ইরানকেন্দ্রিক মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রথম আঘাত বাংলাদেশের ওপর

প্রকাশিতঃ এপ্রিল ১, ২০২৬ | ৫:০২ অপরাহ্ণ
অনলাইন নিউজ ডেক্স

ইরান যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে প্রথম ক্ষতিগ্রস্ত দেশে পরিণত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। টানা কয়েক সপ্তাহ ধরে রেশনিং করেও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় একটি কার্যকর পরিকল্পনা প্রণয়নে হিমশিম খাচ্ছে সরকার। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তেল ও গ্যাস ফুরিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি আছে, যা পরিস্থিতিকে আরও হতাশাজনক করে তুলছে বলে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যম টেলিগ্রাফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তবে দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটি ক্রমবর্ধমান জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি হওয়া একমাত্র দেশ নয়। ইরানের হরমুজ প্রণালি অবরোধের ফলে ভারতেও শিল্প উৎপাদন কমে গেছে। একই সময়ে ফিলিপাইন, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড জ্বালানি সরবরাহে রেশনিং চালু করছে, আর দক্ষিণ কোরিয়া জ্বালানি তেলের ব্যবহার সীমিত করার কথা বিবেচনা করছে। কিছু ক্ষেত্রে দেশগুলো জ্বালানি আমদানির জন্য চীনের সঙ্গে আলোচনায় বসতে বাধ্য হয়েছে এবং বেইজিং এই সংকটকে কাজে লাগাচ্ছে। বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস, যদি ইরানে মার্কিন সামরিক অভিযান চলতে থাকে, তবে যুক্তরাজ্যেও দুই সপ্তাহের মধ্যেই জ্বালানি ঘাটতি দেখা দিতে পারে। কিন্তু ১৭ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশই প্রথম জ্বালানি সংকটে পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত প্রায় ৮০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল ও তেলজাত পণ্য এশিয়ায় রপ্তানি হয়। একইসঙ্গে এলএনজি আমদানি প্রায় ৯০ শতাংশই হয় এই পথ দিয়ে। বাংলাদেশ তার জ্বালানির ৯৫ শতাংশ আমদানি করে, যার দুই-তৃতীয়াংশ আসে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরাকের মতো উপসাগরীয় দেশ থেকে। এই মাসে দেশটি প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার টন অপরিশোধিত তেল ও ডিজেল আমদানি করেছে, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৩ লাখ ৩২ হাজার টন। একটি সূত্র জানিয়েছে, জ্বালানি সংকটে সরকার ক্রমেই হতাশ হয়ে পড়ছে, কীভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করবে তা বুঝতে পারছে না। মার্চের শেষ দিকে বাংলাদেশের ইস্টার্ন রিফাইনারিতে ৮০ হাজার টন অপরিশোধিত তেল মজুদ ছিল, যা প্রায় ১৭ দিন চলার মতো। ডিজেল ও পেট্রলের মজুদও একইভাবে সীমিত। বাংলাদেশ নতুন করে তেল সংগ্রহে হিমশিম খাচ্ছে এবং বিশ্বজুড়ে নতুন উৎস খুঁজছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ৬ লাখ টন রাশিয়ান অপরিশোধিত তেল আমদানির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অনাপত্তি চেয়েছে এবং ইন্দোনেশিয়া থেকে ৬০ হাজার টন পেয়েছে। তবে যুদ্ধের আগে যে দামে কিনত, তার চেয়ে এখন দাম বেশি হওয়ার সম্ভাবনা। ভারত বাংলাদেশকে এ বছরের প্রথমার্ধে ৬০ হাজার টন ডিজেল সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু এখন নিজেদের সংকটের কারণে সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। রাজধানী ঢাকায় গাড়িচালকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা পেট্রোল পাম্পে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রয়েছে এবং সরকারি কর্মকর্তাদের দিনে বিদ্যুৎ ব্যবহার কমাতে বলা হয়েছে। সিএনজিচালিত অটোচালক মমিন উল্লাহ বলেন, ‘চার ঘণ্টা ধরে লাইনে আছি, এখনও জানি না গ্যাস পাব কিনা। খালি হাতে ফিরলে আজ আমার পরিবার না খেয়ে থাকবে।’ যাত্রীরা যাতায়াত বাতিল করছে, ডেলিভারি কর্মীরা বসে আছে এবং রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গণপরিবহন কমে গেছে। একটি সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশে ‘মাত্র ১০ থেকে ২১ দিনের জ্বালানি মজুদ’ থাকতে পারে। সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ‘যদি ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয় এবং সরবরাহ ব্যাহত থাকে, তবে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বাংলাদেশ কার্যত থমকে যেতে পারে।’ সরকার অবশ্য কোনো ঘাটতি থাকার কথা অস্বীকার করেছে। জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, ‘এ মুহূর্তে বাংলাদেশে কোনো জ্বালানি সংকট নেই। বরং গত বছরের তুলনায় সরবরাহ বেড়েছে।’ তিনি অতিরিক্ত ব্যবহারের জন্য পরিস্থিতিকে দায়ী করেন। এদিকে ভারতে গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন সাড়ে চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে নেমে গেছে। দক্ষিণ কোরিয়া ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের পর প্রথমবারের মতো গাড়ি ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার কথা ভাবছে। ফিলিপাইন ইতোমধ্যে জাতীয় জ্বালানি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। জাপান গত সপ্তাহে তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জরুরি তেল মজুদ (৮ কোটি ব্যারেল) ছেড়েছে, যা প্রায় ৪৫ দিন চলবে। মিয়ানমারে মানুষকে ঘরে থাকতে বলা হচ্ছে এবং জ্বালানি কেনায় সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে। কম্বোডিয়ায় এক-তৃতীয়াংশ পেট্রোল পাম্প বন্ধ হয়ে গেছে। এদিকে তেলের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১৬ ডলারে পৌঁছানোয় ইরান লাভবান হচ্ছে। একটি সূত্র জানায়, ইরান প্রতিদিন প্রায় ২ দশমিক ৮ মিলিয়ন ব্যারেল তেল রপ্তানি করছে, যা যুদ্ধের আগের সমান বা তারও বেশি। এই তেলের বড় অংশ চীনে যায়, যেখানে তা পণ্যের বিনিময়ে বা গোপন ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অর্থ জমার মাধ্যমে লেনদেন হয়। এই অর্থের বড় অংশ, প্রায় ৬ থেকে ৭ বিলিয়ন ডলার, যুদ্ধের ঝুঁকি এড়াতে বিভিন্ন দেশে সরিয়ে রাখা হয়েছে।