যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশিদের অপমৃত্যুর হার উদ্বেগজনক

প্রকাশিতঃ এপ্রিল ১২, ২০২৬ | ৬:৪১ অপরাহ্ণ
অনলাইন নিউজ ডেক্স

সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও ধারণা করা হয়, যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে ১০ লক্ষাধিক বাংলাদেশি বসবাস করছে। সরকারি হিসাবে এ সংখ্যা কম-বেশি তিন লাখ। সাধারণত আনডকুমেন্টেড বা যুক্তরাষ্ট্রে বৈধ অবস্থানের নথিপত্রবিহীন বিদেশি লোকজন পরিসংখ্যানে উঠে আসে না। যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে বাংলাদেশিদের তিন শতাধিক সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে যারা যুক্ত, এমনকি যারা যুক্ত না হলেও সংগঠনগুলো তাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানে, তাদের অনুমিত সংখ্যা থেকে বাংলাদেশিদের সংখ্যা ১০ লক্ষাধিক দাবি করা হয়। তবে বড় বড় আমেরিকান শহরে বাংলাদেশিদের বসবাস, কাজকর্ম, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ইত্যাদিও বাংলাদেশিদের সংখ্যা নিরূপণে ভূমিকা রাখে। কেবল বাংলাদেশি নয়, সব বিদেশি কমিউনিটির ক্ষেত্রেই এমন অনুমিত সংখ্যা ব্যবহার করা হয়। নিউইয়র্ক, লস অ্যাঞ্জেলেস, আটলান্টিক সিটি, প্যাটারসন, মিশিগান এবং ফ্লোরিডা ও ইলিনয়ের কিছু শহরে জনসংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশিদের আনুপাতিক ঘনত্ব দৃশ্যমান। বাংলাদেশি-আমেরিকান তরুণ প্রজন্ম এখন অনেক কিছুতেই অগ্রসরমান। ভালো-মন্দ মিলিয়ে বাংলাদেশি কমিউনিটিও অনেকাংশে মিশে গেছে মূলধারায়। অপরাধ, ঘটনা-দুর্ঘটনায় এতদিন স্থায়ী কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানদের অবস্থান ছিল শীর্ষে। দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল মেক্সিকো এবং সেন্ট্রাল আমেরিকান দেশগুলো থেকে আগত স্প্যানিশ ভাষাভাষী হিসপানিকরা। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে এখন তা কম-বেশি সব কমিউনিটিতে ছড়িয়ে পড়েছে। পিছিয়ে নেই একশ্রেণির বাংলাদেশিও। গত বছরের জানুয়ারিতে অবৈধ ও অপরাধী অভিবাসীদের বিরুদ্ধে পরিচালিত ইউএস ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস এনফোর্সমেন্টের (আইস) অভিযানে তিন লক্ষাধিক বিদেশিকে বহিষ্কার করা হয়েছে। অন্যান্য কৌশল অবলম্বন ও নগদ অর্থ হাতে ধরিয়ে দিয়ে স্বেচ্ছা-বহিষ্কারের প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে আরও কয়েক লাখ অভিবাসীকে। তবে গুরুতর অপরাধ সংঘটনের অভিযোগে প্রায় পাঁচশ অভিবাসীকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে ১০ বাংলাদেশিও আছেন। তাদের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসা, স্বল্পবয়সি মেয়েদের যৌন ব্যবসায় নিয়োজিত করাসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করে, যার ক্ষেত্রে যা প্রযোজ্য, সেই শাস্তি বিধান করবে আদালত। ২০১২ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত ইতোমধ্যে অন্তত চার বাংলাদেশি অভিবাসীকে হত্যা, নাশকতা ও রাষ্ট্রবিরোধী ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত থাকার অপরাধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে। গত মাসে (ফেব্রুয়ারি ২০২৬) কোভিডকালীন ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার জন্য ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দেওয়া ন্যূনতম সুদে দীর্ঘকালীন যে অনুদান দেওয়া হয়েছিল, তাতে ব্যাপক নয়ছয় ঘটায় নিউইয়র্ক স্টেট অ্যাটর্নির পক্ষ থেকে করা এক মামলায় আট আসামির মধ্যে সাতজনই বাংলাদেশি অভিযুক্ত হয়েছে। তাদের গ্রেফতার করে আদালতে তোলা হলে বিচারকের সামনে তারা তাদের বিরুদ্ধে আনীত অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ স্বীকার করে আত্মসাৎকৃত অর্থ সরকারি কোষাগারে প্রত্যর্পণ করার মুচলেকা দিয়ে জামিন লাভ করেছেন। এসব অভিযোগের বাইরেও প্রতারণার মাধ্যমে এক বা একাধিক বাংলাদেশি অংশীদারত্বের ভিত্তিতে ব্যবসা শুরু করার কিছুদিন পর পুরো ব্যবসা একজন অংশীদার কর্তৃক হাতিয়ে নিয়ে নিরীহ অংশীদারকে সর্বস্বান্ত করার অনেক ঘটনা ঘটেছে ও ঘটছে। এমন বেশকিছু ঘটনাও আছে, আমেরিকায় যেহেতু ওয়াকফ আইন অচল, সেজন্য নিউইয়র্ক সিটির হাউজিং বিধি অনুযায়ী মসজিদের জন্য মসজিদ কমিটির ‘পরম বিশ্বস্ত’ একজনের নামে বাড়ি কেনার পর যার নামে বাড়িটি কেনা হয়েছিল, তিনি আর মসজিদ কমিটিকে বাড়ি বুঝিয়ে না দিয়ে নিজেই বাড়ির মালিকানা নিয়েছেন। ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার চেয়ে আদালতে মামলা রুজু করেছেন; কিন্তু তাতে কোনো ফল হয়নি। যেহেতু বাড়িটি একজনের নামে কেনা হয়েছে, দলিলপত্রে বাড়ি সেই ব্যক্তির নামে রেজিস্ট্রিকৃত, অতএব আদালতের রায়ে বাড়ির আসল মালিক হয়ে গেছেন আত্মসাৎকারী ব্যক্তি। মহৎ উদ্দেশ্যও এসব ক্ষেত্রে ব্যক্তিবিশেষের নোংরামির কারণে লোভের সার্বিক হতাশার জন্ম দিয়ে চলেছে। প্রতারণা গুটিকয়েক বাংলাদেশির পেশায় পরিণত হয়েছে বললে বোধহয় বাড়িয়ে বলা হবে না। নিউইয়র্ক সিটির ব্রঙ্কসে রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী হিসাবে পরিচয়দানকারী এক বাংলাদেশি ভদ্রলোক সপরিবারে বসবাস করতেন এক মিসরীয় অভিবাসীর মালিকানাধীন বাড়িতে। মিসরীয় ব্যক্তি একজন ট্যাক্সি ড্রাইভার। দীর্ঘ নয় বছর বাংলাদেশি ভাড়াটিয়া তাকে বাড়িভাড়া পরিশোধ করেননি। বাড়িমালিক ভাড়া চাইলে বরং হুমকি দিয়েছেন তার কন্যার সঙ্গে অশোভন, ইঙ্গিতপূর্ণ আচরণ করেছেন বলে মামলা করার। বেচারি বাড়িমালিক হতাশা-দুঃখে বেপরোয়া হয়ে ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে তার বাংলাদেশি ভাড়াটিয়াকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে কারাগারে যাওয়াকে বরং প্রাধান্য দিয়েছেন। দীর্ঘদিন বসবাস করেও বাড়িভাড়া পরিশোধ না করা কিছু চিহ্নিত বাংলাদেশি ভাড়াটিয়া আছেন। বাংলাদেশি কমিউনিটির সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধির অনুষঙ্গ হিসাবে এসব অবাঞ্ছিত ঘটনা বেড়ে চলেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর আইন প্রয়োগে একপর্যায়ে হয়তো হ্রাস পাবে। দ্বিতীয় প্রজন্মের বাংলাদেশিরা যখন আমেরিকার মূলধারায় ব্যাপকভাবে জড়িত হবে, তখন তাদের মধ্যে এ ধরনের অপরাধপ্রবণতা হ্রাস পাবে বলে ধারণা করা যায়। যুক্তরাষ্ট্রে এখন যেসব বাংলাদেশি অভিবাসী অপরাধ কার্যকলাপে লিপ্ত, তারা জন্মসূত্রে বাংলাদেশি, বৈধ বা অবৈধ উপায়ে যুক্তরাষ্ট্রে এসে বৈধতা পেয়ে ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে আছেন, গ্রিনকার্ড পেয়েছেন অথবা ন্যাচারালাইজ্ড সিটিজেন হয়েছেন। অপরাধপ্রবণতার পাশাপাশি বাংলাদেশি অভিবাসীদের অপমৃত্যুর ঘটনাও বেড়ে চলেছে। বরং বলা যায়, বড় শহরগুলোতে অভিবাসী কমিউনিটির মধ্যে বাংলাদেশিদের অপমৃত্যুর হারও তুলনামূলকভাবে বেশি। অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা সবসময় স্পর্শকাতর। সেজন্য তাদের মাঝে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা প্রবল। প্রতিটি অস্বাভাবিক মৃত্যু ও দুর্ঘটনা সব বাংলাদেশি অভিবাসীকে কাঁদায় এবং তাদের শঙ্কিত করে। গত ৬ এপ্রিল পর্যন্ত এক সপ্তাহে তিনটি অঙ্গরাজ্য-নিউইয়র্ক, ক্যালিফোর্নিয়া ও ফ্লোরিডায়-চারটি পৃথক ঘটনায় পাঁচ বাংলাদেশি নিহত এবং একজনের রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের দুজন নারী। নিহতদের চারজনই নিউইয়র্কে দুটি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। অপর দুটি ঘটনার একটি ঘটেছে ফ্লোরিডায়, যেখানে এক গ্যাস স্টেশনের মাঝবয়সি বাংলাদেশি নারীকর্মী নীলুফার ইয়াসমিনকে (৪৮) এক কৃষ্ণাঙ্গ দুর্বৃত্ত হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করেছে। আরেকজন ১৯ বছর বয়সি তরুণী নিশাত ট্রাকের নিচে চাপা পড়ে নিহত হয়েছেন। চতুর্থ ঘটনায় ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেসে বাংলাদেশি তরুণ সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার ২৯ বছর বয়সি সাকিব আলীর মরদেহ উদ্ধার করা হয় তার নিজ অ্যাপার্টমেন্ট থেকে। এসব অপমৃত্যুর ঘটনা আমেরিকান বাংলাদেশি কমিউনিটিতে শোক ছড়িয়ে দেয়। দুর্ঘটনার ঘটনাগুলোর কোনো নিষ্পত্তি কখনোই ঘটে না। এজন্য প্রয়োজন সতর্কতা অবলম্বন ও সচেতনতা সৃষ্টির। সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি ভীতির কারণ হয়ে উঠেছে সম্ভাবনাময় তরুণ-তরুণীদের অপমৃত্যুর ঘটনাগুলো, যা বাংলাদেশি আমেরিকান কমিউনিটিতে উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সের অনেক সন্তানকে হারিয়েছেন বাংলাদেশি কমিউনিটির মা-বাবারা। এসব মৃত্যুর অধিকাংশই ঘটছে মাদকসেবন, নিঃসঙ্গতা ও নৈরাশ্য থেকে; প্রতিবেশ ও পরিবারের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারায় এবং অসৎ সঙ্গের কারণে। এ দেশে সন্তানদের নিয়ে অভিভাবকরা প্রায় সার্বক্ষণিক উদ্বেগে কাটান। মৃত্যুর কোনো সময় নির্ধারিত নেই বলে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো মৃত্যুই অকালমৃত্যু নয়। কিন্তু মৃত্যু তো দুঃখ বয়ে আনে। কোনো কোনো মৃত্যু একটি প্রতিষ্ঠিত পরিবারকেও ধ্বংস করে দেয় অথবা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে। বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান যেমন শক্তিমত্তাসহ সবকিছুর শীর্ষে, তেমনি অপমৃত্যুর ক্ষেত্রেও দেশটির অবস্থান শীর্ষে। আত্মহত্যা, আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে পরিচালিত সহিংসতা, হত্যা ও সড়ক দুর্ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর অপমৃত্যুর শিকার হন কয়েক লাখ মানুষ। যুক্তরাষ্ট্রে অপমৃত্যুর পরিসংখ্যান ভয়াবহ। ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আত্মহত্যা করেছে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ। বেশির ভাগই তাদের নিজেদের আগ্নেয়াস্ত্রের গুলিতে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন। আত্মহত্যা ছাড়াও এদেশে দৈনিক গড়ে ১২০ জন নিহত হয় আগ্নেয়াস্ত্রের গুলিতে। সব মিলিয়ে নানা উপায়ে ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে নিহত হয়েছে ৪২ হাজারের বেশি মানুষ। একই বছর সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ৪৩ হাজার প্রাণহানি ঘটেছে। বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, আমেরিকান জনসংখ্যার উল্লেখ্যযোগ্য একটি অংশ অপরাধপ্রবণ। তবে আইনের শাসনের কঠোরতার কারণে এর বহিঃপ্রকাশ সীমিত। তারপরও উন্নত জীবন-জীবিকার অন্বেষণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের হাজারও মানুষ পাহার-সমুদ্র পেরিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আসছেন যুক্তরাষ্ট্রে। আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু : যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সিনিয়র সাংবাদিক