জাবালে রহমত আরাফার ময়দানে একদিন

প্রকাশিতঃ এপ্রিল ১১, ২০২৬ | ১১:০৯ অপরাহ্ণ
ড.আব্দুস সাত্তার, ওয়াশিংটন ডি সি

জাবালে রহমত (রহমতের পাহাড়) হলো- আরাফাতের ময়দানে অবস্থিত একটি পাহাড়। যা সৌদি আরবের মক্কার পূর্ব দিকে আরাফাতের ময়দানে অবস্থিত। এই পাহাড়ের চতুর্দিকে দৈঘ্য-প্রস্থে দুই মাইল সমতল ভূমিকে আরাফাতের ময়দান বলা হয়। অবশ্য আরাফাতের পাহাড়ের মাধ্যমে সমগ্র এলাকাকে বোঝানো হয়। পাহাড়টি বহুনামে পরিচিত, যেমন- ইলাল, জাবালে আরাফা, জাবালে রহমত, জাবালে দোআ, জাবালে মুশাহ, জাবালে করীম, জাবালে কুবকুব। এই পাহাড়টি ইসলামের ইতিহাসে বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ, তখন ১০ম হিজরি। ৬৩২ খ্রিস্টাব্দ। হজের জন্য হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়াসাল্লাম মক্কার আরাফার মাঠে অবস্থান করছেন। এই পাহাড়ে দাঁড়িয়েই মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়াসাল্লাম বিদায় হজের ভাষণ দিয়েছেন। সেই মাঠেই মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়াসাল্লামের ভাষণ শেষে এই আয়াত নাজিল হয়। এই মাঠের ছোট্ট পাহাড়ের নাম জাবালে রহমত। কল্যাণ ও করুণার পাহাড়। আমাদের চেতনার স্তম্ভ। মানবতার সৌধ। শান্তি ও মানবতার মিনার। এই ছোট পাহাড়ের বুকে দাঁড়িয়ে আছে ইসলামের সার্বভৌম অধ্যায়। শান্তি-মানবতা ও কল্যাণের রূপরেখা। কল্যাণের মানচিত্র। প্রতিবছর জিলহজ মাসের ৯ তারিখে সেই পাহাড় থেকে বিশ^ময় ছড়িয়ে পড়ে শান্তির বিভা। কল্যাণের জয়ধ্বনি। হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহতায়ালা জগদ্বাসীর জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছেন। আর মানবতার নবী, দয়ার নবীর শেষ ভাষণও দিয়েছেন জাবালে রহমতে বা রহমতের পাহাড়ে দাঁড়িয়ে। তাই বলি, এই পাহাড় আমাদের শান্তির ঠিকানা। এই পাহাড়ের ভাষণ উম্মাহর শান্তি-শৃঙ্খলা ও মানবতার প্রামাণ্য। আল্লাহর আদেশ অমান্য করে গন্ধম ফল খাওয়ায় প্রথম মানব মানবী আদম ও হাওয়াকে স্বর্গোদ্যান থেকে নামিয়ে দেওয়া হলো পৃথিবীতে। আদমকে সরনদীপে (শ্রীলংকা) ও হাওয়াকে জেদ্দায় (সঊদী আরব)। অবশ্য বিষয়টা নিয়ে অনেক মতভেদ আছে। ইসলামী ঐতিহ্য ও বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনামতে, পৃথিবীতে নির্বাসিত হওয়ার দীর্ঘ সময় পর আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.)-এর প্রথম পুনর্মিলন ঘটেছিল আরাফাতের জাবালে রহমত বা রহমতের পাহাড়ে। তখন পাহাড়ে তাঁদের সাক্ষাৎ হয় এবং ক্ষমা লাভ করেন। এই কারণে পর্বতের আরবি নাম জাবাল আর-রহমাহ, অর্থাৎ \"দয়াপর্বত\"। এই ঘটনাস্থল চিহ্নিত করতে পর্বতের চূড়ায় একটি স্তম্ভ স্থাপন করা হয়েছে। আমি ১৯৯০ সালে প্রথম গিয়েছিলাম, তারপর বহুবার গিয়েছি হজ ও ওমরায়, কখনো জাবলে রাহমতে উঠিনি। তখন পাথর বেয়ে বেয়ে অনেক কষ্ট করে উপরে উঠতে হতো। সেই সময় অনেকেই উপরে উঠতে পারতেন না। সম্প্রতি জাবালে রহমতকে মক্কার বাসিন্দা এবং দর্শনার্থীদের জন্য একটি উন্মুক্ত গন্তব্য হিসেবে সংস্কার করে নতুনভাবে সাজানো হয়েছে। ব্যাপক উন্নয়ন প্রচেষ্টার ফলে স্থানটি বছরব্যাপী পর্যটন আকর্ষণের স্থানে রূপান্তরিত হয়েছে। এই সংস্কার এমনভাবে করা হয়েছে যাতে পাহাড়ের গভীর ধর্মীয় এবং ঐতিহাসিক তাৎপর্য অক্ষুন্ন থাকে। সংস্কার কাজের অংশ হিসেবে দর্শনার্থীদের চলাচলের জন্য বিস্তৃত রাস্তা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা চালু করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে খাবারের দোকান,পার্কিং সেবা, পানীর ফোয়ারা, ছায়াযুক্ত বসার জায়গা এবং বাতাস ঠান্ডা রাখতে বিশেষ ফ্যান। নতুন সংস্কারের ফলে মক্কা ও এর আশেপাশের বাসিন্দরা যেমন জাবালে রহমতে ভিড় করছেন, তেমনি উমরা পালনকারীরা স্বাচ্ছন্দে এখানে এসে নফল নামাজ আদায় ও দোয়া করছেন। ইসলামের এই সমস্ত নিদর্শনগুলো দেখতে হলে হজের আগে বা পরে আসতে হবে ওমরা ভিসা অথবা ভিজিট ভিসায়। আল্লাহ সবাইকে তৌফিক দান করুন। আমিন।