ভর্তুকি অনিশ্চয়তায়: গ্রীষ্মে বিদ্যুৎ সরবরাহে ঝুঁকি, বাড়ছে লোডশেডিংয়ের আশঙ্কা

প্রকাশিতঃ এপ্রিল ৪, ২০২৬ | ১০:০৭ অপরাহ্ণ
অনলাইন নিউজ ডেক্স

আসন্ন গ্রীষ্ম ও সেচ মৌসুমে সারাদেশে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ বজায় রাখা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগ অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে বড় অঙ্কের ভর্তুকি চেয়ে সতর্ক করেছে—সময়মতো অর্থ ছাড় না হলে উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটতে পারে এবং দেশজুড়ে লোডশেডিং পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের পাঠানো চাহিদাপত্র অনুযায়ী, মার্চ থেকে ডিসেম্বর সময়কালের জন্য ২০ হাজার ১৩৬ কোটি টাকা ভর্তুকি প্রয়োজন। তবে এ বিষয়ে অর্থ বিভাগের পক্ষ থেকে এখনো স্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত না আসায় অনিশ্চয়তা কাটেনি। খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ও বিক্রয়মূল্যের মধ্যে দীর্ঘদিনের ব্যবধানই বর্তমান সংকটের মূল কারণ। বিদ্যুৎ বিভাগের হিসাবে, প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে গড় ব্যয় ১২ টাকা ১৫ পয়সা, বিপরীতে পাইকারি বিক্রয়মূল্য ৭ টাকা ৪ পয়সা। ফলে প্রতি ইউনিটে ৫ টাকার বেশি লোকসান সরকারকে ভর্তুকির মাধ্যমে সমন্বয় করতে হচ্ছে। এই কাঠামোগত ঘাটতি সমাধান না হওয়ায় প্রতিবছরই ভর্তুকির চাপ বাড়ছে। ভর্তুকির বড় অংশই ব্যয় হচ্ছে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধে। চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের ফলে অনেক কেন্দ্র বছরের বড় সময় অলস থাকলেও চুক্তি অনুযায়ী কেন্দ্রভাড়া দিতে হচ্ছে সরকারকে। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, গত ১৫ বছরে এ খাতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা, যা ভর্তুকি চাপ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। এদিকে, টাকার অবমূল্যায়ন, জ্বালানি গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি এবং উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ আমদানির প্রভাবেও উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। গ্যাসের দাম কয়েক দফায় বাড়িয়ে ৫.০২ টাকা থেকে ১৫.৫০ টাকায় উন্নীত হওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ সরাসরি বেড়েছে। পাশাপাশি ডলারের বিপরীতে টাকার দরপতনে আমদানি নির্ভর জ্বালানি ও বিদ্যুতের ব্যয়ও বেড়েছে। চাহিদাপত্রে উল্লেখ করা হয়, জাতীয় গ্রিডে নতুন যুক্ত হওয়া তিনটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রাখতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ভর্তুকি প্রয়োজন। এগুলো হলো—শ্রীপুর ১৬০ মেগাওয়াট এইচএফওভিত্তিক কেন্দ্র, পটুয়াখালী ১৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র এবং মাতারবাড়ি আল্ট্রাসুপার ক্রিটিক্যাল কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র। এছাড়া ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির বিল পরিশোধ এবং সরকারি ও বিপিডিবির নিজস্ব বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনায়ও বড় অঙ্কের ভর্তুকি প্রয়োজন হবে। তবে ভর্তুকি বাড়ানোর এই প্রবণতা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর শর্তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সংস্থাটির ঋণ কর্মসূচির আওতায় ধাপে ধাপে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে ভর্তুকি কমানোর প্রতিশ্রুতি ছিল সরকারের। কিন্তু মূল্যবৃদ্ধি স্থগিত থাকায় ভর্তুকির চাপ আরও বেড়েছে। ভর্তুকির বিষয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের উপসচিব (উন্নয়ন-১) মো. সোলায়মান বলেন, “ভর্তুকি চেয়ে চিঠি পাঠানোর পর অর্থ বিভাগ থেকে এখনও কোনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। বিষয়টি নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে প্রতিনিয়ত আলোচনা চলছে। তবে, এই অর্থ ছাড় না পেলে বিদ্যুৎ সরবরাহে নিশ্চিতভাবেই প্রভাব পড়বে।” জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) প্রাক্তন অধ্যাপক ইজাজ হোসেইন বলেন, “বিদ্যুৎ খাতে এই বিপুল পরিমাণ ভর্তুকির দায় মূলত বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ভুল পরিকল্পনার। তারা পরিকল্পনা করেছিল তিন-চার মাস পরপর দাম বাড়িয়ে চলতি বছরের মধ্যেই ভর্তুকি সমন্বয় করবে। কিন্তু বর্তমান অন্তবর্তীকালীন সরকার বিদ্যুতের দাম বাড়ায়নি। এখন যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে বিদ্যুতের দাম না বাড়িয়ে এই ভর্তুকি সামলানো প্রায় অসম্ভব। সরকার এখনই দাম বাড়াতে চায় না, কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি বলছে দাম বৃদ্ধি আবশ্যক।” সব মিলিয়ে, বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকিনির্ভর বর্তমান কাঠামো ক্রমেই অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। নীতিগত সমন্বয় ছাড়া এ চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হবে—আর সেই চাপের প্রভাব গ্রীষ্মে গিয়ে পড়তে পারে সরাসরি গ্রাহক পর্যায়ে।