরকারের আমলে সংস্কারের দোহাই দিয়ে এই ঋণের বড় একটি অংশ সরকারের নীতিনির্ধারক ও সংশ্লিষ্টদের বিলাসিতা এবং ‘মোজমাস্তি’র পেছনে ব্যয় করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মোট বৈদেশিক ঋণের মধ্যে সরকারি খাতের ঋণের পরিমাণ সাড়ে ৯৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। ২০০৯ সালে যেখানে ঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র ২৩ বিলিয়ন ডলার। সেখানে বর্তমানে তা আকাশচুম্বী হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে গত এক বছরে নেওয়া ৯ বিলিয়ন ডলার ঋণের বড় অংশই ব্যয় হয়েছে সরকারের পরিচালনা কাজে, যা কোনো টেকসই আয় তৈরি করতে সক্ষম হয়নি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিগত সরকারের উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিরা রাষ্ট্রীয় টাকায় ঘনঘন বিদেশ সফর এবং বিলাসবহুল জীবনযাপন করে ঋণের অর্থের অপচয় করেছেন। এনসিপি ও সমন্বয়ক নামধারী একদল সুযোগসন্ধানী এই অর্থ দিয়ে আমোদ-প্রমোদে মেতেছিলেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। এমনকি সরকারের প্রভাবশালী মহলের কর ফাঁকি এবং রাজস্ব আদায়ে অনীহা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, বৈদেশিক মুদ্রায় আয় নিশ্চিত না করে এভাবে ঋণ নেওয়া দেশের জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।
অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন,”যে কাজের জন্য ঋণ নেওয়া হচ্ছে, সেখান থেকে যদি বিদেশি কারেন্সিতে আয় করে ঋণ পরিশোধের পথ তৈরি না হয়, তবে এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক ভয়াবহ বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।”
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, “আমাদের নতুন ঋণ নেওয়ার জায়গা সংকুচিত হয়ে এসেছে। ফরেন এক্সচেঞ্জ রিজার্ভের ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলা করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা এবং খরচের স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করে ঋণ নেওয়া মোটেও যৌক্তিক ছিল না।”
ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের শেষ বছরে এসে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায়ে চরম ব্যর্থতা লক্ষ্য করা গেছে। কর ফাঁকি রোধ এবং দুর্নীতি বন্ধে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে বরং বিদেশের ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে অনেক ক্ষেত্রে খাজনা ও ট্যাক্স মওকুফ সুবিধা ভোগ করেছেন সরকারের ঘনিষ্ঠরা। এমনকি প্রধান উপদেষ্টা ইউনূস নিজেই নিজের হাজার হাজার কোটি টাকার কর মওকুফ করে নিয়েছেন। যা সাধারণ মানুষের ওপর করের বোঝা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
বর্তমানে মোট ঋণের প্রায় সাড়ে ২৭ শতাংশই দীর্ঘমেয়াদি। বহুপাক্ষিক ও দ্বিপাক্ষিক ঋণের এই বিশাল কিস্তি পরিশোধ করতে গিয়ে দেশের অর্থনীতি অদূর ভবিষ্যতে বড় ধরনের সংকটে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সাধারণ মানুষের পেটে টান পড়লেও সরকারের ‘মোজমাস্তি’ ও অর্থ অপচয় থামেনি, যা নিয়ে এখন জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।