দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের দুই প্রধান উৎস—পণ্য রপ্তানি ও প্রবাসী আয়—এখন বিপরীতমুখী প্রবণতায় চলছে। প্রবাসী আয় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লেও রপ্তানি আয়ের বড় পতন সেই ইতিবাচক প্রভাবকে ছাপিয়ে গেছে। ফলে সামগ্রিকভাবে দেশে বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ কমেছে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার, যা সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য নতুন চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের মার্চ থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১২ মাসে দেশে রেমিট্যান্স আসে প্রায় ২৭.৩ বিলিয়ন ডলার। পরের ১২ মাসে, অর্থাৎ ২০২৫ সালের মার্চ থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩১.৮ বিলিয়ন ডলারে। এক বছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন ডলার বা ১৬ শতাংশ।
অন্যদিকে একই সময়ে রপ্তানি আয় ৫৪.৩ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৪৪.৬ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। অর্থাৎ এক বছরে রপ্তানি খাতে আয় কমেছে প্রায় ৯.৭ বিলিয়ন ডলার, যা প্রায় ১৮ শতাংশ পতন নির্দেশ করে। ফলে রপ্তানি ও রেমিট্যান্স মিলিয়ে মোট বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ ৮১.৬ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৭৬.৪ বিলিয়ন ডলারে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি, ইউরোপীয় বাজারে দুর্বল চাহিদা এবং বৈশ্বিক ক্রেতাদের সতর্ক অবস্থান অর্ডার কমিয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে চীন, ভিয়েতনাম ও ভারতের মতো প্রতিযোগী দেশগুলো তুলনামূলক কম দামে পণ্য সরবরাহ করে বাজারে অংশীদারিত্ব বাড়াচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা মূল্য প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, কেবল বৈশ্বিক চাহিদা হ্রাস নয়, দেশের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও রপ্তানি পতনকে ত্বরান্বিত করছে। জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, লজিস্টিক ব্যয় উচ্চ থাকা এবং পণ্যের সীমিত বৈচিত্র্য দীর্ঘদিন ধরে প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রভাবে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়েছে এবং সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি বৈদেশিক খাতের ভারসাম্যে কাঠামোগত দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। রেমিট্যান্স প্রবাহ সাময়িক স্বস্তি দিলেও রপ্তানি খাতের টানা নিম্নমুখী ধারা অব্যাহত থাকলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বিনিময় হার এবং আমদানি সক্ষমতার ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে রপ্তানি বাজার বৈচিত্র্য করা, উৎপাদন ব্যয় কমানো, জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা এবং বাণিজ্য কূটনীতি জোরদার করা এখন জরুরি হয়ে উঠেছে। অন্যথায়, রপ্তানির এই ধস দীর্ঘমেয়াদে সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।
চলতি বছরের মার্চে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ৩.৭৫ বিলিয়ন ডলার, যা একক মাসে সর্বোচ্চ। আগের বছরের একই মাসের তুলনায় প্রবৃদ্ধি প্রায় ১৪ শতাংশ। ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিনিময় হার সমন্বয়, বৈধ চ্যানেলে প্রণোদনা এবং অনানুষ্ঠানিক লেনদেনে নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধির কারণে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বেড়েছে।
তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, এর একটি বড় অংশ আগের অনানুষ্ঠানিক প্রবাহের আনুষ্ঠানিকীকরণ—যা টেকসই প্রবৃদ্ধির নিশ্চয়তা নয়।
রপ্তানি খাতের চিত্র ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চে দেশের পণ্য রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৩৪৮ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই মাসে ছিল ৪২৫ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি কমেছে প্রায় ১৮ শতাংশ।
টানা ৮ মাস ধরে এই নিম্নমুখী প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে মোট রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৫.৩৯ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৫ শতাংশ কম।
দেশের রপ্তানি কাঠামোর উচ্চ নির্ভরতা তৈরি পোশাক খাতের ওপর। মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশই আসে এ খাত থেকে। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে এখানেই বড় ধরনের সংকোচন দেখা যাচ্ছে। ২০২৫ সালের মার্চে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছিল ৩.৪৫ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৬ সালের মার্চে কমে দাঁড়িয়েছে ২.৭৮ বিলিয়ন ডলারে। এ সময়ে নিটওয়্যার রপ্তানি কমেছে প্রায় ২১ শতাংশ এবং ওভেন পোশাক কমেছে প্রায় ১৭ শতাংশ।